kalerkantho


চাপের মুখে নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়

উগ্রপন্থী শিক্ষকদের মদদেই কিছু শিক্ষার্থী জঙ্গিবাদে

নিজস্ব প্রতিবেদক   

৪ মার্চ, ২০১৭ ০০:০০



উগ্রপন্থী শিক্ষকদের মদদেই কিছু শিক্ষার্থী জঙ্গিবাদে

বসুন্ধরা আবাসিক এলাকাজুড়ে গতকালও ছিল নিরাপত্তা বাহিনীর সতর্ক প্রহরা। ছবি : কালের কণ্ঠ

জঙ্গিবাদের ঘাঁটি হিসেবে পরিচিতি পাওয়া বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় নর্থ সাউথের অনেক শিক্ষক ও ছাত্র জঙ্গি সংগঠনের সঙ্গে জড়িত—এমন তথ্যের ভিত্তিতে এই বিশ্ববিদ্যালয়ে গোয়েন্দা নজরদারি বাড়ানো হয়েছে। ব্লগার রাজীব হায়দার হত্যা, গুলশানের হলি আর্টিজান বেকারিতে হামলাসহ বেশ কয়েকটি চাঞ্চল্যকর ঘটনায় এই বিশ্ববিদ্যালয়ের কয়েকজন ছাত্র-শিক্ষকের জড়িত থাকার প্রমাণ মেলে। এসব ঘটনার পর বসুন্ধরা আবাসিক এলাকায় নিরাপত্তা জোরদার ও সন্দেহভাজনদের নজরদারির আওতায় আনা হয়। গ্রেপ্তার হয়েছে অনেক জঙ্গি ও জঙ্গির সহযোগী। প্রশাসনের এসব উদ্যোগে সব ধরনের সহায়তা করেছে রাজধানীর শান্তিপূর্ণ অভিজাত আবাসিক এলাকা বসুন্ধরা কর্তৃপক্ষ। এসব কারণেই জঙ্গিবাদের কেন্দ্র নর্থ সাউথের একটি গোষ্ঠী কোনো প্রকার উসকানি ছাড়া পরিকল্পিতভাবে বসুন্ধরায় তাণ্ডব চালিয়েছে। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে এমনই সন্দেহ করা হচ্ছে। আর এসব বিষয় খতিয়ে দেখছেন পুলিশ, র‌্যাব ও গোয়েন্দা সংস্থার কর্মকর্তারা।

বসুন্ধরা আবাসিক এলাকায় ব্যাংক, রেস্টুরেন্ট, এটিএম বুথসহ বিভিন্ন বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানে নারকীয় হামলা ও লুটপাটে অংশগ্রহণকারী এবং নেপথ্য মদদদাতাদের খুঁজে বের করতে ইতিমধ্যে কাজ শুরু করেছে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। তদন্তের বিভিন্ন কৌশলের পাশাপাশি তারা সহায়তা নিচ্ছে ভিডিও ফুটেজের। গত বুধবার মধ্য রাতে এ্যাপোলো হসপিটালের পার্শ্ববর্তী গেটে আনসার সদস্যদের সঙ্গে নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটির ছাত্র শাহরিয়ার হাসনাত তপুর হাতাহাতির ঘটনা থেকে শুরু করে বৃহস্পতিবার দিনভর দফায় দফায় হামলার ভিডিও সংগ্রহ করা হচ্ছে।

সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা জানিয়েছেন, শত শত ছাত্র ও বহিরাগত বাঁশ, রড, লাঠি হাতে বসুন্ধরায় অফিস ও বাড়িতে হামলা চালালেও নর্থ সাউথ কর্তৃপক্ষ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে কোনো ভূমিকাই রাখেনি। এই বিশ্ববিদ্যালয়ে জঙ্গিবাদের আস্তানা নির্মূল করতে বসুন্ধরা আবাসিক এলাকার কর্তৃপক্ষ তাদের যেসব সহায়তা করেছে তা উল্টো বিপদের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

