kalerkantho


আবুল কালাম আজাদ

সেদিন ভাবিনি বেঁচে থাকব

অরণ্য ইমতিয়াজ, টাঙ্গাইল   

৭ মার্চ, ২০১৭ ০০:০০



সেদিন ভাবিনি বেঁচে থাকব

‘১৯৭১ সালের ১৭ আগস্ট সকালে পাওয়ার হাউস রেকি করি আমি ও বাকু। রেকি করতে গিয়ে দেখি, পাকিস্তানি আর্মি ও রাজাকাররা জায়গাটি ঘিরে রেখেছে। প্রায় ১৫ দিন আগে পাওয়ার হাউস উড়িয়ে দেওয়ার জন্য গ্রেনেড চার্জ করা হয়েছিল। কিন্তু সেদিন সফল হইনি। এরপর পাওয়ার হাউসে কড়া পাহারা বসানো হয়। ওই দিনই (১৭ আগস্ট) সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়, শহরের আশপাশে ছোট ছোট ট্রান্সফরমার ধ্বংস করা হবে। সিদ্ধান্ত নেওয়ার সঙ্গে সঙ্গে চলে যাই টাঙ্গাইল সদর থানার তারুটিয়া-ভাতকুড়া এলাকায়। সেখানে ক্ষেতের মধ্যে একটি ট্রান্সফরমার ছিল। আমরা দুজন ভাতকুড়া গ্রামের বাচ্চু ড্রাইভারের বাড়িতে উঠি। তাঁকে সব বুঝিয়ে ট্রান্সফরমারের জায়গায় যাওয়ার রাস্তা সম্পর্কে জেনে সেখানে রেকি করি। গ্রেনেড ও অন্যান্য বিস্ফোরক পাশের গোরস্থানে লুকিয়ে রেখে পাশের এক পাটক্ষেতে অপেক্ষা করতে থাকি।

আমাদের অবস্থান থেকে প্রায় ২০০ গজ দূরে ছিল লোহার একটি ব্রিজ। সন্ধ্যার পর গ্রেনেড-বিস্ফোরকসহ ট্রান্সফরমারের দিকে রওনা হই। চারপাশে শান্তি বাহিনীর লোকজন পাহারা দিচ্ছিল। তাদের চোখ এড়িয়ে গন্তব্যে পৌঁছাই। শান্তি বাহিনীর পাহারা দেওয়ার কথা বাচ্চু ড্রাইভার আগেই বলেছিলেন। লোহার ব্রিজে পাকিস্তানি আর্মি ও রাজাকাররা টহল দিচ্ছিল। আমরা ট্রান্সফরমারের নিচে বিস্ফোরক রাখার জন্য গর্ত খুঁড়তে শুরু করি। এরই মধ্যে মুষলধারে বৃষ্টি শুরু হয়। ব্যর্থ হয় আমাদের অপারেশন। ’

কথাগুলো বলছিলেন টাঙ্গাইলের বীর মুক্তিযোদ্ধা আবুল কালাম আজাদ বীরবিক্রম। তাঁর বয়স এখন ৬৬ বছর। আব্দুল কাদের সিদ্দিকীর নেতৃত্বাধীন কাদেরিয়া বাহিনীর সদস্য ছিলেন তিনি। দেশকে শত্রুমুক্ত করতে জীবন বাজি রেখেছিলেন একাত্তরে। বেশ কিছু যুদ্ধে অংশ নিয়েছেন তিনি। তাঁর ও নজরুল ইসলাম বাকুর মূল দায়িত্ব ছিল টাঙ্গাইল শহরে। পাকিস্তানি বাহিনীর ক্যাম্প ছিল শহরে। সেই ক্যাম্প ছিল তাঁদের নজরদারিতে। সেখান থেকে পাকিস্তানি সেনারা যাতে সহজে বের হতে না পারে সেটি দেখাই ছিল তাঁদের কাজ।

