kalerkantho


রিট করেই পদে ফিরছেন বরখাস্ত জনপ্রতিনিধিরা

আশরাফ-উল-আলম ও রেজাউল করিম   

১১ মার্চ, ২০১৭ ০০:০০



রিট করেই পদে ফিরছেন বরখাস্ত জনপ্রতিনিধিরা

নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের সাময়িক বরখাস্ত করার বিধান নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। সংশ্লিষ্ট আইনের এসংক্রান্ত ধারাগুলো রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে বলে মনে করছেন বিশিষ্টজন ও আইনজ্ঞরা।

২০০৯ সালে করা স্থানীয় সরকার (সিটি করপোরেশন) আইনের ১২(১) ধারায় বলা হয়েছে, কোনো সিটি করপোরেশনের মেয়র বা কাউন্সিলরের বিরুদ্ধে ফৌজদারি মামলায় চার্জশিট বা অভিযোগপত্র গৃহীত হলে সরকার লিখিত আদেশের মাধ্যমে ওই মেয়র বা কাউন্সিলরকে সাময়িক বরখাস্ত করতে পারবে। স্থানীয় সরকারের অন্যান্য স্তর যেমন ইউনিয়ন পরিষদ, উপজেলা পরিষদ, পৌরসভার ক্ষেত্রেও আইনে একই রকম বিধান রাখা হয়েছে।

স্থানীয় সরকার (ইউনিয়ন পরিষদ) আইনের ৩৪(১) ধারা, স্থানীয় সরকার (উপজেলা পরিষদ) আইনের ১৩খ(১) ধারা এবং স্থানীয় সরকার (পৌরসভা) আইনের ৩১(১) ধারায়ও বলা হয়েছে, সংশ্লিষ্ট স্থানীয় সরকারের কোনো নির্বাচিত প্রতিনিধির বিরুদ্ধে ফৌজদারি মামলায় আদালতে চার্জশিট গৃহীত হলে বা আদালত কোনো ফৌজদারি অপরাধ আমলে নিলে সরকার লিখিত আদেশের মাধ্যমে ওই জনপ্রতিনিধিকে সাময়িক বরখাস্ত করতে পারবে।

বর্তমান সরকারের আমলে সিটি করপোরেশন, পৌরসভা ও ইউনিয়ন পরিষদের নির্বাচিত অনেক জনপ্রতিনিধি বিভিন্ন মামলায় চার্জশিটভুক্ত হওয়ায় তাঁদের একের পর এক সাময়িক বরখাস্ত করা হয়। কিন্তু উচ্চ আদালতের নির্দেশে উল্লেখযোগ্যসংখ্যক জনপ্রতিনিধি পদ ফিরেও পেয়েছেন। ফলে স্থানীয় সরকার আইনের ওই সব ধারার কার্যকারিতা থাকছে না।

সর্বশেষ গত রবিবার সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ রাজশাহীর মেয়র মোসাদ্দেক হোসেন বুলবুলের সাময়িক বরখাস্তের ক্ষেত্রে হাইকোর্টের দেওয়া রায় বহাল রেখেছেন। বিএনপির এই নেতা মেয়র নির্বাচিত হওয়ার পর ২০১৫ সালের ৭ মে তাঁকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছিল।

 এরপর তিনি হাইকোর্টে রিট আবেদন করেন।

শুনানি শেষে হাইকোর্ট একই বছরের ২৮ মে এক রায়ে বুলবুলের সাময়িক বরখাস্তের আদেশ স্থগিত করেন। রিটের পূর্ণাঙ্গ শুনানি শেষে ২০১৬ সালের ১০ মার্চ হাইকোর্ট স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের আদেশ অবৈধ ঘোষণা করেন এবং বুলবুলকে মেয়র পদে পুনর্বহালের নির্দেশ দেন। হাইকোর্টের রায়ের বিরুদ্ধে সরকার আপিল বিভাগে আবেদন করলে চেম্বার জজ হাইকোর্টের রায় স্থগিত করেন। গত রবিবার আপিল বিভাগ সরকারের আবেদন খারিজ করে দেন। এখন বুলবুলের মেয়র পদ ফিরে পেতে আর কোনো আইনগত বাধা নেই বলে তাঁর আইনজীবীরা জানান। তবে সরকার ইচ্ছা করলে রিভিউ আবেদন করতে পারে। সে ক্ষেত্রে বুলবুলেন মেয়র পদ ফিরে পেতে আরো কিছুদিন সময় লাগতে পারে।