গোয়েন্দা সূত্রে জানা গেছে, নর্থ সাউথের উদ্যোক্তাদের মধ্যে ছিলেন জামায়াতের নীতিনির্ধারক সাবেক সচিব শাহ আবদুল হান্নান ও বিতর্কিত ব্যবসায়ী রাগীব আলী। আর এসবের সঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয়টিতে প্রথম থেকেই জামায়াত মতাদর্শিক শিক্ষকদের নিয়োগ দিয়ে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা করা হয়। দেশের শীর্ষ ধনীদের সন্তানরা এখানে পড়তে এসে জঙ্গিবাদের খপ্পরে পড়ে। ফলে কিছু শিক্ষার্থী জঙ্গিবাদের জালে জড়িয়ে পড়ে।

জঙ্গিসংশ্লিষ্টতার ঘটনায় আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সঙ্গে বন্দুকযুদ্ধে এ পর্যন্ত নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটির পাঁচ ছাত্র নিহত হয়েছে। এ ছাড়া আটক হয়েছে দেড় ডজনেরও বেশি শিক্ষার্থী। ব্লগার রাজীব হায়দার হত্যা মামালায় আদালত দুজনের ফাঁসি ও অন্য চারজনের বিভিন্ন মেয়াদে দণ্ড দেন। তারা বর্তমানে কারাগারে আটক রয়েছে। এ ছাড়া হিযবুত তাহ্রীরের সঙ্গে সংশ্লিষ্টতার অভিযোগে এ বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঁচ শিক্ষককে চাকরিচ্যুত করা হয়। গুলশানের হলি আর্টিজান হামলার সন্দেহভাজন হিসেবে আটক হন সাবেক শিক্ষক হাসনাত করিম। এ ছাড়া জঙ্গিদের আশ্রয়-প্রশ্রয় দেওয়ায় ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে এক ডজন শিক্ষকের বিরুদ্ধে, জঙ্গি হামলার পরিকল্পনায় জড়িত অভিযোগে পাঁচ শিক্ষক গ্রেপ্তারও হয়েছেন। হলি আর্টিজান হামলার পরিকল্পনাও হয় এ বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রোভিসি গিয়াসউদ্দিন আহসানের বাসভবনেই। পুলিশের তদন্তে তা বেরিয়ে আসে।

এমনকি যুদ্ধাপরাধী গোলাম আযম ও মতিউর রহমান নিজামীর ছেলে চাকরি করতেন এই নর্থ সাউথেই। জাতীয় ও আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে বিভিন্ন সময়ে জঙ্গিবাদে নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটির সম্পৃক্ততা নিয়ে সংবাদ পরিবেশন হয়েছে। মালয়েশিয়ার মোনাশ ইউনিভার্সিটির জঙ্গি সম্পৃক্ততার অভিযোগে যাঁরা আটক হয়েছিল তাদের অধিকাংশই নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটির ছাত্র। এর মধ্যে অনেকের ফেসবুক স্টাটাস পরীক্ষা করে দেখা গেছে, ধর্মীয় উসকানি সৃষ্টি করার মতো নানা বক্তব্য। আইন প্রয়োগকারী সংস্থা তাদের বিষয়ে খোঁজখবর রাখছে।

ঢাকা মহানগর পুলিশের গুলশান বিভাগের উপকমিশনার মোস্তাক আহমেদ বলেন, পুরো ঘটনাটি তদন্তের ক্ষেত্রে সম্ভাব্য সব দিক বিবেচনা করা হচ্ছে। তদন্তের ক্ষেত্রে আমরা প্রযুক্তির সহায়তা নেব। বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের সিসিটিভি ক্যামেরার ফুটেজ সংগ্রহ করা হচ্ছে। ফুটেজ বিশ্লেষণ করে প্রকৃত অপরাধীদের খুঁজে বের করা হবে।

