kalerkantho


জাতীয় নাগরিক কমিশনের প্রতিবেদন

সন্তানরা বাইরে পড়ে তাই পাঠ্য বই নিয়ে নেতারা গাছাড়া

নিজস্ব প্রতিবেদক   

১১ মার্চ, ২০১৭ ০০:০০



সন্তানরা বাইরে পড়ে তাই পাঠ্য বই নিয়ে নেতারা গাছাড়া

পাঠ্যপুস্তক সাম্প্রদায়িকীকরণ কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। নতুন প্রজন্ম পাকিস্তানি ধারায় শিক্ষিত হলে বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ হবে অন্ধকার।

ক্ষমতাসীন ১৪ দল কিংবা বিএনপি-জামায়াতের নেতাদের সন্তানরা বাংলাদেশে লেখাপড়া করেনি, যারা করেছে তারাও বাংলা মাধ্যম বা মাদরাসায় পড়েনি। এমনকি গোলাম আযম, নিজামীর ছেলেরাও মাদরাসায় পড়েনি। সে জন্য বাংলাদেশের শিক্ষাক্রমে তাদের কিছু যায় আসে না। তাদের সন্তানরা বিদেশে নির্ভয়ে থাকবে, দেশে এলে উচ্চপদে থাকবে। আর সাধারণের সন্তানদের দাস হয়ে থাকতে হবে। তাই সমাজের প্রগতিশীল, শুভবুদ্ধি ও মানবিক বোধসম্পন্ন মানুষকে এই সাম্প্রদায়িকীকরণের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াতে হবে।

পাঠ্যপুস্তক সাম্প্রদায়িকীকরণ তদন্তে গঠিত জাতীয় নাগরিক কমিশনের প্রতিবেদনের পর্যবেক্ষণে এসব কথা বলা হয়েছে। গতকাল শুক্রবার রাজধানীর ধানমণ্ডিতে ডাব্লিউভিএ মিলনায়তনে কমিশনের প্রতিবেদন প্রকাশ করা হয়। পরিস্থিতির উন্নয়নে কমিশনের প্রতিবেদনে ১২ দফা সুপারিশ করা হয়েছে।

কমিশনের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০১৭ সালে পাঠ্যপুস্তক নিয়ে যে বিতর্ক ও সমালোচনা হচ্ছে তার দুটি দিক আছে—রাজনীতি ও দক্ষতা। রাজনীতির সঙ্গে জড়িত আছে নির্বাচন ও ভোট এবং ক্ষমতায় থাকার ভিত্তি, যা বর্তমান পাঠ্যক্রম নির্মাণে ভূমিকা রেখেছে। যারা এই পাঠ্যক্রমের দাবি করেছিল তাদের লক্ষ্য রাজনীতির সঙ্গে দূরবর্তী কৌশলও। ১৪ দল তাদের এই নীতি বাস্তবায়নে সহায়ক ভূমিকা পালন করেছে। কারণ তারা মনে করেছে. এতে তারা ভোটের ক্ষেত্রে সুবিধা পাবে। ১৪ দলীয় সরকার সব সময় প্রচার করছে তারা অসাম্প্রদায়িকতার পক্ষে। কিন্তু পাঠ্য বইয়ে জেনেশুনে যে সাম্প্রদায়িকীকরণ করা হয়েছে, তা কখনো বাঙালি জাতি গঠনে সহায়তা করবে না বরং জিয়াউর রহমান উদ্ভাবিত পাকিস্তানি জাতীয়তাবাদ বিকাশে সহায়তা করবে।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, হেফাজতে ইসলামের দাবি ছিল প্রথম থেকে দ্বাদশ শ্রেণি পর্যন্ত যে লেখকদের গল্প-কবিতা অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে, তাতে হিন্দু লেখকদের লেখা বেশি। কিন্তু তাদের এ দাবি মিথ্যা। পাঠ্যপুস্তকে ৩৩ জন মুসলমান ও ২০ জন হিন্দু ও অন্যান্য ধর্মের লেখকের লেখা রয়েছে। হেফাজতের দাবি ছিল, বিভিন্ন সময়ে ১৭টি লেখা বাদ পড়েছে, সেগুলো ফিরিয়ে আনতে হবে। আর ২০১৩ সালে যুক্ত হওয়া ১২টি লেখাও বাদ দিতে হবে। এ ২৯ লেখার বিষয়ে হেফাজতের দাবি মেনে নেওয়া হয়েছে।

প্রতিবেদনে বিভিন্ন শ্রেণির বাংলা, ইংরেজি, গণিত, ইসলাম ও নৈতিক শিক্ষা, মাদরাসার বই, কিন্ডারগার্টেনসহ বিভিন্ন বইয়ের বানান ভুল, বিভ্রান্তিকর ও ভুল তথ্য এবং সাম্প্রদায়িকীকরণের তথ্যও বিশদভাবে তুলে ধরা হয়।

