kalerkantho


জঙ্গিদের ‘হাইড পয়েন্ট’ থেকে ২৯ গ্রেনেড উদ্ধার

নিজস্ব প্রতিবেদক, চট্টগ্রাম ও মিরসরাই প্রতিনিধি   

৯ মার্চ, ২০১৭ ০০:০০



জঙ্গিদের ‘হাইড পয়েন্ট’ থেকে ২৯ গ্রেনেড উদ্ধার

চট্টগ্রামের মিরসরাই উপজেলা সদরের একটি বাসা থেকে ২৯টি গ্রেনেড ও বিপুল পরিমাণ বিস্ফোরকদ্রব্য উদ্ধার করেছেন আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা। মিরসরাই থানা থেকে ২০০ গজ এবং ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক থেকে মাত্র ৫০ গজ দূরের এই বাসাকে জঙ্গিদের ‘হাইড পয়েন্ট’ বলেছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী।

তাদের মতে, দেশের অর্থনীতির পাইপলাইন খ্যাত ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক বন্ধ রাখার মতো অপতৎপরতায় এসব গ্রেনেড বিস্ফোরক ব্যবহৃত হতে পারত। এসব গ্রেনেড বিস্ফোরক দিয়ে বড় ধরনের নাশকতা চালানো সম্ভব।

একই সঙ্গে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কর্মকর্তারা আরো বলেন, জঙ্গি আস্তানা থেকে উদ্ধার করা গ্রেনেড ও বিস্ফোরকের চেয়েও ভয়ংকর হচ্ছে কালো পাঞ্জাবি ও পতাকা। ঢাকার গুলশানের হলি আর্টিজানে হামলার পর এ ধরনের কালো পতাকা ও পাঞ্জাবি মানুষের মধ্যে আতঙ্ক তৈরি করেছে। ওই ঘটনার আগে জঙ্গিরা কালো পাঞ্জাবি ও পতাকা নিয়ে ছবি তুলেছিল, যা পরবর্তী সময়ে গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে দেশে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়। হলি আর্টিজানের পর মিরসরাইয়েও এ ধরনের কালো পতাকা ও পাঞ্জাবি উদ্ধার করা হয়েছে যা জঙ্গিদের অপতৎপরতার অংশ।

গত মঙ্গলবার রাত থেকে বুধবার দিনভর এই অভিযান চলে। আগের দিন কুমিল্লার চান্দিনায় পুলিশের ওপর হামলা চালাতে গিয়ে যে দুই জঙ্গি ধরা পড়েছিল, তাদের একজন মাহমুদুল হাসান। তাকে নিয়েই মূল অভিযান চালায় কাউন্টার টেররিজম ইউনিট ও পুলিশ।

পুলিশ কর্মকর্তারা জানান, রাতে জঙ্গি মাহমুদুল হাসান আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে বিভ্রান্তিকর তথ্য দেয়। এই কারণে জেলার আরো একাধিক থানায় অভিযান চালাতে হয়েছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে। তবে সেখানে কিছু পাওয়া যায়নি। শেষ পর্যন্ত মিরসরাই এসেই মাহমুদুল হাসানের আস্তানা থেকে গ্রেনেড ও বিস্ফোরকদ্রব্য উদ্ধার করা হয়।

মঙ্গলবার রাতে হাসানকে নিয়ে মিরসরাই থানার পূর্ব গোভানীয়া গ্রামের রিদোয়ান মঞ্জিল নামের বাড়ি ঘিরে অভিযান শুরু করে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। অভিযান শেষে গ্রেনেড ও বিস্ফোরকদ্রব্য উদ্ধারের তথ্য জানান কর্মকর্তারা। এর পরই পুলিশ-র‌্যাবসহ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর বিভিন্ন ইউনিট ঘটনাস্থলে পৌঁছে। আর গতকাল দিনভর উদ্ধার করা গ্রেনেডগুলো বিস্ফোরণ ঘটিয়ে ধ্বংস করেন চট্টগ্রাম মহানগর পুলিশের বোমা নিষ্ক্রিয়করণ ইউনিটের সদস্যরা।

