kalerkantho


‘বড় হুজুরের’ অনুমোদনে গুলশান হামলা!

► নব্য জেএমবির ‘আধ্যাত্মিক’ নেতা কাশেম গ্রেপ্তার, সাত দিনের রিমান্ডে
► অস্ত্র ও গ্রেনেড সরবরাহ করেন ‘বড় মিজান’
► অন্তত ৩০ জনের বিরুদ্ধে চার্জশিট হচ্ছে

এস এম আজাদ   

৪ মার্চ, ২০১৭ ০০:০০



‘বড় হুজুরের’ অনুমোদনে গুলশান হামলা!

গুলশান হামলার ঘটনায় গ্রেপ্তার জেএমবির আধ্যাত্মিক নেতা আবুল কাশেম

রাজধানীর গুলশানে হলি আর্টিজান বেকারিতে ভয়াবহ জঙ্গি হামলায় সরাসরি জড়িত ছিল নব্য জেএমবির ২০ থেকে ২২ জন সদস্য। তদন্তসংশ্লিষ্ট পুলিশ কর্মকর্তাদের দাবি, ওই জঙ্গি হামলার পরিকল্পনা ও বাস্তবায়নে পেছন থেকে সহায়তা করে আরো ১০-১৫ জন। তাদের মধ্যে অন্যতম মুফতি মাওলানা আবুল কাশেম (৬০) নব্য জেএমবির জঙ্গিদের ‘আধ্যাত্মিক’ নেতা। তিনি ‘বড় হুজুর’ হিসেবেও পরিচিতি পেয়েছেন। হলি আর্টিজানে হামলাসহ বেশ কয়েকটি হামলার অনুমোদন দেন তিনি। ‘ফতুয়া’ ও নিজস্ব ব্যাখ্যা দিয়ে জঙ্গিদের হামলায় উদ্বুদ্ধ করে তুলতেন কুড়িগ্রামের এই জঙ্গি। দিনাজপুরের একটি মাদরাসার সাবেক অধ্যক্ষ আবুল কাশেম এক বছরেরও বেশি সময় আত্মগোপনে ছিলেন। তাঁর মতোই গুলশান হামলার পেছনের আরেক কারিগর চাঁপাইনবাবগঞ্জের ষাটোর্ধ্ব ‘বড় মিজান’। হামলায় ব্যবহূত গ্রেনেড ও পিস্তল বড় মিজানের মাধ্যমে ঢাকায় নিয়ে আসা হয়েছিল। রাজধানীর বসুন্ধরায় তানভীর কাদেরীর বাসায় তামিম চৌধুরীর কাছে অস্ত্র পৌঁছানোর ব্যবস্থা করেছিলেন তিনিই।

এই দুজনকে গ্রেপ্তার করার পর ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) কাউন্টার টেররিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম (সিটিটিসি) ইউনিটের কর্মকর্তারা বলছেন, নেপথ্যের জঙ্গিদের শনাক্ত করে চলতি বছরের শেষ দিকে গুলশান হামলার চার্জশিট বা অভিযোগপত্র দাখিল করা হবে।

সিটিটিসি ইউনিটের কর্মকর্তারা জানান, রাজধানীর বনানী থেকে গত বুধবার বড় মিজানকে গ্রেপ্তার করার পর তথ্য মেলে পালিয়ে থাকা আবুল কাশেমের ব্যাপারে। সেই তথ্যের ভিত্তিতে গত বৃহস্পতিবার রাতে মিরপুরের সেনপাড়া পর্বতা এলাকা থেকে তাঁকে গ্রেপ্তার করা হয়। কল্যাণপুরের জাহাজবাড়িতে অভিযানের ঘটনায় দায়ের করা মামলায় গতকাল শুক্রবার তাঁকে আদালতে হাজির করে রিমান্ড (জিজ্ঞাসাবাদের জন্য হেফাজত) চাওয়া হয়। আদালত কাশেমের সাত দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন। অন্যদিকে দারুসসালাম থানায় দায়ের করা একটি অস্ত্র মামলায় বড় মিজানের ১০ দিনের রিমান্ড চেয়ে আবেদন করেছেন তদন্ত কর্মকর্তা। আগামীকাল রবিবার ওই আবেদনের ওপর শুনানির দিন ধার্য আছে।

