kalerkantho


বিজিএমইএ ভবন ভাঙা এখন সময়ের ব্যাপার

► রিভিউ আবেদন খারিজ
► কত দিনের মধ্যে ভাঙতে হবে জানা যাবে ৯ মার্চ

নিজস্ব প্রতিবেদক   

৬ মার্চ, ২০১৭ ০০:০০



বিজিএমইএ ভবন ভাঙা এখন সময়ের ব্যাপার

রাজধানীর কারওয়ান বাজারসংলগ্ন বেগুনবাড়ী-হাতিরঝিল প্রকল্পে বেগুনবাড়ী খালের ওপর অবস্থিত বহুতল ভবন ‘বিজিএমইএ কমপ্লেক্স’ ভাঙতেই হচ্ছে। ভবন রক্ষার চূড়ান্ত আইনি লড়াইয়ে বাংলাদেশ তৈরি পোশাক শিল্প প্রস্তুত ও রপ্তানিকারক সমিতির (বিজিএমইএ) হার হওয়ায় এ ভবন ভাঙা ছাড়া আর কোনো পথ নেই। ভবন ভাঙাসংক্রান্ত আপিল বিভাগের রায় পুনর্বিবেচনা (রিভিউ) চেয়ে বিজিএমইএর করা আবেদন গতকাল রবিবার খারিজ করে দিয়েছেন দেশের সর্বোচ্চ আদালত সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ। তবে কত দিনের মধ্যে ভবন ভাঙতে হবে সে বিষয়ে আদেশ দেওয়ার জন্য আগামী ৯ মার্চ দিন ধার্য করেছেন আদালত। ফলে উচ্চ আদালতের রায়ে ‘হাতিরঝিল প্রকল্পে একটি ক্যান্সারের মতো’ বলে উল্লেখ করা ভবনটি ভাঙা এখন কেবল সময়ের ব্যাপার। তবে ভবন ভাঙতে এখন সময়ক্ষেপণের পথে হাঁটছে বিজিএমইএ। রিভিউ আবেদন খারিজ হওয়ার পরও তারা ভবন ভাঙতে সময় চেয়ে মৌখিকভাবে আবেদন জানিয়েছে। আদালত লিখিতভাবে আবেদন দাখিল করতে বলেছেন।

প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহার নেতৃত্বে আপিল বিভাগ গতকাল এক আদেশে বিজিএমইএর রিভিউ আবেদন খারিজ করেন। গত বছর ৮ ডিসেম্বর রিভিউ আবেদনটি দাখিল করেছিলেন বিজিএমইএ সভাপতি।

গতকাল আদালতে রাষ্ট্রপক্ষে আইনজীবী ছিলেন অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম।

বিজিএমইএর পক্ষে ছিলেন অ্যাডভোকেট কামরুল হক সিদ্দিকী ও ইমতিয়াজ মইনুল ইসলাম। পরিবেশবাদী ও মানবাধিকার সংগঠন হিউম্যান রাইটস অ্যান্ড পিস ফর বাংলাদেশের (এইচআরপিবি) পক্ষে ছিলেন অ্যাডভোকেট মনজিল মোরসেদ। এ মামলায় হাইকোর্টে তিনি অ্যামিকাস কিউরি হিসেবে শুনানিতে অংশ নিয়েছিলেন।

আপিল বিভাগের রায়ে বলা হয়েছিল, বিজিএমইএকে নিজ খরচে ভবনটি ভাঙতে হবে। বিজিএমইএ ভবন ভাঙতে ব্যর্থ হলে রায়ের কপি পাওয়ার ৯০ দিনের মধ্যে রাজউক ভবনটি অপসারণ করবে। এ জন্য বিজিএমইএর কাছ থেকে খরচ নেবে। এ ছাড়া এ ভবনে যারা ফ্ল্যাট কিনেছেন তাঁদের টাকা ফেরত দেওয়াসহ হাইকোর্টের দেওয়া অন্যান্য নির্দেশনা বহাল রাখেন আপিল বিভাগ।

