kalerkantho


বড় দুই দলের চাপ কৌশল

পরিস্থিতি বুঝে পক্ষ-বিপক্ষ বেছে নিতে চায় অন্য দলগুলোও

এনাম আবেদীন   

৯ মার্চ, ২০১৭ ০০:০০



বড় দুই দলের চাপ কৌশল

রাজনীতিতে এখন ধীরে ধীরে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে আগামী জাতীয় নির্বাচন ইস্যুটি। ওই ভোট থেকে রাজনৈতিক ফসল কে কিভাবে ঘরে তুলবে তা নিয়ে শুরু হয়েছে চিন্তাভাবনা, পরিকল্পনা, হিসাব-নিকাশ। এরই অংশ হিসেবে একে অন্যের ওপর মনস্তাত্ত্বিক ও রাজনৈতিক চাপ বাড়ানোর কৌশল নিয়েছে পরস্পর বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলো। বিশেষ করে দেশের বড় দুটি রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগ ও বিএনপি একে অন্যকে চাপে ফেলে নির্বাচন-পূর্ববর্তী পরিস্থিতি নিজেদের অনুকূলে নিতে চাইছে, যাতে ফল তাদের পক্ষে যায়। জাতীয় পার্টি এখন পর্যন্ত সরকারের সঙ্গে থাকলেও দলটির ভবিষ্যৎ ভূমিকা কী হবে তা এখনো নিশ্চিত নয়। আর অন্যান্য রাজনৈতিক দলও চাইছে ক্ষমতার অংশীদারত্ব। অর্থাৎ ন্যূনতম কিছু আসনসহ রাজনৈতিকভাবে সুবিধাজনক অবস্থায় যেতে বিশেষ একটি পরিস্থিতি তথা মেরুকরণের অপেক্ষায় তারাও।

যদিও ক্ষমতাসীন ১৪ দল ও বিএনপির নেতৃত্বাধীন ২০ দলীয় জোটের বাইরে থাকা ওই দলগুলোর মধ্যে ‘তৃতীয় একটি ধারা’ গড়ে তোলার চেষ্টা চলছে অনেক দিন ধরে। কিন্তু নানা হিসাব-নিকাশে ওই ধারা বাস্তবে রূপ লাভ করেনি। ফলে এখন তারাও নির্বাচন ঘনিয়ে আসার সময়ের অপেক্ষায় রয়েছে। পরিস্থিতি ও সুবিধা বুঝে সিদ্ধান্ত নিতে চায় ওই দলগুলোও।

বিকল্পধারার প্রেসিডেন্ট সাবেক রাষ্ট্রপতি অধ্যাপক এ কিউ এম বদরুদ্দোজা চৌধুরীর মতে, নির্বাচনের আগে দেশের বড় দুটি দল আওয়ামী লীগ ও বিএনপির পরস্পরকে চাপে রাখা একটি প্রচলিত কৌশল। সম্ভবত তারই অংশ হিসেবে নির্বাচনে যাওয়া না-যাওয়ার কথা পাল্টাপাল্টিভাবে বলা হচ্ছে। কিন্তু বাস্তবে ভোট এখনো বেশ দূরে। এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘বিকল্পধারা কোনদিকে যাবে তা এখনই বলা যাচ্ছে না। বিষয়টি পরিস্থিতি তথা রাজনৈতিক হিসাব-নিকাশের ওপর নির্ভর করছে। তবে সেই হিসাব শুরু হয়েছে কি না, তা এখনই বলব না। ’

জাতীয় পার্টির কো-চেয়ারম্যান গোলাম মোহাম্মদ কাদের বলেন, নির্বাচন এলে দেশের বড় রাজনৈতিক দলগুলো তা থেকে রাজনৈতিকভাবে লাভবান হতে চাইবে, এটিই স্বাভাবিক। আর এ জন্য তারা বিভিন্ন কৌশলও নেবে। সম্ভবত রাজনীতিতে এখন সেই কৌশল শুরু হয়েছে। তাঁর মতে, জাতীয় পার্টিও এ কৌশলের বাইরে নয়। তবে দেখতে হবে পরিস্থিতি আসলে কার অনুকূলে থাকে।

