kalerkantho


অপপ্রচার চালিয়ে জঙ্গি তাণ্ডব

► গভীর রাতে মোটরসাইকেল নিয়ে আবাসিক এলাকায় ঢোকার সময় আনসার সদস্যের সঙ্গে মারামারি, বিনা উসকানিতে হামলা
► শিক্ষার্থী মুমূর্ষু বলে ফেসবুকে অপপ্রচার
► দাবি মানলেও অফিস-ব্যাংকে হামলা, ভাঙচুর
► নেতৃত্বে বহিরাগত ও নর্থ সাউথের বহিষ্কৃতরা
► র‌্যাব-পুলিশের তৎপরতায় আরেকটি হামলাচেষ্টা প্রতিরোধ

নিজস্ব প্রতিবেদক   

৩ মার্চ, ২০১৭ ০০:০০



অপপ্রচার চালিয়ে জঙ্গি তাণ্ডব

গুজব ছড়িয়ে বুধবার গভীর রাতে ও গতকাল সকালে বসুন্ধরা আবাসিক এলাকায় তাণ্ডব চালায় ‘মুখোশ পরা বহিরাগত জঙ্গিরা’। ছবি : কালের কণ্ঠ

গুলশানে রক্তাক্ত হামলাসহ দেশে বেশ কয়েকটি জঙ্গি হামলার ঘটনার পর রাজধানীর বারিধারায় বসুন্ধরা আবাসিক এলাকার নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এলাকাটির কয়েকটি গেট রাতে বন্ধ রাখা এবং নিয়মিত তল্লাশিসহ বেশ কিছু নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে পুলিশের পক্ষ থেকে। এই নির্দেশনা বাস্তবায়ন করতে গিয়ে উগ্রপন্থী জঙ্গিগোষ্ঠীর ভয়ংকর তাণ্ডবের শিকার হয়েছে রাজধানীর এই শান্তিপূর্ণ অভিজাত আবাসিক এলাকা বসুন্ধরা।

পরে র‌্যাব-পুলিশ এবং বসুন্ধরা গ্রুপের সতর্ক তৎপরতায় আরেকটি বড় ধরনের পরিকল্পিত জঙ্গি হামলার অপচেষ্টা রুখে দেওয়া সম্ভব হয়েছে।

বুধবার মধ্যরাতে নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের এক ছাত্র নিরাপত্তাকর্মীদের হামলায় গুরুতর আহত বলে অপপ্রচার চালিয়ে ওই রাতেই আবাসিক এলাকায় ব্যাপক ভাঙচুর চালায় ছাত্র নামধারী কিছু যুবক। পরে ফেসবুকেও ব্যাপক প্রচারণা চালানো হয়। পরদিনও অপকর্মে লিপ্ত হয় চক্রান্তকারী মহলটি। কথিত ওই শিক্ষার্থীদের পরিকল্পনায় গতকাল বৃহস্পতিবার দিনব্যাপী ব্যাপক তাণ্ডব চলে। বিক্ষোভের নামে তারা বেশ কয়েকটি বাণিজ্যিক ব্যাংক, প্রতিষ্ঠানে হামলা-ভাঙচুর করে প্রগতি সড়ক অবরোধ করে। দুপুরে তারা বসুন্ধরা গ্রুপের করপোরেট অফিস, ইন্ডাস্ট্রিয়াল হেডকোয়ার্টার, বাবা রাফি নামের চারটি রেস্টুরেন্ট, এক ডজন গাড়ি এবং ব্যাংক বুথে হামলা ও ভাঙচুর চালায়।

এদিকে বুধবার রাত থেকেই বসুন্ধরা কর্তৃপক্ষ নর্থ সাউথের শিক্ষার্থীদের কথা শোনে এবং তাদের দাবির কথা মেনে নেওয়ার আশ্বাস দেয়। পুলিশও ধৈর্য ধরে শিক্ষার্থীদের দাবি সমাধানের আশ্বাস দেয়।

এর পরও বিনা উসকানিতে তাণ্ডবের ঘটনায় জঙ্গিগোষ্ঠীর ষড়যন্ত্র সবার সামনে প্রকট হয়ে ওঠে। গতকাল পুলিশ কোনো রকম লাঠিপেটা না করলেও কিছু যুবক পুলিশের ওপর হামলা চালায়।

সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, নিরাপত্তার কড়াকড়ির কারণে উগ্রবাদী জঙ্গিগোষ্ঠী বসুন্ধরা আবাসিক এলাকার প্রশাসন ও পুলিশের ওপর হামলা চালিয়েছে। তাদের অপপ্রচারে বিভ্রান্ত হয়ে কিছু সাধারণ শিক্ষার্থীও ভুল আন্দোলনে যোগ দেয়। পরে যারা ঘটনা বুঝতে পারে তারা ওই তাণ্ডব থেকে সরে যায়।

এদিকে নর্থ সাউথ কর্তৃপক্ষ দাবি করছে, যারা এ হামলা চালিয়েছে, তারা এই বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রই নয়। আন্দোলনে যারা হামলার নেতৃত্ব দিয়েছে, তারা বহিরাগত। সেখানে জঙ্গি তৎপরতার দায়ে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বহিষ্কৃতদেরও দেখা গেছে।

