kalerkantho


মুক্তিযোদ্ধা লিয়াকত হোসেন সরকার

ভাইয়ের খবর আনতে গিয়ে যুদ্ধে জড়াই

ওমর ফারুক মিয়াজী, দাউদকান্দি (কুমিল্লা)   

৫ মার্চ, ২০১৭ ০০:০০



ভাইয়ের খবর আনতে গিয়ে যুদ্ধে জড়াই

‘আমি তখন দশম শ্রেণির ছাত্র। মুক্তিযুদ্ধ শুরু হয়ে গেছে।

এক মাস পর আমার বড় ভাই মোবারক হোসেন সরকার যুদ্ধে চলে যায়। দেড় মাস পর বাড়িতে খবর এলো, আগরতলায় ট্রেনিং করার সময় তার মৃত্যু হয়েছে। মা-বাবা ছেলের লাশ আনার জন্য পাগল হয়ে পড়ল। কিন্তু ঘরে টাকা-পয়সা নেই। প্রচণ্ড যুদ্ধ চলছে। কিভাবে ভাইয়ের লাশ আনব! পুরো পরিবারে কান্নার রোল চলছে। পরে মায়ের জমানো ডিম বিক্রির ৪০ টাকা নিয়ে ভারতের আগরতলায় ট্রেনিং ক্যাম্পের উদ্দেশে রওনা হই। তখন আষাঢ় মাস, চারদিকে পানি থইথই করছে। নৌকায় করে আমার সঙ্গে পাশের গ্রামের সাত-আটজন যুবকও রওনা দেয়। তারা সবাই আমার চেয়ে বয়সে বড়। আমরা দাউদকান্দির ইলিয়টগঞ্জ বাজারে যাই। সেখান থেকে হেঁটে চান্দিনার মাধাইয়া পৌঁছতে রাত হয়ে যায়। একটি বাড়িতে রাত যাপন করি। সকালে আবার হেঁটে রওনা হই; দেবিদ্বার হয়ে কসবা সীমান্তে পৌঁছি। সেখান থেকে সালদা নদী দিয়ে নৌকায় করে যাই আগরতলায়। ’

বড় ভাইয়ের খবর আনতে গিয়ে কিভাবে মুক্তিযুদ্ধে জড়ালেন সেই বর্ণনা দিয়েছেন দাউদকান্দি উপজেলার পদুয়া ইউনিয়নের তুলাতলী গ্রামের মুক্তিযোদ্ধা লিয়াকত হোসেন সরকার। বাবা ফজর আলী সরকার। পাঁচ ভাই ও এক বোনের মধ্যে তিনি তৃতীয়। বড় ভাই মুক্তিযোদ্ধা মোবারক হোসেন সরকার।

লিয়াকত হোসেন বলেন, “আগরতলায় গিয়ে জানতে পারলাম, আমাদের এলাকার এলএমএফ আবদুর রশিদ ইঞ্জিনিয়ার মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক। কুমিল্লার লোকদের দেখাশোনা করেন তিনি। এক দিন পর তাঁর সঙ্গে দেখা করি। ভাইয়ের খবর জানার জন্য উদগ্রীব হয়ে পড়ি। তিনি বললেন, ‘তুমি কোনো চিন্তা কোরো না। দেখি, তোমার ভাই কোন ক্যাম্পে ট্রেনিং করেছে। ’ পরের দিন খোঁজ নিয়ে তিনি বললেন, ‘মোবারক হোসেন নামের চার-পাঁচজন এক মাসের প্রশিক্ষণের জন্য মেলান্দহে এসেছে। একজন অস্ত্র প্রশিক্ষণের সময় মারা গেছে। সে তোমার ভাই কি না নিশ্চিত হয়ে নিই। ’ এক দিন পর তিনি জানালেন, মোবারক হোসেন নামে যে মারা গেছে সে ভবানীপুরের আলমাছ মিয়ার ছেলে (লাশ শনাক্ত করতে গিয়ে জানা গেল তাঁর বাবার নাম আকরাম আলী)। তাঁর কথায় নিশ্চিত হলাম, আমার ভাই বেঁচে আছে। জানলাম, সে প্রশিক্ষণ নিয়ে যুদ্ধ করার জন্য বাংলাদেশে চলে গেছে। এ কথা শুনে আমার আত্মা শান্তি পেল। কিন্তু খবরটি মা-বাবাকে জানানোর জন্য অস্থির হয়ে পড়ি। ”

