kalerkantho


মুক্তিযোদ্ধা আব্দুল মজিদ

সেদিনের কথা মনে হলে এখনো নিজেকে ফিরে ফিরে দেখি

ইয়াদুল মোমিন, মেহেরপুর   

৩ মার্চ, ২০১৭ ০০:০০



সেদিনের কথা মনে হলে এখনো নিজেকে ফিরে ফিরে দেখি

‘মুক্তিযুদ্ধের কথা মনে পড়লে এখনো শরীর শিউরে ওঠে। একটি লাঠি নিয়ে বাড়ি থেকে বের হয়েছিলাম। পরে পাঁচটি গুলি আর একটি থ্রি নট থ্রি রাইফেল পেয়েছিলাম। তা-ই নিয়ে যুদ্ধ শুরু করেছিলাম—ভাবতেই পারি না! মাঝে মাঝে স্বপ্নে দেখি, অস্ত্র হাতে পাকিস্তানি সেনাদের ঘায়েল করতে গুলি ছুড়ছি। সৃষ্টিকর্তা তখন কী অসীম সাহস দিয়েছিলেন! সে কথা মনে হলে এখনো নিজেকে ফিরে ফিরে দেখি। ’

দিন কয়েক আগে এক সকালে কথা হয় মেহেরপুর শহরের ফুলবাগানপাড়ার যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধা আব্দুল মজিদের সঙ্গে। সবার কাছে তিনি পাতান নামে পরিচিত। এখন তাঁর বয়স ৬৮ বছর। মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিকথা বলতে গিয়ে আবেগাপ্লুত হয়ে পড়ছিলেন; মনে হচ্ছিল এখনো তিনি রণাঙ্গনেই আছেন।

আব্দুল মজিদ বলেন, ‘বঙ্গবন্ধু ৭ মার্চের ভাষণে একটি কথা বলেছিলেন, যা এখনো আমাকে অনুপ্রাণিত করে। সেটি হলো—আমি যদি হুকুম দিতে নাও পারি, তোমাদের যার যা কিছু আছে তা-ই নিয়ে শত্রুর মুকাবিলা করিও।

সেই থেকে যুদ্ধে অংশ নেওয়ার জন্য নিজের মধ্যে তাড়া কাজ করত। কখন ডাক আসে, সেই অপেক্ষায় সময় কাটত। ’ তিনি জানান, ১৯৬৬ সালে আনসার বাহিনীতে প্রশিক্ষণ নেওয়ার পর নিজেকে সেভাবেই প্রস্তুত করেছিলেন।

মুক্তিযোদ্ধা মজিদ বলেন, ‘ছাব্বিশে মার্চ প্রথম প্রহরে জেলা তথ্য অফিস থেকে মাইকে ঘোষণা আসে, পাকিস্তানি সেনারা চারদিক থেকে ঘিরে ফেলেছে। আপনাদের যার যা আছে তা-ই নিয়ে মুকাবিলার জন্য প্রস্তুত হন। ঘোষণা শোনার পর একটি লাঠি নিয়ে বাড়ি থেকে বের হয়ে পড়ি। বড়বাজার মোড়ে গিয়ে পাই পাতান আলী, আবুল হোসেন ও আরো কয়েকজনকে। দলবদ্ধ হয়ে আমরা মেহেরপুর কোর্টে যাই। জেলা আনসার অ্যাডজুডেন্ট আমাদের হাতে একটি করে থ্রি নট থ্রি রাইফেল ও পাঁচ রাউন্ড গুলি দেন। ’

পরে সেখান থেকে ছয়জনকে পাঠানো হয় সদর উপজেলার গোপালপুর ব্রিজের কাছে। ওই দলে তিনিও ছিলেন। ব্রিজের পাশে একটি মোড়ের কাছে একটি কুদরতি মরিচা (প্রাকৃতিক পরিখা) ছিল, সেখানেই তাঁরা পজিশন নেন। সেখান থেকে মদনাডাঙ্গা পর্যন্ত দেখা যায়। ২৮ মার্চ সকাল পর্যন্ত সেখানে ছিলেন। পরে তাঁদের মেহেরপুর শহরের নিউ মার্কেটে নিয়ে যাওয়া হয়। বিকেলে ট্রাকে করে তাঁকে ও আরো ১২৪ জনকে পাঠানো হয় কুষ্টিয়ার মিরপুরে। সেখান থেকে পায়ে হেঁটে তাঁরা যান মশানে। পরে তাঁদের ত্রিমোহনীর চেয়ারম্যান বাড়িতে নেওয়া হয়।

আব্দুল মজিদ বলেন, ২৯ মার্চ সকালে তাঁদের কয়েকজনকে কুষ্টিয়ার বিভিন্ন এলাকায় পাঠানো হয় রেকি করার জন্য। এরই মধ্যে চুয়াডাঙ্গা থেকে ইপিআরের উইং কমান্ডার মেজর আবু ওসমান চৌধুরী একটি দল নিয়ে চেয়ারম্যান বাড়িতে পৌঁছান। রেকি শেষ করে এসে দলটি তাঁকে নকশা দেয়। জানা গেল, কুষ্টিয়ার পুলিশলাইন, ওয়ারলেস অফিস ও জেলা স্কুলে পাকিস্তানি সেনারা শক্ত ঘাঁটি গেড়েছে। প্রথমে নকশাগুলোকে অগ্রাহ্য করেন তিনি, পরে সেগুলোর ভিত্তিতে একটি বৈঠক করেন। তিনটি দলে ভাগ হয়ে ঘাঁটিগুলোকে ঘিরে ফেলার সিদ্ধান্ত হয়। সে অনুযায়ী প্রস্তুতি নেন তাঁরা।

