kalerkantho


সাত পরিবহন শ্রমিক রিমান্ডে

নিজস্ব প্রতিবেদক   

৩ মার্চ, ২০১৭ ০০:০০



সাত পরিবহন শ্রমিক রিমান্ডে

পরিবহন ধর্মঘট প্রত্যাহার করে নেওয়ার পর গতকাল বৃহস্পতিবার রাজধানী ঢাকাসহ দেশজুড়ে নির্বিঘ্নে চলেছে সব ধরনের যানবাহন। সপ্তাহের শেষ কর্মদিবস হওয়ায় রাজধানীর প্রায় সব এলাকার রাস্তায় সৃষ্টি হয় যানজট। যদিও ভ্রাম্যমাণ আদালতের ভয়ে রাজধানীতে গণপরিবহন ছিল কম। ধর্মঘটের নামে আগের দুই দিন মহাসড়কে প্রতিবন্ধকতা ও নৈরাজ্য সৃষ্টির অভিযোগে তিনটি মামলায় আসামি করা হয়েছে সহস্রাধিক ব্যক্তিকে। একটি মামলায় গ্রেপ্তার হওয়া সাত পরিবহন শ্রমিকের এক দিন করে রিমান্ড (জিজ্ঞাসাবাদের জন্য হেফাজত) মঞ্জুর করা হয়েছে।

ঢাকার অতিরিক্ত মুখ্য মহানগর হাকিম আলমগীর কবির রাজ গতকাল সাতজনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন। ওই সাতজন হলো রফিকুল ইসলাম, হাসানুর, রবিন, মো. সোহেল, ফজলে রাব্বী, আলামিন ও এনামুল হক।

ধর্মঘটের নামে গত মঙ্গল ও বুধবার গাবতলী এলাকায় পরিবহন শ্রমিকরা মহাসড়কে ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগ করে এবং যান চলাচল ও পুলিশের কাজে বাধা দেয়। এসব নৈরাজ্যমূলক কর্মকাণ্ডের অভিযোগে রাজধানীর দারুসসালাম থানায় দায়ের করা হয় তিনটি মামলা। একটি মামলায় আসামিদের গতকাল আদালতে হাজির করেন তদন্ত কর্মকর্তা দারুসসালাম থানার উপপরিদর্শক মো. যোবায়ের। তিনি আসামিদের পুলিশের হেফাজতে নিয়ে সাত দিন জিজ্ঞাসাবাদের অনুমতি চেয়ে আবেদন করেন।

এতে বলা হয়, ঘটনার সঙ্গে আসামিদের জড়িত থাকার প্রমাণ মিলেছে। ঘটনার সঙ্গে আর কে কে জড়িত, তা জানতে আসামিদের রিমান্ডে নেওয়া প্রয়োজন। অন্যদিকে আসামিদের জামিন চেয়ে আবেদন করেন অ্যাডভোকেট শামসুজ্জোহা। শুনানি শেষে বিচারক এক দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন। দারুসসালাম থানার উপপরিদর্শক বিশ্বজিৎ পাল মামলাটি করেন।

একই ঘটনায় দারুসসালাম থানায় মোট তিনটি মামলায় হয়েছে। তিন মামলায় ৪০ জনের নাম উল্লেখসহ অজ্ঞাতপরিচয় এক হাজারেরও বেশি শ্রমিককে আসামি করা হয়েছে। দারুসসালাম থানার ওসি সেলিমুজ্জামান এ তথ্য নিশ্চিত করে জানান, দুটি মামলার বাদী পুলিশ আর একটি মামলার বাদী ক্ষতিগ্রস্ত এক ব্যক্তি।

আলাদা দুটি ঘটনায় এক গাড়িচালকের যাবজ্জীবন কারাদণ্ড এবং আরেকজনের মৃত্যুদণ্ড হওয়ায় এর প্রতিবাদে গত মঙ্গল ও বুধবার পরিবহন ধর্মঘট করে শ্রমিকরা। মঙ্গলবার রাত থেকে রাজধানীর গাবতলীতে অবস্থান নিয়ে শ্রমিকরা বিভিন্ন যানবাহন ভাঙচুর এবং বেশ কিছু স্থাপনায় আগুন ধরিয়ে ব্যাপক তাণ্ডব চালায়। পুলিশ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে গেলে তাদের সঙ্গেও সংঘর্ষে লিপ্ত হয় শ্রমিকরা। সংঘর্ষের একপর্যায়ে বুধবার সকালে গুলিবিদ্ধ হন শ্রমিক শাহিনুর (৩৭)। চার পুলিশ সদস্যসহ প্রায় ৩০ জন আহত হন। ওই দিনও শ্রমিকরা গাবতলীর তিন রাস্তার মোড়ে টায়ার জ্বালিয়ে অবরোধ সৃষ্টি করে। তারা একটি মোটরসাইকেল পুড়িয়ে দেয় এবং পুলিশের গাড়ির ক্ষতিসাধন করে। পুলিশের রেকার, পুলিশবক্সও আক্রান্ত হয়। এ ছাড়া অ্যাম্বুল্যান্স, প্রাইভেট কারসহ বেশ কয়েকটি যানবাহন ভাঙচুর করে শ্রমিকরা। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে চরম দুর্ভোগে পড়ে রাজধানীবাসী। যদিও বুধবার দুপুরে নৌপরিবহনমন্ত্রীর আহ্বানে পরিবহন ধর্মঘট প্রত্যাহার করে শ্রমিকরা।

