kalerkantho


সুদিন ফিরছে প্রশাসনে

♦ দু-তিন বছরের মধ্যে স্বাভাবিক কাঠামোতে ফিরবে
♦ দুর্নীতিমুক্ত, স্মার্ট ও জনবান্ধব করতে নানা উদ্যোগ

আশরাফুল হক রাজীব   

৫ মার্চ, ২০১৭ ০০:০০



সুদিন ফিরছে প্রশাসনে

দুই-তিন বছরের মধ্যে প্রশাসন পিরামিড কাঠামোতে ফিরবে। এ সময়ের মধ্যে বড় দুটি ব্যাচের বেশির ভাগ কর্মকর্তা অবসরে চলে যাবেন। এরপর স্বাভাবিক কাঠামোয় ফিরে সংশ্লিষ্টদের জন্য সুদিন বয়ে আনবে প্রশাসন—এমনটাই মনে করছেন অনেকে।

উপজেলা পর্যায়ে ম্যাজিস্ট্রেটের তাত্ক্ষণিক প্রয়োজন মেটাতে ১৯৮৪ ও ১৯৮৫ ব্যাচে সহস্রাধিক কর্মকর্তা নিয়োগ দেওয়া হয়। প্রশাসনের প্রারম্ভিক পর্যায়ে অনেক পদ থাকলেও শীর্ষ পর্যায়ে তা সংকুচিত হয়ে আসে। ১৯৮৪ ও ১৯৮৫ ব্যাচের বেলায়ও তাই হয়েছে। বিপুলসংখ্যক কর্মকর্তা যখন ধাপে ধাপে ওপরের দিকে উঠতে শুরু করেন তখনই সমস্যা প্রকট হয়। এ দুটি ব্যাচের কর্মকর্তাদের উপসচিব, যুগ্ম সচিব, অতিরিক্ত সচিব ও সচিব পদে পদোন্নতি দিতে গিয়ে প্রশাসনের সাংগঠনিক কাঠামো ভেঙে পড়ে। পিরামিড আকৃতির প্রশাসন হয়ে যায় পেট মোটা।

সুদিন ফিরবে আরো অনেক কারণে। প্রশাসনকে জনমুখী করার জন্য নানা ধরনের উদ্যোগ রয়েছে সরকারের।

কর্মকর্তাদের জবাবদিহি নিশ্চিত করার জন্য বার্ষিক কর্মসম্পাদন চুক্তি হচ্ছে। প্রণয়ন করা হচ্ছে সেকেন্ড জেনারেশন সিটিজেন চার্টার। জনপ্রশাসনকে দুর্নীতিমুক্ত করতে শুদ্ধাচার কৌশল বাস্তবায়ন হচ্ছে। জনগণের অভিযোগ গ্রহণ ও প্রতিকার ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করতে প্রতিটি মন্ত্রণালয়ে নিয়োগ করা হয়েছে ফোকাল পয়েন্ট কর্মকর্তা। এসডিজি অর্জনে গৃহীত পরিকল্পনা বাস্তবায়নে জনপ্রশাসন কাজ করছে। বিভাগীয় মামলাগুলো নিষ্পত্তির জন্য কেন্দ্রীয়ভাবে সংস্থা গঠনের সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, এসব সিদ্ধান্ত বাস্তবায়িত হলে প্রশাসন হয়ে উঠবে স্মার্ট ও জনবান্ধব।

বর্তমানে নিচের দিকে অর্থাৎ সহকারী সচিব বা সিনিয়র সহকারী সচিব পর্যায়ে প্রয়োজনের তুলনায় কর্মকর্তা অনেক কম। জুনিয়র কর্মকর্তাদের সংখ্যা বাড়াতে ধারাবাহিকভাবে বিসিএস পরীক্ষার আয়োজন করছে পাবলিক সার্ভিস কমিশন। জনপ্রশাসন সচিব ড. মো. মোজ্জাম্মেল হক খান কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘শিগগিরই ৩৮তম বিসিএসের সার্কুলার জারি হবে। এর মাধ্যমে প্রায় ৩০০ কর্মকর্তা প্রশাসন ক্যাডারে যোগ দেবেন। এতে করে নিচের দিকের কর্মকর্তা সংকট দূর হবে। ’

