kalerkantho


হাজারীবাগের সব ট্যানারি বন্ধের নির্দেশ হাইকোর্টের

নিজস্ব প্রতিবেদক   

৭ মার্চ, ২০১৭ ০০:০০



হাজারীবাগের সব ট্যানারি বন্ধের নির্দেশ হাইকোর্টের

সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশ অমান্য করে রাজধানীর হাজারীবাগে চালু থাকা সব ট্যানারি অবিলম্বে বন্ধের নির্দেশ দিয়েছেন হাইকোর্ট। একই সঙ্গে সব ট্যানারি থেকে গ্যাস, পানি ও বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। পরিবেশ অধিদপ্তরের মহাপরিচালককে এ নির্দেশ বাস্তবায়ন করতে বলা হয়েছে। এ বিষয়ে আগামী ৬ এপ্রিলের মধ্যে তাঁকে আদালতে অগ্রগতি প্রতিবেদন দাখিল করতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। ১০ এপ্রিল পরবর্তী শুনানির দিন ধার্য করা হয়েছে।

বাংলাদেশ পরিবেশ আইনজীবী সমিতির (বেলা) করা আবেদনের শুনানি শেষে বিচারপতি সৈয়দ রেফাত আহমেদ ও বিচারপতি মো. সেলিমের হাইকোর্ট বেঞ্চ গতকাল সোমবার এ আদেশ দেন।

তবে ট্যানারির মালিকরা বলছেন, চলতি বছরের জুন মাস পর্যন্ত সময় চেয়ে তাঁরা আদালত ও শিল্প মন্ত্রণালয়ে আবেদন করবেন। আর শিল্প মন্ত্রণালয় ট্যানারি সরাতে সময় দেওয়ার পরিবর্তে আদালতের রায় কার্যকরেই আগ্রহী বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।

গতকাল আদালতে বেলার পক্ষে আইনজীবী ছিলেন ব্যারিস্টার ফিদা এম কামাল, অ্যাডভোকেট সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান ও মিনহাজুল হক চৌধুরী। শিল্প মন্ত্রণালয়ের পক্ষে ছিলেন রইস উদ্দিন আহমেদ। রাষ্ট্রপক্ষে ছিলেন ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল অমিত তালুকদার।

হাইকোর্টের ওই নির্দেশ বাস্তবায়নে সহযোগিতা করতে স্বরাষ্ট্র ও শিল্পসচিব, পুলিশের মহাপরিদর্শক ও ঢাকা মহানগর পুলিশ কমিশনারকে বলা হয়েছে। এ ছাড়া হাজারীবাগে কাঁচা চামড়া প্রবেশ বন্ধে সরকারের বিভিন্ন সংস্থা সহযোগিতা করছে কি না, তা জানিয়ে আদালতে প্রতিবেদন দাখিল করতে বলা হয়েছে শিল্প মন্ত্রণালয়কে।

বাংলাদেশ ট্যানারস অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি শাহীন আহমেদ কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘হাজারীবাগ থেকে ট্যানারি সরাতে আগামী জুন মাস পর্যন্ত সময়ের আবেদন করা হবে। শিল্প মন্ত্রণালয়েও সময় চেয়ে ফের আবেদন করব। আরো অনন্ত সাড়ে চার মাস সময় না দিলে ট্যানারি সরানো সম্ভব হবে না। সাভার চামড়াশিল্প নগরীতে কারখানা নির্মাণ করতে ছোট ট্যানারির মালিকরা আর্থিক অনটনে ভুগছেন। এরই মধ্যে গ্যাস, বিদ্যুৎ ও পানির লাইন কেটে দেওয়া হলে বড় ধরনের বিপর্যয় হবে। আমরা হাজারীবাগ ছেড়ে যেতে চাই, এ জন্য প্রস্তুতি চলছে। শিল্প মন্ত্রণালয়ের কাছে জুন মাস পর্যন্ত সময় চেয়েছিলাম। এর মধ্যে আদালতের এমন নির্দেশ চামড়া খাতকে হুমকিতে ফেলবে। তবে এ ক্ষেত্রে আইনি পন্থায় ট্যানারি স্থানান্তরে সময় বাড়ানোর সুযোগ থাকলে সেই পথে যাব। ’

সাভার চামড়াশিল্প নগরীর প্রকল্প পরিচালক জিয়াউল হক কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আদালতের রায়ের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে বলছি সাভার চামড়াশিল্প নগরীতে ট্যানারি স্থানান্তরে পুরোপুরি প্রস্তুত। আদালতের নির্দেশ আমাদের কাছে পৌঁছানোর পর তা কিভাবে কার্যকর করা যায়, সে বিষয়ে শিল্প মন্ত্রণালয়ের নেতৃত্বে রায় বাস্তবায়নকারী সংশ্লিষ্ট সবাই বৈঠকে বসব। এখনো এ বিষয়ে শিল্প মন্ত্রণালয় বিসিককে কোনো নির্দেশ দেয়নি। ’