আবুল কালাম আজাদ বলেন, ‘একপর্যায় আমরা স্থানীয় ৮-১০ জনকে নিয়ে একটি দল গঠন করি। সেই দলের কাজও ছিল আর্মিদের খোঁজখবর রাখা। পাশাপাশি আমার ও বাকুর ওপর দায়িত্ব পড়ে শহরের পাওয়ার হাউস ধ্বংস করার। বিদ্যুত্ সরবরাহ বন্ধ থাকলে পাকিস্তানি আর্মি রাতের বেলা সহজে আক্রমণ করতে পারবে না। অন্যদিকে মুক্তিযোদ্ধাদের চেনা শহরে যুদ্ধ করতে সহজ হবে। এ জন্যই পাওয়ার হাউস ধ্বংস করার পরিকল্পনা করা হয়েছিল। ’

বীরবিক্রম আবুল কালাম আজাদ বলেন, ‘ট্রান্সফরমারের জায়গা থেকে ফিরে আমরা পাশের একটি বাড়িতে আশ্রয় নিই। সদর থানার পাঁচকাউনিয়া মুক্তিযোদ্ধা ক্যাম্পে যাওয়ার জন্য ভোরে যাত্রা শুরু করি। ফ্যানকচুর পাতা দিয়ে বিস্ফোরক ঢেকে চলছিলাম। কিছুদূর যাওয়ার পর তিন রাজাকার পথ আটকে দাঁড়ায়, তারা নানা প্রশ্ন করতে থাকে। একপর্যায়ে তারা পার্শ্ববর্তী আর্মি ক্যাম্পে গিয়ে খবর দেয়। কিছুক্ষণের মধ্যে শতাধিক আর্মি সদস্য ঢাকা-টাঙ্গাইল সড়ক ঘিরে ফেলে বৃষ্টির মতো গুলি ছুড়তে থাকে। আমরা মাটিতে শুয়ে পড়ি। আমাদের কাছে ৩০টির বেশি গ্রেনেড ও গুলিভর্তি পিস্তল ছিল। তা-ই দিয়ে আর্মিদের প্রতিরোধ করতে চেষ্টা করি। আর্মি গুলি ছুড়ছিল আর আমরা গ্রেনেড ছুড়ে মারছিলাম। তুমুল সংঘর্ষ চলতে থাকে। হঠাত্ দেখি, বাকু আমার পাশে নেই। সে আলাদা হয়ে গেছে। আমাদের পেছনে কাশবন ছিল। বাকি তিন দিক দিয়ে গুলি করতে করতে আর্মিরা এগিয়ে আসতে থাকে। একটি গুলি আমার বাঁ পায়ের নিচে, আরেকটি গুলি বাঁ চোখের পাশে লাগে। তখন বৃষ্টি পড়ছিল। আমি জ্ঞান হারিয়ে ফেলি। কিছুক্ষণ পর জ্ঞান ফিরলে দেখি, পাকিস্তানিরা ঘিরে রেখেছে। তাকানোর পরই তারা আমাকে বেধড়ক পেটাতে থাকে। পাশের পাটক্ষেত থেকে পাট দিয়ে ও আমার গামছা দিয়ে আমার দুই হাত পেছন দিকে শক্ত করে বাঁধা হয়। গুলিবিদ্ধ হওয়ায় শরীর রক্তে ভেজা। ইকবাল নামের এক রাজাকার বুকে রাইফেল তাক করে গুলি করতে উদ্যত হয়। কিন্তু একজন পুলিশ সদস্য তাকে বাধা দিয়ে বলে, মেরে ফেললে তথ্য জানা যাবে না। আমাকে নিয়ে যাওয়া হয় সার্কিট হাউসে আর্মি ক্যাম্পে। যাওয়ার পথে দেখলাম বাকু কিছু দূরে একটা খালের পাশে গুলিবিদ্ধ অবস্থায় উঠে দাঁড়ানোর চেষ্টা করছে। তখন পেছন থেকে ইকবাল রাজাকার তাকে পরপর ৯টি গুলি করে। সঙ্গে সঙ্গে বাকু মাটিতে লুটিয়ে পড়ে। তার রক্তে খালের পানি লাল হয়ে যায়। ’ তিনি আরো বলেন, ‘এরপর আমাকে সার্কিট হাউস থেকে নেওয়া হয় থানায়। তারপর আবার সার্কিট হাউসে। দুই দিন জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। অমানবিক নির্যাতন চালানো হয়। সেখানে আমার সঙ্গে দেখা করেন চারজন বিদেশি সাংবাদিক। তাঁরা নানা প্রশ্ন করে চলে যান। ’