গতকাল রিভিউ আবেদন খারিজ হওয়ার পর অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম সাংবাদিকদের জানান, বিজিএমইএর রিভিউ আবেদন খারিজ করেছেন আপিল বিভাগ। এখন ভবনটি ভেঙে ফেলা ছাড়া আর কোনো পথ থাকল না। ভবনটি কত সময়ের মধ্যে ভাঙতে হবে সে বিষয়ে বৃহস্পতিবারের মধ্যে আবেদন করতে হবে বিজিএমইএ কর্তৃপক্ষকে। তিনি বলেন, ‘আমরা বলেছিলাম এক বছর সময় দেওয়া হোক। কিন্তু বিজিএমইএ কর্তৃপক্ষের আইনজীবী তিন বছর সময় চেয়ে মৌখিক আবেদন করেন। আদালত লিখিত আবেদন করতে বলেছেন। সে আবেদনের বিষয়ে আগামী ৯ মার্চ বৃহস্পতিবার শুনানির জন্য রাখা হয়েছে। ’

অ্যাটর্নি জেনারেল বলেন, ‘ভবন নির্মাণ শুরু করার আগেই পরিবেশবাদীদের বাধা দেওয়া উচিত ছিল। তারা তো জানত এটা একটা অবৈধ জায়গা। বাধা দেওয়ার পর না মানলে তখনই আদালতে আসার দরকার ছিল। ’

বিজিএমইএ ভবনের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেছিলেন একজন প্রধানমন্ত্রী এবং ভবনটি উদ্বোধন করেছিলেন আরেক প্রধানমন্ত্রী—বিষয়টি উল্লেখ করে মন্তব্য জানতে চাইলে অ্যাটর্নি জেনারেল বলেন, ‘ওনারা তো সরকারপ্রধান। তবে মনে হয় ওনাদের অবহিত করা হয়নি। যাঁরা এটার অনুমতি দিয়েছেন তাঁরা তো বলেননি এটা জলভূমি। ’

বিজিএমইএর আইনজীবী ইমতিয়াজ মইনুল ইসলাম বলেন, ‘আদালত রিভিউ আবেদন খারিজ করে দিয়েছেন। এখন আমরা তিন বছর সময় চাইব। আদালত আমাদের লিখিতভাবে আবেদন দিতে বলেছেন। ’

মনজিল মোরসেদ সাংবাদিকদের জনান, ভবন ভাঙার বিষয়ে বিজিএমইএর সময় চাওয়ার বিষয়টি নিষ্পত্তির জন্য রয়েছে। বৃহস্পতিবার জানা যাবে কত দিনের মধ্যে ভবনটি ভাঙতে হবে।

রিভিউ আবেদন খারিজ হওয়ার পর দুপুরে বিজিএমইএ সভাপতি সিদ্দিকুর রহমান এক সংবাদ সম্মেলনে বলেন, ‘ভবন ভাঙতে দুই থেকে তিন বছর সময় লাগবে। এ জন্য আদালতে আবেদন দেওয়া হবে। আদালতকে অনুরোধ করব যেন আমাদের এ সময় দেওয়া হয়। এরপর আদালত যে আদেশ দেবেন তা মাথা পেতে নেব। ’

গতকাল সকালে বিজিএমইএর করা রিভিউ আবেদনটির ওপর শুনানি হয়। প্রথমে শুনানিতে অংশ নিয়ে সংগঠনটির আইনজীবী অ্যাডভোকেট কামরুল হক সিদ্দিকী বলেন, রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) কাছ থেকে বরাদ্দ নেওয়ার পর রাজউক ভবনটির নকশা অনুমোদন দিয়েছে। এরপর ভবন নির্মাণ করা হয়েছে। সরকারের কাছ থেকে টাকা দিয়ে জমি কিনে নেওয়া হয়েছে। এরপর বৈধভাবেই অনুমোদন নিয়ে ভবন নির্মাণ করা হয়েছে। তিনি তাঁর বক্তব্যের পক্ষে ইপিবির বরাদ্দ দেওয়া এবং রাজউকের অনুমোদনের প্রক্রিয়াটি আদালতে তুলে ধরেন।

ওই সময় আদালত বলেন, ‘সরকারের কাছ থেকে আপনারা (বিজিএমইএ) কিভাবে জমি নিয়েছেন সেটা আমাদের দেখার বিষয় না। এটি জলাধার আইনের লঙ্ঘন। ’

শুনানি শেষে আদালত রিভিউ আবেদন খারিজ করে আদেশ দেওয়ার পর অ্যাডভোকেট কামরুল হক সিদ্দিকী আদালতকে বলেন, ‘ভবন ভাঙতে সময় প্রয়োজন। এ জন্য আমাদের সময় দেওয়া হোক। ’

তখন আদালত বলেন, ‘ভবন ভাঙার নির্দেশনা বাস্তবায়নে কত সময় লাগবে? আপনাদের কোনো আবেদন আদালতের সামনে নেই। আপনারা মুখে না বলে লিখিত আবেদন দিন। ’

