kalerkantho


ইউনুস আহম্মেদ

মা বললেন, দেশ স্বাধীন না করে বাড়ি ফিরবি না

কে এম সবুজ, ঝালকাঠি   

৯ মার্চ, ২০১৭ ০০:০০



মা বললেন, দেশ স্বাধীন না করে বাড়ি ফিরবি না

‘১৯৭১ সালে ম্যাট্রিক (এসএসসি) পরীক্ষার্থী ছিলাম। মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেওয়ার কারণে পরীক্ষা দেওয়া হয়নি। বাবা মো. তাহের উদ্দিন, মা রূপবান বিবি ও চার ভাই মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিয়েছি। বোন একজনই—সে মুক্তিযোদ্ধাদের রান্না করে খাওয়ানোর কাজ করেছে। আমাদের বসত ঘরের পাশেই কাচারি ঘরে আশ্রয় নিত মুক্তিযোদ্ধারা। তাদের দেওয়া তথ্য শহরে মুক্তিযোদ্ধাদের কাছে পৌঁছে দিতাম আমি। ভিখারির বেশে হাতে থালা নিয়ে শহর ঘুরে বেড়াতাম। একদিন এমপি চান্দু মিয়া আমাদের বাড়িতে আসেন। তাঁকে আশ্রয় দেওয়া হয়। তিনি প্রায়ই চিরকুট দিয়ে শহরের কিছু ব্যক্তির কাছে আমাকে পাঠাতেন। তাঁদের খুঁজে বের করে

চিরকুট পৌঁছে দিতাম, বাড়িতে নিয়ে আসতাম।

চান্দু মিয়ার নির্দেশে আমাদের বাড়িতে মুক্তিযুদ্ধের জন্য অস্ত্র আনা হয়, মজুদ রাখা হয় ঘরের মধ্যে। এই অস্ত্র দিয়েই স্থানীয় মুক্তিযোদ্ধারা যুদ্ধ করেছে। ’

কথাগুলো বলেন মুক্তিযুদ্ধের বীর সেনানী ইউনুস আহম্মেদ। পাকবাহিনী ও রাজাকারদের সঙ্গে সম্মুখ যুদ্ধে অংশ নিয়েছেন তিনি। মুক্তিযোদ্ধাদের কাছে বার্তা পৌঁছে দেওয়া, বাড়িতে আশ্রয় দেওয়া, মুক্তিযোদ্ধাদের অস্ত্র মজুদ রাখা—এসব দায়িত্বও পালন করেছেন তিনি। মুক্তিযুদ্ধে তাঁর বড় ভাই আলতাফ হোসেন শহীদ হন। ভাই হারানোর বেদনা আজও কাঁদায় তাঁকে। মুক্তিবার্তায় নাম থাকলেও ষড়যন্ত্র করে লাল মুক্তিবার্তা থেকে নাম বাদ দেওয়া হয় বলে অভিযোগ তাঁর।

ইউনুস আহম্মেদের বাড়ি ঝালকাঠির নলছিটির কুশঙ্গল ইউনিয়নের ফয়রা গ্রামে। ছোট্ট একটি টিনশেড ঘরে পরিবার-পরিজন নিয়ে থাকেন। একান্ত আলাপে মুক্তিযুদ্ধের সময়ের অনেক কথাই জানান তিনি।

