kalerkantho


সাঁওতালদের বাড়িঘরে আগুন

দুই পুলিশ চিহ্নিত

নিজস্ব প্রতিবেদক   

১০ মার্চ, ২০১৭ ০০:০০



দুই পুলিশ চিহ্নিত

গাইবান্ধার গোবিন্দগঞ্জে সাঁওতালদের বাড়িঘরে আগুন লাগানোর ঘটনায় জড়িত দুই পুলিশ সদস্যকে চিহ্নিত করা হয়েছে। ওই দুজনের নাম উল্লেখ করে পুলিশ প্রশাসন থেকে পৃথক দুটি প্রতিবেদন হাইকোর্টে দাখিল করা হয়েছে।

চিহ্নিত দুই পুলিশ সদস্য হলেন গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) এসআই মাহবুবুর রহমান ও গাইবান্ধা পুলিশ লাইনের কনস্টেবল মো. সাজ্জাদ হোসেন। দুজনকেই চাকরি থেকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে।

বিচারপতি ওবায়দুল হাসান ও বিচারপতি কৃষ্ণা দেবনাথের হাইকোর্ট বেঞ্চে গতকাল বৃহস্পতিবার ওই দুটি প্রতিবেদন দাখিল করা হয়। আদালত প্রতিবেদন দুটি নথিভুক্ত করেন। এ সময় রাষ্ট্রপক্ষে ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল মোতাহার হোসেন সাজু ও রিট আবেদনকারী পক্ষে অ্যাডভোকেট আবু ওবায়দুর রহমান উপস্থিত ছিলেন।

পুলিশের রংপুর রেঞ্জের অতিরিক্ত ডিআইজি সৈয়দ মনজুরুল কবিরকে প্রধান করে গঠিত তিন সদস্যের অনুসন্ধান কমিটির একটি প্রতিবেদন গতকাল হাইকোর্টে দাখিল করা হয়। এ কমিটির অপর দুই সদস্য হলেন গাইবান্ধার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার আবুল বাশার মোহাম্মদ আতিকুর রহমান ও জ্যেষ্ঠ সহকারী পুলিশ সুপার মো. রেজিনুর রহমান। এ ছাড়া এ কমিটির প্রতিবেদন সংযুক্ত করে হাইকোর্টে একটি অগ্রগতি প্রতিবেদনও দেন পুলিশের রংপুর রেঞ্জের ডিআইজি খন্দকার গোলাম ফারুক।

অতিরিক্ত ডিআইজির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গাইবান্ধা পুলিশের গোয়েন্দা শাখার (ডিবি) এসআই মাহবুবুর রহমান ও গাইবান্ধা পুলিশ লাইনের কনস্টেবল মো. সাজ্জাদ হোসেন সেদিন সাঁওতালদের ঘরে অগ্নিসংযোগ করেন বলে প্রাথমিক তদন্তে প্রমাণিত হয়েছে।

তাঁদের চাকরি থেকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে। এ ছাড়া অন্য কোনো পুলিশ সদস্য কিংবা পুলিশ ব্যতীত অন্য কেউ জড়িত আছে বলে প্রতীয়মান হলেও তাদের চিহ্নিত করা সম্ভব হয়নি। ওই প্রতিবেদনে বলা হয়, হাইকোর্টের নির্দেশে এ ঘটনায় গত বছর ১৬ নভেম্বর গোবিন্দগঞ্জ থানায় দায়ের করা মামলার তদন্ত করছে পিবিআই (পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন)। এ ঘটনায় ভবিষ্যতে কেউ দোষী প্রমাণিত হলে তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। প্রতিবেদনে বলা হয়, ৮৫ জন পুলিশ সদস্য ২০১৬ সালের ৬ নভেম্বর গোবিন্দগঞ্জের চামগাড়ী এলাকায় দায়িত্ব পালন করেছেন। এ ছাড়া র‌্যাব-১৩ গাইবান্ধা ক্যাম্পের সহকারী পুলিশ সুপার হাবিবুর রহমানের নেতৃত্বে কিছু র‌্যাব সদস্যও দায়িত্ব পালন করেছেন। প্রতিবেদনে বলা হয়, হাইকোর্টের নির্দেশনার আলোকে গাইবান্ধার পুলিশ সুপার আশরাফুল ইসলামকে গত ২৩ ফেব্রুয়ারি খাগড়াছড়ি জেলায় বদলি করা হয়েছে। এ ছাড়া ৬ নভেম্বর সাঁওতালপল্লীতে দায়িত্ব পালনকারী ৮৫ জন পুলিশ সদস্যের মধ্যে ৫৮ জনকে অন্যত্র বদলি করা হয়েছে।