জবাবে কামরুল হক সিদ্দিকী বলেন, এই ভবনটির সঙ্গে দেশের পোশাক রপ্তানি খাত জড়িত। এখানে বিদেশি ক্রেতারা আসা-যাওয়া করেন। একটি উপযুক্ত স্থান নির্বাচন করে সেখানে স্থানান্তর করা সময়ের ব্যাপার।

ওই পর্যায়ে আদালত ভবনটি ভাঙতে কত সময় লাগবে তা জানতে চাইলে অ্যাটর্নি জেনারেল বলেন, ‘সময় তো লাগবেই। কমপক্ষে এক বছর সময় লাগবে। ’

তখন আদালত বলেন, ‘হাইকোর্টের রায় অনেক দিন আগে দেওয়া হয়েছে। ২০১১ সালের রায়। গুলশান, বনানী, বারিধারায় বিভিন্ন দূতাবাস চলছে বাড়ি ভাড়া করে। তাহলে এটি চালাতে অসুবিধা কোথায়?’

ওই সময় অ্যাডভোকেট কামরুল হক সিদ্দিকী বলেন, তিন বছর সময় দরকার। আদালত বলেন, লিখিতভাবে আবেদন দিতে হবে। আদালত গতকালই লিখিত আবেদন দিতে বললে কামরুল হক সিদ্দিকী অপারগতা প্রকাশ করে সময় চান। এরপর আদালত বৃহস্পতিবারের মধ্যে লিখিত আবেদন দিতে বলেন। আদালত বলেন, ওই দিন আদেশ দেওয়া হবে।

হাইকোর্ট ২০১১ সালের ৩ এপ্রিল এক রায়ে বিজিএমইএ ভবনকে ‘হাতিরঝিল প্রকল্পে একটি ক্যান্সারের মতো’ উল্লেখ করেছিলেন। ভূমির স্বত্ব না থাকা এবং ইমারত নির্মাণ বিধিমালা ও জলাধার আইন ভঙ্গ করায় ওই ভবন ভাঙার পক্ষে রায় দিয়েছিলেন হাইকোর্ট। রায় প্রকাশের ৯০ দিনের মধ্যে তা ভেঙে ফেলতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (রাজউক) তথা সরকারকে। ২০১৩ সালের ১৯ মার্চ হাইকোর্টের পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশিত হয়। ওই রায়ের কপি পাওয়ার পর আপিল বিভাগে লিভ টু আপিল আবেদন করেন বিজিএমইএর সভাপতি। শুনানি শেষে গত ২ জুন আবেদনটি খারিজ করা হয়।

রাজউকের অনুমোদন ছাড়াই বিজিএমইএ ভবন নির্মাণ করা নিয়ে ২০১০ সালের ২ অক্টোবর ইংরেজি দৈনিক ‘নিউ এজ’-এ একটি প্রতিবেদন প্রকাশিত হলে প্রতিবেদনটি আদালতে উপস্থাপন করেন সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ডি এইচ এম মনির উদ্দিন। পরদিন ৩ অক্টোবর বিজিএমইএ ভবন কেন ভাঙার নির্দেশ দেওয়া হবে না তা জানতে চেয়ে হাইকোর্ট স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে (সুয়োমটো) রুল জারি করেছিলেন। রুলের ওপর শুনানিতে আদালতকে আইনি সহায়তা দিতে ২০১১ সালের ২২ ফেব্রুয়ারি সুপ্রিম কোর্টের সাতজন আইনজীবীকে অ্যামিকাস কিউরি নিয়োগ দেন হাইকোর্ট। ওই সাত আইনজীবী হলেন বর্তমান অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম, সাবেক অ্যাটর্নি জেনারেল ফিদা এম কামাল, ব্যারিস্টার রোকনউদ্দিন মাহমুদ, ড. আখতার ইমাম, ব্যারিস্টার সারাহ হোসেন, পরিবেশ আইনজীবী সমিতির (বেলা) নির্বাহী পরিচালক অ্যাডভোকেট সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান ও অ্যাডভোকেট মনজিল মোরসেদ। ওই রুলের ওপর শুনানি শেষে রায় দিয়েছিলেন হাইকোর্ট।

