kalerkantho


অপহৃত শিশুর লাশ মিলল খড়ের গাদায়

মুক্তিপণসহ রাতভর অপেক্ষার পরও সাড়া দেয়নি ঘাতকরা

জয়পুরহাট প্রতিনিধি   

৫ মার্চ, ২০১৭ ০০:০০



অপহৃত শিশুর লাশ মিলল খড়ের গাদায়

‘লাটিম নিয়ে আসার কথা বলে সেই যে গেল আর ফিরে এলো না আমার বাবা। বড় কষ্ট দিয়ে ওরা মেরে ফেলেছে আমার বুকের ধনকে। টাকার জন্য ওরা আমার বাবাকে অপহরণের পর মেরে লাশ ফেলে দিয়ে গেছে। তোমরা আমার বাবাকে এনে দাও। আমার বাবা ছাড়া আমি বাঁচব না। ’

বুক চাপড়াতে চাপড়াতে কথাগুলো বলছিলেন অপহরণের পর হত্যার শিকার শিশু তাওহীদ শামিম শুভর (৯) মা জাকিয়া বেগম। একমাত্র পুত্রকে হারিয়ে বাবা আব্দুল গফুর তোতা শয্যাশায়ী। কিছুক্ষণ পরপর ডুকরে কেঁদে উঠছেন। কোনো সান্ত্বনাবাক্যই তাঁদের বুকে চেপে বসা শোকের পাথর সরাতে পারছে না। শুভ হত্যাকাণ্ডের খবর ছড়িয়ে পড়লে আশপাশ অঞ্চলের শত শত নারী-পুরুষ ভিড় জমিয়েছে তোতার বাড়িতে। গোটা এলাকায় নেমে এসেছে শোকের ছায়া।

গতকাল শনিবার সকাল ১০টার দিকে জয়পুরহাটের কালাই পৌর সদরের মুন্সীপাড়া মহল্লার আব্দুল গফুর তোতার বাড়িতে গিয়ে দেখা গেছে এমন হৃদয়বিদারক দৃশ্য। ধনাঢ্য কাঠ ব্যবসায়ী তোতার তিন সন্তানের মধ্যে ছেলে তাওহীদ শামিম শুভ ছিল সবার ছোট। দুই মেয়ের মধ্যে বড় শম্পা ইয়াসমিন বগুড়ার আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়ন স্কুল অ্যান্ড কলেজে উচ্চ মাধ্যমিকের শিক্ষার্থী। ছোট মেয়ে শোভা ইয়াসমিন দশম শ্রেণিতে পড়ছে। আর শুভ ছিল কালাই কাকলি শিশু নিকেতনের দ্বিতীয় শ্রেণির ছাত্র।

পরিবার, প্রতিবেশী ও পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, শুক্রবার সকাল সাড়ে ১০টার দিকে পাশেই বড় চাচা আব্দুস সালামের বাড়িতে খেলতে গিয়ে ভুল করে লাটিম ফেলে এসেছে জানিয়ে তা আনতে মায়ের কাছ থেকে বাড়ির বাইরে যায় শুভ। চাচার বাড়ি থেকে লাটিম নিয়ে একটু সময় পরই বড় চাচি আলেয়া বেগমকে বাড়ি যাওয়ার কথা জানিয়ে চলে আসে সে। এর পরই শিশুটি নিখোঁজ হয়। বিভিন্ন স্থানে খোঁজাখুঁজি করেও আর সন্ধান মেলেনি। বিকেল ৩টার দিকে অপরিচিত নম্বর থেকে তোতার মোবাইল ফোনে একাধিকবার মিসড কল আসে। তিনি বারবার ওই নম্বরে রিং করলেও কেউ ফোন রিসিভ করেনি। পরে সন্ধ্যা ৭টার দিকে ওই নম্বরে কথা হয় তোতার। ছেলেকে ফেরত পেতে ফোনের ওপাশ থেকে তিন লাখ টাকা মুক্তিপণ দাবি করা হয়। টাকা কোথায় দিতে হবে, কিভাবে যোগাযোগ হবে ইত্যাদি বিষয়ে তাঁকে রাত ৮টায় জানানোর কথা বলেই অপর প্রান্ত থেকে ফোন কেটে দেওয়া হয়। কিন্তু রাত ৮টার পর থেকেই ওই ফোন নম্বর বন্ধ পাওয়া যায়। এ অবস্থায় রাত ১২টার দিকে তোতা বাদী হয়ে অজ্ঞাতপরিচয় ব্যক্তিদের আসামি করে কালাই থানায় অপহরণ মামলা করেন।