জানা গেছে, বুধবার রাতে শিক্ষার্থী তপু ও এক আনসার সদস্যের মধ্যে মারামারিতে দুজনই সামান্য আহত হন। এই তুচ্ছ ঘটনাকে পুঁজি করে নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটির শিক্ষার্থীদের উসকানি দেয় একটি মহল। প্রকৃত ঘটনাকে অতিরঞ্জিত করে তারা সাধারণ ছাত্রদের খেপিয়ে তোলে। ফেসবুকে একাধিক পেজ খুলে তারা সাধারণ ছাত্রছাত্রীদের উসকানি দিতে থাকে। আহত তপুর শারীরিক অবস্থাকে সংকটাপন্ন বলে অপপ্রচার চালানো হয় ফেসবুক পেজের স্ট্যাটাসের মাধ্যমে। উসকানিদাতাদের কয়েকজন ভিডিও কলের মাধ্যমে উৎসাহ দিয়েছে অন্যদের। ফেসবুক পেজের নির্দেশনামূলক স্ট্যাটাসগুলো ছিল অনেকটা যুদ্ধপ্রস্তুতির মতো। প্রশিক্ষিত যোদ্ধা ও প্রশিক্ষকরাই সাধারণত তাদের সহযোদ্ধাদের এ ধরনের নির্দেশনামূলক বক্তব্য দিয়ে থাকে বলে মন্তব্য করেছেন অনেক নিরাপত্তা বিশ্লেষক। একটি ফুটেজে দেখা যায়, সমবেত ছাত্রদের উত্তেজিত করে তুলতে এক যুবক বক্তব্য দিচ্ছে। অনেকের মুখ ছিল কালো কাপড় দিয়ে ঢাকা। এ সময় অংশ নেওয়া এক যুবককে বলতে শোনা যায়, ‘রক্ত কি খেলে না? কতক্ষণ আর আমরা চুপ করে থাকব। ’ প্রত্যুত্তরে কয়েকজন বলতে থাকে, ‘অবশ্যই’...। ফেসবুকে আপলোড করা বেশ কিছু পোস্ট পরে মুছে ফেলে ওই দুর্বৃত্তরা। সেখানেই তারা বলতে থাকে, ‘নিরাপত্তার স্বার্থে এগুলো মুছে ফেলা জরুরি। ’

বসুন্ধরা করপোরেট অফিসের নিচতলায় একটি ভিডিও ফুটেজে দেখা যায়, অজ্ঞাতপরিচয় এক যুবক হামলা চালিয়ে অফিসে ভাঙচুরের পর ডেস্কে পড়ে থাকা মোবাইল ফোনসেট এবং তিনটি ব্লেজারসহ কিছু সরঞ্জাম নিয়ে যাচ্ছে। তদন্তসংশ্লিষ্ট এক কর্মকর্তা বলছেন, ফেসবুক পেজে ভিডিও বক্তব্য দেওয়া শাহজাদাসহ সন্দেহভাজনদের ব্যক্তিগত প্রোফাইল ঘেঁটে দেখা হচ্ছে। নজরদারিতে রাখা হচ্ছে সন্দেহভাজনদের গতিবিধি।

র‌্যাবের আইন ও গণমাধ্যম শাখার পরিচালক কমান্ডার মুফতি মাহ্মুদ খান বলেন, জননিরাপত্তা বিঘ্ন হয় এমন কোনো কাজ করতে দেওয়া হবে না। গত বুধবার থেকে বৃহস্পতিবার দিনভর বসুন্ধরা আবাসিক এলাকার বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে যারা তাণ্ডব চালিয়েছে তাদের খুঁজে বের করা হবে।

একাধিক গোয়েন্দা সূত্র জানায়, ব্লগার রাজীব হায়দার খুনের পর নর্থ সাউথ ব্যাপক আলোচনায় আসে। তাদের বেশ কিছু ছাত্র ও শিক্ষককে নজরদারিতে নেওয়া হয়। হলি আর্টিজানে হামলার পরও ঘটে একই ঘটনা। পুলিশ এই বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রসহ অনেকের সংশ্লিষ্টতা খুঁজে পায়। এ বিশ্ববিদ্যালয়ের কাছে নিহত জঙ্গি তানভীর কাদরীর বাসায় বৈঠক, নব্য জেএমবি নেতা তামিম চৌধুরীর সঙ্গে যোগাযোগের কারণে বেশ কিছু শিক্ষার্থীকে শনাক্ত করা হয়। এসব কারণে বসুন্ধরা আসাসিক এলাকায় অভিযান ও তল্লাশি চালানো হয়। কর্তৃপক্ষকে তল্লাশি, গেট বন্ধ রাখা এবং পরিচয় যাচাইসহ বেশ কিছু নির্দেশনা দেয় পুলিশ। বসুন্ধরা প্রশাসনকে এসব কাজে সহায়তা করে। এর ফলে নর্থ সাউথে জড়িয়ে পড়া অনেক জঙ্গি ঝুঁকির মধ্যে পড়ে। এতে ক্ষিপ্ত হয়ে কিছু জঙ্গি বসুন্ধরায় হামলায় অংশ নিয়েছে বলে ধারণা করছেন গোয়েন্দারা।