জনপ্রশাসনের কর্মকর্তারা জানান, প্রশাসনের কাজের ধরন পাল্টে যাচ্ছে। বার্ষিক কর্মসম্পাদন চুক্তির ফলে কোনো কর্মকর্তার অলস বসে থাকার সুযোগ নেই। এ চুক্তির আওতায় সবার কাজ পর্যবেক্ষণের ব্যবস্থা হচ্ছে। কারণ মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের সঙ্গে চুক্তি করছে বিভিন্ন মন্ত্রণালয়। সেই মন্ত্রণালয় বা বিভাগ চুক্তি করছে তার অধীনস্থ সংস্থা বা দপ্তর-অধিদপ্তরের সঙ্গে। ফলে কারো আর অলস সময় কাটানোর সুযোগ নেই। প্রত্যেক সরকারি কর্মচারী নেটওয়ার্কের মধ্যে এবং তাঁর আগামী বছরে কাজের লক্ষ্য কী তা নির্দিষ্ট করা থাকছে। একই সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা সেই পরিকল্পিত কাজের কতটুকু করেছেন তা মূল্যায়নের সুুযোগ রয়েছে কর্মসম্পাদন চুক্তিতে। এর আওতায় প্রতিটি মন্ত্রণালয়ের সমস্যা ও চ্যালেঞ্জগুলো চিহ্নিত করা হচ্ছে। আর সমস্যা চিহ্নিত হলে তার সমাধানও সহজ হয়ে যায়।

জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের সমস্যা ও চ্যালেঞ্জগুলো কী জানতে চাইলে এক কর্মকর্তা জানান, বিভিন্ন ক্যাডারে জনবল নিয়োগের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের ওপর নির্ভরশীলতা একটি বড় প্রতিবন্ধকতা। জনপ্রশাসনের কর্মচারীদের জন্য উপযুক্ত প্রশিক্ষণ কারিকুলাম ও মডিউল যুগোপযোগী করে হালনাগাদ করার ক্ষেত্রে সমস্যা রয়েছে। বুনিয়াদি বা মূল প্রশিক্ষণের জন্য নির্বাচিতদের নিয়ন্ত্রণকারী কর্তৃপক্ষ অবমুক্ত না করায় লক্ষ্যমাত্রা অর্জন কষ্টসাধ্য হয়ে পড়ে। এসডিজি এবং সপ্তম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনার লক্ষ্যের সঙ্গে জনপ্রশাসনের কোন কোন ক্ষেত্রে সম্পৃক্ততা আছে, তা নির্ধারণ এবং সে অনুযায়ী কর্মপরিকল্পনা প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন একটি বড় চ্যালেঞ্জ।

গত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় সরকারি অফিসগুলোতে কার কী কাজ এবং সেই কাজ পেতে কত দিন সময় প্রয়োজন তার একটি তালিকা (সিটিজেন চার্টার) অফিস প্রাঙ্গণে প্রদর্শন করা হতো। প্রশাসনের কেন্দ্রবিন্দু সচিবালয় থেকে শুরু করে ইউনিয়ন পর্যায়ের ভূমি অফিসগুলোতেও এ চার্টার ছিল। এর ফলে সাধারণ মানুষের পক্ষে সরকারি সেবা পাওয়া সহজ হয়েছিল। কিন্তু ২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ সরকার গঠনের পর এসব চার্টার উধাও হয়ে যায়। আশার কথা হচ্ছে, সেই সব সিটিজেন চার্টার আবার ফিরতে শুরু করেছে। তবে পরিবর্তিত আকারে সেকেন্ড জেনারেশন সিটিজেন চার্টার হিসেবে তা ফিরছে। এ চার্টারের উদ্দেশ্য সম্পর্কে জানতে চাইলে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের একজন কর্মকর্তা জানান, প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা বাড়িয়ে দক্ষ, সেবামুখী ও দায়বদ্ধ জনপ্রশাসন গড়ে তোলা হচ্ছে এর লক্ষ্য। বেসামরিক প্রশাসনে রাজস্ব খাতভুক্ত পদে চাকরিরত অবস্থায় কোনো সরকারি কর্মচারী মারা গেলে বা স্থায়ীভাবে অক্ষম হয়ে গেলে দুই থেকে পাঁচ লাখ টাকার আর্থিক অনুদান দেওয়া হয়। জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের সিটিজেন চার্টার বলছে, এ সেবা পেতে ৫০ কার্যদিবস লাগবে। অথচ একসময় এ অনুদান পেতে বছরের পর বছর লেগে যেত।