এ প্রসঙ্গে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের সচিব আবদুল মালেক কালের কণ্ঠকে বলেন, মামলার রায়সংক্রান্ত কাগজপত্র এখনো হাতে পাননি। পাওয়ার পর আইনি পদক্ষেপ নেওয়া হবে।

২০১৬ সালের ২০ মার্চ হবিগঞ্জ পৌরসভার টানা তৃতীয়বারের মতো নির্বাচিত মেয়র জি কে গউছকে সাময়িক বরখাস্ত করে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়। জি কে গউছের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে গত ২৩ জানুয়ারি হাইকোর্ট বরখাস্তের ওই আদেশ স্থগিত করেন।

গাজীপুর সিটি করপোরেশনের মেয়র বিএনপি নেতা এম এ মান্নানকে ২০১৫ সালের ১৯ আগস্ট সাময়িক বরখাস্ত করা হয় এক আদেশে। ওই আদেশের বিরুদ্ধে মেয়র মান্নান পরের বছর ৩১ মার্চ হাইকোর্টে রিট আবেদন করেন। গত বছর ১১ এপ্রিল হাইকোর্ট মেয়র মান্নানের বরখাস্ত আদেশ স্থগিত করেন। সরকার আপিল বিভাগে গেলে আপিল বিভাগ হাইকোর্টের আদেশ বহাল রাখেন।

স্থানীয় সরকার সংস্থার সংশ্লিষ্ট আইনের অন্য ধারা অনুযায়ী কোনো জনপ্রতিনিধি সাময়িকভাবে বরখাস্ত থাকা অবস্থায় ওই পদের দায়িত্ব পালন করে থাকেন অন্য প্যানেল সদস্যরা। এ পর্যন্ত যাঁদের সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে তাঁদের বেশির ভাগই বিএনপি সমর্থক। ইউনিয়ন পরিষদ, পৌরসভা, উপজেলা পরিষদ, সিটি করপোরেশনের মেয়র বা চেয়ারম্যানকে সাময়িক বরখাস্ত করার পর বেশির ভাগ স্থানে আওয়ামী লীগ থেকে নির্বাচিত সদস্যদের দায়িত্ব দেওয়া হচ্ছে। এ কারণেই অভিযোগ উঠেছে, বিরোধী দল থেকে নির্বাচিত প্রতিনিধিদের দায়িত্ব পালন করতে না দেওয়ার জন্যই সাময়িক বরখাস্তের ওই বিধান রাখা হয়েছে এবং প্রয়োগ করা হচ্ছে।

সর্বশেষ নির্বাচনের পর শতাধিক জনপ্রতিনিধিকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়। এরই মধ্যে হাইকোর্টে রিট আবেদন করে পদ ফিরে পেয়েছেন ৪০ জনের বেশি জনপ্রতিনিধি, যাঁদের প্রায় সবাই বিএনপি ও মিত্র দলের নেতা বা সমর্থক। বিএনপির পক্ষ থেকে অভিযোগ করা হচ্ছে, রাজনৈতিক স্বার্থেই বিএনপি ও তার মিত্রদের জনপ্রতিনিধি হিসেবে কাজ করতে না দেওয়ার জন্যই আইনে এমন বিধান রাখা হয়েছে। একই সঙ্গে বিএনপি ও তার মিত্র দলের নেতাকর্মীদের ক্ষেত্রেই বিধানটি প্রয়োগ করা হচ্ছে।

ওই বিধানটি আইনের সাধারণ নীতির পরিপন্থী এবং দেশের সংবিধানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক বলেই জনপ্রতিনিধিদের সাময়িক বরখাস্তের আদেশ উচ্চ আদালতে টিকছে না। আইনের সাধারণ নীতি হচ্ছে—কোনো আদালত কাউকে দোষী সাব্যস্ত না করা পর্যন্ত তাঁকে অপরাধী বলা যাবে না। স্থানীয় সরকার আইনে কারো বিরুদ্ধে ফৌজদারি মামলায় দেওয়া চার্জশিট আদালতে গৃহীত হলেই একজন নির্বাচিত প্রতিনিধিকে শাস্তিমূলকভাবে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়। আদালতে দোষী সাব্যস্ত হওয়ার আগেই তিনি হয়ে যান ‘অপরাধী’। বিষয়টি আইনের সাধারণ নীতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।