আবুল কালাম আজাদের বিবরণে ফুটে উঠছিল সেদিনের দৃশ্য। তিনি বলে যাচ্ছিলেন, ‘ওই দিনই আমাকে মির্জাপুরের গোড়াই আর্মি ক্যাম্পে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখান থেকে হেলিকপ্টারে করে ঢাকা সেনানিবাসে। সেখানে নির্যাতনের মাত্রা আরো বেড়ে যায়। লজ্জাবতী গাছের ওপর দিয়ে ২৫টি ডিগবাজি দেওয়ানো হয়। একটি কক্ষে অন্য বন্দিদের সামনে উল্টো করে ঝুলিয়ে চালানো হয় নির্যাতন। অন্তত ১০ বার আমাকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। এরপর নিয়ে যাওয়া হয় শাহবাগে রেডিও পাকিস্তানে। সেখান থেকে শেরেবাংলানগরে নিয়ে যাওয়া হয় সাক্ষাত্কার দেওয়ার জন্য। আমাকে বলতে বলা হয় যে কাদেরিয়া বাহিনীর প্রধান কাদের সিদ্দিকী জোর করে আমাকে অস্ত্র দিয়ে মুক্তিযুদ্ধে পাঠিয়েছে। সঞ্চালক বলেন, আমি এ কথা না বললে আর্মিরা আমাকে মেরে ফেলবে। জীবন বাঁচাতে আমি তাদের কথায় রাজি হই। সেই সাক্ষাত্কার রেডিওতে প্রচার করা হয়। এরপর আমার ওপর আবার নির্যাতন চালানো হয়। সারা শরীরে আলপিন ফোটানো হয়। দুই দিন পর চূড়ান্ত জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। জিজ্ঞাসাবাদের একপর্যায়ে জ্বলন্ত রড আমার দুই পায়ের পাতায় ঢুকিয়ে দেওয়া হয়। সঙ্গে সঙ্গে জ্ঞান হারিয়ে ফেলি। ’

একটু থেমে তিনি বলেন, ‘জ্ঞান ফিরলে আবার আমাকে আর্মি ক্যাম্পে নিয়ে যাওয়া হয়। শরীরের ক্ষত থেকে দুর্গন্ধ ছড়াচ্ছিল। কোনো চিকিত্সা দেওয়া হয়নি। সেখানে বিচারে আমার ১৪ বছরের কারাদণ্ড হয়, সঙ্গে ১৪টি বেত্রাঘাত। জেলে কাটতে থাকে সময়। এর মধ্যেই দেশ স্বাধীন হয়। ১৭ ডিসেম্বর কাদেরিয়া বাহিনীর প্রধান কাদের সিদ্দিকী লোক পাঠান জেলখানায়। তাঁরা আমাকে ও অন্য বন্দিদের মুক্ত করেন। ’

আবুল কালাম আজাদ বলেন, ‘যুদ্ধ ও নির্যাতনের কথা আজও আমার পরিষ্কার মনে আছে। সেদিন ভাবিনি বেঁচে থাকব, স্বাধীন বাংলাদেশ দুই চোখ ভরে দেখতে পারব। ’


মন্তব্য