kalerkantho


কবির উদ্দিন আহম্মদ

ধরমপাশার যুদ্ধ জীবনের শ্রেষ্ঠ অর্জন

শফিক আদনান, কিশোরগঞ্জ   

৬ মার্চ, ২০১৭ ০০:০০



ধরমপাশার যুদ্ধ জীবনের শ্রেষ্ঠ অর্জন

‘বিজয় ঘোষণার এক দিন পর কিশোরগঞ্জ শত্রুমুক্ত হয়। সেদিন শহরবাসীর অনুভূতি ছিল অন্য রকম।

দুঃসহ ৯ মাস পার করলেও একটা দিন যেন কাটছিল না তাদের। আমরা খবর পাচ্ছিলাম—মানুষের এ দম বন্ধ অবস্থার। ১৬ ডিসেম্বর আমার কম্পানির অবস্থান ছিল ১০ মাইল দূরে করিমগঞ্জে। সেখান থেকে রাতেই অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে চলে যাই বৌলাইয়ে। পরের দিন ভোরে শহরের - কাছাকাছি সতালে যুদ্ধের প্রস্তুতি নিই। চারদিকে উত্তেজনা, গুজব। শেষ পর্যন্ত রাজাকাররা রণে ভঙ্গ দেয়, তারা আত্মসমর্পণ করে। আমি সহযোদ্ধাদের নিয়ে ঢুকে পড়ি শহরে। ’

কথাগুলো বললেন বীর মুক্তিযোদ্ধা কবির উদ্দিন আহম্মদ।

এখন তাঁর বয়স ৭৫ বছর। শহরের আখড়া বাজারের পিটিআই গলিতে নিজের বাসায় থাকেন। মুক্তিবাহিনীর এই কম্পানি কমান্ডার সেখানে বসে শোনালেন অগ্নিঝরা সেই দিনগুলোর কথা। তিনি বলেন, কিশোরগঞ্জ শহর মুক্ত করা ও ধর্মপাশার যুদ্ধ তাঁর জীবনের শ্রেষ্ঠ অর্জন।

শিক্ষকতায় নিয়োজিত ছিলেন তিনি। দেশমাতৃকার টানে পাকিস্তানের করাচি থেকে পালিয়ে এসে যোগ দেন মুক্তিযুদ্ধে। স্বাধীনতার পর আরো ১৭ বছর রাজধানী ঢাকায় ও নিজের এলাকায় শিক্ষকতা করেছেন তিনি।

কবির উদ্দিন আহম্মদ বলেন, ‘১৭ ডিসেম্বরের সকাল আমার জীবনের শ্রেষ্ঠ সকাল; আমার অহংকার। ১০টার দিকে শহরে প্রবেশ করে দেখি, রাস্তাঘাট লোকারণ্য; জনতার উল্লাস, জয় বাংলা স্লোগানে মুখরিত। যে যেভাবে পারে, সেভাবেই বিজয় উদ্যাপন করছে। কেউ মুক্তির আনন্দে, কেউবা স্বজন হারানোর বেদনায় কেঁদে বুক ভাসাচ্ছে। কেউবা বুকে টেনে নিচ্ছে আমাদের, আমরাও কাঁদছি। সুখের কান্না কেমন বুঝেছিলাম সেদিন। স্বাধীন দেশের পতাকা কত সুন্দর, কত পবিত্র হয় প্রাণভরে দেখেছিলাম সেদিন। ’

‘৪ ডিসেম্বর পাকিস্তানি বাহিনী শহর ছেড়ে পালিয়ে গেলেও মাওলানা আতাহার আলীর নেতৃত্বে রাজাকাররা ১৭ ডিসেম্বর ভোর পর্যন্ত কিশোরগঞ্জ শহরের নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখে। মুক্তিযোদ্ধাদের শহর আক্রমণের ঠিক আগে আত্মসমর্পণে বাধ্য হয় তারা। শহীদী মসজিদের পাশে ইসলামিয়া ছাত্রাবাসে তাদের অস্ত্রশস্ত্র জমা রাখা হয়। চার থেকে পাঁচ শ রাজাকারকে বন্দিশালায় পাঠানো হয়। ’