১৯৯৮ সালের ২৮ নভেম্বর তখনকার প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বিজিএমইএ ভবনের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেছিলেন। ভবন নির্মাণ শেষ হলে ২০০৬ সালের ৮ অক্টোবর বিজিএমইএ ভবন উদ্বোধন করেন সে সময়কার প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া। এর পর থেকে বিজিএমইএ তাদের প্রধান কার্যালয় হিসেবে ব্যবহার করছে ভবনটি। সুউচ্চ ভবনটির চারটি ফ্লোর রয়েছে বিজিএমইএর দখলে। বাকি ১২টি ফ্লোর বিক্রি করা হয়েছে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের কাছে।

‘ভবনটি দেশের সব আইন লঙ্ঘন করে নির্মাণ করা হয়েছে’ : ভবন ভাঙার বিষয়ে আপিল বিভাগের রায়ে বলা হয়, ভবনটি রক্ষার জন্য আবেদনকারীর আইনজীবীরা বলেছেন যে এ সংগঠনের সঙ্গে ৪৫ লাখ শ্রমিকের স্বার্থ জড়িত। বিজিএমইএর কারণে সারা দেশে চার-পাঁচ কোটি মানুষ উপকৃত হচ্ছে। জিডিপির হার বাড়ানোর জন্য এ সংগঠনের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তাদের এ বক্তব্য যুক্তিসংগত হলেও আইন অনুযায়ী জমির মালিকানার যথাযথ কাগজপত্র দেখাতে হবে। কিন্তু এ ক্ষেত্রে সেটা অনুপস্থিত। রায়ে বলা হয়, ভবন নির্মাণ আইন ১৯৯৬ অনুযায়ী রাজউক থেকে নকশা অনুমোদনের জন্য জমির মালিকানার প্রমাণপত্র দাখিল করতে হয়। জমির মালিকানা সঠিক হলে আইন অনুযায়ী রাজউক নকশা অনুমোদন করতে পারে। কিন্তু এ ক্ষেত্রে আলোচিত জমিটি রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) কাছ থেকে নিয়েছে বিজিএমইএ। অথচ ইপিবি এ জমির মালিকই নয়। রায়ে জমির মালিকানাসংক্রান্ত তথ্য বিস্তারিতভাবে উল্লেখ করা হয়েছে। আদালত রায়ে বলেন, ‘ভবন নির্মাণের জন্য জলাধার আইন ২০০০ এবং পরিবেশ সংরক্ষণ আইন ১৯৯৫ অনুযায়ী পরিবেশগত ছাড়পত্র নিতে হয়। এখানে সেটা অনুপস্থিত। অবৈধভাবে জমি হস্তান্তরের পর অবৈধভাবে বহুতল ভবন নির্মাণ করা হয়েছে। ভবনটি দেশের সব আইন লঙ্ঘন করে নির্মাণ করা হয়েছে—এটা বলতে আমাদের কোনো দ্বিধা নেই। ’

হাইকোর্টের রায়ে যা বলা হয়েছিল : রায় প্রকাশের ৯০ দিনের মধ্যে ভবনটি ভেঙে ফেলার নির্দেশনা দিয়ে হাইকোর্টের রায়ে বলা হয়েছিল, ওই ভবনের জমির ওপর বিজিএমইএর কোনো মালিকানা নেই। কেননা জমিটি ১৯৬০ সালে রেলওয়ের জন্য অধিগ্রহণ করা হয়েছিল। অধিগ্রহণ আইন অনুযায়ী, কোনো দাবিদার কর্তৃপক্ষের জন্য শুধু জনস্বার্থে ভূমি অধিগ্রহণ করা যায়। পরে যদি দাবিদার কর্তৃপক্ষ অধিগ্রহণকৃত জমি বা সে জমির অংশ অপ্রয়োজনীয় মনে করে, তাহলে দাবিদার কর্তৃপক্ষ সে জমি সরকার বা জেলা প্রশাসনকে ফেরত দিতে বাধ্য থাকে। আইন অনুযায়ী সরকার ওই জমি অন্য কোনো জনস্বার্থে ব্যবহার করবে অথবা মূল মালিককে ফেরত দিতে বাধ্য থাকবে। এ ছাড়া ঢাকা মাস্টারপ্ল্যান ও জলাধার আইন না মেনে এবং রাজউকের অনুমোদন না নিয়েই ভবনটি নির্মাণ করা হয়েছে। এ কারণেও ভবনটি ভেঙে দিতে কর্তৃপক্ষ বাধ্য।

