kalerkantho


আচমত মিয়া

দেউলার যুদ্ধের কথা মনে হলে এখনো শিহরিত হই

শিমুল চৌধুরী, ভোলা   

৮ মার্চ, ২০১৭ ০০:০০



দেউলার যুদ্ধের কথা মনে হলে এখনো শিহরিত হই

একাত্তরে ভোলা জেলায় যে কয়টি যুদ্ধ হয়েছিল সেগুলোর মধ্যে দেউলার যুদ্ধ ছিল সবচেয়ে বড় ও ভয়াবহ। সে কথা মনে হলে এখনো শরীরে শিহরণ জাগে। প্রায় দেড় ঘণ্টাব্যাপী সম্মুখযুদ্ধে ৫২ জন পাকিস্তানি সেনা নিহত হয়েছিল। ১২ জন পুলিশ, রাজাকার ও শান্তি কমিটির সদস্য আত্মসমর্পণ করেছিল। দুজন মুক্তিযোদ্ধা শহীদ হয়েছিলেন। স্থানীয় জনতা ও মুক্তিযোদ্ধারা সম্মিলিত আক্রমণে পাকিস্তানি বাহিনীকে সম্পূর্ণ পরাস্ত করেছিল। নির্মূল করেছিল তাদের দোসরদের।

মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিচারণা করতে গিয়ে বোরহানউদ্দিন উপজেলার দেউলায় সংঘটিত যুদ্ধের বিবরণ দেন বীর মুক্তিযোদ্ধা আচমত আলী মিয়া। এখন তাঁর বয়স ৭০। বোরহানউদ্দিন উপজেলা মুক্তিযোদ্ধা সংসদের সাবেক কমান্ডার তিনি। বাড়ি সাচড়া ইউনিয়নের রামকেশব গ্রামে।

সেনাবাহিনীতে চাকরিরত অবস্থায় যুদ্ধে জড়ান তিনি।

আচমত মিয়া বলেন, ‘২৮ অক্টোবর রাতে বোরহানউদ্দিন বাজারে বশির মিয়ার ঘরে ভাষাসৈনিক রেজা-এ-করিম চৌধুরী (চুন্নু মিয়া) এমসিএ, বশির আহম্মেদ মিয়া, মোহাম্মদ হোসেন চৌধুরী, সিদ্দিক মিয়া, সামছু মিয়া, মাকসুদুর রহমান, ল্যান্স নায়েক মো. সিদ্দিকুর রহমান ও আরো কয়েকজনের সঙ্গে বৈঠক করি। সেখানে বাংলাবাজারের যুদ্ধসহ ভোলায় মুক্তিযুদ্ধের সার্বিক পরিস্থিতি পর্যালোচনা করা হয়। আলোচনায় এ ধারণা হয় যে পাকসেনারা যেকোনো সময় বোরহানউদ্দিন আক্রমণ করতে পারে। তাই খেয়াঘাট, লঞ্চঘাট, তেঁতুলিয়া নদীর সংযোগ খাল ও বোরহানউদ্দিনের উত্তর দিকে পাহারা বসানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। ’

‘সিদ্ধান্ত অনুযায়ী খেয়াঘাট ও লঞ্চঘাটের পাহারার দায়িত্ব নেয় সিদ্দিক মিয়ার গ্রুপ। বাজারের উত্তর ও পশ্চিম দিকে পাহারার দায়িত্ব নেয় আমার গ্রুপ। বাজারের বিভিন্ন স্থানে ও বোরহানউদ্দিন হাই স্কুলে মুক্তিযোদ্ধাদের থাকার ব্যবস্থা করা হয়। সেখানে তাদের প্রশিক্ষণও দেওয়া হয়। গঠন করা হয় সংগ্রাম পরিষদ। সার্বিক তত্ত্বাবধানের দায়িত্ব নেন রেজা-এ-করিম চৌধুরী। খাবারের দায়িত্ব নেন বশির আহম্মেদ মিয়া, সৈয়দ ডাক্তার ও সংগ্রাম পরিষদের অন্য সদস্যরা। বাজারের ব্যবসায়ীরা তাঁদের সহযোগিতা করে। ’