কবির উদ্দিন আহম্মদ বলেন, ‘মুক্তিযুদ্ধে যোগ দেওয়া আমার জন্য খুবই কঠিন কাজ ছিল। করাচির সেকেন্ডারি স্কুল ফর বেঙ্গলি বয়েজ নামের একটি স্কুলে ইংরেজির শিক্ষক ছিলাম। একাত্তরের ২৫ মার্চের পর সেখানে রীতিমতো বন্দিদশায় ছিলাম। চোখে চোখে রাখা হতো আমাকে। পড়াশোনা শেষ করে ১৯৬৫ সালের দিকে ওই স্কুলে শিক্ষক হিসেবে পেশাজীবন শুরু করি। আমার এক ভাই বিমানবাহিনীতে ছিলেন। ১৯৫৮ সালে জগন্নাথ কলেজে পড়তাম। তাঁর আমন্ত্রণে সেখানে গিয়ে সুইডিশ পাকিস্তানি ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজিতে একটি বিষয়ে ডিপ্লোমা করি। ’

‘২৫ মার্চের গণহত্যার খবর পাকিস্তানে বসেই পেয়েছিলাম। মোস্তফা নামে আমার এক বন্ধু ছিল, তার বাড়ি নোয়াখালী। আমরা দুজন মিলে পালানোর ফন্দি করে চলে গেলাম কেয়ামারি সমুদ্রসৈকতে। সেখানে মাছ ধরার জাহাজ ধরে পালানোর চেষ্টা করে ব্যর্থ হই। মার্চের শেষে বা এপ্রিলের শুরুতে অনেক কষ্টে বিমানের টিকিট জোগাড় করে সোজা ঢাকায়। সেখান থেকে মেজো ভাইয়ের বাসায়, নারায়ণগঞ্জে। এরপর অনেক দুর্ভোগ সয়ে কিশোরগঞ্জের নিকলীর ধারিশ্বরে মামার বাড়ি যাই। সেখান থেকে নিজের বাড়ি করিমগঞ্জের ন্যামতপুরে যাই। কয়েক দিন অবস্থান করে মুক্তিযুদ্ধে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিই। প্রথমে ভারতের মহেশখলা ইয়ুথ ক্যাম্পে পৌঁছি। সেখান থেকে আড়াই শতাধিক যুবককে আমার নেতৃত্বে বাঘমারা ক্যাম্পে পাঠানো হয়। চূড়ান্ত বাছাই শেষে ভারতের ১১ নম্বর সেক্টরের তোড়া ট্রেনিং ক্যাম্পে প্রশিক্ষণের জন্য পাঠানো হয় আমাদের। প্রশিক্ষণ শেষে আমাকে কম্পানি কমান্ডারের দায়িত্ব দেওয়া হয়। আমার নাম অনুসারে কম্পানির নাম হয় কবির কম্পানি। মহেশখলা দিয়েই দেশের রণাঙ্গনে পাঠানো হয় আমাদের। ’

কমান্ডার কবির উদ্দিন বলেন, ‘একাত্তরে সবচেয়ে বড় যুদ্ধটি করেছি সুনামগঞ্জের ধর্মপাশায়। টানা ৪৮ ঘণ্টা ভয়াবহ লড়াই করে আমরা ধর্মপাশা থানা মুক্ত করি। ওই যুদ্ধে নেত্রকোনার আটপাড়া থানার মোফাজ্জল হোসেন শহীদ হন। আহত হন অনেকে। শত্রুপক্ষের ফেলে যাওয়া অনেক অস্ত্র ও গোলাবারুদ আমাদের দখলে আসে। প্রায় আড়াই শ মুক্তিযোদ্ধার সাঁড়াশি আক্রমণে টিকতে না পেরে থানা ক্যাম্প থেকে পালিয়ে যায় পাকিস্তানি বাহিনী ও রাজাকাররা। যুদ্ধ শেষে স্থানীয় এক রাজাকারের মৃতদেহ ছাড়া শত্রুপক্ষের আর কাউকে পাওয়া যায়নি। অনেক জায়গায় ছোপ ছোপ রক্তের চিহ্ন দেখতে পেয়েছিলাম। এর থেকে ধারণা করি, তাদের অনেকে আহত বা নিহত হয়েছে। ’