ভাইয়ের খবর জানানোর পর আব্দুর রশিদ বললেন, ‘এবার যুদ্ধে যাবি, নাকি বাড়ি যাবি? আমি বললাম, ভাই যেহেতু মারা যায়নি, আমিও মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেব। যেহেতু আমাকে বাড়ি পাঠাতে হবে সে কারণে আমাকে স্বল্প মেয়াদি (সাত দিনের) প্রশিক্ষণ দেওয়া হলো। আমি বাড়ি চলে আসি। আমার জন্য কাঁদতে কাঁদতে মা-বাবার চোখ ফুলে গেছে। প্রায় এক মাস পর বাড়ি ফিরলাম। মা-বাবা আমাকে জড়িয়ে ধরে কান্নায় ভেঙে পড়ল। তাদের জানালাম, মোবারক হোসেন নামে যে মারা গেছে সে ভবানীপুরের আকরাম আলীর ছেলে। বড় ভাই আখাউড়ায় মুক্তিযোদ্ধাদের সঙ্গে আছে, পাক-হানাদারদের সঙ্গে যুদ্ধ করছে। আসার সময় ভাইয়ের হাতে লেখা চিঠি নিয়ে আসি। তাতে লেখা, ‘মা, তুমি আমাদের জন্য দোয়া করো, দেশ স্বাধীন করে আমি বাড়ি ফিরব। ’ চিঠি পড়ার পর মা বিশ্বাস করল, আমার ভাই বেঁচে আছে। ”

মুক্তিযোদ্ধা লিয়াকত বলেন, “পরে আমি মুক্তিযোদ্ধাদের দাউদকান্দি দক্ষিণ অঞ্চলের কমান্ডার নান্নু সরকারের সঙ্গে দেখা করলাম। তিনি আমাকে মুজিব বাহিনীর দাউদকান্দি থানা কমান্ডার আবদুস ছামাদ ভাইয়ের কাছে পাঠালেন। তিনি আমাকে দেখে বললেন, ‘এই ছেলে, তুমি এত ছোট! সাত দিনের কী প্রশিক্ষণ নিয়েছো? তুমি কি অস্ত্র চালাতে পারবে?’ এ কথা বলে আমাদের ১০ জনকে কিছু অস্ত্র দিয়ে তিনি বললেন, ‘দেখি, কে চালাতে পারো। ’ আমাদের সঙ্গী রফিক ভাই এসএমজির ট্রিগার টিপে ধরতেই এলোপাতাড়ি গুলি বের হতে শুরু করল। আমাদের মধ্যেই দুজনের গায়ে গুলি লেগে যায়। সঙ্গে সঙ্গে আমি অস্ত্রটির ট্রিগার চেপে ধরে বন্ধ করি। তখন ছামাদ ভাই বুঝতে পারলেন, আমি অস্ত্র চালাতে শিখেছি। আহত দুজনের মধ্যে সফিক ভাই মারা যায়। রাতে তাকে বাড়িতে নিয়ে গিয়ে মাটি দিয়ে আসি। কমান্ডারের কথায় পরে আরো ১৫ দিনের প্রশিক্ষণ নিই। ”

‘কমান্ডার ছামাদ ভাই আমার ওপর আস্থা রাখলেন—ছোট হলেও পাক-হানাদারদের সঙ্গে যুদ্ধ করতে পারব। ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে শহীদনগর ওয়্যারলেস গেটের একটি কক্ষে আমাকে থাকতে বললেন তিনি। আমি সারা দিন বিভিন্ন জায়গা থেকে পাক-হানাদারদের অবস্থানের খবর সংগ্রহ করি। এসব খবর থানা কমান্ডারকে জানাই। একবার জানতে পারলাম, হানাদাররা দাউদকান্দির গোয়ালমারীতে ঘাঁটি গড়তে শুরু করেছে। বিষয়টি কমান্ডারকে জানালাম। তাদের সঙ্গে যুদ্ধ করার জন্য চারজনকে দায়িত্ব দেওয়া হয়। তখন ছিল কার্তিক মাস, ক্ষেতে বুকসমান পানি। সেই পানির মধ্যে দিয়ে মাথায় অস্ত্র নিয়ে আমরা পাঁচ-ছয়জন ধানক্ষেতের ভিতর দিয়ে এগিয়ে যাই। কিছু পরে আমি ফায়ারিং শুরু করি। পাকিস্তানি বাহিনীও আমাদের লক্ষ্য করে ফায়ারিং শুরু করে। ফায়ারিং করতে করতে আমরা সামনে এগোতে থাকি। সকাল ৭টায় যুদ্ধ শুরু হয়, রাত সাড়ে ১০টা পর্যন্ত চলে। থেমে থেমে ফায়ারিং চলছিল। বুঝতে পারলাম, ওরা ক্লান্ত হয়ে পড়েছে। ফাঁকে কাঁচা শাপলা আর শালুক খেয়ে কোনোমতে ক্ষুধা নিবারণ করলাম। আবার ফায়ারিং শুরু করি। টানা ১৬ ঘণ্টার যুদ্ধে মোট ১২ জন মারা যায়। আমাদের পাঁচজন শহীদ হন। পাকিস্তানি বাহিনীর সাতজন মারা যায়। পাকিস্তানি বাহিনী অস্ত্র-গোলাবারুদ ফেলে গোমতী নদী দিয়ে দাউদকান্দির দিকে চলে যায়। ’