মুক্তিযোদ্ধা আচমত মিয়া বলেন, ‘দেউলা স্কুলবাড়ির পশ্চিম পাশে গোড়ানীবাড়িতে একজন খুন হলে থানায় একটি মামলা হয়। অন্যদিকে পাকবাহিনীকে সহযোগিতা করার অভিযোগে সিদ্দিকুর রহমান ১৪ অক্টোবর দেউলার রাজাকার চৌকিদার আব্দুল মান্নানকে গাছের সঙ্গে বেঁধে গুলি করে হত্যা করেন। স্থানীয়দের লাশ দাফন করতে নিষেধ করেন তিনি। এ দুটি ঘটনার কারণে বোরহানউদ্দিন থানার এসআই শাজাহানের নেতৃত্বে ১৫ জন পুলিশ ও রাজাকারের একটি দল দেউলায় নসু মিয়ার বাড়িতে যায়। তারা মান্নান চৌকিদারের লাশ গাছ থেকে নামিয়ে দাফন করে। খবরটি মুক্তিযোদ্ধা ক্যাম্পে পৌঁছায় নজিব। এরপর সিদ্দিকুর রহমানের নেতৃত্বে মুক্তিযোদ্ধাদের একটি দল পুলিশ ও রাজাকারদের ঘেরাও করে কয়েক রাউন্ড গুলি ছোড়ে ও কয়েকটি হাতবোমা ফাটায়। পুলিশ ও রাজাকাররা আত্মসমর্পণ করে এবং অস্ত্র ও গুলি সিদ্দিক মিয়ার কাছে জমা দেয়। অঙ্গীকারনামা দিয়ে রাজাকাররা প্রাণভিক্ষা নেয়। ’

 ‘বিষয়টি চাপা থাকেনি। রাজাকাররাও তাদের কথা রাখেনি। তারা থানায় গিয়ে ঘটনার বিস্তারিত ব্যাখ্যা দেয়। কিন্তু থানার ওসি সন্তুষ্ট হতে পারেননি। তিনি তাদের আটকে রাখেন এবং ভোলা সদরে অবস্থানরত পাকিস্তানি বাহিনীকে বিষয়টি জানান। সিদ্দিক মিয়া ও সহযোদ্ধারা অনুমান করেন—যেকোনো সময় পাকিস্তানি বাহিনী দেউলা আক্রমণ করতে পারে। ১৫ অক্টোবর রাতে মাকসুদুর রহমান, আমি ও আরো কয়েকজনের সঙ্গে দেউলা ক্যাম্পে আলোচনায় বসেন সিদ্দিক মিয়া। পাকিস্তানি বাহিনীর আক্রমণ কিভাবে প্রতিরোধ করা যায় সে ব্যাপারে তিনি একটি পরিকল্পনা করেন। আমাদের কাছে মাত্র ২০টি রাইফেল ও কিছু হাতবোমা ছিল। পরিকল্পনা অনুযায়ী গাজীপুর দোন খেয়াঘাটের পশ্চিম পাশে গোয়েন্দা পাঠানো হয়। তাদের বলা হয়, পাকিস্তানি বাহিনী দেউলার দিকে অগ্রসর হওয়া মাত্র যেন ক্যাম্পে খবর পৌঁছানো হয়। তালুকদার বাড়ির (ক্যাম্প) বেশির ভাগ নারী, শিশু ও বৃদ্ধকে বাইরে পাঠিয়ে দেওয়া হয়। ক্যাম্পের মুক্তিযোদ্ধাদের প্রস্তুত থাকার নির্দেশ দেওয়া হয়। ’