রাষ্ট্রের অন্যতম লক্ষ্য হচ্ছে নাগরিকদের জন্য আইনের শাসন, মানবাধিকার ও ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা। একই সঙ্গে রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সামাজিক অধিকার নিশ্চিত করা। এসব লক্ষ্য পূরণে সুশাসন প্রতিষ্ঠা ও প্রশাসনকে দুর্নীতিমুক্ত রাখা জরুরি। এ উদ্দেশ্যে সরকার শুদ্ধাচার কৌশলপত্র প্রণয়ন করেছে। কৌশলপত্রে বিভিন্ন সেক্টরের শতাধিক চ্যালেঞ্জ নির্ধারণ করে তা বাস্তবায়নে স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি কৌশল চিহ্নিত করা হয়েছে। জাতীয় শুদ্ধাচার কৌশলের আলোকেই তথ্য অধিকার আইন বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। সব মন্ত্রণালয় বা বিভাগ তথ্য প্রকাশ কার্যক্রম জোরদারে বিভিন্ন কমিটি-উপকমিটি গঠন করেছে। মন্ত্রিসভা অনুমোদিত জাতীয় শুদ্ধাচার কৌশল বাস্তবায়ন, পরিবীক্ষণ ও সমন্বয়ের জন্য প্রধানমন্ত্রীর নেতত্বে জাতীয় শুদ্ধাচার উপদেষ্টা পরিষদ গঠন করা হয়েছে। এ কমিটিতে সরকারি কর্মকর্তা ছাড়াও শিক্ষাবিদ, সুধীসমাজ, এনজিও, সাংবিধানিক ও সংবিধিবদ্ধ প্রতিষ্ঠানপ্রধানদের পাশাপাশি বেসরকারি খাতসংশ্লিষ্টদের অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। কিভাবে এ শুদ্ধাচার কৌশলপত্র বাস্তবায়ন করা হবে—জানতে চাইলে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের একজন কর্মকর্তা বলেন, ব্যক্তিপর্যায়ে কর্তব্যনিষ্ঠা ও সততাচর্চার মাধ্যমে শুদ্ধাচার কৌশল বাস্তবায়ন করা হবে। সমাজ থেকে দুর্নীতি দমন ও শুদ্ধাচার প্রতিষ্ঠার জন্য একটি সমন্বিত উদ্যোগ হিসেবে এ কৌশলপত্র প্রণয়ন করা হয়েছে। এতে সরকারি ও বেসরকারি খাতের সক্ষমতা বাড়ানোর প্রস্তাব রয়েছে। বিদ্যমান আইন-কানুন সংস্কার এবং নতুন রীতি-পদ্ধতি প্রণয়ন করে লক্ষ্য বাস্তবায়নের কথা বলা হয়েছে। এ কৌশলপত্র বাস্তবায়ন করতে পারলে প্রশাসনের মতো সারা দেশে পরিবর্তন আসবে।

সরকারি কর্মকর্তাদের মধ্যে উদ্ভাবনী চর্চার বিকাশ জনপ্রশাসনে সেবা প্রদানের ক্ষেত্রে এক নতুন দ্বারের সূচনা করেছে। উন্নত দেশের সঙ্গে তাল মিলিয়ে ডিজিটাল সেবা প্রদানে বাংলাদেশ এখন মডেল হিসেবে সারা পৃথিবীর কাছে পরিচিত। সরকারি দপ্তরের উদ্ভাবনী কার্যক্রম সম্পর্কে সচেতনতা বাড়াতে মেলার আয়োজন করা হচ্ছে। এর মাধ্যমে সরকারি সেবাগ্রহীতাদের সচেতন করতে বিভিন্ন সম্ভাবনাকে ব্র্যান্ডিংয়ের মাধ্যমে জাগিয়ে তোলা হচ্ছে।

সরকারি কর্মচারীদের বিরুদ্ধে প্রতিবছর শত শত বিভাগীয় মামলা হয়। এসব মামলায় নামমাত্র তদন্ত হয়। বিভাগীয় মামলা হলেও শাস্তি হয় খুব নগণ্যসংখ্যক কর্মচারীর। এর অন্যতম কারণ হচ্ছে বিভাগীয় মামলাটি পরিচালনা করা হয় অভিযুক্তের সংশ্লিষ্ট সংস্থা বা দপ্তরের কর্মকর্তা দ্বারাই। অভিযুক্ত বা তদন্তকারী উভয়ে দীর্ঘদিন ধরে একই মন্ত্রণালয় বা সংস্থায় কাজ করেন। ফলে এখানে ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা সম্ভব হয় না। এসব বিভাগীয় মামলায় কোটি কোটি টাকার সংশ্লিষ্টতা থাকে। বিভাগীয় অভিযোগ সুশাসনের অন্তরায় বলে সরকার বিভাগীয় মামলা তদন্ত ও ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য আলাদা কর্তৃপক্ষ গঠনের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এ বিষয়ে একজন কর্মকর্তা কালের কণ্ঠকে বলেছেন, বর্তমানে প্রতিবছরই বিভাগীয় মামলা বাড়ছে। আলাদা কর্তৃপক্ষ হলে এর সংখ্যা বাড়বে না। কয়েকটি দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দিতে পারলে মামলার সংখ্যা কমতে বাধ্য।


মন্তব্য