‘পিছু হটা পাকিস্তানি বাহিনী দাউদকান্দি ডাকবাংলোতে অবস্থান নেয়। মুক্তিযোদ্ধারা জড়ো হয়ে পরিকল্পনা করে, মেঘনা-গোমতীর তীরবর্তী দাউদকান্দি ডাকবাংলোতে অভিযান চালানো হবে। সব দল জড়ো হয়ে ৮ ডিসেম্বর রাতে অপারেশন শুরু করি। প্রচণ্ড আক্রমণের মুখে হানাদার বাহিনী পিছু হটতে শুরু করে, এতে মুক্তিযোদ্ধাদের মনোবল দ্বিগুণ হয়ে যায়। ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের ইলিয়টগঞ্জ, শহীদনগর ওয়্যারলেস কেন্দ্র এবং সড়ক ও জনপথ বিভাগের দাউদকান্দি ডাকবাংলোতে অবস্থানরত পাকিস্তানি সেনাদের ওপর উত্তর ও দক্ষিণ দিক থেকে একযোগে আক্রমণ শুরু হয়। মোহাম্মদপুর, ডাকখোলা, গোয়ালমারী, বাতাকান্দি প্রভৃতি এলাকার ক্যাম্প থেকে মুক্তিযোদ্ধারা অগ্রসর হতে থাকে। পূর্ব দিক থেকে মিত্র বাহিনীর আর্টিলারির কাভারিংয়ে মুক্তিযোদ্ধারা আক্রমণ শুরু করলে পাকিস্তানি সেনারা পশ্চিম দিকে পিছু হটতে থাকে। মিত্র বাহিনীর শেলিংয়ের কারণে শহীদনগর ওয়্যারলেস কেন্দ্র এলাকা ছেড়ে তারা দাউদকান্দি সদরের দিকে দৌড়াতে থাকে। যুদ্ধের প্রচণ্ডতায় ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের পার্শ্ববর্তী গ্রামগুলোর মানুষ উত্তর দিকে গোমতী নদীতে ঝাঁপিয়ে পড়ে। ৮ ডিসেম্বর সারা রাত ও ৯ ডিসেম্বর সকাল ১১টা পর্যন্ত যুদ্ধ চলে। পাকিস্তানি সেনারা লঞ্চে করে মেঘনা নদী দিয়ে গজারিয়া হয়ে ঢাকায় পালিয়ে যায়। দুপুরে আমরা মুক্তিযোদ্ধারা দাউদকান্দি পৌঁছি এবং স্বাধীন বাংলার লাল-সবুজ পতাকা উড়াই। পুরো দেশ বিজয়ের অপেক্ষায় আছে। আমরা সবাই ডাকবাংলোতে অপেক্ষায় আছি—কখন বিজয় ঘোষণা হবে। ১৫ তারিখে শুনতে পেলাম, জেনারেল নিয়াজী আত্মসমর্পণ করছেন। আমরা আনন্দ-উল্লাস শুরু করি। বিজয় ঘোষণার পর বড় ভাই মোবারক হোসেন সরকার আর আমি বাড়িতে যাই। ’

লিয়াকত হোসেন বলেন, ‘বাড়ি ফেরার পর বড় ভাই মোবারক হোসেন সরকারকে কাঁচা দুধ দিয়ে গোসল করিয়ে বরণ করা হয়। আমি পাঁচগাছিয়া উচ্চ বিদ্যালয়ে গিয়ে লেখাপড়া শুরু করি। ১৯৭২ সালে এসএসসি পাস করে ঢাকা পলিটেকনিকে সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে ভর্তি হই। অনেক কষ্ট করে ১৯৭৭ সালে পাস করে বের হই। তখন সরকারি চাকরির তেমন সুযোগ ছিল না। বিভিন্ন বেসরকারি কম্পানিতে চাকরি করেছি। ’

বীর মুক্তিযোদ্ধা লিয়াকত হোসেন বলেন, ‘আমরা দুই ভাই মুক্তিযোদ্ধা। আমরা দুই ভাই-ই মুক্তিযোদ্ধা ভাতা পাচ্ছি। বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনা মুক্তিযোদ্ধাদের ও তাদের সন্তানদের যেভাবে মূল্যায়ন করছেন, বাংলাদেশের কোনো সরকার তা করেনি। আমরা মুক্তিযোদ্ধারা ও আমাদের সন্তানরা আজীবন এ সরকারের কাছে কৃতজ্ঞ থাকব। ’


মন্তব্য