সিটিটিসি ইউনিটের প্রধান মনিরুল ইসলাম গতকাল কালের কণ্ঠকে বলেন, হলি আর্টিজান হামলায় এখন পর্যন্ত ২০-২২ জনের সরাসরি সম্পৃক্ততার বিষয়ে পুলিশ নিশ্চিত হয়েছে। তাদের মধ্যে ১৪ জন নিহত হয়েছে। তবে জড়িত ব্যক্তির মোট সংখ্যা ৩০ থেকে ৩৫ জন হতে পারে। এখনো তদন্ত চলছে। তদন্ত শেষ করে এ বছরের শেষ দিকে চার্জশিট দেওয়া হবে।

এর আগে ডিএমপির মিডিয়া সেন্টারে এক সংবাদ সম্মেলনে মনিরুল ইসলাম বলেন, কাউন্টার টেররিজম ইউনিটের দুটি দল বৃহস্পতিবার রাত ১১টার দিকে রাজধানীর সেনপাড়া পর্বতা এলাকা থেকে মাওলানা কাশেমকে গ্রেপ্তার করে। প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে জানা গেছে, ২০১৩ সালে তামিম চৌধুরী ও মাওলানা মো. আবুল কাশেমের যৌথ প্রয়াসে বাংলাদেশে নব্য জেএমবির জঙ্গিবাদী কার্যক্রমের সূচনা হয়। এই জঙ্গি নেতা একসময় দিনাজপুরের রানীর বন্দর এলাকার একটি মাদরাসার প্রিন্সিপাল ছিলেন। অনেক আগে থেকেই তিনি ‘সপরিবারে’ পুরাতন জেএমবির সঙ্গে জড়িত ছিলেন। ২০০৯ সালে জেএমবির একাংশের আমির মাওলানা সাইদুর রহমান গ্রেপ্তার হওয়ার পর কাশেমই সংগঠনের ওই অংশের আমির হিসেবে দায়িত্ব পালন করে আসছিলেন। তামিম চৌধুরী ২০১৩ সালে কানাডা থেকে আসার পর রাজশাহীতে বৈঠক করেন। সেখানে কাশেমও উপস্থিত ছিলেন। তামিম চৌধুরী, মারজানসহ নব্য জেএমবির গুরুত্বপূর্ণ অনেক নেতাই কাশেমের অনুরক্ত ছিলেন। সাম্প্রতিক সময়ে গ্রেপ্তার জঙ্গিদের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে কাশেমকে গ্রেপ্তার করার চেষ্টা চলছিল বেশ কিছুদিন ধরেই।

মনিরুল ইসলাম জানান, গুলশান হামলার ‘অন্যতম পরিকল্পনাকারী’ জাহাঙ্গীর আলম ওরফে রাজীব গান্ধীকে চলতি বছর জানুয়ারিতে গ্রেপ্তার করার পর কাশেম সম্পর্কে ‘বিস্তারিত তথ্য’ পাওয়া যায়। তবে জাহাঙ্গীরের দেওয়া ঠিকানায় গিয়ে কাউকে পাওয়া যায়নি। গত বুধবার মো. মিজান ওরফে বড় মিজানকে গ্রেপ্তার করার পর কাশেমের অবস্থান সম্পর্কে ‘গুরুত্বপূর্ণ তথ্য’ আসে কাউন্টার টেররিজম ইউনিটের হাতে। মনিরুল বলেন, বৃহস্পতিবার রাত ১১টার দিকে মাওলানা আবুল কাশেমকে গ্রেপ্তার করা হয়। ওই সময় তিনি বিকাশের মাধ্যমে টাকা আনতে যাচ্ছিলেন। নব্য জেএমবির এ নেতাকে সংগঠনে সবাই ডাকে ‘বড় হুজুর’ বলে। তাঁর আরেক নাম শায়েখ আবু মোহাম্মদ আইমান হাফিজুল্লাহ। গ্রামের বাড়ি কুড়িগ্রামে। নামে-বেনামে ‘দাওলার আসল রূপ’, ‘জিহাদ কেন করবেন’, ‘ইসলামি বসন্ত’—এ রকম বহু জঙ্গিবাদী বই রয়েছে তাঁর। ‘আধ্যাত্মিক নেতা’ হিসেবে কাশেমই গুলশান হামলার ‘অনুমোদন দিয়েছিলেন’ বলে দাবি করেন মনিরুল ইসলাম।