‘আমরা ধর্মপাশায় কাঠ বা ছন দিয়ে বানানো পাক সেনার বেশ কিছু ডামি পেয়েছিলাম। কলাগাছ ও কাগজ দিয়ে বানানো কয়েকটি ডামি কামান পেয়েছিলাম। এসব দেখে কখনো বিভ্রান্ত হয়েছি আমরা। এসব টার্গেটে প্রচুর গুলি খরচ করতে হয়েছে আমাদের। আমার কম্পানির এক যোদ্ধা একটি ফলস কামানের দখল নিতে গিয়ে তো মারাই গেল। এভাবে শত্রুপক্ষের চতুরতাও মোকাবেলা করতে হয়েছে আমাদের। ’

ধর্মপাশার যুদ্ধের বিবরণ দিয়ে কবির উদ্দিন বলেন, ‘শত্রুপক্ষ সম্পর্কে আমাদের কোনো ধারণা ছিল না। তাই স্থানীয় এক মেম্বারকে নিয়ে ছদ্মবেশে ধর্মপাশা থানা এলাকা, রাস্তাঘাট ও শত্রুপক্ষের শক্তি সম্পর্কে ধারণা নিতে রেকি করি। দুই-তিন মাইল দূরে সহযোদ্ধাদের রেখে আমি পাঁচ-সাতজনকে নিয়ে একটি ছোট নৌকায় করে বের হই। কিছু অস্ত্রপাতিও সঙ্গে ছিল, কাঁথা দিয়ে সেগুলো ঢেকে রাখা হয়। একটি ওয়্যারলেস আমার কাছে এবং আরেকটি ক্যাপ্টেন হামিদের কাছে ছিল। ওই মেম্বারের ক্ষেতের শ্রমিক হিসেবে পুরো এলাকা ঘুরে একটা ধারণা নিয়ে ফিরে যাই সহযোদ্ধাদের কাছে। কিন্তু স্থানীয়রা বিষয়টি টের পেয়ে বাড়িঘর ছেড়ে চলে যেতে থাকে। মুক্তিবাহিনী আসছে—এ খবর ছড়িয়ে পড়ে এলাকায়। তাই তড়িঘড়ি করে কম্পানির ১৩৫ জন মুক্তিযোদ্ধাকে নিয়ে থানা ঘেরাও করি। আধাপাকা ধানক্ষেত দিয়ে ক্রলিং করে আমরা এগিয়ে যাই। আমরা গুলি করলেও শত্রুপক্ষ থেকে কোনো জবাব আসেনি। ওই সময় সামনে একটি সেতুর ওপর বসানো কামানের দখল নিতে গিয়ে শত্রুপক্ষের গুলিতে মারা যায় মোফাজ্জল। আমরা একটু পিছু হটি। অন্ধকার নেমে এলে মোফাজ্জলের মরদেহ উদ্ধার করে কয়েকজন মুক্তিযোদ্ধাকে দিয়ে মদনে পাঠানোর ব্যবস্থা করি। এরই মধ্যে শুরু হয়ে যায় গোলাগুলি, বৃষ্টির মতো গুলি। যুদ্ধ পরের দিন সন্ধ্যা পর্যন্ত চলে। সন্ধ্যার পর শক্ররা পালিয়ে যায়। আমরা থানায় ঢুকে একজনের গুলিবিদ্ধ লাশ পড়ে থাকতে দেখি। স্থানীয় লোকজন তাকে রাজাকার বলে শনাক্ত করে। ওই রাজাকারের নাম মনে করতে পারছি না। ’

কবির উদ্দিন আহম্মদ বলেন, ‘যুদ্ধজয়ের পর এলাকাবাসী আমাদের যে রাজকীয় আপ্যায়ন করেছে, তা ভোলার মতো নয়। তারা বস্তা বস্তা চিড়া, মুড়ি, গুড় ও রান্না করা খাবার পাঠিয়েছে আমাদের জন্য। ক্ষুধায় কষ্ট করতে হয়নি। ’

