kalerkantho


বিজয় দাস

বেঁচে ফিরব ভাবিনি

শরীফ আহেমদ শামীম, গাজীপুর   

১১ মার্চ, ২০১৭ ০০:০০



বেঁচে ফিরব ভাবিনি

ব্রাহ্মণবাড়িয়ার তিতাস পারের যুদ্ধে আমাদের হাতে ২০-২৫ জন পাকিস্তানি সেনা নিহত হয়। আত্মসমর্পণ করে পাঁচ-সাতজন। ওই যুদ্ধে আমাদের কমান্ডার ক্যাপ্টেন নাসিম (পরে সেনাপ্রধান) গুলিবিদ্ধ হয়েছিলেন। তার পরও মুক্তিযুদ্ধের কথা উঠলে, চোখে ভেসে ওঠে ৯ ডিসেম্বর আশুগঞ্জ বিদ্যুৎকন্দ্রের যুদ্ধের ছবি। বেঁচে ফিরব কল্পনাও করিনি। দুই দিনের যুদ্ধে মুক্তি ও মিত্রবাহিনীর তিন শতাধিক সদস্য শহীদ এবং পাকিস্তানি বাহিনীর শতাধিক সেনা নিহত হয়েছিল। পরে আমাদের সাঁড়াশি আক্রমণে টিকতে না পেরে ভৈরব রেলসেতু উড়িয়ে দিয়ে পিছু হটে পাকিস্তানি সেনারা। ১১ ডিসেম্বর সকালে আশুগঞ্জ মুক্ত করে বাংলাদেশের পতাকা ওড়ায় মুক্তিযোদ্ধা ও মিত্রবাহিনী। স্মরণীয় মুক্তিযুদ্ধের কথা জানতে চাইলে এসব কথা জানান বিজয় দাস।

পেশায় কৃষক এই মুক্তিযোদ্ধার বয়স এখন ৬২ বছর। গাজীপুর সদর উপজেলার বাড়িয়া গ্রামের বঙ্কু বিহারী দাসের ছেলে তিনি।

মুক্তিযুদ্ধে শহীদ ও অসহায় পরিবারের বিপদে-আপদে পাশে থাকায় তাঁর আরেক পরিচয় ‘বিপদের বন্ধু’। যুদ্ধের সময় তিনি ছিলেন বাড়িয়া উচ্চ বিদ্যালয়ের দশম শ্রেণির ছাত্র। রোল নাম্বার এক। তখন ছিলেন মা-বাবার একমাত্র সন্তান। স্বাধীনতার পর তাঁর আরো এক ভাই ও চার বোনের জন্ম হয়। বিজয় দাসের ছেলে পীযূষ কান্তি দাস পুলিশ কনস্টেবল। মেয়ে স্মৃতি রানী দাস বিবাহিত। নিজের দুই-তিন বিঘা জমি আছে। জমির ফসল ও মুক্তিযোদ্ধা ভাতায় অভাব-অনটনে কোনো রকমে জীবন চলে তাঁর।

বিজয় দাস জানান, যুদ্ধ শুরুর পর ১৪ মে তাঁদের গ্রামে লুটপাট, অগ্নিসংযোগ, ধর্ষণ ও গণহত্যা চালায় পাকিস্তানিরা। অনেকে বালু নদী পার হয়ে পাশের কালীগঞ্জ উপজেলায় আশ্রয় নেয়। ওই দিন মা-বাবার সঙ্গে পালিয়ে তিনি প্রাণে বেঁচে গেলেও ঠাকুরমাসহ দুই শতাধিক গ্রামবাসী নিহত হয়। তিন দিন পর গ্রামে ফিরে দেখেন বাড়ির আঙিনায় লাশ শিয়াল-কুকুরে খাচ্ছে। ঠাকুরমাই ছিল তাঁর সব। ওই দিনই শপথ নেন, যাঁরা বৃদ্ধ নিরপরাধ ঠাকুরমাকে হত্যা করেছে, গ্রামের মানুষকে হত্যা ও ধর্ষণ করেছে, যুদ্ধে গিয়ে তাদের খতম করে প্রতিশোধ নেবেন, দেশ স্বাধীন করবেন।

বিজয় দাস জানান, পরিকল্পনা অনুযায়ী জুন মাসের প্রথম দিকে ট্রেনিং নিতে ১৭-১৮ বন্ধু মিলে ভারতের উদ্দেশে রওনা হন। প্রথমে গাজীপুরের পুবাইল বাজার থেকে নৌকায় কাঁচপুর, সেখান থেকে বেবিট্যাক্সিতে বৈদ্যেরবাজার। এরপর গ্রামের ক্ষেত-খামারের ভেতর দিয়ে কয়েক মাইল হেঁটে নদী পার হয়ে ভারতের আগরতলার টিপরা রাজাবাড়ি পৌঁছেন। হাপানিয়া ক্যাম্পে গিয়ে ট্রেনিং গ্রহণ শুরু করেন তিনি।

