kalerkantho


নুরুল ইসলাম ইছাম

যুদ্ধের কথা মনে হলে এখনো শরীর স্তব্ধ হয়ে যায়

হাকিম বাবুল, শেরপুর   

১০ মার্চ, ২০১৭ ০০:০০



যুদ্ধের কথা মনে হলে এখনো শরীর স্তব্ধ হয়ে যায়

‘তন্তর, কাটাখালি, নালিতাবাড়ীতে যুদ্ধ করেছি। তবে তেলিখালির যুদ্ধের সঙ্গে অন্য কোনো যুদ্ধের তুলনা হয় না। দিনের বেলা সামনাসামনি যুদ্ধ, সেটাই ছিল সবচেয়ে কঠিন যুদ্ধ। রাত ১২টা থেকে পরদিন দুপুর ২টা পর্যন্ত যুদ্ধ হয়েছে। বৃষ্টির মতো গোলাগুলি হয়েছে। মাথার ওপর দিয়ে গুলি যাচ্ছিল; মনে হচ্ছিল, এই বুঝি গুলি লাগবে, এই বুঝি মারা যাব। এলএমজি, এসএমজি, রাইফেল, সিক্স পাউন্ডার, গ্রেনেড—সব ব্যবহৃত হয়েছে সেই যুদ্ধে। অবশেষে পাকিস্তানি বাহিনীর ক্যাম্প দখলে এলো। ওই দিনের যুদ্ধের কথা মনে পড়লে এখনো শরীর স্তব্ধ হয়ে যায়। ’

মুক্তিযুদ্ধের স্মরণীয় ঘটনা সম্পর্কে জানতে চাইলে এভাবেই সেই সব দিনের বিবরণ দেন মুক্তিযোদ্ধা নুরুল ইসলাম ইছাম। শেরপুরের নালিতাবাড়ী উপজেলার বরুয়াজানি গ্রামের বাসিন্দা তিনি।

ছিলেন দুর্ধর্ষযোদ্ধা।

তেলিখালি যুদ্ধের বর্ণনা দিতে গিয়ে তিনি বলেন, ‘ভারতের মেঘালয়ের তোরায় আমাদের কম্পানি দুটি ভাগে ছিল। এক ভাগ ছিল দুমনিপাড়ায়। আরেক ভাগ পাঁচ-ছয় কিলোমিটার দূরে গাছুয়াপাড়ায়, ওই ক্যাম্পে আমরা ছিলাম। সেখানে আমাদের দুটি প্লাটুন ছিল। তখন রোজার মাস। আমাদের বলা হলো, যাত্রাকোনা যেতে হবে। যাত্রাকোনা থেকে ছোট একটি নদী পার হলেই হালুয়াঘাটের তেলিখালি। দুপুরে খাওয়ার পর রওনা হলাম। আর্মির গাড়ি আমাদের নিয়ে যায়। জীবনে প্রথম কারেন্ট (বিদ্যুৎ) দেখলাম সেখানে। বিএসএফ অস্থায়ী ক্যাম্প বসিয়েছিল; সব কিছু তৈরি যাত্রাকোনায়। বড় কিছু ঘটবে। ’

‘রাতে আমরা তেলিখালির দিকে অগ্রসর হই। পূর্ণিমার রাত, ফুটফুটে চাঁদের আলো। সব দেখা যাচ্ছে। ’ তিনি বলেন, “কড়ইতলা-বাঘাইতলা-ফরেস্ট ক্যাম্প অফিসের জন্য কাটআপ পার্টি হিসেবে তিন কম্পানি ছিল। আমরা ছিলাম বাঘাইতলায়। যাত্রাকোনায় আমরা ১৭-১৮ জন গেলাম। রাত ৯টার পর রওনা হলাম যাত্রাকোনা থেকে। রাত ১০টায় বাঘাইতলা ক্যাম্পের কাছে পৌঁছি। আমাদের সঙ্গে ইন্ডিয়ান আর্মির কয়েকজন ছিল। আমরা বাঁশে ঝোলানো টেলিফোনের তার বেয়নেট দিয়ে কেটে দেই, যাতে পাকিস্তানি আর্মি বাঘাইতলার সঙ্গে যোগাযোগ না করতে পারে। কিন্তু তার কাটার বিষয়টি তারা টের পেয়ে যায়। তারা গুলি ছুড়তে শুরু করে। রাত তখন ১১টার মতো। তারা সার্চলাইট মারে। ক্ষেতের বাতরের (আইল) আড়াল নিয়ে শুয়ে পড়ি আমরা। কমান্ডাররা রেকি করতে শুরু করে। বাংকার থেকে পাকিস্তানি বাহিনী গুলি ছুড়ছিল। মাথার ওপর দিয়ে মুহুর্মুহু গুলি যাচ্ছিল। মাঝেমধ্যে গ্রেনেড ছুড়ে অগ্রসর হচ্ছিলাম। ওই দিন আমাদের পাসওয়ার্ড ছিল ‘পাগড়ি’ কিংবা ‘গামছা’। আমার ভাই জিয়াউল, টুআইসি শওকত ও তাদের সাত-আটজন সঙ্গী হাইডআউটে থেকে সব কিছু রেকি করছিল। ইন্ডিয়ান আর্মিও ঘুরছিল। একপর্যায়ে তারা ইন্ডিয়ান আর্মির সামনে পড়ে যায়, তত্ক্ষণাৎ পাসওয়ার্ড না বলায় ফায়ারিংয়ে পড়ে টুআইসি শওকত মারা যায়। আমার বড় ভাই জিয়াউলও মারা গেছে বলে শুনতে পাই। ”