একটি সূত্র জানায়, নর্থ সাউথ গোপনে অনেক ছাত্রকে বহিষ্কার করেছে। অনেক শিক্ষক তাদের পৃষ্ঠপোষক। বৃহস্পতিবার সংঘাতময় পরিস্থিতির পরও বিশ্ববিদ্যালয়টি বন্ধ ঘোষণা করেনি কর্তৃপক্ষ। একটি আবাসিক এলাকায় এ ধরনের ঘটনা অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। এ বিষয়ে কর্তৃপক্ষের আচরণও সন্দেহজনক।

সূত্রগুলো বলছে, বুধবার রাতে কথিত ছাত্ররা প্রথম দফায় তাণ্ডব চালানোর পর বৃহস্পতিবার ফের হামলা রহস্যজনক। সেখানে ছাত্ররা বেপরোয়াভাবে অংশ নিলেও কর্তৃপক্ষ তাদের ঠেকানোর কোনো ব্যবস্থাই নেয়নি।

অনেক ঘটনায় নর্থ সাউথের জঙ্গিরা : জানা গেছে, ২০১৩ সালের ১০ মার্চ ব্লগার রাজীব হায়দার হত্যার ঘটনায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেয় নর্থ সাউথের পাঁচ শিক্ষার্থী। তারা জানায়, বিশ্ববিদ্যালয়ের বড় ভাই রেদোয়ানুল আজাদ রানা ও সাদমানের নির্দেশনায় তারা রাজীব হায়দারকে হত্যা করে। এই রানারের নির্দেশেই ২০১৫ সালের ২৬ ফেব্রুয়ারি বিজ্ঞানমনস্ক লেখক অভিজিৎ রায়কে খুন করা হয়, একই বছরের ৩০ মার্চ তেজগাঁওয়ে ওয়াশিকুর রহমান বাবু, ১২ মে সিলেটে ব্লগার অনন্ত বিজয় দাস, ৭ আগস্ট গোড়ানে ব্লগার নিলাদ্রী নিলয় এবং ৩১ আগস্ট শাহবাগে ব্লগার ফয়সল আরেফিন দীপনকে হত্যা করা হয়। ২০১৬ সালের ২৫ মার্চ কলাবাগানে বাসায় ঢুকে জুলহাস মান্নান ও তন্ময়কে হত্যা করা হয়। ২০১৬ সালের ৬ এপ্রিল ব্লগার নাজিমকে হত্যা করা হয়। সব হত্যাকাণ্ডের তদন্তে পরিকল্পনাকারী হিসেবে বেরিয়ে আসে রানার নাম। ব্লগার হত্যা মামলার আট আসামির মধ্যে সাতজনই নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র। এর মধ্যে রেদোয়ানুল হক রানাকে গ্রেপ্তার করা হয় গত ২০ ফেব্রুয়ারি। ফাঁসির দণ্ডাদেশপ্রাপ্ত রানা খুন করেই মালয়েশিয়ায় পাড়ি জমায়। সেখান থেকে তাকে আটক করে দেশে ফেরত পাঠানো হয়। রানা ছাড়াও নর্থ সাউথের আরো ১১ জনকে সাম্প্রতিক জঙ্গি হামলায় জড়িত হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। হলি আর্টিজানের ঘটনায় নিহত জঙ্গি নিবরাস ইসলাম ছিল নর্থ সাউথের ছাত্র। শোলাকিয়ায় হামলাকারী আবির ছিল একই বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী। পুলিশের সঙ্গে গুলিবিনিময়ে সে নিহত হয়। গুলশান ঘটনার পরপরই বাংলাদেশে আরো জঙ্গি হামলার হুমকি দিয়ে একটি ভিডিও বার্তা প্রকাশ করে তিন তরুণ, যার মধ্যে সস্ত্রীক তুরস্কে পাড়ি জমানো তাহমিদও ছিলেন নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র।

