kalerkantho


রাজীব গান্ধীর স্বীকারোক্তি

বাংলা ভাইয়ের নির্দেশে সাংবাদিক দীপংকর হত্যা

নিজস্ব প্রতিবেদক, বগুড়া   

৮ মার্চ, ২০১৭ ০০:০০



বাংলা ভাইয়ের নির্দেশে সাংবাদিক দীপংকর হত্যা

রাজীব গান্ধী

জেএমবির বিরুদ্ধে লেখালেখির কারণেই বগুড়ার সাহসী সাংবাদিক দীপংকর চক্রবর্তীকে খুন করা  হয়েছিল। এর নির্দেশদাতা ছিলেন পুরনো জেএমবির তখনকার সেকেন্ড ইন কমান্ড সিদ্দিকুল ইসলাম ওরফে বাংলা ভাই।

জেএমবির প্রথম দিকের সামরিক কমান্ডার শায়খ আব্দুর রহমানের জামাতা শায়খ আব্দুল আউয়ালের সরাসরি তত্ত্বাবধানে ওই হত্যাকাণ্ড ঘটায় চার জঙ্গি। ঢাকার হলি আর্টিজান বেকারিতে হামলার ঘটনার গ্রেপ্তার শীর্ষ জেএমবি নেতা জাহাঙ্গীর আলম ওরফে রাজীব গান্ধীও ওই কিলিং স্কোয়াডে ছিল।

গতকাল মঙ্গলবার বগুড়ার আদালতে এই হত্যাকাণ্ডের বিষয়ে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছে রাজীব গান্ধী। এর ফলে সাংবাদিক দীপংকর চক্রবর্তী হত্যার ১৩ বছর পর এর রহস্য উন্মোচিত হলো।

এত দিন কোনো সূত্র (ক্লু) না পেয়ে গোয়েন্দা পুলিশ এটি পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড উল্লেখ করে আদালতে চারবার চূড়ান্ত রিপোর্ট দিয়েছিল। ২০০৪ সাল থেকে এ পর্যন্ত মামলাটি থানা পুলিশ, ডিবি পুলিশ ও সিআইডি পুলিশের ১২ জন কর্মকর্তা তদন্ত করেছেন। সর্বশেষ তদন্ত কর্মকর্তা হিসেবে ডিবির এসআই মজিবর রহমান সেটি তদন্ত করছেন।

বাংলাদেশ ফেডারেল সাংবাদিক ইউনিয়নের (বিএফইউজে) সাবেক সহসভাপতি ও স্থানীয় দৈনিক দুর্জয় বাংলার নির্বাহী সম্পাদক ছিলেন দীপংকর চক্রবর্তী। ২০০৪ সালের ২ অক্টোবর রাতে বগুড়ার শেরপুর উপজেলার সান্যালপাড়ায় নিজ বাড়ির সামনে কুপিয়ে হত্যা করা হয় সাংবাদিক দীপংকরকে।

হত্যাকারীরা ধারালো অস্ত্রের আঘাতে তাঁর দেহ থেকে মাথা প্রায় বিচ্ছিন্ন করে ফেলেছিল। এই হত্যাকাণ্ড নিয়ে তখন বগুড়াসহ সারা দেশে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি হয়।

বগুড়ার পুলিশ সুপার (এসপি) আসাদুজ্জামান জানান, হলি আর্টিজানে হামলা মামলার আসামি রাজীব গান্ধী আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিতে বলেছে, জেএমবির তখনকার শীর্ষ নেতা সিদ্দিকুল ইসলাম বাংলা ভাই ও শায়খ আব্দুর রহমানের জামাতা শায়খ আব্দুল আউয়ালের নির্দেশে সাংবাদিক দীপংকর চক্রবর্তীকে হত্যা করা হয়। ওই হত্যাকাণ্ডে রাজীব গান্ধী ছাড়া অন্য যে তিন জঙ্গি অংশ নিয়েছিল তারা হলো জেএমবির কিলিং গ্রুপের সদস্য মানিক, সানাউল্লা ও নুরুল্লাহ।

রাজীব গান্ধীর জবানবন্দির তথ্য উল্লেখ করে পুলিশ জানায়, বগুড়ার জহুরুলনগরে একটি ছাত্রাবাসে বসে হত্যার পরিকল্পনা করা হয়। হত্যার আগের রাত ১০টায় মানিক মোটরসাইকেল দিয়ে সানাউল্লা ও নুরুল্লাহকে নিয়ে শেরপুরে যায়। এর আগেই বাসে করে রাজীব গান্ধী সেখানে পৌঁছায়। রাজীব গান্ধীর দায়িত্ব ছিল সাংবাদিক দীপংকরের গতিবিধি লক্ষ্য করা, আর হত্যার মূল দায়িত্বে ছিল সানাউল্লা ও নুরুল্লাহ। ঘটনার দিন রাত ১২টায় বগুড়া থেকে কাজ শেষে সাংবাদিক দীপংকর শেরপুর উপজেলা সদরে নেমে একটি হোটেলে চা পান করেন। পরে ফেরার পথে বাড়ির ফটকের সামনে তাঁকে কুপিয়ে হত্যা করা হয়।