নুরুল ইসলাম ইছাম বলেন, ‘আমরা খুব সুবিধা করতে পারছিলাম না। ফজরের আগ মুহূর্তে বলা হলো ফিরে যেতে। ওয়্যারলেসে ব্রিগেডিয়ার বাবাজির নির্দেশে আমাদের দল ফেরার পথ ধরল। ফেরার সময় কড়ইতলা-বাঘাইতলা সড়কে দেখলাম, পাকিস্তানি আর্মি অনেক বাংকার করে ফেলেছে। তাদের বড় ক্যাম্প সেখান থেকে এক কিলোমিটার উত্তর-পূর্বে। যাত্রাকোনা ক্যাম্পে ফিরে দেখি, প্রচুর লোক। চার-পাঁচ শ হবে। বড় ভাইকে দেখতে পেলাম। কিন্তু আমি তখনো বিশ্বাস করতে পারছিলাম না। একেবারে তব্দা মেরে (অবাক হয়ে) গেছিলাম। ’

“ব্রিগেডিয়ার বাবাজি খুব চেঁচালেন, সবাইকে ধমকালেন। খাওয়াদাওয়া নেই। তিনি বললেন, যেকোনো মূল্যে তেলিখালি ক্যাম্প দখলে নিতে হবে। কমান্ডারের নির্দেশে না খেয়েই চললাম খুব ভোরে, ক্রলিং করে। শুরু হলো প্রচণ্ড গোলাগুলি। আমরা ১০-১২ জন ক্রলিং করে অগ্রসর হচ্ছি। এসএমজির ব্রাশফায়ার আমাদের মাথার ওপর দিয়ে যাচ্ছে। পাকিস্তানি বাহিনী প্রচুর চোক্কি (চোখা বাঁশের খুঁটি) পুঁতে রেখেছে। সেগুলো তুলে তুলে অগ্রসর হচ্ছি। হাইডআউটের লোকজন ওয়্যারলেসে সব খবর দিচ্ছে। তেলিখালি ক্যাম্পের কাছে চোক্কির ঘেরে ইন্ডিয়ান আর্মির একজন গুলি খেয়ে পড়ে গেল। তাকে আমি নিতে যাই। পরে ইন্ডিয়ান আর্মি তাকে নিয়ে যায়। রাস্তার পাশে পৌঁছাই, পাকিস্তানি আর্মি এখন গুলি ছুড়ছে না। কিছুক্ষণ অপেক্ষার পর ‘জয় বাংলা’ স্লোগান দিয়ে ক্যাম্পে ঢুকে পড়ি আমরা তিন মুক্তিযোদ্ধা আব্দুল হালিম উকিল (সাবেক পৌর মেয়র), আমি ও হালুয়াঘাটের পাবলিক সেকশনের মোটা ভাই এবং সাত-আটজন ইন্ডিয়ান আর্মি। ক্যাম্পে ঢুকে সাত-আটজন পাকিস্তানি সেনার লাশ পড়ে থাকতে দেখি। একটা বাংকারে এক লোক উঁকি মারছিল। জোড় হাত করছিল (হাতজোড় করে কিছু বলা)। তার পরনে কেবল আন্ডারওয়্যার, উরুতে গুলির ক্ষত থেকে রক্ত ঝরছে। গ্রেনেডের পিন যখন খুলেছি, তখন ইন্ডিয়ান আর্মি আমার হাত ধরে ফেলে। তাকে আটক করা হয়। গেটের দুই পাশে দুটি রাইফেল দেখতে পাই। একটি হাতিয়ার ধরতেই ইন্ডিয়ান আর্মি সেটা নিয়ে যায়। এরপর পুরো ক্যাম্প, সব বাংকার ঘুরে ঘুরে দেখি। চাল-ডাল, ডেকচি-পাতিল, মোরগ-মুরগি প্রভৃতি দেখতে পাই। এর মধ্যেই পাকিস্তানি আর্মি মুচার বাড়ি, ঢুলুইক্কা মুন্সির বাড়ি ও হালুয়াঘাট থেকে সিক্স পাউন্ডার (দূর নিয়ন্ত্রিত বোমা) ছুড়তে থাকে। আমরা বাংকারে ঢুকে পড়ি। প্রায় ১৫ মিনিট সেখানে থেকে পাকিস্তানি বাহিনীর ফেলে যাওয়া গোলাবারুদের একটি ব্যাগ পিঠে ঝুলিয়ে ফিরে আসি। ইন্ডিয়ান আর্মি তখন ফরেস্ট অফিসের দিকে এলএমজির গুলি ছুড়ছিল। ”

