kalerkantho


ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ৫০তম সমাবর্তনে রাষ্ট্রপতি

ছাত্র নেতৃত্বের বিকাশে অবশ্যই ডাকসু নির্বাচন করতে হবে

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিনিধি   

৫ মার্চ, ২০১৭ ০০:০০



ছাত্র নেতৃত্বের বিকাশে অবশ্যই ডাকসু নির্বাচন করতে হবে

রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ গতকাল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ৫০তম সমাবর্তন অনুষ্ঠানে কৃতী শিক্ষার্থীদের স্বর্ণপদক প্রদান করেন। ছবি : পিআইডি

দেশের গণতন্ত্রের ভিত্তি শক্তিশালী করতে নতুন নেতৃত্ব গড়ে তোলার জন্য ডাকসু নির্বাচনের ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন রাষ্ট্রপতি ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আচার্য আবদুল হামিদ। তিনি বলেন, ছাত্র নেতৃত্বের বিকাশে অবশ্যই ডাকসু নির্বাচন করতে হবে। গতকাল শনিবার বিকেলে দেশের সর্বোচ্চ বিদ্যাপীঠ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় খেলার মাঠে আয়োজিত বিশ্ববিদ্যালয়ের ৫০তম সমাবর্তন অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এ কথা বলেন।

সমাবর্তন উপলক্ষে গতকাল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন বিভাগ, ইনস্টিটিউট ও ভবন ছাত্রছাত্রীদের পদচারণে মুখরিত হয়ে ওঠে। কালো গাউন পরে শিক্ষার্থীরা ক্যাম্পাসজুড়ে আনন্দ-উল্লাস প্রকাশ করে।

সমাবর্তন অনুষ্ঠানে আবদুল হামিদ বলেন, দেশে যোগ্য ও সৎ নেতৃত্ব গড়ে না উঠলে জাতির ভবিষ্যৎ নেতৃত্ব গড়ে উঠবে না। দেশের টেকসই উন্নয়ন নিশ্চিত করতে রাজনৈতিক নেতৃত্বের কোনো বিকল্প নেই। আর এ নেতৃত্ব গড়ে উঠবে ছাত্ররাজনীতির মাধ্যমে। কিন্তু বর্তমান সময়ের ছাত্ররাজনীতিতে আদর্শ, দেশ ও জাতির কল্যাণের চেয়ে ব্যক্তি বা গোষ্ঠী স্বার্থের প্রাধান্য বেশি রয়েছে।

কিছু ক্ষেত্রে অছাত্ররাই ছাত্ররাজনীতির নেতৃত্ব দিচ্ছে, নিয়ন্ত্রণ করছে। ফলে ছাত্ররাজনীতির প্রতি সাধারণ মানুষ ও সাধারণ শিক্ষার্থীদের আস্থা, সমর্থন ও সম্মান ক্রমান্বয়ে কমে যাচ্ছে।

তাই তিনি এ অবস্থা থেকে বেরিয়ে আসতে ছাত্রসমাজকেই অগ্রণী ভূমিকা পালন করার আহ্বান জানান।

বর্তমান ছাত্ররাজনীতির দুরবস্থা তুলে ধরে রাষ্ট্রপতি আরো বলেন, বর্তমান সময়ের ছাত্রনেতাদের বয়স থাকে ৪৫-৫০ বছর। এটা হতে পারে না। এ ব্যাপারে এখনই চিন্তাভাবনা করা দরকার। এখন থেকে যারা নিয়মিত ছাত্র তারাই যেন ছাত্রদের নেতৃত্বে আসে সেদিকে খেয়াল রাখা উচিত। কারণ এই বয়সের নেতারা বিশ্ববিদ্যালয়ের ২০-২২ বছরের ছেলেমেয়েদের সঙ্গে খাপ খাওয়াতে পারে না। সুতরাং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ডাকসু নির্বাচন আবশ্যক। এ নির্বাচন না হলে ভবিষ্যতে এ দেশে নেতৃত্বের শূন্যতা সৃষ্টি হবে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে উন্নত মানবসম্পদ গড়ার কেন্দ্রবিন্দু হিসেবে উল্লেখ করে রাষ্ট্রপতি বলেন, ১৯২১ সালের ১ জুলাই বিশ্ববিদ্যালয়টি চালু হওয়ার পর থেকে আধুনিক, বিজ্ঞানভিত্তিক এবং সময়োপযোগী শিক্ষাব্যবস্থা গড়ে তুলতে বিশ্ববিদ্যালয়টি গতিশীল এবং বাস্তবভিত্তিক বিভিন্ন পদক্ষেপ নিয়েছে।

নিজের রাজনৈতিক জীবনের কথা বলতে গিয়ে রাষ্ট্রপতি বলেন, তিনি ছাত্রজীবনেই রাজনীতি শুরু করেছিলেন। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র ছিলেন না, তবে একজন ছাত্রনেতা হিসেবে তিনি অনেকবার এ বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে এসেছেন এবং অবস্থান করেছেন। ফলে এ বিশ্ববিদ্যালয় নিয়ে তিনি গর্ববোধ করেন।

এবারের সমাবর্তনে বিশ্ববিদ্যালয়ের ৬১ জন গবেষককে পিএইচডি, ৪৩ জনকে এমফিল, ৮০ জনকে স্বর্ণপদক এবং ১৭ হাজার ৮৭৫ জন গ্র্যাজুয়েটকে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রি দেওয়া হয়।