সাংবাদিক দীপংকর চক্রবর্তী খুন হওয়ার পর তাঁর ছেলে পার্থ সারথী চক্রবর্তী বাদী হয়ে অজ্ঞাতপরিচয় সন্ত্রাসীদের আসামি করে একটি হত্যা মামলা করেন। মামলাটি প্রথমে শেরপুর থানা পুলিশ তদন্ত করে। পরে তদন্তভার পায় সিআইডি পুলিশ। তারা ২০০৭ সালের ২৬ নভেম্বর আদালতে সূত্রহীন (ক্লুলেস) মামলা হিসেবে চূড়ান্ত রিপোর্ট দাখিল করে। এরপর বাদীর নারাজি আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে আদালত মামলাটি পুনরায় তদন্তের আদেশ দেন। দ্বিতীয় দফাও তদন্তভার সিআইডিকে দেওয়া হয়। এরপর সিআইডির সহকারী পুলিশ সুপার আব্দুস সামাদ মিঞা ২০১৩ সালের ১৩ জুলাই আবারও একই ধরনের চূড়ান্ত রিপোর্ট দাখিল করেন। বাদী আবারও নারাজি আবেদন দিলে মামলাটির তদন্তভার ২০১৪ সালের ১২ ডিসেম্বর জেলা গোয়েন্দা পুলিশকে (ডিবি) দেওয়া হয়।

পুলিশ সুপার জানান, ২০১৬ সালের ১ জুলাই হলি আর্টিজানে হামলার অন্যতম প্রধান পরিকল্পনাকারী জাহাঙ্গীর আলম ওরফে নাছির ওরফে রাজীব গান্ধী ওরফে সুভাস ওরফে জাহিদ ওরফে জাকির ওরফে আদিল ওরফে টাইগার ওরফে আবু ওমর আল বাঙ্গালকে (৩৩) এর আগে বগুড়া পুলিশ গ্রেপ্তার করে। তাকে শেরপুরের জোয়ানপুরে জেএমবি আস্তানায় বোমা বিস্ফোরণের মামলায় গ্রেপ্তার দেখিয়ে রিমান্ডে নেওয়া হয়। জিজ্ঞাসাবাদের একপর্যায়ে অতীত কর্মকাণ্ডের বর্ণনাকালে রাজীব গান্ধী সাংবাদিক দীপংকর খুনে জড়িত থাকার কথা স্বীকার করে।

জবানবন্দিতে রাজীব গান্ধী জানায়, ২০০১ সালে সে জেএমবিতে যোগ দেয়। ২০০৪ সালের মাঝামাঝি সময়ে সারোয়ার জাহান ওরফে মানিক তাকে হিজরত (স্থানান্তর) করতে বলে। তার আহ্বানে সাড়া দিয়ে সে গাইবান্ধার সাঘাটা থেকে সিরাজগঞ্জ জেলায় ডা. নজরুলের কাছে যায়। ডা. নজরুল তাকে একটি মেসে নিয়ে যায়। সেখানে শাহাদত, মানিকসহ আরো পাঁচ-ছয়জন ছিল। প্রায় দুই মাস ওই মেসে ছিল সে। একদিন মানিক তাকে বলে বগুড়ায় একটা কাজ করতে হবে। সে রাজি হলে ২০০৪ সালের সেপ্টেম্বর মাসের শেষের দিকে মানিক তাকে সিরাজগঞ্জ থেকে বগুড়ার জহুরুলনগর এলাকায় ভাইবোন ছাত্রাবাসে নিয়ে যায়। ওই মেসে সে নুরুল্লাহ, সানাউল্লা, রাহাত, শিহাব, ওসমানসহ আরো ১০ থেকে ১২ জনকে দেখতে পায়। মেসে তিনটি কক্ষ ছিল, এর মধ্যে একটি কক্ষ ছিল ফাঁকা। তারা দুইজন রাতে ওই মেসে অবস্থান করে।

রাজীব গান্ধী জানায়, পরের দিন সকাল ১০টায় আব্দুল আওয়াল ওই মেসে একজন ব্যক্তিসহ আসে এবং সেখানে একটি বৈঠক করে। সেখানে সেসহ অন্যরা উপস্থিত ছিল। বৈঠকে আব্দুল আওয়াল বলে যে জেএমবি সম্পর্কে পত্রপত্রিকায় লেখালেখি এবং বিভিন্ন সভা-সেমিনারে জেএমবির কার্যক্রম নিয়ে বিরূপ মন্তব্য করায় শুরা সদস্য সিদ্দিকুল ইসলাম ওরফে বাংলা ভাই সাংবাদিক দীপংকর চক্রবর্তীকে হত্যার নির্দেশ দিয়েছেন। এরপর সেখানেই আব্দুল আওয়াল সাংবাদিক দীপংকরকে হত্যার বিস্তারিত পরিকল্পনা করে। সেই সিদ্ধান্ত অনুযায়ী রাজীব গান্ধী, নুরুল্লাহ, সানাউল্লা ও মানিক হত্যার পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করে।


মন্তব্য