গত জানুয়ারিতে একাত্তরের ঘাতক-দালাল নির্মূল কমিটির জাতীয় সম্মেলনে সাম্প্রতিক শিক্ষাক্রমে সাম্প্রদায়িকীকরণ তদন্তে বিচার বিভাগীয় তদন্ত কমিশন গঠনের দাবি করা হয়। পরে গত ১১ ফেব্রুয়ারি নির্মূল কমিটির সভায় বিচারপতি গোলাম রব্বানীকে সভাপতি করে জাতীয় নাগরিক কমিশন গঠন করা হয়। কমিশনের সদস্যরা হলেন অধ্যাপক অজয় রায়, বিচারপতি সৈয়দ আমিরুল ইসলাম, অধ্যাপক অনুপম সেন, বিচারপতি শামসুল হুদা, কথাসাহিত্যিক অধ্যাপক হাসান আজিজুল হক, শিক্ষাবিদ শ্যামলী নাসরিন চৌধুরী, অধ্যাপক পান্না কায়সার, অধ্যাপক ফরিদা মজিদ, শিক্ষাবিদ মমতাজ লতিফ ও লেখক সাংবাদিক শাহরিয়ার কবির।

 

কমিশনের সদস্যসচিব ছিলেন অধ্যাপক মুনতাসীর মামুন এবং সমন্বয়কারীর দায়িত্ব পালন করেন তপন পালিত। এক মাসের মাথায় গতকাল কমিশন তাদের প্রতিবেদন প্রকাশ করল।

অথচ পাঠ্যপুস্তকে ভুল নিয়ে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে তিনটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হলেও এ পর্যন্ত কেবল একটি কমিটি তাদের প্রতিবেদন জমা দিয়েছে। তবে সেটিও প্রকাশ করা হয়নি। আর বই দেওয়ার আড়াই মাস হতে চললেও জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড (এনসিটিবি) এখনো বইয়ের ভুল সংশোধনের তালিকা স্কুলে স্কুলে পাঠাতে পারেনি।

নাগরিক কমিশন তাদের প্রতিবেদনে ১২টি সুপারিশ করেছে। সেগুলো হলো—হেফাজতের দাবির কারণে পাঠ্যসূচিতে যে সাম্প্রদায়িকীকরণ হয়েছে তা থেকে সরে আসার ঘোষণা সরকারকেই দিতে হবে, ক্রমান্বয়ে একমুখী শিক্ষার দিকে অগ্রসর হতে হবে, মাদরাসা শিক্ষায় আমূল পরিবর্তন আনতে হবে, বর্তমান ব্যবস্থায় বাংলার বদলে যেভাবে উর্দুকে প্রাধান্য দেওয়া হচ্ছে তা বন্ধ করতে হবে, শিক্ষা মন্ত্রণালয়কে আরো কয়েকটি ভাগ করে মনিটরিং ও শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে হবে, এনসিটিবির সিন্ডিকেট ভাঙতে হবে, শুধু বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের দিয়ে বই লেখানো বাদ দিতে হবে, শিক্ষা ক্ষেত্রে বর্ণবাদ, মৌলবাদ ও সাম্প্রদায়িকতা পরিহারের প্রয়োজনে দায়ী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে; কবীর চৌধুরী শিক্ষা কমিশন শুধু বাস্তবায়নই নয়, শিক্ষা আইন পাস করাতে হবে; বইয়ের ভুলের জন্য দায়ীদের ব্যাপারে কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে, মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস ও বাঙালি জাতির ইতিহাস পাঠ বাধ্যতামূলক করতে হবে, যেসব প্রতিষ্ঠানে জাতীয় পতাকা উত্তোলন হয় না, জাতীয় সংগীত গাওয়া হয় না; তাদের বিচারের মুখোমুখি করতে হবে। হেফাজতে ইসলাম ও জামায়াতে ইসলামীর মতো মৌলবাদী সংগঠনকে নিষিদ্ধ করতে হবে। একই সঙ্গে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের রন্ধ্রে রন্ধ্রে অবস্থানকারী জামায়াত-হেফাজতিদের অপসারণ করতে হবে।

প্রতিবেদন প্রকাশ অনুষ্ঠানে পাঠ্য বই সাম্প্রদায়িকীকরণ নিয়ে আলোচনা সভাও হয়। সেখানে বিচারপতি মোহাম্মদ গোলাম রব্বানীর সভাপতিত্বে বক্তব্য দেন শাহরিয়ার কবির, অধ্যাপক মুনতাসীর মামুন, সাবেক আইনমন্ত্রী ব্যারিস্টার শফিক আহমেদ, অধ্যাপক অনুপম সেন, বিচারপতি শামসুদ্দিন চৌধুরী মানিক, শিক্ষাবিদ রাশেদা কে চৌধুরী ও শহীদজায়া শ্যামলী নাসরিন চৌধুরী। সঞ্চালনা করেন ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটির সাধারণ সম্পাদক কাজী মুকুল।

বিচারপতি মোহাম্মদ গোলাম রব্বানী বলেন, ‘পাঠ্য বইয়ে সাম্প্রদায়িকীকরণ বন্ধে আদালতে একটি রিট চলমান রয়েছে। বিচার বিভাগ আমাদের কখনো নিরাশ করেনি। আর বিচার বিভাগের কাজে এই প্রতিবেদন সহায়তা করবে। ’


মন্তব্য