গতকাল প্রতিবেদন আদালতে উপস্থাপন করে ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল মোতাহার হোসেন সাজু বলেন, আদালতের নির্দেশের পরিপ্রেক্ষিতে আগুন লাগানোর ঘটনার সঙ্গে জড়িতদের চিহ্নিত করতে  রংপুর রেঞ্জের অতিরিক্ত ডিআইজি সৈয়দ মনজুরুল কবিরকে প্রধান করে তিন সদস্যের অনুসন্ধান কমিটি গঠন করা হয়েছিল। ওই কমিটি গত ২২ ফেব্রুয়ারি তাদের তদন্ত প্রতিবেদন দিয়েছে। এ ছাড়া আদালতের নির্দেশের পর গাইবান্ধার পুলিশ সুপার মো. আশরাফুল ইসলামকে খাগড়াছড়ি বদলি করা হয়েছে। তদন্তে আগুন লাগনোর সঙ্গে জড়িত দুজনকে চিহ্নিত করা হয়েছে। তাঁদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য তাঁদের সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে। তিনি বলেন, প্রতিবেদনে বলা হয়েছে যে ভবিষ্যতে আর কাউকে চিহ্নিত করা গেলে তা আদালতকে অবহিত করা হবে।

এ সময় আদালত বলেন, ভালো করেছেন; আদেশ প্রতিপালন করেছেন; তদন্ত করে প্রতিবেদন দিয়েছেন। ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল বলেন, পুলিশ সুপার দক্ষ ছিলেন। তাঁর দক্ষতার জন্যই স্থানীয় সংসদ সদস্য মঞ্জুরুল ইসলাম লিটনের খুনিকে ধরা গেছে। কিন্তু তাঁকে খাগড়াছড়িতে বদলি করায় জনগণের মধ্যে ধারণা তাঁকে শাস্তি দেওয়া হয়েছে।

এ সময় আদালত বলেন, ‘আমরা তো তাঁকে শাস্তি দিতে বলিনি। শুধুই বদলি করতে বলেছি। আর বদলি করা কোনো শাস্তি নয়। তাঁকে খাগড়াছড়ি বদলি করা হয়েছে। খাগড়াছড়ি কি দেশের অংশ নয়?’

এ সময় আদালত বলেন, এ রিপোর্ট কার?

জবাবে ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল বলেন, ডিআইজি রংপুর রেঞ্জের।

এরপর আদালত আদেশ দেন। আদেশে বলা হয়, গাইবান্ধার এসপি ও অন্যান্য পুলিশ সদস্য প্রত্যাহার করা হয়েছে। দুজনের বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা গ্রহণের কার্যক্রম শুরু হয়েছে। এ কারণে প্রতিবেদন নথিতে রাখা হলো।

আবু ওবায়দুর রহমান আদালতে বলেন, পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন তদন্ত করছে। তাদের একটি প্রতিবেদন যেন আদালতে দেওয়া হয় এ বিষয়ে আদেশ চাচ্ছি।

আদালত বলেন, তদন্ত চলছে, তাই এ মুহূর্তে আদেশের প্রয়োজন নেই।

আদালত এ সময় আগুন লাগানোর ঘটনায় আলজাজিরাসহ গণমাধ্যমে প্রচারিত ও প্রকাশিত বিভিন্ন প্রতিবেদনের কথা তুলে ধরে বলেন, সংবাদমাধ্যমের সোচ্চার ভূমিকার কারণেই আজকে বিষয়গুলো স্পষ্ট হয়েছে। আদালত বলেন, ‘আলজাজিরা ঘটনার ভিডিও প্রচার না করলে কি আমরা বিষয়টি জানতে পারতাম? আলজাজিরায় প্রতিবেদন প্রকাশের কারণে পুলিশ বাহিনী সম্পর্কে গোটা বিশ্বে একটা নেতিবাচক ধারণার সৃষ্টি হয়েছে। কিন্তু মাত্র দুই-একজন পুলিশের জন্য গোটা পুলিশ বিভাগ কলঙ্কিত হতে পারে না। এ কারণেই তো বিষয়টি জানার পর আমরা এবিষয়ে তদন্ত করার আদেশ আগেই দিয়েছিলাম। পুলিশ সম্পর্কে যেন জনমনে খারাপ ধারণা না হয় সে জন্যই তো আদেশ দেওয়া হয়েছিল। ’

এ সময় ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল বলেন, সংবাদমাধ্যম তো সমাজের দর্পণ।  

এর আগে গত ৭ ফেব্রুয়ারি হাইকোর্ট এক আদেশে চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেটের তদন্তে সহযোগিতা না করায় গাইবান্ধার পুলিশ সুপার মো. আশরাফুল ইসলাম এবং আগুন লাগানোর দিন চামগাড়ী বিল এলাকায় দায়িত্বরত সব পুলিশ সদস্যকে প্রত্যাহারের নির্দেশ দেন। অবিলম্বে এ আদেশ কার্যকর করতে স্বরাষ্ট্রসচিব, পুলিশের আইজি, ডিআইজি রংপুর রেঞ্জকে নির্দেশ দেওয়া হয়। এ ছাড়া আলজাজিরা টিভিতে প্রচারিত আগুন লাগানোর ভিডিও চিত্র ফরেনসিক ল্যাবরেটরিতে পরীক্ষার জন্য পুলিশ সদর দপ্তর কী পদক্ষেপ নিয়েছে সে বিষয়ে চার সপ্তাহের মধ্যে জবাব দাখিল করতে পুলিশের আইজি ও রংপুর রেঞ্জের ডিআইজিকে নির্দেশ দেওয়া হয়। এর পরিপ্রেক্ষিতে গতকাল পুলিশের প্রতিবেদন দুটি দাখিল করা হয়।