বিজয় দাস বলেন, একদিন ১১ ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের একজন মেজর ক্যাম্পে আসেন সৈনিক পদে লোক ভর্তির জন্য। কয়েক হাজার যুবকের মধ্যে আমিসহ ৫০-৫৫ জন বাছাইয়ে উত্তীর্ণ হয়ে ১৫ সেপ্টেম্বর রেজিমেন্টের ডি (ডেল্টা) কম্পানির ১০ প্লাটুনে সিপাহি পদে নিয়োগ পাই। ট্রেনিংয়ের জন্য আমাদের নিয়ে যাওয়া হয় আগরতলার ফটিকছড়া ক্যাম্পে। সেখানে ডিনামাইট, টাইমবোমা, স্টেনগান, গ্রেনেড, এসএলআর রাইফেল, এলএমজিসহ ১৩ ধরনের অস্ত্র চালনার ওপর প্রশিক্ষণ দিয়ে আমাদের গেরিলা হিসেবে গড়ে তোলা হয়। ট্রেনিং ইনস্ট্রাক্টর ছিলেন রেজিমেন্টের লে. নায়েক মো. কাশেম, হাবিলদার মো. আবদুর রহমান, হাবিলদার মো. মতিউর রহমান মতিন, সুবেদার মেজর মো. তৈয়ব আলী ও নজরুল ইসলাম।

ম্মৃতি হাতড়ে বিজয় দাস বলেন, ভারতীয় মিত্র বাহিনীর নির্দেশে ১১ ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্ট প্রচুর গোলাবারুদসহ কুমিল্লা সীমান্ত দিয়ে ২ ডিসেম্বর রাতে বাংলাদেশে প্রবেশ করে। তখন রেজিমেন্টে এ (আলফা), বি (ব্রাভো), সি (চার্লি) ও ডি (ডেল্টা)—এ চার কম্পানি ছিল। প্রতি কম্পানিতে তিনটি করে প্লাটুন ছিল। প্রতি প্লাটুনে সিপাহি ছিল ৬০ জন করে। প্লাটুনের নেতৃত্বে ছিলেন একজন করে ক্যাপ্টেন। আমি ছিলাম ডি কম্পানির ১০ নম্বর প্লাটুনে। এর কমান্ডার ছিলেন ক্যাপ্টেন নাসিম, যিনি পরে সেনাপ্রধান হয়েছিলেন। রাত ১০টার দিকে বাংলাদেশে প্রবেশের পর পরই রাজাকারদের টহলের মুখে পড়তে হয়। কিন্তু আমাদের বিশাল বাহিনীর কারণে রাজাকাররা পালায়। যুদ্ধ করতে করতে আমরা ঢাকার দিকে এগোতে থাকি। ৪ ডিসেম্বর ব্রাহ্মণবাড়িয়ার তিতাস নদের পূর্ব তীরে এসে হানাদারদের তীব্র বাধার মুখে পড়তে হয়। শুরু হয় মুখোমুখি তুমুল যুদ্ধ। আমাদের হাতে ২০-২৫ জন পাকিস্তানি সেনা নিহত হয়। আত্মসমর্পণ করে পাঁচ-সাতজন। তাদের মধ্যে একজন হঠাৎ অস্ত্র কেড়ে নিয়ে আমাদের কমান্ডার ক্যাপ্টেন নাসিমকে গুলি করে। তাঁর পায়ে গুলি লাগে।