গ্রেনেড ও বিস্ফোরকদ্রব্য উদ্ধারের বিষয়টি নিশ্চিত করে চট্টগ্রাম জেলা পুলিশ সুপার নূরে আলম মিনা বলেন, ‘জঙ্গি আস্তানা থেকে ছোট-বড় মিলিয়ে ২৯টি তাজা গ্রেনেড, ২২টি প্যাকেটভর্তি প্রায় ১১ কেজি বিস্ফোরকদ্রব্য, ৪০টি জেল, ৯টি চাপাতি, পাঁচটি কালো রঙের পাঞ্জাবি, আরবি লেখা একটি কালো ব্যানার, জঙ্গিদের ব্যবহৃত কয়েকটি জার্নি ব্যাগসহ বিভিন্ন সরঞ্জাম উদ্ধার করা হয়েছে। ’ এক প্রশ্নের জবাবে পুলিশ সুপার নূরে আলম মিনা বলেন, ‘জঙ্গি আস্তানা থেকে গ্রেনেড-বিস্ফোরক উদ্ধার করা হয়েছে, ধৃত জঙ্গিদের ভালোভাবে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়নি। তাই এখনই জঙ্গি সংগঠনের নাম বলা সম্ভব নয়। জিজ্ঞাসাবাদের পর নিশ্চিত হয়ে জঙ্গি সংগঠনের নাম প্রকাশ করা হবে। ’

নূরে আলম মিনা আরো বলেন, ‘জঙ্গি আস্তানাটি কামাল উদ্দিন পরিচয় দিয়ে এক ব্যক্তি ভাড়া নিয়েছিলেন। এই কামাল উদ্দিনই চান্দিনা থানা এলাকায় গ্রেপ্তারকৃত জসিম উদ্দিন। অর্থাৎ ভুয়া ঠিকানা দিয়ে কাপড় ব্যবসার কথা বলে বাড়িটি ভাড়া নেওয়া হয়েছিল। জঙ্গিরা নিজদের যে জাতীয় পরিচয়পত্র জমা দিয়েছে, সেটি ভুয়া বলে প্রাথমিকভাবে জানা গেছে। ’

অভিযানের বিষয়টি ব্যাখ্যা করে তিনি বলেন, মাহমুদুল হাসান ও জসিমকে কুমিল্লার চান্দিনা থেকে গ্রেপ্তারের পর জিজ্ঞাসাবাদে তারা জঙ্গি আস্তানায় গ্রেনেড থাকার তথ্য জানায়। এরপর কাউন্টার টেররিজম ইউনিট ও পুলিশ যৌথভাবে মঙ্গলবার রাতভর অভিযান চালিয়ে গ্রেনেড ও বিস্ফোরকদ্রব্য উদ্ধার করে। এই ঘটনায় নতুন করে কাউকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে কি না জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘এই মুহূর্তে দুজনের বেশি গ্রেপ্তারের তথ্য আমার জানা নেই। ’ 

উদ্ধার অভিযানের সঙ্গে থাকা র‌্যাব-৭-এর কর্মকর্তা শাফায়াত জামিল ফাহীম সাংবাদিকদের বলেন, এটি হাইড পয়েন্ট হতে পারে। ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক একটি গুরুত্বপূর্ণ সড়ক। অতীতে এই মহাসড়ক বন্ধ রাখার মতো অপতৎপরতা চালানো হয়েছিল। এখন এই হাইড পয়েন্ট থেকে যে পরিমাণ গ্রেনেড ও বিস্ফোরক উদ্ধার করা হয়েছে, সেগুলো ব্যবহার করে মহাসড়ক বন্ধ রাখার মতো অপতৎপরতার আশঙ্কা ছিল। জঙ্গিরা বড় ধরনের নাশকতার প্রস্তুতিই নিচ্ছিল বলে মনে হচ্ছে। নিজেদের কর্মকাণ্ড আড়ালে রাখার কৌশল হিসেবেই এ ধরনের জনাকীর্ণ এলাকায় তারা আস্তানা তৈরি করতে পারে।