গত বছরের ২৫ জুলাই রাজধানীর কল্যাণপুরে জাহাজ বিল্ডিংয়ে অভিযানে ৯ জঙ্গি নিহত হওয়ার ঘটনায় দায়ের করা মামলায় কাশেমকে গ্রেপ্তার দেখিয়েছে পুলিশ। গতকাল তাঁকে ঢাকা মহানগর হাকিম আদালতে হাজির করে ১০ দিনের রিমান্ড আবেদন করেন মামলার তদন্ত কর্মকর্তা সিটিটিসির পরিদর্শক জাহাঙ্গীর আলম। শুনানি শেষে ঢাকা মহানগর হাকিম সত্যব্রত শিকদার সাত দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন।

কাশেম-তামিম বৈঠক শেষেই নব্য জেএমবির পথচলা শুরু : সিটিটিসি ইউনিট সূত্রে জানা যায়, তরুণ সমাজকে জঙ্গিবাদে উদ্বুদ্ধ করতে মুফতি মাওলানা আবুল কাশেম একাধিক বই লিখেছেন। ২০০৫ সালের ১৭ আগস্ট দেশজুড়ে সিরিজ বোমা হামলার সময় জেএমবির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন তিনি। তবে সেই সময় তিনি বেশি আলোচনায় আসেননি। সূত্র মতে, কল্যাণপুরের জঙ্গি আস্তানায় পুলিশের অভিযানে নিহত আবদুল্লাহ জেএমবি নেতা তামিম চৌধুরীকে পরিচয় করিয়ে দেন বড় হুজুর কাশেমের সঙ্গে। কাশেমের সঙ্গে তামিম চৌধুরীর প্রথম বৈঠক হয় দিনাজপুরের রানীরবন্দরের অকড়াবাড়ী মাদরাসায়। কাশেমের কাছে তাঁর পরিকল্পনা জানান তামিম। এর পরই কাশেম সংগঠনের আধ্যাত্মিক নেতা হিসেবে যোগ দিতে রাজি হন। পরে তিনি পুরনো ও নব্য জেএমবির সদস্যদের মধ্যে যোগসূত্র স্থাপনেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন।

সিটিটিসি ইউনিট সূত্রের দাবি, ওই বৈঠকে কাশেমকে তামিম চৌধুরী বলেন, নতুন ধারায় তাঁরা জিহাদ শুরু করতে যাচ্ছেন। এ জন্য কিছু দক্ষ ও ত্যাগী নেতা-কর্মী দরকার। তিনি জেএমবির পুরনো নেতা সুলতান মাস্টার, সারোয়ার জাহান ওরফে মানিক ওরফে নয়ন, রিপনসহ অন্য নেতাদের তামিম চৌধুরীর সঙ্গে কাজ করার নির্দেশ দেন। এর পরই শুরু হয় নতুন ধারার জেএমবির পথচলা। একপর্যায়ে ঢাকায় এসেও বিভিন্ন ঘরোয়া বৈঠকে সংগঠনের নেতাদের উদ্দেশে বয়ান দিতে শুরু করেন শায়খ আবুল কাশেম। তাঁর কাজই ছিল জঙ্গিদের মগজধোলাই করতে বিভিন্ন প্রশিক্ষণ সেন্টারে বয়ান দেওয়া। গাইবান্ধার চরাঞ্চলে জঙ্গিদের যে প্রশিক্ষণকেন্দ্র ছিল, সেখানেও তিনি নতুন জঙ্গিদের কয়েক দফা বয়ান দিয়েছিলেন।

সিটিটিসি ইউনিটের প্রধান মনিরুল ইসলাম জানান, জেএমবির শীর্ষ নেতা মাওলানা সাইদুর রহমান ২০১০ সালে গ্রেপ্তার হন। এরপর কাশেম জেএমবির বিদ্রোহী অংশের (নব্য জেএমবি) আমির হিসেবে দায়িত্ব পালন করে আসছিলেন। তিনি তাঁর নিজস্ব মনগড়া ধর্মীয় মতবাদ দিয়ে নব্য জেএমবিকে হিংস্র করে তোলেন।