বিজয় দাস বলেন, যুদ্ধ করতে করতে আমরা এগোতে থাকি। ইন্টেলিজেন্স আর্টিলারির মাধ্যমে আমরা খবর পাই আশুগঞ্জ বিদ্যুৎকন্দ্রে পাকিস্তানি সেনারা ক্যাম্প করেছে। তাদের উদ্দেশ্য ছিল ১১ ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টকে ঢাকায় ঢুকতে বাধা দেওয়া। তাদের সঙ্গে ট্যাংক, মর্টারসহ আধুনিক যুদ্ধ সরঞ্জাম ছিল। ৯ ডিসেম্বর ভোরে ভারতীয় বিহার রেজিমেন্ট ও স্থানীয় মুক্তিযোদ্ধারা আশুগঞ্জ সার কারখানা ও বিদ্যুৎকন্দ্রের পাকিস্তানি সেনাদের ঘিরে ফেলে এবং তীব্র আক্রমণ চালায়। ওই যুদ্ধে তিন শতাধিক মিত্রবাহিনীর সদস্য ও মুক্তিযোদ্ধা শহীদ হন। ধ্বংস হয় ছয়টি ট্যাংক। পাকিস্তানি সেনাদের আক্রমণে পিছু হটতে থাকে মিত্রবাহিনীর আরো আটটি ট্যাংক। তখন মিত্রবাহিনীর রেজিমেন্ট ছিল মাত্র এক কিলোমিটার দূরে দুর্গাপুর গ্রামে। দুপুর ১২টার দিকে তারা আমাদের দেখে ওপরের দিকে গুলি ছুড়তে শুরু করে। উদ্দেশ্য ছিল আমরা শত্রু না মিত্রপক্ষ সেটা যাচাই করা। একটি গোলা আমাদের দিকে ছুটে আসে। ভেবেছিলাম আর বাঁচব না। কারণ ডেল্টা কম্পানি ছিল অগ্রভাগে। ওই গোলা আমাদের পাশ দিয়ে চলে যাওয়ায় বেঁচে যাই। ভুল বোঝাবুঝির বিষয়টি বুঝতে পেরে ক্যাপ্টেন নাসিম তাত্ক্ষণিক আমাদের আত্মসমর্পণের নির্দেশ দেন। ক্যাপ্টেন নাসিম নিজে আত্মসমর্পণের কায়দায় একটি অস্ত্র উঁচু করে দৌড়ে ট্যাংকের কাছে গিয়ে জানান, আমরা মিত্র বাহিনীর সদস্য। পরে দুর্গাপুর গ্রামে আমরাসহ পিছু হটা বিহার রেজিমেন্ট বাংকার খনন শুরু করি। আসতে থাকে আরো ভারতীয় ট্যাংক। ১০ ডিসেম্বর মিত্রবাহিনী ও বেঙ্গল রেজিমেন্ট সারা রাত ধরে প্রস্তুতি নিয়ে ভোরে আশুগঞ্জ বিদ্যুৎকন্দ্রের রেস্ট হাউসে পাকিস্তানি অবস্থানে হামলা চালায়। সঙ্গে যোগ দেয় ভারতীয় বোমারু বিমান। যুদ্ধে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন তত্কালীন লে. কর্নেল কে এম সফিউল্লাহ। সঙ্গে ছিলেন লে. কর্নেল মোর্শেদ, মেজর নাসির, ক্যাপ্টেন মো. নাসিম, ক্যাপ্টেন মতিনসহ আরো অনেকে। দিনভর ব্যাপক যুদ্ধ চলে। অবশেষে রাতে পাকিস্তানি বাহিনী আশুগঞ্জ থেকে ভৈরবে পালিয়ে যায়। যাওয়ার আগে তারা ডিনামাইট দিয়ে মেঘনা নদীর ওপর রেলসেতুর একাংশ উড়িয়ে দেয়। এতে দুটি স্প্যান ভেঙে নদীতে পড়ে যায়। আশুগঞ্জ মুক্ত করতে গিয়ে যুদ্ধে শহীদ হন সুবেদার সিরাজুল ইসলাম, ল্যান্স নায়েক আব্দুল হাই, সিপাহি কফিল উদ্দিনসহ অনেকে। আশুলিয়া ছিল পাকিস্তানিদের অন্যতম শক্তিশালী ঘাঁটি। বিভিন্ন এলাকা থেকে মুক্তিযোদ্ধা ও সাধারণ লোকজনকে ধরে এনে সাইলোর কাছে, মেঘনা নদীর ওপর নির্মিত রেলসেতুর কাছে, ধানের আড়তের মাঠে, মাছ বাজারে, রেলস্টেশনের কাছে গুলি করে হত্যা করা হতো। নারীদের এনে ধর্ষণ-নির্যাতন করা হতো। ১১ ডিসেম্বর ভোরে আমরা আশুগঞ্জ দখল করে বাংলাদেশের পতাকা ওড়াই। এ যুদ্ধের স্মৃতি আমি কোনো দিন ভুলব না।

বীরযোদ্ধা বিজয় দাস জানান, এরপর ভারতীয় হেলিকপ্টারের সাহায্যে মেঘনা নদী পার হয়ে আমরা ভৈরবে পাকিস্তানি বাহিনীর ওপর হামলার প্রস্তুতি নিতে থাকি। এরই মধ্যে ১৬ ডিসেম্বর পাকিস্তানিরা ঢাকায় আত্মসমর্পণ করে। আমরা ১৭ ডিসেম্বর আশুগঞ্জ থেকে হেঁটে পরদিন নরসিংদী কলেজে গিয়ে আশ্রয় নিই। বিকেলে ট্রেন এসে আমাদের ঢাকায় নিয়ে যাওয়া হয়। ১৯ ডিসেম্বর ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের ডি কম্পানির ১০ প্লাটুনের সৈনিকদের  বঙ্গভবনের নিরাপত্তায় মোতায়েন করা হয়। তখন অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি সৈয়দ মো. নজরুল ইসলাম ও প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদ বঙ্গভবনে বসে দেশ পরিচালনা করতেন। পরের বছরের ২৫ জানুয়ারি আমাকে বঙ্গভবন থেকে খুলনায় বদলি করা হয়। পরে এসএসসি পরীক্ষা এবং মা-বাবার ইচ্ছার কারণে চাকরি থেকে ইস্তফা দিয়ে বাড়ি ফিরে আসি।

বিজয় দাস জানান, ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের সৈনিক হলেও মাত্র কয়েক মাস চাকরি করার কারণে তিনি পেনশন পাননি। এখন অভাব-অনটনে তাঁর সংসার চলে। বঙ্গবন্ধুকন্যা তাঁর পেনশনের ব্যবস্থা করে দিলে তাঁর কাছে চিরকৃতজ্ঞ থাকবেন বলে জানান এই দরিদ্র মুক্তিযোদ্ধা।


মন্তব্য