বাড়ির মালিক রিদুয়ানুল হক জানান, ১ ফেব্রুয়ারি কামাল উদ্দিন নামের একজন নিজের স্ত্রী ও সন্তানকে নিয়ে থাকার কথা বলে ৯ হাজার টাকায় বাড়ির নিচতলার দুটি কক্ষ ভাড়া নেয়। তার সঙ্গে এক বছরের এক কন্যাশিশু ও স্ত্রী থাকত। তিনি আরো বলেন, ভাড়াটিয়ার জাতীয় পরিচয়পত্র ও একজন কাউন্সিলরকে সাক্ষী রেখে বাড়ি ভাড়া দেওয়া হয়েছিল। চলতি মার্চ মাসের ভাড়াও তারা পরিশোধ করে দিয়েছে।

প্রসঙ্গত, মঙ্গলবার সকালে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের চান্দিনা উপজেলার কুটুম্বপুর এলাকায় চট্টগ্রাম থেকে ঢাকাগামী শ্যামলী বাসে তল্লাশি চালানোর সময় দুই জঙ্গি পুলিশকে লক্ষ্য করে বোমা ছোড়ে। এরপর পুলিশ গুলি ছোড়ে। পরে তাদের গ্রেপ্তার করা হয়। এই দুই জঙ্গিকে গ্রেপ্তারের পর কাউন্টার টেররিজম ইউনিটসহ পুলিশের একাধিক বিশেষ দল তাদের ব্যাপক জিজ্ঞাসাবাদ করে। এরপর তাদের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে ‘জঙ্গিদের হাইড পয়েন্ট’-এর সন্ধান পাওয়া যায়।

পুলিশ কর্মকর্তারা জানান, গভীর রাতে অভিযানকারী দল প্রথমে বাড়ির মালিক রিদুয়ানুল হকের সঙ্গে কথা বলে। পরে দলটি যায় ভবনের নিচতলার একটি ফ্ল্যাটে। সেখানে হাইড পয়েন্টটি শনাক্ত করা হয়।

গ্রেনেড ধ্বংস ও মামলা

এদিকে উদ্ধার করা গ্রেনেডগুলো ধ্বংসের জন্য চট্টগ্রাম মহানগর পুলিশের বোমা নিষ্ক্রিয়করণ ইউনিটের একটি দল গতকাল দুপুরে ঘটনাস্থলে পৌঁছে। বিকেল থেকে তারা বোমাগুলো নিষ্ক্রিয় করা শুরু করে। এই বিষয়ে নগর গোয়েন্দা পুলিশের উপকমিশনার (উত্তর) পরিতোষ ঘোষ কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘নগর পুলিশের বোমা নিষ্ক্রিয়করণ ইউনিটের সদস্যরা মিরসরাই গিয়ে উদ্ধার করা গ্রেনেড ধ্বংস করছে। ’

এদিকে জেলা পুলিশের একজন দায়িত্বশীল কর্মকর্তা বলেন, ঘটনার পর তাঁরা ১০টি নাম পেয়েছেন। তাদের আসামি করে রাতেই একটি মামলা দায়েরের প্রক্রিয়া চলছে। তবে এই পুলিশ কর্মকর্তা ওই ১০ নাম প্রকাশ করতে রাজি হননি। এ ছাড়া ওই বাড়িতে যে নারী থাকতেন (জসিমের স্ত্রী) সেই নারী ও এক শিশুকে হেফাজতে রাখা হয়েছে। পুলিশ কর্মকর্তারা জানান, মূলত মাহমুদুল হাসান, তার দুলাভাই জসিমসহ পুরো পরিবার জঙ্গি তৎপরতার সঙ্গে যুক্ত। তাদের সবাইকে মামলায় আসামি করা হতে পারে।


মন্তব্য