kalerkantho


মুক্তিযোদ্ধা খায়রুজ্জামান শরীফ

সতীঘাটা-কামালপুর যুদ্ধের কথা ভুলব না কোনো দিন

ফখরে আলম, যশোর   

৪ মার্চ, ২০১৭ ০০:০০



সতীঘাটা-কামালপুর যুদ্ধের কথা ভুলব না কোনো দিন

‘আমাদের ওপি (অবজারভেশন পোস্ট) খবর দেয়, ছুটিপুরে হানাদার বাহিনী ঘাঁটি গেড়েছে; সঙ্গে রাজাকারও আছে। আমরা এ খবর পেয়ে আমাদের শেল্টার বেনাপোলের খাঁবাড়ি থেকে ছুটিপুরের দিকে মুভ করি। গভীর রাত। আমরা আট-দশজন ছুটিপুর ব্রিজের পাশে অবস্থান নিই। বুঝতে পারি, শত্রু আমাদের টার্গেটের ভেতর এসে গেছে। আমার কোড নম্বর জে-৩৬। আমি কোড উল্লেখ করে বারাকপুর ক্যান্টনমেন্টে রেডিও বার্তা পাঠাই। এরপর আমি এসএলআর দিয়ে ফায়ার ওপেন করি। ওরাও গুলি ছোড়া শুরু করে। ৪০-৫০ মিনিট ধরে ব্যাপক গোলাগুলি হয়। একপর্যায়ে শত্রুপক্ষের গুলিবর্ষণ থেমে যায়।

রাতেই আমরা শেল্টারে ফিরে আসি। পরদিন সকালে জানতে পারি, ছুটিপুর যুদ্ধে দুজন পাকিস্তানি সেনা আর একজন রাজাকার মারা গেছে। ’

১৯৭১ সালের আগস্টে সংঘটিত ছুটিপুর যুদ্ধের এ বর্ণনা দিলেন যশোর সদর উপজেলার চাঁচড়া গ্রামের শহীদ পরিবারের সদস্য বীর মুক্তিযোদ্ধা খায়রুজ্জামান শরীফ। তাঁর ডাক নাম রয়েল। তিনি শোনালেন কিভাবে মুক্তিযুদ্ধে নাম লিখিয়েছিলেন, কিভাবে প্রশিক্ষণ নিয়েছিলেন এবং কিভাবে যুদ্ধ করেছিলেন। পোকাযুক্ত সিএম (একধরনের হালুয়া) খেয়ে জীবনধারণের কথাও জানালেন তিনি।

খায়রুজ্জামান শরীফ উপজেলা আওয়ামী লীগের সাবেক সভাপতি। এখনো দলের সঙ্গে যুক্ত আছেন। তিনি জানান, একাত্তরের ৩০ মার্চ চাঁচড়া রাজবাড়ীর সামনে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীকে প্রতিরোধের যুদ্ধে অংশ নেন তাঁর বড় ভাই মহিউদ্দিন শরীফ। ওই যুদ্ধে তিনি শহীদ হন। তাঁর বাবা পুলিশ সদস্য আব্দুল জলিলও মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেন। এপ্রিলে হানাদার বাহিনীর হাতে আটক হন তিনি। তাঁকে যশোর ক্যান্টনমেন্টে নিয়ে যাওয়া হয়। ৯ মে নির্মম নির্যাতন চালিয়ে হানাদাররা হত্যা করে তাঁকে।

খায়রুজ্জামান শরীফ বলেন, ‘তখন আমি ম্যাট্রিক (এসএসসি) পরীক্ষার্থী। আমার ভেতরে একটি রাজনৈতিক চেতনা ছিল। যুদ্ধের শুরুতে বড় ভাইয়ের শহীদ হওয়ার ঘটনায় আমি প্রতিজ্ঞা করি, এর শোধ নেবই। আমার বাবা তাঁর রাইফেল দিয়ে আমাকে গুলি চালানো শেখান। এপ্রিলের প্রথম সপ্তাহে পকেটে তিন টাকা নিয়ে হেঁটে শার্শার খলিসা দিয়ে সীমান্ত পার হয়ে বনগাঁর হরিদাসপুর শরণার্থী ক্যাম্পে যাই। কিন্তু সেখানে আমাকে থাকতে দেওয়া হয়নি। ১০-১২ দিন ক্যাম্পের সামনে পান-বিড়ির দোকানের একটি বেঞ্চে ঘুমিয়েছি। এরপর চাপাবেড়ে ইয়ুথ ক্যাম্পে গিয়ে আশ্রয় নিই। সেখানে আমাকে এক বেলা সিএম খেতে দিত। সিএমের মধ্যে বড় বড় পোকা থাকত। সেই পোকা বেছে সিএম খেয়েছি। অনেক চেষ্টার পর লাইনে দাঁড়িয়ে মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে নাম লেখাতে সক্ষম হই। ’