মুক্তিযোদ্ধা ইউনুস আহম্মেদ বলেন, ‘আমি ও বড় ভাই ছিলাম বন্ধুর মতো। দুজনের মধ্যে কখনো বাগিবতণ্ডা হয়নি। পড়ালেখাও করতাম এক সঙ্গে। তাঁর বিয়ে ঠিক হলো। আক্দ অনুষ্ঠানও সম্পন্ন হয়। এরই মধ্যে শুরু হয় মুক্তিযুদ্ধ। বিয়ের অনুষ্ঠান আর করতে পারিনি আমরা। যুদ্ধের প্রস্তুতিতে ব্যস্ত সবাই। ১৪ নভেম্বর আমরা খবর পাই, পাকবাহিনী ও রাজাকারের একটি দল সিদ্ধকাঠির দিকে আসছে। আমরা কমান্ডার সেকেন্দার মিয়ার নেতৃত্বে দরগাবাড়ির সামনে গিয়ে অবস্থান নিই। দুপুর ২টার দিকে ওরা কাছাকাছি আসতেই আমরা গুলি ছুড়তে থাকি। শুরু হয় সম্মুখ যুদ্ধ। একপর্যায়ে আমাদের পেছন দিক থেকে পাকিস্তানি এক সেনা এসে বড় ভাইকে লক্ষ্য করে গুলি চালায়। পর পর দুটি গুলি বিদ্ধ হয় তাঁর শরীরে। মাটিতে লুটিয়ে পড়েন তিনি। আমরা প্রবল প্রতিরোধ গড়ে তুলি, ছত্রভঙ্গ হয়ে যায় পাকসেনারা। বেশ কয়েকজন পাকসেনা ও রাজাকার মারা যায়। ওই যুদ্ধে আরো একজন মুক্তিযোদ্ধা শহীদ হন। তাঁর নাম কবির হোসেন। পাকবাহিনী চলে যাওয়ার পর বড় ভাইয়ের লাশ নিয়ে বাড়ি আসি। মা বললেন, যা পাকিস্তানি বাহিনী ও রাজাকারদের শেষ করে আয়। দেশ স্বাধীন না করে বাড়ি ফিরবি না। মায়ের নির্দেশে বাড়ি থেকে বের হই; বিভিন্ন স্থানে যুদ্ধে অংশ নিয়েছি। ’

‘আমাদের পরিবারের সবাই মুক্তিযোদ্ধা জানতে পেরে পাকবাহিনী আমাদের বাড়িতে হামলা চালিয়েছে। পুরো বাড়ি আগুন দিয়ে পুড়িয়ে দেওয়ার চেষ্টা করেছে। আল্লাহর রহমতে ঘরের কিছু অংশ পুড়লেও বেশি ক্ষতি হয়নি। যদি পুরো ঘরে আগুন লেগে যেত, তাহলে মজুদ করা অস্ত্র ও গোলাবারুদ ধ্বংস হয়ে যেত; বিস্ফোরণে পরিবারের সবাই শেষ হয়ে যেত। ওই দিন পাকবাহিনী আমার মাকে ঘর থেকে বের করে উঠোনে নিয়ে একটি চেয়ারে বসায়। পেছন থেকে পর পর তিনবার ট্রিগার টেপে। কিন্তু একটি গুলিও বের হয়নি। তারা মাকে না মেরে চলে যায়। ’

কথাগুলো বলার সময় আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন ইউনুস আহম্মেদ। চোখের কোণে জমা পানি গাল বেয়ে ঝরতে থাকে অঝোরে।

‘আমাদের বাড়িতে বসেই নলছিটির মুক্তিযোদ্ধারা প্রথম সংগঠিত হয়। তাদের জন্য তথ্য জোগাড়ের ভার ছিল আমার ওপর। নলছিটি শহরের লঞ্চঘাট এলাকায় ছিল মুক্তিযোদ্ধা বাকে আলী কাজীর ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান। রাজাকারদের খবর, মুক্তিযোদ্ধাদের বার্তা ও চরমপত্র নিয়ে যেতাম বাকে আলী কাজীর কাছে। শহরের খবর গ্রামের মুক্তিযোদ্ধাদের কাছে পৌঁছে দিতাম। আমাদের বাড়িতে বসে মুক্তিযোদ্ধারা সিদ্ধান্ত নিত—কোথায় কখন যেতে হবে। চরমপত্র নিয়ে একদিন লুঙ্গি ও শার্ট পরে বাড়ি থেকে বের হয়ে বাকে আলীর দোকানে যাই। ওই সময় কালো পোশাকে পাকবাহিনীর একটি দল লঞ্চঘাটে আসে। দোকানের পেছনে বসে তাস খেলছিল কয়েকজন রাজাকার। তারা আমাকে সন্দেহের চোখে দেখতে শুরু করে। বাকে আলী কাজী কৌশলে আমাকে দোকান থেকে বের করে দেন, বাড়ি চলে যেতে বলেন। অল্পের জন্য পাকবাহিনীর হাত থেকে রক্ষা পাই। দ্রুত শহর থেকে পালিয়ে গ্রামের পথ ধরি। ’