তবে নাম প্রকাশ না করার শর্তে শিল্প মন্ত্রণালয়ের ঊর্ধ্বতন একজন কর্মকর্তা জানান, হাজারীবাগ থেকে ট্যানারি সরাতে সরকার কঠোর অবস্থানে আছে। প্রয়োজনে সাভার চামড়াশিল্প নগরীতে হাজারীবাগের ট্যানারি মালিকদের প্লট বাতিল করে নতুন ট্যানারি মালিকদের দেওয়া হবে।

আদালতের নির্দেশের বিষয়ে শিল্প মন্ত্রণালয় কী ভাবছে জানতে যোগাযোগ করলে শিল্পমন্ত্রী আমির হোসেন আমু বলেন, ‘আমি অসুস্থ। এখন কথা বলতে পারব না। ’

ঢাকার পরিবেশ রক্ষায় ট্যানারি শিল্প হাজারীবাগ থেকে অন্যত্র সরিয়ে নিতে হাইকোর্ট ২০০১ সালে রায় দেন। এরপর ২০০৯ সালের ২৩ জুন আদালত এক আদেশে ২০১০ সালের ২৪ ফেব্রুয়ারির মধ্যে হাজারীবাগ ট্যানারি শিল্প স্থানান্তরের নির্দেশ দেন। পরে সরকারের আবেদনে এ সময়সীমা কয়েক দফা বাড়ান আদালত। সর্বশেষ ২০১০ সালের ৩০ অক্টোবর ছয় মাস সময় বাড়ানো হয়। সে সময়সীমা শেষ হয় ২০১১ সালের ৩০ এপ্রিল। এর পরও হাজারীবাগ থেকে ট্যানারি সরানো হয়নি। আদালতের অনুমতি ছাড়াই সরকার ট্যানারি মালিকদের দফায় দফায় সময় দেয়। সর্বশেষ আগামী ৩১ মার্চের মধ্যে সব ট্যানারি সরিয়ে নিতে সরকার সময়সীমা বেঁধে দিয়েছে। সরকারের এ সিদ্ধান্তের বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে গত ৩ জানুয়ারি হাইকোর্টে আবেদন করে বেলা। এ আবেদনের ওপর শুনানি শেষে গতকাল উল্লিখিত আদেশ দেন আদালত।

এর আগে গত বছরের ১৬ জুন হাইকোর্ট হাজারীবাগ থেকে ট্যানারি না সরানো পর্যন্ত পরিবেশদূষণের ক্ষতিপূরণ হিসেবে ১৫৪টি ট্যানারির মালিককে প্রতিদিন ৫০ হাজার টাকা করে জরিমানা রাষ্ট্রীয় কোষাগারে জমা দেওয়ার নির্দেশ দেন। ওই আদেশের বিরুদ্ধে ট্যানারি মালিকদের সংগঠন আপিল বিভাগে আবেদন জানালে আপিল বিভাগ গত বছরের ১৮ জুলাই জরিমানা কমিয়ে প্রতিদিন ১০ হাজার টাকা করে জমা দিতে নির্দেশ দেন। কিন্তু এ নির্দেশ যথাযথভাবে প্রতিপালন না হওয়ায় আবারও হাইকোর্টে আদালত অবমাননার আবেদন করে এইচআরপিবি। এ আবেদনে গত ২৫ জানুয়ারি হাইকোর্ট এক আদেশে শিল্পসচিব মো. মোশাররফ হোসেন ভূঁইয়াকে তলব করেন। গত ১৩ ফেব্রুয়ারি শিল্পসচিব হাজির হয়ে আদালতকে জানান, বকেয়া জরিমানার পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৩০ কোটি ৮৫ লাখ টাকা। শুনানি শেষে গত ২ মার্চ হাইকোর্ট জরিমানার বকেয়া টাকা দুই সপ্তাহের মধ্যে রাষ্ট্রীয় কোষাগারে জমা দিতে মালিকদের নির্দেশ দেন।

সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা জানান, হাজারীবাগে থাকা ট্যানারিগুলোর প্রতিটি পরিবেশ অধিদপ্তরের কালো তালিকাভুক্ত। এর জের ধরে আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের চামড়া খাতের বাণিজ্য হুমকির মুখে পড়েছে। এরই মধ্যে বিশ্বখ্যাত বিভিন্ন ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠান, পরিবেশবাদী দেশি-বিদেশি সংগঠন জানিয়ে দিয়েছে যে পরিবেশবান্ধব কারখানায় চামড়া প্রক্রিয়াকরণ বা চামড়াজাত পণ্য উৎপাদন না করলে বাংলাদেশ থেকে এসব পণ্য আমদানি করা হবে না।


মন্তব্য