kalerkantho


‘৯ ব্লগারের খুনি’ আনসার আল ইসলাম নিষিদ্ধ

নিজস্ব প্রতিবেদক   

৬ মার্চ, ২০১৭ ০০:০০



‘৯ ব্লগারের খুনি’ আনসার আল ইসলাম নিষিদ্ধ

জঙ্গি সংগঠন আনসার আল ইসলামকে অবশেষে নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। গতকাল রবিবার স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জননিরাপত্তা বিভাগের বিজ্ঞপ্তিতে নিষেধাজ্ঞার কথা জানানো হয়েছে।

তাতে বলা হয়, ‘আনসার আল ইসলাম নামের জঙ্গি দল/সংগঠন ঘোষিত কার্যক্রম দেশের শান্তি-শৃঙ্খলা পরিপন্থী। সংগঠনটির কার্যক্রম জননিরাপত্তার জন্য হুমকি বিবেচিত হওয়ায় বাংলাদেশে এর কার্যক্রম নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হল। ’ গত বছরের নভেম্বরে সংগঠনটি নিষিদ্ধ করার আবেদনসহ প্রতিবেদন দাখিল করেছিল পুলিশ সদর দপ্তর। এ নিয়ে বাংলাদেশে জঙ্গি তৎপরতার অভিযোগে সাতটি সংগঠন নিষিদ্ধ করা হলো।

সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা জানান, গত তিন বছরে বেশ কয়েকটি হত্যাকাণ্ডের পর আনসার আল ইসলাম  ৩, ৬, ৭, ৮, ১১ ও ১৩ নামে দায় স্বীকার করা হয়। ব্লগার, শিক্ষক, বুদ্ধিজীবী এমনকি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর নাম লিখে হত্যার হুমকিসংবলিত চিঠি দেওয়া হয় এ সংগঠনের নাম ব্যবহার করে। পুলিশের তদন্তে ব্লগার, লেখক ও অনলাইন অ্যাকটিভিস্টসহ ৯ জন খুনের ঘটনায় আনসার আল ইসলাম জড়িত বলে তথ্য মিলেছে।

সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানিয়েছে, জঙ্গি সংগঠন আনসারুল্লাহ বাংলা টিম (এবিটি) নিষিদ্ধ হওয়ার আগেই ওই সংগঠনের মতাদর্শীরা বাংলাদেশে আল-কায়েদার ভারতীয় উপমহাদেশ শাখার (একিউআইএস) মতাদর্শী সংগঠন আনসার আল ইসলাম গঠন করে। ২০১৪ সালের ৩ সেপ্টেম্বর আল-কায়েদার প্রধান আয়মান আল জাওয়াহিরি ভিডিও বার্তায় বাংলাদেশ ও মিয়ানমার নিয়ে ভারতে তাঁর সংগঠনের শাখা স্থাপনের ঘোষণা দেন।

সে সময়ই খোলস থেকে বেরিয়ে আনসার আল ইসলাম নামের সংগঠন তৈরি করে উগ্রপন্থী একটি দল।

জাওয়াহিরির বার্তার পর ২০১৪ সালের ৫ সেপ্টেম্বর ‘বাংলাদেশের জন্য বিপত্সংকেত! ভারতে আল-কায়েদার শাখা খোলার ঘোষণা, বাংলাদেশ নিশানায়’ শিরোনামে বিশেষ প্রতিবেদন প্রকাশ করেছিল কালের কণ্ঠ। এরপর একের পর এক ব্লগার হত্যাসহ বিভিন্ন ঘটনার তদন্ত করে পুলিশ এবিটি থেকে আনসার আল ইসলামের রূপান্তরের তথ্য পায়। গত বছরের ২৫ আগস্ট ‘নিষিদ্ধ হচ্ছে আনসার আল ইসলাম’ শিরোনামে সংগঠনটির কর্মকাণ্ড এবং নিষেধাজ্ঞা চেয়ে আবেদনের বিষয়ে প্রতিবেদন প্রকাশ করে কালের কণ্ঠ।

গত বছরের ২৪ আগস্ট ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) কাউন্টার টেররিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম (সিটিটিসি) ইউনিটের প্রধান মনিরুল ইসলাম কালের কণ্ঠকে জানিয়েছিলেন, ভিন্নমতাদর্শীদের হত্যায় জড়িত আনসার আল ইসলামের সদস্য, সাংগঠনিক কাঠামো, নেতৃত্ব, অস্ত্র, হত্যার মিশনসহ বেশ কিছু তথ্য পেয়েছেন তাঁরা। এসব তথ্যের ভিত্তিতে সিটিটিসি মনে করছে, আনসার আল ইসলাম জঙ্গি তৎপরতায় নিয়োজিত। শিগগিরই সংগঠনটি নিষিদ্ধ করার জন্য পুলিশ সদর দপ্তরের মাধ্যমে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে আবেদন করা হবে।

ডিএমপির উপকমিশনার (মিডিয়া) মাসুদুর রহমান গতকাল বলেন, ‘আগস্টে শনাক্ত করার সেই ঘোষণার কয়েক দিনের মধ্যে পুলিশ সদর দপ্তরে আমরা প্রতিবেদন পাঠাই। এরপর নভেম্বরে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে প্রতিবেদন পাঠানো হয়। ’