গতকাল সকালে ময়নাতদন্ত শেষে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ মর্গ থেকে শ্রমিক শাহিনুরের লাশ বুঝে নেন দারুসসালাম থানার এসআই মহেশ চন্দ্র সিংহ। তিনি বলেন, ময়নাতদন্ত শেষে শাহিনুরের মরদেহ পুলিশের প্রহরায় তাঁর গ্রামের বাড়ি জয়পুরহাটে পাঠানো হয়েছে। গ্রাম থেকে স্বজনদের আসার কথা থাকলেও তারা আসেনি। সাংবাদিকরা উপস্থিত হলেও সেখানে নিহত এই বাসচালকের স্বজনদের দেখা যায়নি। নিহত শাহিনুর জয়পুরহাট পাঁচবিবি থানার পশ্চিম বালিঘাটা গ্রামের ছায়েম উদ্দিনের ছেলে। তিনি বৈশাখী পরিবহনের বাসের চালক ছিলেন।

লাশের ময়নাতদন্ত করেন ঢাকা মেডিক্যাল কলেজের ফরেনসিক বিভাগের প্রধান সোহেল মাহমুদ। তিনি কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘শটগানের গুলিতেই মারা গেছেন শাহিনুর। তাঁর সারা শরীরে ছোট ছোট বুলেট ছিল। অসংখ্য দাগে ভরা, অনেকটা ছররা গুলির মতো। ’

২০১১ সালের ১৩ আগস্ট মানিকগঞ্জের শিবালয়ে শালজানা গ্রামে ‘কাগজের ফুল’ ছবির শুটিং স্পট থেকে ঢাকায় ফেরার পথে ঢাকা-আরিচা মহাসড়কে জোকা এলাকায় বেপরোয়া গতির একটি বাসের ধাক্কায় চলচ্চিত্রকার তারেক মাসুদ, চিত্রগ্রাহক-সাংবাদিক মিশুক মুনীরসহ পাঁচজন নিহত হন। আহত হন আরো তিনজন। ওই ঘটনায় চুয়াডাঙ্গা ডিলাক্সের বাসচালক জামির হোসেনকে অভিযুক্ত করে অভিযোগপত্র দেয় পুলিশ। গত ২৩ ফেব্রুয়ারি মানিকগঞ্জের আদালত এক রায়ে আসামি জামিরকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেন।

২০০৩ সালের ২০ জুন সাভারের ঝাউচর এলাকার বাসিন্দা নুরু গাজীর বাড়ির সামনের রাস্তা দিয়ে ট্রাকে করে মাটি নিয়ে যাচ্ছিলেন ট্রাকচালক মীর হোসেন মিরু। সকাল ১১টা ৩০ মিনিটের দিকে ট্রাকের সামনে এসে দাঁড়ান নুরু গাজী ও তাঁর স্ত্রী খোদেজা (৩৮)। পারিবারিক রাস্তা দিয়ে মাটিভর্তি ট্রাক চলাচলে তাঁরা বাধা দেন। ক্ষিপ্ত হয়ে ওই দম্পতির ওপর দিয়ে ট্রাক চালিয়ে দেন চালক। নুরু গাজী সরে গেলে প্রাণে বেঁচে যান। তাঁর স্ত্রী খোদেজা ট্রাকের চাকায় পিষ্ট হয়ে ঘটনাস্থলে মারা যান। তদন্তে এটি পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড হিসেবে প্রমাণিত হওয়ায় দণ্ডবিধির ৩০২ ধারায় চার্জশিট দেয় পুলিশ। বিচার শেষে ওই মামলায় গত ২৭ ফেব্রুয়ারি ঢাকার পঞ্চম জেলা ও দায়রা জজ প্রদীপ কুমার রায় ট্রাকচালক মীর হোসেন মিরুর মৃত্যুদণ্ড দেন।


মন্তব্য