বিশেষ করে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় এবং দেশের রাজনৈতিক মেরুকরণের ওপরও তা অনেকাংশে নির্ভর করছে।

পরস্পরকে চাপে রাখার কৌশল আওয়ামী লীগ ও বিএনপির নির্ভরযোগ্য সূত্রগুলোর মতে, বিএনপিকে দুর্বল অবস্থার মধ্যে ফেলে নির্বাচনে নিতে চায় আওয়ামী লীগ। উদ্দেশ্য হলো, দলটি যাতে নির্বাচনও করে আবার আসনও খুব বেশি না পায়। অর্থাৎ বিএনপি যেন বিরোধী দলে থাকে। কারণ এমন পরিস্থিতি তৈরি করা গেলে নির্বাচন দেশে-বিদেশে গ্রহণযোগ্যতা পাবে। এ লক্ষ্য সামনে রেখে বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়াসহ দলটির শীর্ষ নেতাদের বিরুদ্ধে চলমান মামলাগুলোকে পরিণতির দিকে এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে। পাশাপাশি দলটির সাংগঠনিক কর্মকাণ্ড তথা নেতাদের তৎপরতাও মনিটরিং করছে সরকার। উদ্দেশ্য হলো, বিএনপি যাতে চাপে থাকে। বড় ধরনের শোডাউন বা আন্দোলন করার সুযোগ না পায়। আর এমন কৌশল থেকেই সভা-সমাবেশের ব্যাপারেও সরকার এক ধরনের অলিখিত বিধিনিষেধ দিয়ে রাখছে বলে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে আলোচনা আছে।

অনেকের মতে, বিএনপির ভেতরে সন্দেহ আর অবিশ্বাস সৃষ্টির নেপথ্যেও সরকারের হাত থাকতে পারে। বিশেষ করে নির্বাচনের আগে দলটিকে ভাঙার চেষ্টা হচ্ছে—এমন আলোচনা রাজনৈতিক অঙ্গনে ঘুরপাক খাচ্ছে। বলা হচ্ছে, মূল বিএনপি বর্জন করলেও খণ্ডিত একটি অংশকে নির্বাচনে নেওয়ার জন্য সরকারের শীর্ষ মহলের ইঙ্গিতে ‘গ্রাউন্ডওয়ার্ক’ চলছে। পাশাপাশি আগামী নির্বাচনে জামায়াতের ভূমিকা বা অবস্থান নিয়ে নানা আলোচনা আছে। এখন পর্যন্ত ২০ দলীয় জোটে থাকলেও দলের নিবন্ধন তথা অস্তিত্ব রক্ষার প্রশ্নে শেষ পর্যন্ত ওই দলটি কী করবে সে বিষয়ে সংশয় আছে খোদ বিএনপির মধ্যেই।

যদিও আওয়ামী লীগ ও আওয়ামী লীগবিরোধী এই দুই মেরুকরণের কঠিন বাস্তবতায় বিএনপিকে ভাঙার সুযোগ কম বলেই বিশ্লেষকরা মনে করেন। বরং নির্বাচনের আগে এ দলকে ঐক্যবদ্ধ করার সম্ভাবনাই বেশি দেখছেন তাঁরা। ওয়ান-ইলেভেনের পর উদ্ভূত পরিস্থিতিতে বিএনপি ভাঙার উদ্যোগও শেষ পর্যন্ত কার্যকর হয়নি।

এদিকে নির্বাচনকালীন সরকার প্রশ্নে আওয়ামী লীগ কোনো ছাড় দেবে না—এমন বার্তা দিয়েও বিএনপিকে চাপে রাখার কৌশল নিয়েছে সরকার। কারণ সরকার ‘ছাড়’ দেবে—এটি জনমনে স্পষ্ট হওয়ার অর্থই দুর্বলতা প্রকাশ হওয়া। বরং নিবন্ধন বাতিলের ঝুঁকির বার্তা দিয়ে বিএনপিকে নির্বাচনে নিতে চায় সরকার। আবার ‘বিএনপি নির্বাচনে আসবেই’—এ কথা বলে দলটিকে ভোট থেকে দূরে রাখার ‘উসকানি’ দেওয়া হচ্ছে বলেও বিএনপি নেতারা মনে করেন।