গণতন্ত্র ও মানবাধিকার প্রসঙ্গে সংবিধানের ১১ অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, ‘প্রজাতন্ত্র হইবে একটি গণতন্ত্র, যেখানে মৌলিক মানবাধিকার ও স্বাধীনতার নিশ্চয়তা থাকিবে, মানবসত্তার মর্যাদা ও মূল্যের প্রতি শ্রদ্ধাবোধ নিশ্চিত হইবে এবং প্রশাসনের সকল পর্যায়ে নির্বাচিত প্রতিনিধিদের মাধ্যমে জনগণের কার্যকর অংশগ্রহণ নিশ্চিত হইবে। ’ স্থানীয় শাসন প্রসঙ্গে সংবিধানের ৫৯ অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, ‘আইনানুযায়ী নির্বাচিত ব্যক্তিদের সমন্বয়ে গঠিত প্রতিষ্ঠানসমূহের উপর প্রজাতন্ত্রের প্রত্যেক প্রশাসনিক একাংশের স্থানীয় শাসনের ভার প্রদান করা হইবে। ’ অর্থাৎ ইউনিয়ন পরিষদ, উপজেলা পরিষদ, জেলা পরিষদ, পৌরসভা ও সিটি করপোরেশনের শাসনকাজ পরিচালনা করবেন নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিরা। আদালতে দোষী সাব্যস্ত হওয়ার আগে তাঁদের ‘অপরাধী’ আখ্যা দিয়ে সাময়িক বরখাস্ত করা সংবিধানের এই অনুচ্ছেদের সঙ্গে সাংঘর্ষিক। এসব কারণেই জনপ্রতিনিধিদের সাময়িক বরখাস্ত করার আদেশ উচ্চ আদালতে টিকছে না। ফলে আইনের সংশ্লিষ্ট ধারার কার্যকারিতাই থাকছে না। এই মুহূর্তে স্থানীয় সরকার সংস্থার সংশ্লিষ্ট আইনের ওই ধারা সংশোধন করা জরুরি হয়ে পড়েছে বলে মত দেন বিশিষ্টজন ও আইনজ্ঞরা।

জানা গেছে, সিটি করপোরেশন, পৌরসভা, ইউনিয়ন পরিষদ ও উপজেলা পরিষদের ৪১ জন প্রতিনিধিকে সাময়িক বরখাস্তের আদেশ এ পর্যন্ত স্থগিত করেছেন হাইকোর্ট। এ সময়ে বিভিন্ন জেলায় শতাধিক জনপ্রতিনিধিকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়। তাঁদের মধ্যে আছেন দিনাজপুরের ১১ জন, চাঁপাইনবাবগঞ্জের ৯ জন, কক্সবাজারের পাঁচজন, সাতক্ষীরার আটজন, বগুড়ার ২০ জন, চাঁদপুরের চারজন, হবিগঞ্জের চারজন, রাজশাহীর দুজন, সিলেটের মেয়র আরিফুল হক চৌধুরীসহ ৯ জন, ধোবাউড়া উপজেলা চেয়ারম্যানসহ ময়মনসিংহের দুজন, শরীয়তপুরের পৌর মেয়র, কিশোরগঞ্জের তিনজন, নড়াইলের একজন ও নারায়ণগঞ্জের দুজন। তাঁদের মধ্যে শরীয়তপুরের পৌর মেয়র আবদুর রব মুন্সী জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি। তিনি একটি দুর্নীতির মামলায় জড়িয়ে পড়ায় তাঁকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়। সাময়িক বরখাস্ত হওয়া ১১ জন হলেন জামায়াতের। বাকি সবাই বিএনপির বলে জানা গেছে।