‘একদিন আমাকে পাঠানো হয় নলছিটির নান্দিকাঠি গ্রামে। ভিক্ষুকের বেশ ধরে সেখানে গিয়ে মোহাম্মদ হোসেনকে আমাদের বাড়িতে নিয়ে আসতে বলেন এমপি চান্দু মিয়া। রাজাকারদের চোখ এড়িয়ে একটি থালা হাতে নিয়ে রাস্তায় বের হই। ভিক্ষে করতে করতে নান্দিকাঠি গ্রামে যাই। মোহাম্মদ হোসেনের সঙ্গে দেখা করি। তাঁর কাছে চান্দু মিয়ার বার্তা পৌঁছে দিই। পরে তাঁকে নিয়ে বাড়ির উদ্দেশে রওয়ানা হই। রাস্তা দিয়ে আমি হাঁটছি ভিক্ষুকের বেশে, আর আমাকে সন্তর্পণে অনুসরণ করে হাঁটছেন মোহাম্মদ হোসেন। শত্রুপক্ষের চোখ ফাঁকি দিয়ে শেষ পর্যন্ত তাঁকে নিয়ে বাড়ি পৌঁছাই। ’

‘এমপি চান্দু মিয়াকে টার্গেট করেছিল পাকবাহিনী ও রাজাকাররা। তারা জানতে পারে, চান্দু মিয়া আমাদের বাড়িতে থাকতে পারেন। যেকোনো সময় বাড়িতে তারা আক্রমণ করবে—এমন খবর শুনতে পাচ্ছিলাম। তাই মাঝির বেশ ধরে নৌকা চালিয়ে চান্দু মিয়াকে পটুয়াখালী পৌঁছে দিয়ে আসি। নৌকা চালানোর সময় ভাটিয়ালি গান গাইতাম। কারণ ওই সময় মাঝিরা এসব গান গেয়ে নৌকা চালাত। কারো যেন সন্দেহ না হয়, সে কারণে মাঝির বেশ ধরা। ’

ইউনুস আহম্মেদ বলেন, ‘মুক্তিযুদ্ধের পরে অসংখ্যবার আমি বঙ্গবন্ধুর কাছে গিয়েছি। এমপি চান্দু মিয়ার সঙ্গে যেতাম, যেতে যেতে বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে আমার সুসম্পর্ক হয়ে যায়। তিনি আমাকে পিচ্চি বলে ডাকতেন। বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে ‘হাসুপা’ বলে ডাকতাম। শেখ রাসেলকে অনেকবার কোলে নিয়েছি। ’

দুঃখ করে তিনি বলেন, ‘যখন মুক্তিযোদ্ধাদের তালিকা করা হলো, তখন আমার নাম ছিল। পরে যে কবার তালিকা করা হয়েছে, গেজেট হয়েছে—আমার নাম রয়েছে। মুক্তিবার্তায়ও আমার নাম রয়েছে (নম্বর ০৬০২০২০২৮২)। ১৯৯৮-৯৯ সালে সরকার লাল মুক্তিবার্তা তৈরির কাজ শুরু করে। আমাদের নলছিটির মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার সেকেন্দার আলী মিয়া আমার নাম সে তালিকায় দিয়েছেন। কিন্তু জেলা কমান্ডার মো. শামসুদ্দিন তালিকা মন্ত্রণালয়ে জমা দেওয়ার আগে আমার নাম কেটে দেন। শুধু আমার নামই নয়, কেটে দেওয়া হয় মুক্তিযোদ্ধা খন্দকার মজিবর রহমান, আবদুল হাকিম মোল্লা, আবদুর রব মোস্তান, তোতা মিয়াসহ অনেকের নাম। ’

ইউনুস আহম্মেদ বলেন, ‘আমরা আওয়ামী লীগ করি। ১৯৭৫-এর পরে নানাভাবে নির্যাতিত হয়েছি। আবারও ষড়যন্ত্র করে আমার নাম লাল মুক্তিবার্তায় দেননি জেলা কমান্ডার শামসুদ্দিন। তবু আফসোস নেই। আমি রণাঙ্গনের মুক্তিযোদ্ধা—এটাই আমার পরিচয়। এ পরিচয় নিয়েই আমি গর্বিত। ’


মন্তব্য