২০১৪ সালে কাজী মোহাম্মদ রেজওয়ানুল আহসান নাফিস নামে যে যুবক নিউ ইয়র্কে বোমা হামলা পরিকল্পনার অভিযোগে ধরা পড়েছিল, সেও নর্থ সাউথের ছাত্র ছিল। গুলশান হামলার মধ্য দিয়ে আবারও সামনে আসে এ বিশ্ববিদ্যালয়ের নাম। ওই ঘটনার পর আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হাতে আটক হওয়া ও বর্তমানে জামিনে থাকা অন্যতম সন্দেহভাজন প্রকৌশলী হাসনাত রেজাও নর্থ সাউথের সাবেক শিক্ষক। যাঁকে নিষিদ্ধ সংগঠন হিজবুত তাহ্রীরের কর্মকাণ্ড পরিচালনার অভিযোগে ২০১২ সালে অন্য তিন শিক্ষকের সঙ্গে অব্যাহতি দেওয়া হয়।

কল্যাণপুরে জঙ্গি আস্তানায় আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী অভিযান চালালে ৯ জঙ্গি নিহত হয়। তাদের মধ্যে তিনজনই নর্থ সাউথের। তারা হলো তাজ উল হক রাসিক, আকিফুজ্জামান খান, সেজাত রউফ অর্ক। এই জঙ্গিরা নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটিতে বিশাল নেটওয়ার্ক তৈরি করেছিল। নর্থ সাউথের এক ডজনেরও বেশি শিক্ষক জঙ্গিদের প্রশিক্ষণের সঙ্গে জড়িত ছিলেন। এর বাইরেও আরো ১০ শিক্ষক ছিলেন, যাঁদের প্রত্যেকেই পাকিস্তানি। ইউজিসির নির্দেশে পরে তাঁদের নর্থ সাউথ থেকে বের করে দেওয়া হয়। ইউজিসির তদন্তকারীরা তাঁদের কোনো বৈধ কাগজপত্রও খুঁজে পাননি।

২০১৫ সালে বিশ্ববিদ্যালয়টির লাইব্রেরি থেকে নিষিদ্ধ ঘোষিত হিযবুত তাহ্রীরের জঙ্গিবাদী বইপত্র পায় ইউজিসির একটি তদন্তদল।

জঙ্গিবাদের গোড়ায় অনেক শিক্ষক : নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটিতে শিক্ষক হিসেবে কর্মরত ছিলেন জামায়াতে ইসলামীর সাবেক আমির গোলাম আযম ও মতিউর রহমান নিজামীর সন্তানরা।

জানা গেছে, গোলাম আযমের বড় ছেলে আব্দুল্লা হিল আমান আযমী নর্থ সাউথের খণ্ডকালীন শিক্ষক ও আরেক ছেলে সাদমান আযমী ইংরেজি বিভাগের শিক্ষক ছিলেন। মতিউর রহমান নিজামীর ছেলে নাদিম তালহা নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটির শিক্ষক ছিলেন। বর্তমানে তিনি ডক্টরেট করতে বিদেশে রয়েছেন।

গুলশানে জঙ্গি হামলার ঘটনায় আটক নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটির সাবেক শিক্ষক ও হলি আর্টিজান ঘটনায় জড়িত সন্দেহভাজন হাসনাত করিমের কাছ থেকে এ তথ্য পেয়েছে পুলিশ। পরে বিশ্ববিদ্যালয় ওই শিক্ষকদের পদত্যাগে বাধ্য করে। গোয়েন্দাদের তদন্তে বেরিয়ে আসে নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটিতে হিযবুত তাহ্রীরের প্রধান পৃষ্ঠপোষক ছিলেন তাঁরা।

বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্যোক্তাদের মধ্যে ছিলেন জামায়াতের নীতিনির্ধারক সাবেক সচিব শাহ আবদুল হান্নান ও বিতর্কিত ব্যবসায়ী রাগীব আলী।