মুক্তিযোদ্ধা ইছাম বলেন, ‘ক্ষেতের বাতর (আইল) দিয়ে ফিরে আসছিলাম। সেই রাস্তায় ইন্ডিয়ান আর্মি ছিল, অনেক অফিসার ছিল। শত শত লোক রাস্তা দিয়ে আসছিল। আমাকে দেখে তারা রাস্তা ছেড়ে দিচ্ছিল। সবাই চিৎকার করে বলছিল, জয় বাংলা। নিজেকে খুব গর্বিত মনে হচ্ছিল। পরে যাত্রাকোনা ক্যাম্পে ফিরি। ক্যাম্পে আসার পর সেখানে বানিয়ে রাখা ডাইল পুরি খাই। ক্লান্তি-অবসাদে খুব ঘুম আসছিল। আমাকে গাছুয়াপাড়া ক্যাম্পে ফেরত পাঠাতে বলি। আমাকে তিন-চারজন মুক্তিযোদ্ধাসহ ইন্ডিয়ান আর্মির গাড়িতে করে পাঠানো হয় গাছুয়াপাড়ায়। সেখানে শুনতে পাই, ওই দিনের তেলিখালি যুদ্ধে সাত-আটজন মুক্তিযোদ্ধা, ১০-১২ জন ইন্ডিয়ান আর্মি মারা গেছে। ৬০-৭০ জন পাকিস্তানি আর্মি পাশের নদী দিয়ে পালিয়ে গেছে। ’

‘তেলিখালি যুদ্ধের অল্প কিছুদিনের মধ্যে দেশ স্বাধীন হয়। ৬ ডিসেম্বর আমাদের এলাকা শত্রুমুক্ত হয়, ভারতীয় হেলিকপ্টার আকাশে চক্কর দিতে থাকে। আমাদের মনে তখন কী যে আনন্দ বলে বোঝাতে পারব না। ’