মুক্তিযোদ্ধা মজিদ বলেন, ‘৩০ মার্চ মেজর চৌধুরীর নির্দেশে আমরা পুলিশলাইনে চার দিক থেকে গুলি ছুড়তে শুরু করি। পাকিস্তানি সেনারাও পাল্টা গুলি ছোড়ে। অবস্থানের কারণে তারা আমাদের যথাযথভাবে নিশানা করতে পারছিল না। একপর্যায়ে আমাদের দলের সদস্য মেহেরপুরের ফজলুর রহমান গুলিবিদ্ধ হয়ে ঘটনাস্থলেই শহীদ হন। ততক্ষণে প্রায় সব পাকিস্তানি সেনা নিহত হয়। থেমে থেমে এক জায়গা থেকে গুলিবর্ষণের শব্দ আসছিল। সেদিকে এগোতে গেলে এক পাকিস্তানি সেনার ছোড়া একটি বুলেট আমার ডান কাঁধে বিদ্ধ হয়। প্রথমে বুঝতে পারিনি এটি গুলি। কারণ ইট-পাথরের সুরকি, গাছের ডালপালার আঘাত সহ্য করে যুদ্ধ করতে হয়েছে, মনে হচ্ছিল তেমন কিছু একটা হবে। পরে গুলি অনুভব করায় সেখানে হাত দিয়ে দেখি রক্ত ঝরছে। রক্ত দেখে আমি অজ্ঞান হয়ে পড়ি। যখন জ্ঞান ফেরে তখন দেখি, আমি কুষ্টিয়া হাসপাতালের বিছানায়। তখন শুনেছি, ওই একজন পাকিস্তানি সেনাই জীবিত ছিল। পরে গণপিটুনিতে সে মারা যায়। ৮ এপিল আমাকে মেহেরপুর হাসপাতালে পাঠানো হয়। ’

ওই দিনের যুদ্ধে পাকিস্তানি সেনাদের অনেকে নিহত হয় বলে তিনি জানান। বাকিরা ফাঁকা গুলি করতে করতে ঝিনাইদহের দিকে পালিয়ে যায়। পরে ১৪ এপ্রিল তারা বিমান হামলা চালিয়ে আবার কুষ্টিয়া দখলে নেয়।

আব্দুল মজিদ জানান, মেহেরপুর হাসপাতালে চিকিৎসা শেষ হলে ভারতের নদীয়া জেলার করিমপুরে চলে যান তিনি। সেখানে আত্মীয়স্বজনের সেবায় সুস্থ হয়ে ওঠেন। সেখান থেকে মাঝেমধ্যে টেহট্ট থানার বেতাই যুব প্রশিক্ষণ কেন্দ্রে গিয়ে যুদ্ধের খবর নিতেন। ৬ ডিসেম্বর মেহেরপুরে ফিরে আসেন তিনি।

আব্দুল মজিদ বলেন, ‘৩০ মার্চ কুষ্টিয়া পুলিশলাইনে যুদ্ধের সময় প্রচণ্ড পিপাসা পেয়েছিল। সন্তর্পণে লাইনের পেছনের দিকে গিয়ে দেখি, একটি ১২-১৩ বছরের বালক দাঁড়িয়ে আছে। পানি খাওয়াতে পারবে কি না জিজ্ঞাসা করতেই সে একটি বাড়িতে নিয়ে গেল। সেখানে এক গ্লাস পানি ও একটি আটার রুটি খেতে দেওয়া হলো। বিশ্বাস অর্জনের জন্য তাকে আগে খাওয়ালাম। এরপর নিজের ক্ষুধা নিবারণ করলাম। এর মধ্যে বালকটি বলল, চাচা আপনার কি গুলি লাগবে? তবে এক প্যাকেটের বেশি দিতে পারব না। তার কথা শুনে বললাম, তুমি গুলি কোথায় পেলে? সে বলল, আপনাদের লোকজন দিয়ে গেছে আর বলেছে আপনাদের এক প্যাকেট করে দিতে। সেখান থেকে এক প্যাকেট গুলি নিয়ে আবার যুদ্ধে অংশ নিলাম। ’

মুক্তিযোদ্ধা মজিদ বলেন, ‘পুলিশলাইনের যুদ্ধে নেতৃত্ব দিচ্ছিলেন কালাচাঁদপুরের হাবিলদার মসলেম। তিনি একসময় বললেন, মজিদ তুই পুলিশলাইনের পিছনে গিয়ে দেখ্, একটি চাঁটাইয়ের বেড়া দেওয়া ঘর রয়েছে। সেখানে একটি কুদরতি মরিচা আছে। সেখানে অবস্থান নিয়ে ফায়ারিং শুরু কর। তাহলে শত্রুপক্ষ বুঝতে পারবে না এবং তারা ধরাশায়ী হবে। তাঁর নির্দেশে সেখানে অবস্থান নিয়ে আবার ফায়ারিং শুরু করি। ’


মন্তব্য