রাষ্ট্রপতি স্নাতক ডিগ্রি অর্জনকারীদের স্বাগত জানান এবং তাঁদের এ পর্যন্ত পৌঁছানোর ক্ষেত্রে মা-বাবা, শিক্ষক, সমাজ, দেশ ও জনগণের অবদানের কথা ভুলে না যাওয়ার জন্য শিক্ষার্থীদের প্রতি আহ্বান জানান। শিক্ষার্থীদের উদ্দেশে তিনি বলেন, ‘তোমরা তাদের সকলের কাছে ঋণী। তোমাদের মেধা, প্রজ্ঞা ও কাজের মাধ্যমে নিজ নিজ জায়গা থেকে জাতির আশা-আকাঙ্ক্ষা পূরণে তোমাদের অবশ্যই সক্রিয় ভূমিকা পালন করতে হবে। ’ রাষ্ট্রপতি শিক্ষার্থীদের তাদের চাকরির সুবাদে বিশ্বের যেখানেই থাকুক না কেন, এই দেশ, দেশের মানুষকে ভুলে না যাওয়ার পাশাপাশি কোনো মিথ্যা ও অশুভ শক্তির কাছে মাথানত না করার পরামর্শ দেন।

অনুষ্ঠানে কানাডার ইউনিভার্সিটি অব ওয়েস্টার্ন অন্টারিওর প্রেসিডেন্ট ও উপ-উপাচার্য অধ্যাপক অমিত চাকমা সমাবর্তন বক্তৃতা দেন। সমাবর্তনে তাঁকে ‘ডক্টর অব সায়েন্স’ ডিগ্রি দেওয়া হয়। ১৯৫৯ সালে পার্বত্য চট্টগ্রামের একটি চাকমা পরিবারে জন্ম নেন এই কেমিক্যাল ইঞ্জিনিয়ার।

সমাবর্তন বক্তা হিসেবে অমিত চাকমা বলেন, এটা শিক্ষাযাত্রার সমাপ্তি নয়। একটি মাইলফলক মাত্র। শিক্ষার আলো দিয়ে অজ্ঞানতার অন্ধকার মুছে ফেলে, মনের দরজা খুলে দিতে হবে। নিজের ক্ষমতাকে সত্কাজে ব্যবহার করতে হবে। যত জ্ঞান অর্জিত হবে, তত ভালোমন্দের যাচাই ক্ষমতা বাড়বে। নীতির ওপর অটল থেকে সিদ্ধান্ত নেওয়া যাবে।

অমিত চাকমা বলেন, জীবনে সফল হওয়ার জন্য প্রয়োজন তিনটি বৈশিষ্ট্য। আর তা হলো যোগ্যতা, কর্মনিষ্ঠা ও চারিত্রিক গুণ। নিজের দক্ষতা ও মেধাকে কাজে লাগিয়ে এসব গুণকে অর্জন করতে হবে।

অনুষ্ঠানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. আ আ ম স আরেফিন সিদ্দিক বলেন, শিক্ষার মূল উদ্দেশ্য হচ্ছে মানবকল্যাণ। শুধু সার্টিফিকেট অর্জন বা পরীক্ষায় ভালো ফল করে দেশের কল্যাণ সাধন সম্ভব নয়। এ জন্য প্রয়োজন ভালো মানুষ। বর্তমান বিশ্বায়নের প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে হলে ছাত্রছাত্রীদের আন্তর্জাতিক মানের গ্র্যাজুয়েট হতে হবে।

উপাচার্য আরো বলেন, বর্তমানে উচ্চশিক্ষিত হয়েও অনেকে দুর্নীতির সঙ্গে জড়িয়ে পড়েন। এ কারণে শিক্ষার্থীদের নৈতিক মূল্যবোধে উদ্বুদ্ধ হতে হবে।

অনুষ্ঠানে সমাবর্তন বক্তার সাইটেশন পাঠ করেন উপাচার্য অধ্যাপক ড. আ আ ম স আরেফিন সিদ্দিক। উপ-উপাচার্য (শিক্ষা) অধ্যাপক ড. নাসরীন আহমাদ ধন্যবাদ জ্ঞাপন করেন। অনুষ্ঠানে আরো উপস্থিত ছিলেন উপ-উপাচার্য (প্রশাসন) অধ্যাপক ড. মো. আখতারুজ্জামান, কোষাধ্যক্ষ অধ্যাপক ড. মো. কামাল উদ্দীনসহ মন্ত্রিপরিষদের সদস্য, সংসদ সদস্য, বিভিন্ন কূটনৈতিক মিশনের প্রধান, বিশ্ববিদ্যালয়ের সিনেট-সিন্ডিকেট সদস্য ও একাডেমিক পরিষদের সদস্যরা। সমাবর্তন অনুষ্ঠান সঞ্চালনা করেন বিশ্ববিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত রেজিস্ট্রার মো. এনামউজ্জামান।

এর আগে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের সঙ্গে নিয়ে কার্জন হলের সামনে থেকে এক শোভাযাত্রার মাধ্যমে সমাবর্তনস্থলে উপস্থিত হন আচার্য আবদুল হামিদ। পরে জাতীয় সংগীতের মাধ্যমে অনুষ্ঠান শুরু হয়। এরপর ছিল ধর্মগ্রন্থ থেকে পাঠ এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের নৃত্যকলা বিভাগের আয়োজনে নৃত্য পরিবেশনা।


মন্তব্য