kalerkantho


১ কোটি ১৭ লাখ ভোটারের স্মার্ট কার্ড অনিশ্চিত

কাজী হাফিজ   

৬ মার্চ, ২০১৭ ০০:০০



১ কোটি ১৭ লাখ ভোটারের স্মার্ট কার্ড অনিশ্চিত

বিশ্বব্যাংক ও জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচির (ইউএনডিপি) সহায়তায় আইডেন্টিফিকেশন সিস্টেম ফর এনহ্যান্সিং অ্যাকসেস টু সার্ভিসেস (আইডিইএ) প্রকল্পের আওতায় ৯ কোটি ভোটারকে স্মার্ট এনআইডি কার্ড দেওয়া হবে আগামী ডিসেম্বরের মধ্যে। দেশে বর্তমানে ভোটার ১০ কোটি ১৭ লাখের কাছাকাছি। এ অবস্থায় বাকি এক কোটি ১৭ লাখ ভোটার কবে, কিভাবে তাদের স্মার্ট এনআইডি কার্ড পাবে—এ প্রশ্নের জবাব মিলছে না।

এমন অনিশ্চয়তার মধ্যেই আগামী ১৩ মার্চ থেকে চট্টগ্রামে এনআইডির (জাতীয় পরিচয়পত্র) স্মার্ট কার্ড বিতরণ শুরু করা হবে। চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের ভোটারদের জন্য কার্ড প্রস্তুত করা হয়েছে। এপ্রিলের প্রথমে রাজশাহীতে এবং পরে খুলনা, সিলেটসহ অন্য সিটি করপোরেশন এলাকায় কার্ড বিতরণের পরিকল্পনা করেছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)।

সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, যেহেতু বর্তমান প্রকল্পে ৯ কোটির বেশি ভোটারকে স্মার্ট এনআইডি কার্ড দেওয়ার সুযোগ নেই, সেহেতু গ্রাম এলাকার ভোটাররা আপাতত বঞ্চিত থাকতে পারে। আর ডিসেম্বরের মধ্যে ৯ কোটি ভোটারকে কার্ড দেওয়া সম্ভব হবে কি না তা নিয়েও সংশয় রয়েছে।

এ বিষয়ে ইসি সচিব মোহাম্মদ আবদুল্লাহ বলেন, ‘যে গতিতে কাজ চলছে তাতে কার্ড ছাপানোর জন্য সময় লাগবে আগামী বছরের এপ্রিল পর্যন্ত। গত মঙ্গলবার পর্যন্ত ব্লাংক কার্ড পাওয়া গেছে সাড়ে তিন কোটির মতো। পারসোনালাইজড করা হয়েছে ৭৬ লাখের মতো।

নতুন ইক্যুইপমেন্ট আনার চেষ্টা চলছে। এ অবস্থায় ৩১ ডিসেম্বরের মধ্যে ৯ কোটি ভোটারকে স্মার্ট এনআইডি কার্ড দেওয়া প্রায় অসম্ভব। তবে ভোটারদের হাতে যথাসময়ে কার্ড তুলে দিতে সর্বাত্মক চেষ্টা করে যাচ্ছি। ঢাকায় দুই শিফটের বদলে তিন শিফটে কার্ড বিতরণ করা হবে। চলমান প্রকল্পের ৯ কোটি কার্ড বিতরণ হয়ে গেলে বাকি এক কোটি ১৭ লাখ ভোটারের কার্ড সরকারের নিজস্ব অর্থায়নে দেওয়া হতে পারে। ’

গত বছরের ৩ অক্টোবর থেকে ঢাকায় আনুষ্ঠানিকভাবে স্মার্ট এনআইডি কার্ড বিতরণ শুরু হয়। প্রাথমিকভাবে ঢাকার উত্তরা ও রমনা থানায় এবং কুড়িগ্রামের বিলুপ্ত ছিটমহল দাশিয়ারছড়ায় কার্ড বিতরণ করা হয়।

৯ কোটি স্মার্ট কার্ড বিতরণের ক্ষেত্রে ইসি ঘোষিত পরিকল্পনা হচ্ছে প্রথম পর্যায়ে ঢাকার দুই সিটি করপোরেশন ও কুড়িগ্রামের ফুলবাড়ী; দ্বিতীয় পর্যায়ে খুলনা, চট্টগ্রাম, রাজশাহী, বরিশাল, সিলেট, নারায়ণগঞ্জ, কুমিল্লা, রংপুর ও গাজীপুর সিটি করপোরেশন; তৃতীয় পর্যায়ে ৬৪টি সদর উপজেলা এবং চতুর্থ পর্যায়ে বাকি সব উপজেলায় কার্ড বিতরণ করা হবে। গণমাধ্যমে বিজ্ঞপ্তি দিয়ে, মাইকিং করে এবং ব্যানার-ফেস্টুন দিয়ে প্রচারের মাধ্যমে বিতরণের দিন-তারিখ ও স্থান জানিয়ে দেওয়া হবে বলে ঘোষণা দিয়েছিল ইসি।