তবে এ বিষয়ে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আমরা কাউকে চাপ ও উসকানি কোনোটিই দেই না। এ ধরনের ফালতু রাজনীতি আমরা করি না। ’ তিনি আরো বলেন, ‘মানি না, মানব না—এই ভাঙা রেকর্ড বিএনপির কৌশল  হতে পারে। কিন্তু পর পর দুইবার নির্বাচন না করলে নিবন্ধন বাতিল হয়ে যায়—এই বাস্তবতায় বলছি, বিএনপি তাদের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে নির্বাচনে যাবে। ’    

তবে সরকারের এসব কৌশলের কথা বিএনপির অজানা নয়। পরপর দুইবার নির্বাচনে অংশ না নিলে নিবন্ধন বাতিলের বিষয়ে গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশের ধারা সম্পর্কেও দলটি অবগত। কিন্তু কৌশল হিসেবে দলটি এখনই সরাসরি বলতে রাজি নয় যে তারা নির্বাচনে যাবে। কারণ এতে বিএনপিরই সাংগঠনিক তথা রাজনৈতিক শক্তির দুর্বলতা প্রকাশ পাবে বলে মনে করেন দলটির নীতিনির্ধারকরা। তাই ন্যূনতম কিছু দাবি আদায় করেই নির্বাচনে যাওয়ার পক্ষে বিএনপি। আর এ জন্য আন্দোলনের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সমর্থন পাওয়ার জোর চেষ্টা চলছে দলটির পক্ষ থেকে। পাশাপাশি জনমত গঠনের লক্ষ্যে প্রথম দফায় গত ১৮ নভেম্বর দলটি নির্বাচন কমিশন পুনর্গঠন ইস্যুতে ১৩ দফা প্রস্তাবনা দিয়েছে। দ্বিতীয় দফায় তারা দেবে সহায়ক সরকারের প্রস্তাব, যেখানে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শেখ হাসিনাকে রেখে বা না রেখে, অথবা রাষ্ট্রপতির নেতৃত্বে অথবা অন্য কোনো পন্থায় সংবিধানের মধ্যেই বিকল্প একাধিক প্রস্তাব দেওয়ার কথা ভাবছে দলটি।

বিএনপি মনে করে, এসব প্রস্তাবনার পাশাপাশি সরকারবিরোধী তীব্র আন্দোলন এবং সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের জন্য আন্তর্জাতিক উদ্যোগ যুক্ত হলে মেয়াদের শেষ দিকে সরকারের ওপর প্রবল চাপ সৃষ্টি করা সম্ভব হবে। আর এতে শেষ পর্যন্ত অন্তত কিছু ইস্যুতে সরকার ছাড় দেবে বলে মনে করে দলটি। সূত্র মতে, ১৪ দলীয় জোটের বাইরে থাকা দলগুলোকে কাছে টেনে সরকারকে একঘরে করার চেষ্টাও চালাবে বিএনপি, যাতে নির্বাচন বর্জন বা অংশগ্রহণের সিদ্ধান্ত ঐক্যবদ্ধভাবে নেওয়া যায়।

জানতে চাইলে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন কালের কণ্ঠকে বলেন, “আওয়ামী লীগ নিজেও জানে যে ৫ জানুয়ারির মতো আরেকটি নির্বাচন করা সম্ভব নয়। খোদ প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাই বলেছেন, আগামী নির্বাচন বিতর্কিত হোক তা তিনি চান না। সুতরাং ‘নিবন্ধন বাঁচানোর জন্যই বিএনপি নির্বাচনে যাবে’—এ কথা বলা হচ্ছে আমাদের ওপর চাপ সৃষ্টির জন্য। কিন্তু তাদের মনে রাখা উচিত, শুধু নিবন্ধন বাঁচানোর জন্যই বিএনপি রাজনীতি করে না। গণতন্ত্র, আইনের শাসন ও ভোটাধিকার ফিরিয়ে আনাও আমাদের আন্দোলনের আরেকটি লক্ষ্য। তা ছাড়া এই নিবন্ধনের বিধান  ওয়ান-ইলেভেন সরকারের আবিষ্কার। এটি ভবিষ্যতেও থাকবে তার নিশ্চয়তা নেই। ” তাঁর মতে, ওই জুজুর ভয় দেখিয়ে বিএনপিকে নির্বাচনে নেওয়া যাবে না। নির্বাচনকালীন সহায়ক সরকারের দাবি আদায় করেই বিএনপি নির্বাচনে যাবে, যোগ করেন প্রবীণ এই নেতা।