রাজশাহীর বুলবুলকে মেয়র পদে পুনর্বহাল করতে দেশের সর্বোচ্চ আদালতের দেওয়া আদেশের পর জনপ্রতিনিধিদের সাময়িক বরখাস্তের বিধানটি কার্যকারিতা হারাবে বলেই মনে করেন আইনজ্ঞ ও বিশিষ্টজনরা। এ পর্যন্ত সাময়িক বরখাস্ত হওয়া সব জনপ্রতিনিধি স্বপদে ফিরবেন বলে তাঁদের অভিমত।

সুশাসনের জন্য নাগরিকের (সুজন) সম্পাদক ড. বদিউল আলম মজুমদার কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘এটি বলার অবকাশ রাখে না যে সরকার দ্বারা এসব সাময়িক বরখাস্ত আদেশ রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত। সর্বোচ্চ আদালত যখন নির্বাচিত প্রতিনিধির সাময়িক বরখাস্ত আদেশ অবৈধ ঘোষণা করছেন, তখন স্থানীয় সরকার আইনের বরখাস্তসংক্রান্ত বিধানের কার্যকারিতা নিয়েও প্রশ্ন উঠতে পারে। ’ তিনি আরো বলেন, স্থানীয় সরকার শক্তিশালীকরণে একটি কমিশন হয়েছিল। ওই কমিশন এ রকম সাময়িক বরখাস্তের আদেশের বিষয়ে সুরক্ষা প্রদানের সুপারিশ করেছিল সরকারের কাছে। তার কোনো প্রতিফলন নেই। যখন-তখন কোনো নির্বাচিত প্রতিনিধিকে সাময়িক বরখাস্তের পরিণতি ভালো হয় না। যদি কোনো প্রতিনিধির বিরুদ্ধে ফৌজদারি মামলার রায়ে সাজা হয় তখন এ রকম সিদ্ধান্ত নিতে পারে সরকার।

বাংলাদেশ বার কউন্সিলের ভাইস চেয়ারম্যান আবদুল বাসেত মজুমদার কালের কণ্ঠকে বলেন, এ রকম বিধান প্রয়োগে সতর্ক হওয়া উচিত। কারণ অনেক সময় নির্বাচিত প্রতিনিধিকে সাময়িক বরখাস্তের কারণে সরকারকেও প্রশ্নের মুখোমুখি হতে হয়। প্রবীণ এই আইনজ্ঞ আরো বলেন, যে বিধানবলে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয় বা কর্তৃপক্ষ কোনো নির্বাচিত প্রতিনিধিকে বরখাস্ত করে, ওই বিধান উচ্চ আদালতের আদেশ ছাড়া তা অকার্যকর হবে না।

ঢাকা আইনজীবী সমিতির সাবেক সভাপতি ও বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা মো. বোরহান উদ্দিন বলেন, যে সাময়িক বরখাস্তের আদেশ উচ্চ আদালতে টিকছে না সেটা আপনা আপনি কার্যকারিতা হারাবে।

সংবিধান বিশেষজ্ঞ ড. শাহদীন মালিক কালের কণ্ঠকে বলেন, যে বিধানবলে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয় বিভিন্ন নির্বাচিত জনপ্রতিনিধির দায়িত্ব স্থগিত করছে, ওই বিধান সম্পর্কে স্থগিত আদেশদানকারীদের স্পষ্ট ধারণা নেই। ফলে দলীয় বিবেচনায় বেশির ভাগ স্থগিতাদেশ দেওয়া হচ্ছে। সর্বোচ্চ আদালত যখন স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের এ রকম আদেশের বিরুদ্ধে বারবার রায় দিচ্ছে, তখন স্থগিতের ওই বিধান বাস্তবায়নে সংশ্লিষ্টদের সতর্ক হওয়া উচিত। এ ছাড়া স্থানীয় সরকার আইনের যে বিধানবলে কোনো নির্বাচিত প্রতিনিধির পদ স্থগিত হয় এটিও প্রশ্নবিদ্ধ, কারণ এই বিধান হলো কেন্দ্রীয় সরকার দ্বারা স্থানীয় সরকারকে নিয়ন্ত্রণের হাতিয়ার, যা কোনোভাবে যৌক্তিক নয়। এটি সংবিধানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক। তাই ওই বিধান সংশোধন করা জরুরি হয়ে পড়েছে।


মন্তব্য