৯ কোটি ভোটারের হাতে বিনা মূল্যের স্মার্ট কার্ড তুলে দিতে ৮৪ কোটি টাকা ব্যয় ধরেছে ইসি। অর্থাৎ প্রতিটি স্মার্ট কার্ড বিতরণে খরচ ধরা হয়েছে সাড়ে ৯ টাকা।

ইসির হিসাব অনুযায়ী এ পর্যন্ত স্মার্ট কার্ড বিতরণ করা হয়েছে মাত্র আট লাখের মতো। অসম্পূর্ণ তথ্যের কারণে ঢাকার বিভিন্ন এলাকায় প্রায় এক লাখ স্মার্ট কার্ড ছাপানো স্থগিত রয়েছে।

এর মধ্যে মিরপুরে প্রায় ২৯ হাজার কার্ড ছাপানো হয়নি। মিরপুরসহ অন্যান্য এলাকায় অসংখ্য ভোটারের আঙুল ও আইরিশের ছাপ নেওয়ার পর ‘নট ফাউন্ড বা এনএফ’ স্লিপ ধরিয়ে দেওয়া হয়েছে। এ স্লিপ দেওয়ার সময় সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির মোবাইল ফোন নম্বর রেখেছেন বিতরণকারীরা। দুই মাসের সময় দিয়ে পরে তাদের যোগাযোগ করতে বলা হয়। কিন্তু পরে যোগাযোগ করলেও সমস্যার সমাধান মেলেনি।

জাতীয় তথ্যভাণ্ডারে নাগরিকদের সংরক্ষিত তথ্য যাচাই-বাছাই ও সংশোধনের সুযোগ না দিয়ে কার্ড ছাপা শুরু করায় এমন পরিস্থিতি হয়েছে বলে জানিয়েছেন ইসি সচিবালয়ের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা। এ বিষয়ে জাতীয় পরিচয় নিবন্ধন অনুবিভাগের একজন কর্মকর্তা জানান, যাদের তথ্য অসম্পূর্ণ রয়েছে তাদের তথ্য সংযোজনের পর স্মার্ট কার্ড ফের  ছাপানো হবে।

জাতীয় পরিচয় নিবন্ধন অনুবিভাগের পরিচালক আবদুল বাতেন গতকাল রাতে এ বিষয়ে কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আমাদের তথ্যভাণ্ডারে পরিপূর্ণ তথ্য নেই, এমন ভোটারের সংখ্যা প্রচুর। বিষয়টি স্মার্ট কার্ড প্রস্তুত ও বিতরণের ক্ষেত্রে বড় ধরনের অন্তরায়। আরো কিছু সমস্যা রয়েছে। এসব সমস্যার বিষয় নিবন্ধন অনুবিভাগ থেকে এ সপ্তাহেই সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে জানানো হতে পারে। ’ 

প্রসঙ্গত, ফরাসি কম্পানি অবারথু টেকনোলজির মাধ্যমে স্মার্ট কার্ড প্রস্তুতের কাজ করছে ইসি। ওই প্রতিষ্ঠানটির সঙ্গে ৭৯৬ কোটি ২৬ লাখ টাকার চুক্তিতে এ কাজের মেয়াদ ছিল ২০১৬ সালের জুন পর্যন্ত। পরে মেয়াদ বাড়িয়ে ২০১৭ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত করা হয়েছে।

স্মার্ট কার্ডে তিন স্তরে ২৫টি নিরাপত্তা বৈশিষ্ট্য থাকবে। এ কার্ডের মধ্যে যে মাইক্রোচিপ দেওয়া থাকবে তাতে একজন নাগরিকের সব তথ্য পাওয়া যাবে। প্রাথমিকভাবে ২৫টি কাজে ব্যবহার করা যাবে এই কার্ড। সরকারি সব অনলাইন সুবিধা, টিআইএন প্রাপ্তি, ড্রাইভিং লাইসেন্স, পাসপোর্ট, সম্পত্তি কেনাবেচা, ব্যাংক হিসাব খোলা, ব্যাংক ঋণ, সরকারি ভাতা উত্তোলন, সহায়তা প্রাপ্তি, বিআইএন, শেয়ার-বিও অ্যাকাউন্ট, ট্রেড লাইসেন্স, যানবাহন রেজিস্ট্রেশন, বীমা স্কিম, বিয়ে রেজিস্ট্রেশন, ই-পাসপোর্ট, ই-গভর্ন্যান্স, গ্যাস-বিদ্যুৎ সংযোগ, মোবাইল সংযোগ, হেলথ কার্ড, ই-ক্যাশ, ব্যাংক লেনদেন ও শিক্ষার্থীদের ভর্তির কাজে ব্যবহার করা হবে স্মার্ট কার্ড।


মন্তব্য