নুরুল ইসলাম ইছাম বলেন, “মুক্তিযুদ্ধের সময় আমি নালিতাবাড়ী তারাগঞ্জ পাইলট উচ্চ বিদ্যালয়ের দশম শ্রেণীর ছাত্র। বয়স ১৮-২০ হতে পারে। বড় ভাই জিয়াউল হোসেন ডিগ্রি ক্লাসে পড়তেন। আমরা দুই ভাই এবং আমাদের তিন ভাতিজা খোরশেদ আলম, ওয়াজেদ ও মুকছেদ—এক বাড়ির পাঁচজন মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিয়েছি। বঙ্গবন্ধুর ৭ই মার্চের ভাষণ আমরা আকাশবাণীতে পরদিন শুনি। বড় ভাইরা বলল, লাঠি ট্রেনিং হবে। সুরেন গারো ব্রিটিশ আর্মিতে ছিলেন। তিনি লাঠির ট্রেনিং করাতেন। ২৬শে মার্চের পর ট্রেনিং শুরু হলো। একসময় সীমান্তের লাইন খোলা হলো। বড় ভাই জিয়াউল, ভাতিজা খোরশেদ, এলাকার বড় ভাই আব্দুর রহমান, নাজমুল আহসান বললেন, ‘চল, ভারতে যাই। ’ ৫ এপ্রিল আমরা ১০-১২ জন ভারতে বেড়াতে যাই। ওয়াজেদ ইঞ্জিনিয়ার (পিডিবির সাবেক প্রধান প্রকৌশলী) আমাদের সঙ্গে ছিল। সে তখন কেবল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে ভর্তি হয়েছে। আমরা বারাংগাপাড়া থানা পর্যন্ত গিয়েছিলাম। ওয়াজেদ ভারতীয় থানার অফিসারদের সঙ্গে ইংরেজিতে কথা বলল। বিকেল পর্যন্ত থেকে সেদিন ফিরে এলাম। ২২ এপ্রিল আমাদের এলাকার কয়েকজন বারাংগাপাড়ায় যায়। এমপিএ ডা. নাদেরুজ্জামান, হাকিম সাহেব, ময়মনসিংহের অধ্যক্ষ মতিউর রহমান (বর্তমান ধর্মমন্ত্রী) সাহেবও সেখানে যান। আমি ২৩ এপ্রিল বারাংগাপাড়া ইয়ুথ ক্যাম্পে যাই, তারা আমাকে স্বাগত জানায়। দুপুরে রেশনের মোটা চালের ভাত খেতে দেওয়া হয়। ভাতগুলো কাইওয়ালা, পোকা দেখা যেত। বিকেলে বলা হলো, ট্রেনিংয়ে যেতে হবে। গাছুয়াপাড়ার এক জঙ্গলে নিয়ে যাওয়া হয় আমাদের। মেইন রোড থেকে অনেক ভেতরে। গাছ কেটে, শণ দিয়ে ঘর বানালাম। কাছেই নদী ছিল। পরে সেখান থেকে গাড়িতে করে আমাদের তোরায় রংনাবাগ ট্রেনিং সেন্টারে নেওয়া হয়। সেখানে ২৬-২৭ জন ছিল আমাদের এলাকার। নন্নী, তারাকান্দা, হালুয়াঘাটের লোকজনও ছিল। পরে ১৬৯ জনকে নিয়ে একটি উইং করা হয়। আমাদের উইংয়ের কমান্ডার ছিল নাজমুল হোসেন তারা। পরে আরো লোক গেলে সব মিলে তিনটি উইং করা হয়। ২৭-২৮ দিন ট্রেনিং করানোর পর উইংগুলো ভেঙে চারটি কম্পানি করা হলো। আমি ছিলাম ৩ নম্বর কম্পানিতে। আমাদের কম্পানির কমান্ডার করা হয় আমার এলাকার ছেলে কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র নাজমুল আহসানকে। নাজমুল আহসান কাটাখালি অপারেশনে পাকিস্তানি বাহিনীর গুলিতে শহীদ হয়। টুআইসি উইলিয়াম (মেডিক্যালের ছাত্র, বাড়ি হালুয়াঘাট, জাতিতে গারো) কমান্ডারের দায়িত্ব পান এবং তাঁর টুআইসি নিযুক্ত হন সরিষাবাড়ীর শওকত হোসেন। তিনি তেলিখালির যুদ্ধে ইন্ডিয়ান আর্মির ক্রসফায়ারে নিহত হন। মেঘালয় রাজ্যের তোরায় ইন্ডিয়ান আর্মির ক্যাপ্টেন বালজিৎ সিং ছিলেন আমাদের প্রশিক্ষণের দায়িত্বে। প্রশিক্ষণ করাতেন পিএন দা নামের একজন সুবেদার। তাঁর ১০-১৫ জন সহকারী ছিল। তাদের মধ্যে বাঙালিও ছিল কয়েকজন। বড় কর্তা ছিলেন ব্রিগেডিয়ার বাবাজি (ব্রিগেডিয়ার স্যামসাং)। তাঁর ভালো নাম মনে নেই, সবাই তাকে ‘বাবাজি’ বলেই ডাকত। তিনিই সব অপারেশনের পরিকল্পনা করতেন, অস্ত্র-গোলাবারুদ, সরঞ্জামাদির ব্যবস্থা করতেন। ”

মুক্তিযোদ্ধা ইছাম বলেন, “আমার প্রথম যুদ্ধ ছিল বারোমারি যুদ্ধ। সেখানে ‘ধামাকা পয়দা’ করার (গ্রেনেড-গুলি ছুড়ে আলোড়ন সৃষ্টি করা) দায়িত্ব ছিল। বারোমারি ক্যাম্পে ১০-১৫ জন গ্রেনেড মেরেই রেঞ্জের বাইরে চলে যাই। পাকিস্তানি বাহিনী সার্চলাইট মারে। আমরা লুকিয়ে ফিরে আসি। তন্তর, কাটাখালি, নালিতাবাড়ীতে খণ্ডযুদ্ধ করেছি। তবে তেলিখালির যুদ্ধের সঙ্গে অন্য কোনো যুদ্ধের তুলনা হয় না। সেটাই ছিল আমার জীবনের সবচেয়ে কঠিন যুদ্ধ। সেখানে মূল যুদ্ধ শুরু করার আগে বিভিন্ন ধরনের অপারেশন করেছি। ”

মুক্তিযোদ্ধা নুরুল ইসলাম ইছাম এক ছেলে ও দুই মেয়ের জনক। নালিতাবাড়ীর বরুয়াজানি গ্রামে পরিবার-পরিজন নিয়ে থাকেন। ছেলে-মেয়েরা সবাই বিবাহিত, সরকারি চাকুরে। নিজে কৃষিকাজ করেন।


মন্তব্য