মুক্তিযোদ্ধা শরীফ বলেন, ‘ইয়ুথ ক্যাম্প থেকে ১৫০ জনের একটি দলকে ট্রেনে করে কলকাতায় নিয়ে যাওয়া হয়। ওই দলে আমিও ছিলাম। শিয়ালদহ রেলস্টেশনে সেনাবাহিনী আমাদের অভ্যর্থনা জানায়। সেখান থেকে আমাদের দমদম বিমানবন্দরে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে আমার প্রতিবেশী ও বন্ধু ফজলুল করীমের সঙ্গে দেখা হয়। সে আমাকে জড়িয়ে ধরে কেঁদে ফেলে। তিন ঘণ্টার বিমানযাত্রা শেষে আমরা উত্তর প্রদেশের বরহামপুর সামরিক বিমানঘাঁটিতে পৌঁছাই। সেখান থেকে আমাদের ট্রাকে করে দেরাদুনের তান্ডুয়া মিলিটারি ক্যাম্পে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে আমি এক মাস সাত দিন প্রশিক্ষণ নিই। একপর্যায়ে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের মেজ ছেলে শেখ জামাল আমাদের সঙ্গে যোগ দেন। রাজনৈতিক প্রশিক্ষক হিসেবে যোগ দেন হাসানুল হক ইনু। ’

খায়রুজ্জামান শরীফ বলেন, ‘প্রশিক্ষণ শেষে আমাকে একটি এসএলআর আর ৩০০ রাউন্ড গুলি দেওয়া হয়। আমাদের বেনাপোল সীমান্তবর্তী খাঁ সাহেবের বাড়ির শেল্টারে রাখা হয়। সেখান থেকে আমরা বিভিন্ন জায়গায় গিয়ে অপারেশন চালিয়েছি। প্রাণের ঝুঁকি নিয়ে যশোর ক্যান্টনমেন্টের পাশে ভেকুটিয়া গ্রামে গিয়ে পাকদিয়ার বিলে ১৪-১৫ জন যুবককে যুদ্ধের প্রশিক্ষণ দিয়েছি। বুবি ট্র্যাপ করে রাজাকার ও রেঞ্জারদের বন্দি করেছি। পরে কমান্ডারের নির্দেশে তাদের হত্যা করেছি। ’

‘সতীঘাটা-কামালপুর যুদ্ধের কথা ভুলব না কোনো দিন’—এ কথা জানিয়ে তিনি বলেন, ‘৪ কিংবা ৫ ডিসেম্বর সাড়াপোল-রূপদিয়া-বানিয়াবহ পয়েন্টে মিত্র বাহিনী পৌঁছায়। তাদের সঙ্গে ট্যাংকবহরও ছিল। আমি যৌথ বাহিনীর কমান্ডে সংযুক্ত হই। তাদের সঙ্গে সতীঘাটা-কামালপুর যুদ্ধে অংশ নিই। সকাল থেকে রাত পর্যন্ত যুদ্ধ চলে। ওই যুদ্ধে শতাধিক পাকিস্তানি সেনা নিহত হয়। শহীদ হন মিত্র বাহিনীর ১৮ জন সদস্য। ’

খায়রুজ্জামান শরীফ আরো বলেন, ‘আমার সামনেই মারা যান মিত্র বাহিনীর একজন সদস্য। আমি তাঁর মাথায় হাত রেখেছি। আবার এসএলআর দিয়ে শত্রুর দিকে গুলি ছুড়েছি। সহযোদ্ধার লাশ দ্রুত সরিয়ে নিতে সহযোগিতা করেছি। আমি, ভেকুটিয়ার আমিন, করচিয়ার হোসেন আলী মিত্র বাহিনীর গাড়িতে লাশ তুলে পুলের হাটে নিয়ে দাহ করেছি। মিত্র বাহিনীর পাঁচ সদস্যের লাশ দাহ করে ফের রণাঙ্গনে ছুটে গিয়েছি। ’


মন্তব্য