দলটির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আসলে বিএনপি নির্বাচনে আসবেই—এ কথা বলে আমাদের উসকানি দেওয়া হচ্ছে। এটি তাদের প্রতারণা ও এক ধরনের ছলচাতুরি। এসব করেই তারা টিকে আছে। তাদের মনে ভয় হলো, বিএনপি নির্বাচনে গেলে তাদের খবর আছে। ’ প্রশ্ন উত্থাপন করে তিনি বলেন, ‘আমরা যাব কি না তা ওরা (আওয়ামী লীগ) কী করে জানে? তা ছাড়া আদালতের রায় ও নিবন্ধনের কথা বলে তারা বিভ্রান্তি ছড়াচ্ছে। নিবন্ধন ও আদালতের রায় দিয়ে কি রাজনীতি চলে?’

হিসাব মেলাচ্ছে অন্য দলগুলোও   খোঁজ নিয়ে জানা যায়, গত ৫ জানুয়ারি নির্বাচন বর্জনকারী দলগুলো এককথায় এখনই সরকারি জোট বা বিএনপি নেতৃত্বাধীন জোটের সঙ্গে সুসম্পর্ক গড়ে তুলতে রাজি নয়। বিএনপির পক্ষ থেকে চেষ্টা অব্যাহত থাকলেও দেখেশুনে অগ্রসর হওয়ার পক্ষে সিপিবি-বাসদ, গণফোরাম, বিকল্পধারা, জেএসডি, কৃষক শ্রমিক জনতা লীগ ও নাগরিক ঐক্যসহ সরকারি জোটের বাইরে থাকা দলগুলো। যদিও বিভিন্ন ইস্যুতে ওই দলগুলো এখন সরকারের সমালোচনায় মুখর। কিন্তু তা সত্ত্বেও আগামী নির্বাচনে তারা কী করবে তা নিশ্চিত নয়। কারণ নির্বাচনকালীন পরিস্থিতি কী দাঁড়ায়, আওয়ামী লীগ ও বিএনপি পরস্পরকে কতখানি চাপে ফেলতে পারে; আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের ভূমিকা কী হবে—এসব পর্যালোচনা করেই সিদ্ধান্ত নিতে চায় ওই দলগুলো। তা ছাড়া বেশ কয়েকটি দল আবার আসন ভাগাভাগি তথা ক্ষমতার অংশীদারত্ব চাইছে। ফলে সময় ঘনিয়ে এলে তারা আওয়ামী লীগ ও বিএনপি উভয় দলের সঙ্গে দর-কষাকষি করবে। আবার মেরুকরণ তেমন হলে তৃতীয় ধারা গড়ে তোলা যায় কি না সেটিও বিবেচনায় রাখছে তারা।

জানতে চাইলে সিপিবির প্রেসিডিয়াম সদস্য বর্ষীয়ান রাজনীতিক হায়দার আকবর খান রনো কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আমরা বামপন্থীসহ অন্যরা নির্বাচনের আগে তৃতীয় ধারা গড়ে তোলার চেষ্টা করব। বড় দুই দল বা জোটের সঙ্গে আমরা যাব না। আমরা তাদের বিরুদ্ধে থাকব। ’ তিনি আরো বলেন, ‘ওরা দুই দল একে অন্যকে ঘায়েল করার চেষ্টা করছে করুক; আমরা এর সঙ্গে নেই। ’


মন্তব্য