‘পরের দিন সকালে মুক্তিযোদ্ধাদের নিশ্চিহ্ন করার জন্য ভোলা থেকে বোরহানউদ্দিন হয়ে ৮০-৮৫ জন পাকিস্তানি সেনা ও রাজাকারসহ তাদের দোসররা দেউলা অভিযান শুরু করে। তারা নৌকা দিয়ে বোরহানউদ্দিন ও সাচড়া খেয়া (গাজীপুর দোন) পার হয়ে দেউলার দিকে আসে। দেউলা (মোয়াজ্জেমের হাট) যাওয়ার রাস্তাটি ছিল সরু ও কাঁচা। দুই পাশে ছিল ধানক্ষেত। শান্তি কমিটির সদস্য মতি সিকদার গুলির বাক্স বহন করছিল। তোফাজ্জল সিকদার তাদের পথ দেখিয়ে নিয়ে যাচ্ছিল। যাওয়ার পথে তারা রাস্তার পাশে অনেক বাড়িঘরে আগুন দেয়। দেউলার জান খাঁর দিঘির দক্ষিণ পাশে গিয়ে তারা তিন ভাগে ভাগ হয়। প্রথম ভাগে ছিল রাজাকার, পুলিশ ও পাঞ্জাবি। দ্বিতীয় ভাগে ছিল পুলিশ ও পাঞ্জাবি। তৃতীয় ভাগে ছিল শুধু পাঞ্জাবি। দেউলায় পাকিস্তানি বাহিনীর প্রবেশের খবর সকাল ৯টার দিকে মুক্তিযোদ্ধা ক্যাম্পে পৌঁছান জাহাঙ্গীর তালুকদার। এরপর আমার ও সিদ্দিক মিয়ার নেতৃত্বে মুক্তিযোদ্ধারা দুই ভাগে ভাগ হয়। তাঁর গ্রুপ তালুকদার বাড়ির পশ্চিম পাশ দিয়ে ও সিদ্দিক মিয়ার গ্রুপ তালুকদার বাড়ির সামনে দিয়ে অগ্রসর হয়ে সকাল সাড়ে ৯টা থেকে ১০টার মধ্যে সদর আলী হাওলাদার বাড়ির পুকুরের পুব পাশে অবস্থান নেয়। রণকৌশল হিসেবে তাঁরা পাকিস্তানি বাহিনীর প্রথম গ্রুপকে সামনে এগিয়ে যাওয়ার সুযোগ দেন। দ্বিতীয় গ্রুপ রেঞ্জের মধ্যে এলে সকাল ১১টার দিকে সিদ্দিক মিয়া তাদের লক্ষ্য করে গুলিবর্ষণ শুরু করেন। সঙ্গে সঙ্গে অন্য মুক্তিযোদ্ধারাও গুলিবর্ষণ করতে থাকেন। পাকিস্তানি বাহিনী পাল্টা গুলি চালায়। দুই পক্ষের মধ্যে প্রায় দেড় ঘণ্টা যুদ্ধ চলে। অনেক পাকিস্তানি সেনা নিহত হয়। ১২ জন পুলিশ, রাজাকার ও শান্তি কমিটির সদস্য আত্মসমর্পণ করে। স্থানীয় লোকজন মুক্তিযোদ্ধাদের সঙ্গে মিলে চারদিকে পাকিস্তানি সেনাদের খুঁজতে থাকে। তৃতীয় গ্রুপটি জান খাঁর দিঘির পাড়ে থেকে যায়। তারা আমার গ্রুপের সঙ্গে যুদ্ধে লিপ্ত হয়। একপর্যায়ে পাকিস্তানি বাহিনী পিছু হটে বোরহানউদ্দিনের দিকে ফেরত যেতে থাকে। কিন্তু আমি ও হযরত আলী গাজীপুর গ্রামের সুলতান আহমেদ পঞ্চায়েত বাড়ির কাছে তাদের আক্রমণ করি। বিকেল সাড়ে ৪টা পর্যন্ত চলে সেই যুদ্ধ। সেখানে একজন পাকিস্তানি সেনা মারা যায়। বাকিরা খেয়া পার হয়ে বোরহানউদ্দিনে পালিয়ে যায়। ’

‘জান খাঁর দিঘির দক্ষিণ পাশে পাঠান বাড়ির একটি ঘরের পাটাতনে একজন আহত পাঞ্জাবিকে আটক করে পিটিয়ে মেরে ফেলে আনজত আলী, আব্দুল মজিদ ও স্থানীয় লোকজন। ’

 


মন্তব্য