kalerkantho


জালিয়াতি করে অতিরিক্ত শিক্ষকের এমপিওভুক্তি

শরীফুল আলম সুমন   

৩ মার্চ, ২০১৭ ০০:০০



জালিয়াতি করে অতিরিক্ত শিক্ষকের এমপিওভুক্তি

শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনা অমান্য করে বেশ কয়েকটি কলেজে অতিরিক্ত শ্রেণি-শাখার বিপরীতে নিয়োগ দেওয়া শিক্ষকদের এমপিওভুক্ত করা হয়েছে। এর সঙ্গে জড়িত রয়েছেন ১৪ জন শিক্ষা কর্মকর্তা। তাঁদের মধ্যে আঞ্চলিক শিক্ষা কার্যালয়ের চারজন উপপরিচালক (ডিডি), চারজন জেলা শিক্ষা কর্মকর্তা ও ছয়জন উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা রয়েছেন। তাঁদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশ করেছে শিক্ষা মন্ত্রণালয়। তবে মন্ত্রণালয়ের এ-সংক্রান্ত চিঠি পেয়েও মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা (মাউশি) অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা অভিযুক্তদের বাঁচানোর চেষ্টা করছেন বলে অভিযোগ উঠেছে।

মাউশি অধিদপ্তর সূত্র জানায়, মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক পর্যায়ের একটি শ্রেণিতে বিষয়প্রতি ৫০ জন শিক্ষার্থীর বিপরীতে একজন শিক্ষক নিয়োগ দেওয়া হয়। তবে কোনো শ্রেণিতে শিক্ষার্থীর সংখ্যা ১০০ হলে অতিরিক্ত শ্রেণি-শাখা খোলা যায় এবং অতিরিক্ত শিক্ষক নিয়োগ দেওয়া যায়। অনেক ক্ষেত্রে শিক্ষার্থীর সংখ্যা ৮০ হলেও অতিরিক্ত শ্রেণি-শাখা খোলার অনুমতি দেওয়া হয়।  

সূত্র জানায়, ২০১১ সালের ১৩ নভেম্বর শিক্ষা মন্ত্রণালয় এক পরিপত্রের মাধ্যমে জানায়, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের অতিরিক্ত শ্রেণি-শাখার বিপরীতে নিয়োগ দেওয়া শিক্ষকদের বেতন-ভাতা প্রতিষ্ঠানের বহন করতে হবে। কোনোভাবেই তাঁদের এমপিওভুক্ত করা যাবে না। কিন্তু সেই নির্দেশনা অমান্য করে বেশ কিছু অতিরিক্ত শ্রেণি-শাখার শিক্ষককে এমপিওভুক্ত করা হয়েছে বলে প্রমাণ পেয়েছে মন্ত্রণালয়।

এর সঙ্গে জড়িত কর্মকর্তাদের বিষয়ে বিভাগীয় ব্যবস্থা নিতে মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা (মাউশি) অধিদপ্তরকে চিঠিও দেয় মন্ত্রণালয়।

গত ২৭ নভেম্বর শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের উপসচিব নুসরাত জাবীন বানু স্বাক্ষরিত চিঠিতে বলা হয়, অতিরিক্ত শ্রেণি-শাখার বিপরীতে ২০১১ সালের ১৩ নভেম্বরের পর নিয়োগ পাওয়া শিক্ষকদের এমপিও বাতিল ও এমপিওকরণের সঙ্গে জড়িত সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা নিয়ে মন্ত্রণালয়কে জানাতে নির্দেশক্রমে অনুরোধ করা হলো। অবৈধভাবে এমপিও পাওয়া ছয়জন শিক্ষকের তালিকাও অধিদপ্তরে পাঠায় মন্ত্রণালয়। এরপর এমপিওকরণের সঙ্গে জড়িত কর্মকর্তাদের চিহ্নিত করতে নামে মাউশি অধিদপ্তর। গত ১৫ ডিসেম্বর এ-সংক্রান্ত ফাইল তৈরি করে তারা। ইতিমধ্যে ওই ছয় শিক্ষককে অবৈধভাবে এমপিওভুক্তির দায়ে ১৪ জন কর্মকর্তাকে চিহ্নিত করা হয়।

অভিযোগ পাওয়া গেছে, চিহ্নিত করা হলেও মাউশি অধিদপ্তরের কয়েকজন কর্মকর্তা ওই ১৪ জনকে বাঁচানোর চেষ্টা করছেন। অতিরিক্ত শ্রেণি-শাখার বিপরীতে এমপিও দেওয়ার বিষয়টি প্রমাণিত হলেও এ-সংক্রান্ত ফাইল অধিদপ্তরের মহাপরিচালকের কাছে পাঠানো হচ্ছে না। মন্ত্রণালয় বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দিলেও তা ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা চলছে।