জানা গেছে, জঙ্গিবাদের উত্থানে ভূমিকা রাখতে যুক্তরাষ্ট্রপ্রবাসী ড. মঞ্জুরুল হককে খণ্ডকালীন শিক্ষক হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়েছিল। জঙ্গি কার্যক্রম অব্যাহত রাখতে ভারপ্রাপ্ত উপাচার্য ড. মঞ্জুরুল হক, কয়েকজন শিক্ষক ও পরিচালনা পরিষদের সদস্যদের নিয়ে কর্মকাণ্ড পরিচালনা করেন। জামায়াতি মতাদর্শের আরেক প্রভাবশালী শিক্ষক ড. গোলাম মোহাম্মদও এখানে শিক্ষক ছিলেন। সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক হাফেজ জি এ সিদ্দিকী রাজনৈতিকভাবে জামায়াত মতাদর্শে বিশ্বাসী। জামায়াত অনুসারী সাবেক সচিব শাহ আবদুল হান্নান ও বিতর্কিত ব্যবসায়ী রাগীব আলীর কারণেই এনএসইউতে জঙ্গিবাদী ভাবধারার শিক্ষকরা প্রবেশ করার সুযোগ পান।

জানা গেছে, বিভিন্ন সময় জঙ্গিবাদের মদদদাতা হিসেবে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বহিষ্কৃত নর্থ সাউথের মসজিদের খতিব ও ইমামরা হলেন মাওলানা দেলোয়ার হোসেন, মাওলানা হারুনুর রশিদ ও মাওলানা জিয়াউর রহমান।

গত বছর হলি আর্টিজানের হামলার পর এ বিশ্ববিদ্যালয়ের স্কুল অব লাইফ সায়েন্স অনুষদের ডিন গিয়াস উদ্দিন আহসানকে (জি ইউ আহসান) আটকের পর বহিষ্কার করা হয়। এ ছাড়া সে সময় প্রতিষ্ঠানটির লাইব্রেরিয়ান ড. মোস্তাফিজুর রহমানকেও বহিষ্কার করা হয়। ওই একই সময় দুজন শিক্ষককে এবং একজন কর্মকর্তাকে ফোর্সড রিজাইন করানো হয়। তাঁরা হলেন কম্পিউটার সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের চেয়ারম্যান ড. আব্দুল আউয়াল, ওই বিভাগের শিক্ষক ড. আবুল এল হক এবং প্রশাসনিক কর্মকর্তা গোলাম জলিল। সন্দেহভাজন শিক্ষকদের বেশির ভাগই যোগ দেন ২০০১ থেকে ২০০৬ সালের মধ্যে। সে সময় কম্পিউটার সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের শিক্ষক ড. আতাউর রহমান এবং বিজনেস অনুষদের অধ্যাপক মাহবুব রহমান ও একই বিভাগের শিক্ষক হান্নান মিয়া, ড. জসিম উদ্দিন আহমেদসহ আরো প্রায় এক ডজন শিক্ষককে সন্দেহের তালিকায় রাখা হয়েছিল। এসব শিক্ষকের বিরুদ্ধে জঙ্গিবাদ উত্থানে ভূমিকা ও রাষ্ট্রবিরোধী তত্পরতায় লিপ্ত থাকার অভিযোগ ওঠে। কিন্তু কর্তৃপক্ষ এসব শিক্ষকের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থাই নেয়নি।

একটি বিভাগকে ঘিরেই রহস্য : জানা গেছে, এনএসইউয়ের যেসব শিক্ষার্থী জঙ্গিবাদের সঙ্গে যুক্ত তাদের বেশির ভাগই বিশ্ববিদ্যালয়ের কম্পিউটার সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের ছাত্র। এ বিভাগের কিছু শিক্ষকের বিরুদ্ধে জঙ্গিবাদে মদদের অভিযোগ রয়েছে। ২০১২ সালে যুক্তরাষ্ট্রের নিউ ইয়র্কের ফেডারেল রিজার্ভ ব্যাংকে নাশকতাচেষ্টার অভিযোগে গ্রেপ্তার হন বাংলাদেশি তরুণ কাজী রেজওয়ানুল আহসান নাফিস। এরপর ২০১৩ সালের ১৪ ফেব্রুয়ারি ব্লগার রাজীব হায়দারকে হত্যা করা হয়। এ হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত নর্থ সাউথের পাঁচ তরুণের মধ্যে চারজন ফয়সাল বিন নাইম, মাকসুদুল হাসান অনিক, এহসান রেজা রুম্মান ও নাইম শিকদার ইরাদ এ বিশ্ববিদ্যালয়ের কম্পিউটার সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের শিক্ষার্থী। নাফিসও ছিল একই বিভাগের শিক্ষার্থী।