গত বছর ৬ নভেম্বর গাইবান্ধার গোবিন্দগঞ্জের সাহেবগঞ্জ ইক্ষুখামারে চিনিকলকর্মী, সাঁওতাল ও পুলিশের সংঘর্ষের সময় চারজন নিহত ও বহু লোক আহত হয়। এ ঘটনায় পুলিশের বিরুদ্ধে সাঁওতালদের বাড়িঘরে আগুন দেওয়ার অভিযোগ ওঠে। পরে এ বিষয়ে একটি ভিডিও চিত্র আলজাজিরা টিভিতে প্রকাশের পর ব্যাপক তোলপাড় হয়। এ প্রেক্ষাপটে বিষয়টি আদালতের নজরে আনে রিট আবেদনকারী পক্ষ। এরপর আদালত গত বছর ১২ ডিসেম্বর এক আদেশে বিষয়টি তদন্তের নির্দেশ দেন। সাঁওতালদের বাড়িঘরে কারা আগুন লাগিয়েছে এবং ওই ঘটনার সঙ্গে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা জড়িত কি না তা তদন্ত করতে বলা হয়। এ নির্দেশে গাইবান্ধার চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট (সিজিএম) মো. শহিদুল্লাহ তদন্ত করেন। তাঁর তদন্ত প্রতিবেদন গত ৩১ জানুয়ারি হাইকোর্টে উপস্থাপন করা হয়। প্রতিবেদনে বলা হয়, দুই পুলিশ সদস্য ও একজন ডিবি সদস্য এবং দুই ব্যক্তিকে সক্রিয়ভাবে চামগাড়ী বিল নামক স্থানে সাঁওতালদের স্থাপনায় আগুন লাগাতে দেখা গেছে। তবে তাঁরা হেলমেট পরিহিত থাকায় তাঁদের চিহ্নিত করা যায়নি। এ অবস্থায় আদালত পরবর্তী আদেশের জন্য ৭ ফেব্রুয়ারি দিন ধার্য করেন। ওই দিন আদালত গাইবান্ধার পুলিশ সুপার ও আগুন লাগানোর দিন চামগাড়ী বিল এলাকায় দায়িত্বরত সব পুলিশ সদস্যকে প্রত্যাহারের নির্দেশ দেন। পাশাপাশি ৯ মার্চ পরবর্তী আদেশের দিন ধার্য করা হয়। এ অবস্থায় গতকাল নির্ধারিত দিনে রংপুর রেঞ্জের অতিরিক্ত ডিআইজি সৈয়দ মনজুরুল কবিরের নেতৃত্বাধীন তিন সদস্যের অনুসন্ধান কমিটির প্রতিবেদন গতকাল হাইকোর্টে দাখিল করা হয়।

এর আগে আদালতে দেওয়া সিজিএমের প্রতিবেদনে বলা হয়, আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর একটি গ্রুপ সাহেবগঞ্জ ইক্ষু খামারের অফিসের ভেতর দিয়ে পশ্চিম দিকে চামগাড়ী বিলে সাঁওতালদের স্থাপনার দিকে গুলি করতে করতে এগোতে থাকলে সাঁওতালরা তীর ছুড়ে প্রতিরোধ করার চেষ্টা করে। পুলিশের গুলির আওয়াজে আতঙ্কগ্রস্ত হয়ে সাঁওতালরা বাড়িঘর থেকে চলে যাওয়ার পর আগুন লাগানোর ঘটনা ঘটেছে। ওই সময় আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী তথা পুলিশ, র‌্যাব ও ডিবির পোশাক পরিহিত সদস্য এবং সাধারণ পোশাকধারী দুজন ব্যক্তির উপস্থিতি লক্ষ করা গেছে। ওই গ্রুপটির মধ্য থেকে পুলিশ লেখা পোশাকধারী দুজন, ডিবি লেখা পোশাকধারী একজন ও সাধারণ পোশাকধারী দুজন (লাল ও সাদা রঙের শার্ট পরিহিত) ব্যক্তিকে সক্রিয়ভাবে চামগাড়ী বিলে সাঁওতালদের স্থাপনায় আগুন লাগাতে দেখা গেছে। প্রতিবেদনে আরো বলা হয়, আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা হেলমেট পরা থাকায় এবং ভিডিও ক্লিপটি অনেক দূর ও পেছন থেকে সংগৃহীত হওয়ায় তাদের মুখমণ্ডল দেখা যায় না। তবে তাঁদের পোশাকে পুলিশ, র‌্যাব ও ডিবি লেখা দেখা গেছে।


মন্তব্য