আমাদের দিনাজপুর প্রতিনিধি জানান, কাশেম দিনাজপুরের চিরিরবন্দর উপজেলার সাইতাড়া ইউনিয়নের অকড়াবাড়ী হামিদিয়া ইসলামিয়া মাদরাসায় বছরখানেক আগে অধ্যক্ষ হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছিলেন। তখন সময় ওই এলাকায় জঙ্গি সংগ্রহের চেষ্টা চালিয়েছিলেন তিনি। অকড়াবাড়ী হামিদিয়া ইসলামিয়া মাদরাসার অধ্যক্ষ আবদুল খালেক বলেন, ‘মাদরাসার প্রধান দায়িত্বে (অধ্যক্ষ পদে) থাকলেও শায়খ আবুল কাশেম সম্পর্কে কোনো তথ্য সংরক্ষিত নেই মাদরাসার নথিতে। শুধু শিক্ষার্থী হাজিরা খাতা রেখে অন্যান্য নথি ধ্বংস করে পালিয়েছেন তিনি। পুলিশি অভিযানের পর মাদরাসায় তৃতীয়, পঞ্চম ও ষষ্ঠ শ্রেণিতে পড়ুয়া তাঁর তিন ছেলেও পালিয়ে গেছে। ’

অস্ত্র সরবরাহ করেন বড় মিজান : সিটিটিসি ইউনিটের একাধিক সূত্রে জানা যায়, গত বছরের ২ নভেম্বর রাজধানীর গাবতলী বাস টার্মিনাল থেকে নব্য জেএমবির সদস্য মিজানুর রহমান, তৌফিকুল ইসলাম, আবু তাহের ও সেলিম মিয়াকে গ্রেপ্তার করে সিটিটিসি ইউনিট। তাদের কাছ থেকে হ্যান্ড গ্রেনেডের ৭৮৭টি ডেটোনেটর এবং একটি নাইন এমএম পিস্তল উদ্ধার করা হয়। চারজনকে জিজ্ঞাসাবাদ করে পুলিশ কর্মকর্তারা তথ্য পান, নব্য জেএমবির ভারতে থাকা সদস্যরাই অস্ত্র পাঠাচ্ছে। এ দেশে জঙ্গি আস্তানায় এগুলো পৌঁছে দিচ্ছে গাইবান্ধার বড় মিজানুর রহমান ওরফে বড় মিজান, মিজানুর ওরফে ছোট মিজান, জয়পুরহাটের জঙ্গি সাগর এবং ভারত থেকে ফেরত আসা সোহেল মাহফুজ ওরফে ভাগিনা মাহফুজ, অপারেশনাল কমান্ডার নুরুল ইসলাম মারজান, রাজীব গান্ধী ওরফে আদিল, দুই মিজানের সহযোগী রবিউল, জেল্টু ও লাল্টু। ওই অভিযানে এক মিজান ধরা পড়লেও পড়ে জানা যায় সে দুই মিজানের কেউ নয়। ভারতের জাতীয় তদন্ত সংস্থা এনআইএর বরাত দিয়ে সে দেশের গণমাধ্যমের খবরে বলা হয়, হলি আর্টিজান বেকারিতে হামলাকারীরা যে একে-২২ রাইফেল ব্যবহার করেছিল, তা পশ্চিমবঙ্গের মালদহ জেলায় তৈরি করা হয়। চাঁপাইনবাবগঞ্জ সীমান্ত হয়ে অস্ত্রগুলো বাংলাদেশে পাঠানো হয়েছিল।

সিটিটিসি ইউনিটের প্রধান মনিরুল ইসলাম সম্প্রতি বলেন, গুলশান হামলায় ব্যবহূত একে-২২ রাইফেলের একটি চালান চাঁপাইনবাবগঞ্জ সীমান্ত হয়ে গত বছরের জুন মাসে দেশে আসে। সেখান থেকে ট্রাকে কয়েক দফায় অস্ত্রের চালান ঢাকায় পাঠানো হয়। হামলায় ব্যবহূত অস্ত্র ও বোমার অন্যতম সরবরাহকারী বড় মিজান ও সোহেল মাহফুজ। অস্ত্র আনার ক্ষেত্রে নব্য জেএমবির সদস্য মারজান গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।


মন্তব্য