এদিকে মামলা করলেও ছেলেকে ফিরে পেতে মুক্তিপণের টাকাসহ পরিবারের লোকজন শুক্রবার দিবাগত সারা রাত জেগে অপেক্ষায় থাকে। প্রত্যাশা ছিল অপহরণকারীরা যোগাযোগ করবে। কিন্তু তারা আর কোনো যোগাযোগ করেনি। গতকাল ভোর সাড়ে ৬টার দিকে তোতার বাড়ি থেকে প্রায় ৫০ গজ দূরে প্রতিবেশী সাঈদ ফকিরের খড়ের গাদার পাশে শুভর মৃতদেহ পাওয়া যায়। তার গলা, কপাল ও গালের বেশ কিছু স্থানে অসংখ্য নির্যাতনের চিহ্ন ছিল। কালো কালো দাগ হয়ে গেছে। মুখে ফেনা জমে আছে। খবর পেয়ে পুলিশ মৃতদেহ উদ্ধার করে ময়নাতদন্তের জন্য জয়পুরহাট আধুনিক হাসপাতাল মর্গে পাঠায়।

জয়পুরহাটের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার বেলায়েত হোসেনসহ জেলার একাধিক পুলিশ কর্মকর্তা স্বজনদের আশ্বাস দিয়ে বলেছেন, শুভকে অপহরণ ও হত্যার সঙ্গে জড়িতদের দ্রুত শনাক্ত করে গ্রেপ্তার করা হবে। একই সঙ্গে জয়পুরহাট র‌্যাব ক্যাম্পের এডি জহুরুল ইসলামসহ র‌্যাব সদস্যরাও ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছেন।

নিহতের বড় চাচা আব্দুস সালাম খাজা বলেন, ‘অপহরণকারীদের সঙ্গে যোগাযোগের জন্য আমরা সারা রাত জেগে কাটিয়েছি। আশপাশে সতর্ক নজরদারিও রেখেছি। এত সতর্ক থাকার পরও অপহরণকারীরা শুভর মৃতদেহ কিভাবে বাড়ির পাশে রেখে গেল তা একটা রহস্য। আমরা এই হত্যার দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি চাই। ’

কালাই পৌরসভার ৯ নম্বর ওয়ার্ডের সাবেক কাউন্সিলর সাজ্জাদুর রহমান কাজল জানান, খবর পাওয়ার পর থেকেই পরিবারের সঙ্গে থেকে তিনি শিশুটিকে জীবিত উদ্ধারে নানাভাবে চেষ্টা চালিয়েছেন। কিন্তু ঘাতকরা নিষ্পাপ শিশুটিকে নির্মমভাবে হত্যা করেছে। এ ঘটনায় এলাকায় শোকের ছায়া বিরাজ করছে।

জাকিয়া বেগম কাঁদতে কাঁদতে বলেন, ‘আমার ছেলের খুনিরা যেন কিছুতেই রেহাই না পায়। দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি না হলে এই পাষণ্ডরা আমার মতো আরো অনেক মায়ের বুক খালি করবে। ’

কালাই থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা নুরুজ্জামান চৌধুরী বলেন, ‘শিশুটিকে শ্বাসরোধে হত্যা করা হয়েছে বলে প্রাথমিকভাবে আমরা ধারণা করছি। তবে ময়নাতদন্তে বিষয়টি নিশ্চিত হওয়া যাবে। পুলিশ গুরুত্ব দিয়ে ঘটনা তদন্ত শুরু করেছে। তদন্তকাজে আমরা সবার সহযোগিতা কামনা করছি। ’


মন্তব্য