হাইকোর্টের রায়ে বলা হয়, রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ মোট ৬.২১ একর জমি অপ্রয়োজনীয় বিবেচনায় ছেড়ে দেয় ১৯৬০ সালে। ২০০৬ সালে সরকার একটি টুইন টাওয়ার নির্মাণের জন্য সাফকবলার মাধ্যমে ইপিবিকে ওই জমি প্রদান করে। ওই প্রদান বৈধ বলে ধরা যেতে পারে। ২০০৬ সালের ডিসেম্বর মাসে ইপিবি প্রথমবারের মতো ওই জমির মালিকানা পায়। অর্থাৎ ইপিবি ২০০৬ সালের আগ পর্যন্ত আদৌ ওই জমির মালিক ছিল না। অথচ ১৯৯৮ সালে ইপিবি ভৌতিকভাবে ওই জমি বিজিএমইএকে বেআইনিভাবে প্রদান করে। ২০০১ সালে ইপিবি একটি নিবন্ধনবিহীন দলিলের মাধ্যমে বেআইনিভাবে ওই জমি থেকে একটি অংশ বিজিএমইএকে প্রদান করার প্রয়াস পায়। ইপিবি যা করেছে তা হলো পরের ধনে পোদ্দারি। রায়ে বলা হয়, ইপিবি কোনোভাবেই বিজিএমইএকে তার নিজস্ব ভবন তৈরির জন্য জমি প্রদান করতে পারে না। কারণ এ ভবন নির্মাণের পেছনে কোনো জনস্বার্থ জড়িত নেই। ভবনটি নির্মাণ করা হয়েছে একান্তই বিজিএমইএর সদস্যদের নিজস্ব স্বার্থে। রায়ে বলা হয়, ওই জমি বিজিএমইএকে প্রদান ইপিবির শুধু অনধিকারচর্চাই ছিল না, ভূমি অধিগ্রহণ আইনেরও পরিপন্থী ছিল। রায়ে আরো বলা হয়, সম্পত্তি হস্তান্তর আইন ও নিবন্ধন আইন অনুযায়ী কোনো জমি লিখিত কবলা ও নিবন্ধন ছাড়া হস্তান্তর করা যায় না। এখানে স্বীকৃতভাবেই এখন পর্যন্ত কবলা বা সাফকবলা বিজিএমইএর নামে নিবন্ধিত হয়নি।

রায়ে আরো বলা হয়, ভবনটি নির্মাণ করে বিজিএমইএ বহু প্রত্যাশিত হাতিরঝিল প্রকল্প বাস্তবায়নে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখাচ্ছে তাদের আর্থিক প্রতিপত্তির কারণে, যা কোনোভাবেই আইনের শাসনের আঙ্গিকে গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। একটি সংস্থা আর্থিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ বলে এবং দেশের অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছে বলে তাদের আইনের ঊর্ধ্বে রাখতে হবে—এ যুক্তি কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। দেশের অন্য দশজনের মতো এই আর্থিক পেশিশক্তির অধিকারী লোকেরাও দেশের সাধারণ আইনের আওতাধীন। সংবিধান অনুযায়ী ধনী-দরিদ্রের মধ্যে আইনের প্রয়োগের ব্যাপারে কোনো বৈষম্য চলতে পারে না। রায়ে বলা হয়, একটি গুরুত্বপূর্ণ সংস্থা হিসেবে বিজিএমইএকে আইনের প্রতি আরো অধিক শ্রদ্ধাশীল হওয়া বাঞ্ছনীয় ছিল। অথচ তারা তা না করে আইনকে তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য করে ব্যবহার করেছে।

রায়ে বলা হয়, বিজিএমইএর পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে ভবনের নকশা রাজউক অনুমোদন করেছে। কিন্তু আইন অনুযায়ী, রাজউক অনুমোদন দেয় কী করে তা প্রশ্ন। প্রকৃতপক্ষে রাজউক কোনো নকশা অনুমোদন দেয়নি। এ কারণে ১২ লাখ টাকা জরিমানা নিয়ে রাজউক যে অনাপত্তিপত্র দিয়েছে, তা বেআইনি ও অবৈধ। জরিমানা নিয়েও অননুমোদিত স্থাপনার বৈধতা দিতে পারে না। এটা ইমারত নির্মাণ আইনের লঙ্ঘন। রায়ে যমুনা ফিউচার পার্ক ও র্যাংগস ভবনের উদাহরণ দিয়ে বলা হয়, ওই দুটি ভবনের অননুমোদিত অংশ ভেঙে ফেলার রায় আপিল বিভাগ বহাল রাখেন। এরপর তা অপসারণ করা হয়। এ কারণে বিজিএমইএ ভবনও সরিয়ে ফেলতে হবে।

 


মন্তব্য