কম্পিউটার সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের শিক্ষার্থীদের জঙ্গিবাদের সঙ্গে জড়িয়ে পড়ার অন্যতম কারণ ছিল এ বিভাগের সাবেক চেয়ারম্যান ড. আব্দুল আউয়াল। জঙ্গিবাদের সঙ্গে সম্পৃক্ত থাকার অভিযোগে গত বছর বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ তাঁকে ফোর্সড রিজাইন করায়। সাবেক এই বিভাগীয় প্রধান শিক্ষার্থীদের মগজ ধোলাই করছেন। তাঁর কারণেই শিক্ষার্থীরা ঝুঁকছে জঙ্গিবাদের দিকে।

জানা গেছে, ড. আব্দুল আউয়াল নর্থ সাউথে শিক্ষক হিসেবে যোগদানের আগে দীর্ঘদিন যুক্তরাষ্ট্র, ব্রিটেন ও সৌদি আরবে ছিলেন। এ সময় থেকেই তিনি বিভিন্ন ধর্মীয় উগ্র গোষ্ঠীর সঙ্গে যুক্ত হন। ২০০১ সাল পর্যন্ত তিনি যুক্তরাষ্ট্রে ছিলেন। এ সময় তিনি দেশটির বেল ল্যাবরেটিতে কাজ করার পাশাপাশি উগ্র ধর্মীয় গোষ্ঠীর সঙ্গে যুক্ত হন।   সে সময় তিনি মুসলিম ঐতিহ্যের নামে সেখানে বসবাসরত মুসলামানদের ভেতর জঙ্গিবাদ উসকে দেওয়ার কাজ করেছেন। ১৯৯০ থেকে ১৯৯২ সাল পর্যন্ত তিনি ব্রিটেনের ইউনিভার্সিটি অব ব্রাডফোর্ডে ভিজিটিং প্রফেসর হিসেবে শিক্ষকতা করেছেন। ব্রিটেনের এ বিশ্ববিদ্যালয় পাকিস্তানভিত্তিক জঙ্গিবাদী গোষ্ঠীর অন্যতম নেটওয়ার্ক হিসেবে পরিচিত।

সূত্র জানায়, যুক্তরাষ্ট্র থেকে ২০০১ সালে দেশে ফিরে ড. আব্দুল আউয়াল নর্থ সাউথে যোগ দেন। এরপর তিনি সচ্ছল পরিবার থেকে আসা শিক্ষার্থীদের মগজ ধোলাই শুরু করেন। ২০০৭ থেকে ২০০৯ সাল পর্যন্ত সৌদি আরবের তাইবাহ ইউনিভার্সিটি ও মদিনা মুনাব্বিরা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভিজিটিং প্রফেসর হিসেবে কাজ করেন তিনি। ঢাকার একটি সূত্র নিশ্চিত করেছে, বাংলাদেশের কোনো শিক্ষার্থীর মদিনা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হতে হলে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর অনুমতিপত্র এবং দলটির সুপারিশের দরকার হয়। বাংলাদেশের কোনো শিক্ষক মদিনা বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করতে চাইলে তাঁর ক্ষেত্রেও একই নিয়ম প্রযোজ্য।

জানা যায়, সৌদি আরবের দুটি বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিজিটিং প্রফেসর হিসেবে কর্মরত থাকার সময় ড. আব্দুল আউয়ালের তত্ত্বাবধানে দুটি প্রজেক্ট সম্পন্ন হয়েছে। এ দুটি প্রজেক্টই আল-রাজি ব্যাংকের ই-কমার্স ও ফিন্যানশিয়াল সার্ভিস ডেভেলপমেন্ট এবং মদিনা ইসলামিক ইউনিভার্সিটির ডিসট্যান্স লার্নিং নেটওয়ার্ক ডেভেলপমেন্ট। আল-রাজি ব্যাংকের সঙ্গে জামায়াতে ইসলামীর গভীর সম্পর্ক রয়েছে।