মাউশি অধিদপ্তর সূত্র জানায়, প্রাথমিকভাবে উৎপাদন ব্যবস্থাপনা ও বিপণন এবং ফিন্যান্স, ব্যাংকিং ও বীমা বিষয়ের একাধিক শিক্ষককে জালিয়াতি করে এমপিওভুক্তির প্রমাণ মিলেছে। গোপালগঞ্জের মুকসুদপুরের বঙ্গরত্ন ডিগ্রি কলেজের প্রভাষক অজিত কুমার মণ্ডলকে ২০১৬ সালের জানুয়ারিতে এমপিওভুক্ত করা হয় (ইনডেক্স নম্বর ৩০৯২২০৩)। এ জালিয়াতির সঙ্গে জড়িত ছিলেন ঢাকা আঞ্চলিক শিক্ষা কার্যালয়ের উপপরিচালক, গোপালগঞ্জ জেলা শিক্ষা অফিসার ও মুকসুদপুর উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা। গোপালগঞ্জের কোটালীপাড়ার নেছার উদ্দিন তালুকদার কলেজে গত বছরের জানুয়ারিতে প্রভাষক হিসেবে নিমচাঁদ হাওলাদারকে এমপিওভুক্ত করা হয় (ইনডেক্স নম্বর ৩০৯২১৯৯)। এর সঙ্গে জড়িত ছিলেন ঢাকা আঞ্চলিক শিক্ষা কার্যালয়ের উপপরিচালক, জেলা শিক্ষা অফিসার ও কোটালীপাড়া উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তা।

সাতক্ষীরার তালা উপজেলার পাটিকেলঘাটা এইচ আর কলেজে গত বছরের জানুয়ারিতে প্রভাষক পদে পলাশ ঘোষকে এমপিওভুক্ত করা হয় (ইনডেক্স নম্বর ৩০৯২২৮৭)। এর সঙ্গে যুক্ত ছিলেন খুলনা আঞ্চলিক শিক্ষা কার্যালয়ের উপপরিচালক, সাতক্ষীরার জেলা শিক্ষা অফিসার ও তালা উপজেলার মাধ্যমিক শিক্ষা অফিসার। নেত্রোকোনার পূর্বধলা ডিগ্রি কলেজে গত বছরের মার্চে প্রভাষক পদে এমপিওভুক্ত হন জাফরিন সুলতানা (ইনডেক্স নম্বর ৩০৯২৬৫২)। পূর্বধলার হাফেজ জিয়াউর রহমান কলেজে প্রভাষক হিসেবে ২০১৫ সালের নভেম্বরে এমপিওভুক্ত হন নাদিরুজ্জামান (ইনডেক্স নম্বর ৩০৯১৯৭৪)। উভয়ের এমপিও জালিয়াতির সঙ্গে জড়িত ছিলেন ময়মনসিংহ আঞ্চলিক শিক্ষা কার্যালয়ের উপপরিচালক, নেত্রকোনা জেলা শিক্ষা অফিসার ও পূর্বধলা উপজেলা শিক্ষা অফিসার।

নোয়াখালী জেলার সুধারাম উপজেলার চরমটুয়া কলেজে গত বছরের মার্চে প্রভাষক হিসেবে এমপিওভুক্ত হন মাজেদুল ইসলাম (ইনডেক্স নম্বর ৩০৯২৪৮৯)। এ জালিয়াতির সঙ্গে জড়িত ছিলেন চট্টগ্রাম আঞ্চলিক শিক্ষা কার্যালয়ের উপপরিচালক, নোয়াখালী জেলা শিক্ষা অফিসার ও সুধারাম উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা অফিসার।

ময়মনসিংহ অঞ্চলের আঞ্চলিক কার্যালয়ের উপপরিচালক আবদুল খালেক কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘অতিরিক্ত শ্রেণি-শাখার বিপরীতে এখন এমপিও দেওয়ার সুযোগ নেই। তার পরও আমার অঞ্চলে এটা হয়ে থাকলে তা আমাকে খোঁজ নিয়ে বলতে হবে। ’

মাউশি অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ড. এস এম ওয়াহিদুজ্জামান কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘২০১১ সালের পরিপত্রের পর অতিরিক্ত শ্রেণি-শাখার বিপরীতে অবৈধভাবে দেওয়া এমপিও ইতিমধ্যে স্থগিত করা হয়েছে। তবে বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়ার ফাইলটি এখনো আমার হাতে পৌঁছেনি। দ্রুত এ-সংক্রান্ত ফাইলের খোঁজ নিয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেব। ’


মন্তব্য