‘ধর্মপাশা মুক্ত করে পরের দিন ২২টি নৌকায় করে নেত্রকোনার বিষেরবাসা এলাকায় চলে আসি আমরা। সঙ্গে তখনো যথেষ্ট পরিমাণ গোলাবারুদ ছিল। পরে ওই ক্যাম্প থেকে কিশোরগঞ্জের তাড়াইলের দিকে রওনা হই। সেখানে গিয়ে শুনি, খবর পেয়ে রাজাকাররা পালিয়ে কিশোরগঞ্জে চলে গেছে। পুরো কম্পানি নিয়ে চলে গেলাম করিমগঞ্জের ন্যামতপুরে। করিমগঞ্জে তখনো রাজাকারদের শক্ত অবস্থান ছিল। তবে আমরা করিমগঞ্জে ঢুকে জানতে পারলাম, রাজকাররা আগের দিন ফাঁকা গুলি করতে করতে শহরের দিকে চলে গেছে। প্রায় বিনা যুদ্ধে তাড়াইল ও করিমগঞ্জ থানা মুক্ত করে আমার কম্পানি। ’

মুক্তিযোদ্ধা কবির উদ্দিন আহম্মদ বলেন, ‘আমার গ্রুপটিই ১৭ ডিসেম্বর সকালে সবার আগে কিশোরগঞ্জ শহরে ঢোকে। পরে অন্য মুক্তিযোদ্ধারাও দলবল নিয়ে শহরে ঢোকে। ’ তিনি জানান, ‘করিমগঞ্জে অবস্থানকালে আমাকে ওয়্যারলেসে জানানো হয়েছিল, ভারতীয় বিমান হামলা চালিয়ে কিশোরগঞ্জ শহর মুক্ত করবে। বিমান হামলা হলে মুক্তিযোদ্ধা ও নিরীহ মানুষ মারা যাবে, শহরের বিপুল ক্ষতি হবে—এ আশঙ্কায় ওই প্রস্তাবে সায় দিইনি। ’

‘১৬ ডিসেম্বর দুপুরে গুরুদয়াল কলেজের শিক্ষক জিয়া উদ্দিন আহমদ, অ্যাডভোকেট ফজলুল কবির, আজিমউদ্দিন স্কুলের শিক্ষক হেলালউদ্দিন আহাম্মদ এবং আরো কয়েকজন করিমগঞ্জে গিয়ে আমার সঙ্গে দেখা করেন। তাঁরা বলেন, ‘আমরা কিশোরগঞ্জ শহরে অবরুদ্ধ রাজাকার, দালাল ও আলবদরদের আত্মসমর্পণের প্রস্তাব নিয়ে এসেছি। আমি তিনটি শর্ত দিয়ে প্রস্তাব গ্রহণ করার সঙ্গে যুদ্ধের প্রস্তুতিও নিয়ে রাখি। ১৬ ডিসেম্বর রাতেই পুরো শহর চারদিক থেকে ঘিরে ফেলে মুক্তিযোদ্ধারা। সকালে রাজাকাররা আত্মসমর্পণ করে অস্ত্র জমা দেয়। ’

‘রাজাকারদের আত্মসমর্পণের পর বিকেলে শহরে কিছুটা অরাজকতা দেখা দেয়। গৌরাঙ্গবাজার এলাকায় কয়েকটি লাশ পড়ে থাকতে দেখলাম। আইন-শৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণে রাখার জন্য সন্ধ্যায় শহরে কারফিউ জারি করে দিলাম। পরে একটি খোলা জিপে মাইক লাগিয়ে শহরে অবস্থানরত মুক্তিযোদ্ধাদের নিজ নিজ এলাকার শান্তি-শৃঙ্খলা রক্ষায় কাজ করার আহ্বান জানাই। এতে পরিস্থিতি অনেকটাই স্বাভাবিক হয়ে আসে। পরবর্তী সময়ে মুক্তিযুদ্ধকালীন রাষ্ট্রপতি সৈয়দ নজরুল ইসলামের কাছে কারফিউ জারির ব্যাপারে জবাবদিহি করতে হয়েছিল। তাঁকে কারফিউ জারির প্রেক্ষাপট জানানো হলে তিনি আমার প্রতি সন্তুষ্ট হন। সেই দিনগুলোতে সাধারণ মানুষের কাছ থেকে আমরা যে সাহায্য-সহযোগিতা পেয়েছি তা অবিস্মরণীয়। তাদের সহযোগিতা না পেলে মুক্তিযোদ্ধারা কিছুতেই সফল হতে পারত না। তাদের অবদানের কথা অকুণ্ঠচিত্তে স্বীকার করতে হবে। ’


মন্তব্য