সূত্র জানায়, সৌদি আরবের ক্ষমতাধর এই দুই ব্যক্তির নিবিড় তত্ত্বাবধানে সৌদি আরবে ভিজিটিং প্রফেসর হিসেবে মদিনা বিশ্ববিদ্যালয় ও  তাইবাহ ইউনিভার্সিটিতে শিক্ষকতা করেছেন ড. আব্দুল আউয়াল।

জানা গেছে, কৌশলে নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ে শুধু জঙ্গিবাদের উত্থান ঘটাতে আবদুল আউয়াল ভূমিকা রাখেননি—তিনি বাংলাদেশ সরকারের গুরুত্বপূর্ণ বিভিন্ন স্থানে ঢুকে পড়েন। নেটওয়ার্ক বিষয়ে পারদর্শী ড. আব্দুল আউয়াল দেশের সরকারি বেশির ভাগ টেলিকমিউনিকেশন কাজে যুক্ত রয়েছেন। বাংলাদেশ টেলিকম রেগুলেটরি কমিশনের (বিটিআরসি) বিশেষজ্ঞ, টেলিযোগাযোগ পলিসির অন্যতম প্রণেতা, সুপ্রিম কোর্ট ও  জেলা জজ আদালতের ওয়েব পেজ পরামর্শক, সাবমেরিন কেবল নেটওয়ার্ক, গ্রামীণফোনের ইন্টারনেট প্রজেক্ট, বাংলাদেশ লোকপ্রশাসন কেন্দ্রসহ (পিএটিসি) সরকারের তথ্য-প্রযুক্তিবিষয়ক অনেক খাত রয়েছে, তার প্রায় সব কটিতেই তিনি সংশ্লিষ্ট। ফলে প্রশ্ন উঠেছে সরকারের অন্য তথ্যভাণ্ডারের নিরাপত্তা নিয়েও।

ইউজিসির তদন্তে মিলেছে জঙ্গি প্রমাণ : এনএসইউর বিরুদ্ধে জঙ্গিবাদ উত্থানের ব্যাপক অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের (ইউজিসি) একটি তদন্ত দল গত বছরের ১৪ জুলাই সরেজমিন বিশ্ববিদ্যালয়টিতে যায়। সেখানকার লাইব্রেরিতে নিষিদ্ধ হিযবুত তাহ্রীর বেশ কিছু বই ইউজিসির তদন্ত দল দেখতে পায়। এনএসইউকে লিখিত স্টাম্পে এ ধরনের জঙ্গিবাদী বই রাখা যাবে না—এমন শর্তে তখন ক্ষমা করে ইউজিসি।

এসব বিষয়ে জানতে গতকাল শুক্রবারে রাতে দফায় দফায় এনএসইউ ভিসি অধ্যাপক আতিকুল ইসলামের মোবাইলে ফোন করা হলেও তিনি ফোন ধরেননি। তবে এ বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের জনসংযোগ বিভাগের উপপরিচালক বেলাল আহমেদ বলেন, আজ (শুক্রবার) পর্যন্ত এনএসইউ বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছিল। নতুন ঘোষণা অনুযায়ী, আগামীকাল (শনিবার) পর্যন্ত বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে।

বিশ্ববিদ্যালয়ের কিছু শিক্ষার্থী ও শিক্ষকের বিরুদ্ধে জঙ্গিবাদের অভিযোগ রয়েছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘আমরা সার্বক্ষণিক সবার সঙ্গে যোগাযোগ রাখছি। উছৃঙ্খল কোনো কিছুকেই এনএসইউ আগে কখনোই প্রশ্রয় দেয়নি, এখনো দেবে না। এর আগেও আমরা বিভিন্ন সংকট ধৈর্যের সঙ্গে কঠোর হাতে দমন করেছি। এবারও করব। ’

 


মন্তব্য