সে সময় মনিরুল ইসলাম বলেছিলেন, ‘জাওয়াহিরির বক্তব্যের পরই আনসার আল ইসলাম সাংগঠনিক রূপ নেয়। এর আগে আনসারুল্লাহ বাংলা টিম ছিল একটি ব্লগনির্ভর মতাদর্শী সংগঠন। এ সংগঠনের আধ্যাত্মিক নেতা জসিমউদ্দিন রাহমানীসহ কয়েকজনকে গ্রেপ্তারের পর তারা খোলস বদল করে। গত দুই বছরে একের এর এক গুপ্তহত্যার ঘটনা তদন্ত করতে গিয়ে আনসার আল ইসলামের নাম উঠে আসে। ’ 

সিটিটিসি সূত্র জানায়, ব্লগার আহমেদ হায়দার রাজীবসহ কয়েকটি হত্যাকাণ্ডে এবিটি মতাদর্শীরা জড়িত বলে প্রমাণিত হলে সংগঠনটিকে নিষিদ্ধ করা হয়। এবিটি নিষিদ্ধের আগে থেকেই একই মতাদর্শের কিছু জঙ্গি একিউআইএসের মতাদর্শ গ্রহণ করে সাংগঠনিক রূপরেখা তৈরি করে। এর প্রধান সমন্বয়ক ঢাকার একটি মাদরাসার সুপারিনটেনডেন্ট ছিলেন। বুয়েটের ছাত্র দ্বীপ হত্যাকাণ্ডের পর তাঁর নাম জানতে পারে তদন্তকারীরা। এর পর থেকে আত্মগোপনে চলে যান ওই শিক্ষক। মেজর (চাকরিচ্যুত) সৈয়দ মো. জিয়াউল হক সমন্বয়কের পরবর্তী স্তরের ভূমিকা পালন করছেন। একই সঙ্গে তিনি সামরিক কমান্ডার।

এরই মধ্যে নিষিদ্ধ ঘোষিত অন্য ছয় সংগঠন হলো জামা’আতুল মুজাহিদীন বাংলাদেশ (জেএমবি), জাগ্রত মুসলিম জনতা বাংলাদেশ (জেএমজেবি), হরকাতুল জিহাদ আল ইসলামী বাংলাদেশ (হুজি), শাহাদাৎ-ই আল-হিকমা, হিযবুত তাহ্রীর ও আনসারুল্লাহ বাংলা টিম। ২০১৫ সালের ২৫ মে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এবিটি নিষিদ্ধ ঘোষণা করে।

৯ খুনে আনসার আল ইসলাম : সিটিটিসি ইউনিটের কর্মকর্তারা জানান, ২০১৫ সালের ২৬ ফেব্রুয়ারি অমর একুশে বইমেলার কাছে মুক্তমনা লেখক অভিজিৎ রায় হত্যা, ১২ মে সিলেটে ব্লগার অনন্ত বিজয় দাস হত্যা; ৭ আগস্ট রাজধানীর গোড়ানে নিলাদ্রী চ্যাটার্জি নিলয় হত্যা; ওই বছরের ৩১ অক্টোবর রাজধানীর আজিজ সুপার মার্কেটে প্রকাশক ফয়সল আরেফিন দীপন হত্যা এবং একই দিন লালমাটিয়ায় প্রকাশক আহমেদুর রশীদ টুটুল হত্যাচেষ্টার ঘটনায় আনসার আল ইসলামের জঙ্গিরা জড়িত বলে তথ্য পাওয়া গেছে। এ ছাড়া গত বছরের ৬ এপ্রিল পুরান ঢাকায় জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্র নাজিমউদ্দিন সামাদ এবং ২০১৫ সালে সাভারে ড্যাফোডিল ইউনিভার্সিটির ছাত্র ব্লগার আশরাফুল ইসলাম ও শান্তা মারিয়ামের ছাত্র নিয়াজ মোর্শেদ বাবু হত্যায় এই সংগঠনের সদস্যরা জড়িত বলে তথ্য পেয়েছে তদন্তকারীরা। সর্বশেষ আনসার আল ইসলামের জঙ্গিরা গত বছরের ২৫ এপ্রিল রাজধানীর কলাবাগানে ইউএসএআইডির কর্মসূচি কর্মকর্তা ও সমকামীদের অধিকারবিষয়ক ম্যাগাজিন ‘রূপবান’ সম্পাদক জুলহাজ মান্নান ও তাঁর বন্ধু তনয়কে খুন করে।

সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, ২০১৩ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি রাজধানীর পল্লবীতে ব্লগার আহমেদ রাজীব হায়দার হত্যা, ২০১৪ সালে বুয়েটের ছাত্র রায়হানুল হক দীপ এবং ২০১৫ সালের ৩০ মার্চ তেজগাঁও এলাকায় ব্লগার ওয়াশিকুর রহমান হত্যা মামলায় পুরনো ধারার এবিটি সদস্যরা জড়িত। এবিটির জঙ্গিরা ২০১৩ ও ২০১৪ সালে উত্তরায় ব্লগার আসিফ উদ্দিন এবং মিরপুরে এক শিক্ষকসহ কয়েকজনকে হত্যার চেষ্টা চালায়। তবে ২০১৫ সালের পর থেকে এবিটির নামে কর্মকাণ্ড বন্ধ করে আনসার আল ইসলাম নামে অপতৎপরতা চালায় তারা।


মন্তব্য