গতকাল বিকেলে ঢাকা মহানগর পুলিশের অতিরিক্ত কমিশনার মিজানুর রহমান নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের গেটে কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘গত রাতে সামান্য ঘটনাকে কেন্দ্র করে এখানে হাতাহাতি হয়েছে। এ ঘটনাকে কেন্দ্র করে আইনশৃঙ্খলার অবনতি ঘটেছে। বসুন্ধরার অফিসসহ বেশ কিছু সম্পত্তি বিনষ্ট হয়েছে। এটি একটি আবাসিক এলাকা। এখানে কাউকে অরাজকতা করতে দেওয়া হবে না। আমরা সারা দিন ধৈর্য ধরে হামলাকারীদের শান্ত করার চেষ্টা করেছি। বিকেলে তারা আবার আমাদের ওপর হামলা চালায়। আমরা চাই, প্রকৃত ছাত্ররা আইন মান্য করে ক্যাম্পাসের মধ্যেই থাকবেন। ’

হামলাকারীদের ব্যাপারে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘এখন আমরা পরিস্থিতি স্বাভাবিক করছি। হামলাকারীদের বিভিন্নভাবে দেখা গেছে। তারা ছাত্র কি না, কেন হামলা করল—সব বিষয়ই খতিয়ে দেখা হবে। এখানে আমাদের বিভিন্ন সূত্র আছে। কেউ অপরাধ করলে ছাড় দেওয়া হবে না। অভিযোগ পেলে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে। ’

এদিকে যে শিক্ষার্থীর অবস্থা সংকটাপন্ন বলে ফেসবুকে অপপ্রচার চালানো হয়, তাঁকে রাতেই বাসায় যাওয়ার জন্য ছাড়পত্র দিতে চায় এ্যাপোলো হসপিটালস কর্তৃপক্ষ। হাসপাতালে গেলে গতকাল ওই শিক্ষার্থীর চিকিৎসার দায়িত্বে থাকা এক ডাক্তার বলেন, তাঁর কোনো অর্গান ড্যামেজ নেই। ফ্র্যাকচার নেই বডিতে। এখন আপাতত ব্যথা আছে।

ঘটনার সূত্রপাত : সরেজমিনে গিয়ে জানা যায়, বুধবার রাত আনুমানিক ১২টার দিকে এ্যাপোলো হসপিটালসের সামনে তপু নামে নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটির এক ছাত্র মোটরসাইকেল নিয়ে আসেন। এ সময় আনসারের এক সদস্য তাঁকে বাধা দেন। এ নিয়ে দুজনের বাগিবতণ্ডা চলে। পরে ওই ছাত্র ক্ষিপ্ত হয়ে আনসার সদস্যকে গালাগাল করতে থাকেন। ওই আনসার সদস্য প্রতিবাদ করেন। একপর্যায়ে তাঁকে মারতে এলে আনসার সদস্য ছাত্রকে ধাক্কা দেন। ওই ছাত্র তাঁর কয়েকজন সহপাঠীকে ফোন করে ঘটনাস্থলে নিয়ে আসেন। সবাই মিলে আনসার সদস্যকে মারতে থাকেন। চিত্কার শুনে আশপাশের লোকজন এগিয়ে এলে ছাত্র পরিচয়ধারীরা তাদের ওপরও হামলা চালানোর চেষ্টা করে। এমনকি আনসার সদস্যের রাইফেল পর্যন্ত কেড়ে নেওয়ার চেষ্টা করে। পরে বসুন্ধরা কর্তৃপক্ষ এসে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে। ছাত্রকে এ্যাপোলো হসপিটালসে ভর্তি করা হলেও তাঁর আঘাত গুরুতর না হওয়ায় তাঁকে ছেড়ে দেওয়া হয়।

সব কিছু যখন শান্ত হয়ে আসছিল তখন একদল নামধারী ছাত্র এ্যাপোলো হসপিটালসের পশ্চিম পাশের রাস্তার কোনায় জড়ো হয়ে পরিস্থিতি উত্তপ্ত করে তোলে। খবর পেয়ে পুলিশ ও র‌্যাব ঘটনাস্থলে ছুটে আসে। তারা যুবকদের বুঝিয়ে স্থান ত্যাগ করার অনুরোধ করে। কিন্তু সমবেতরা আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে বসুন্ধরা গ্রুপের বিরুদ্ধে উসকানিমূলক স্লোগান দিতে থাকে। তাদের কর্মকাণ্ড ও আচরণ দেখে সংশ্লিষ্টরা তাদের জঙ্গি হিসেবে চিহ্নিত করে। রাত সাড়ে ১২টার দিকে চিহ্নিত জঙ্গিরা মিছিল বের করে ৩০০ ফুট রাস্তার দিকে যাওয়ার চেষ্টা চালায়। আবারও র‌্যাব-পুলিশ বাধা দিলে তাদেরও গালাগাল করে তারা বিক্ষোভ করতে থাকে। রাস্তার মধ্যে থাকা ডিভাইডারগুলো ভেঙে সামনে যা পায় তাই ভাঙচুর করে লুটের চেষ্টা করে। এ সময় পুরো এলাকায় আতঙ্ক তৈরি হয়। তারা বিশ্ববিদ্যালয়ের সামনে ও এর আশপাশের সড়কগুলোর ডিভাইডার উপড়ে ফেলে। কয়েকটি রাস্তায় ব্যানার ও টায়ার জ্বালিয়ে আগুন ধরিয়ে দেয়। দেয়ালগুলো থেকে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের ব্যানার ছিঁড়ে ফেলা হয়। নানা স্লোগান দিয়ে পরিস্থিতি আরো উত্তপ্ত করে তোলে।

এ পর্যায়ে বড় ধরনের অপ্রীতিকর ঘটনা এড়াতে অতিরিক্ত পুলিশ ও র‌্যাব সদস্য বাড়ানো হয়। পুলিশ ও র‌্যাবের উপস্থিতি বৃদ্ধি দেখে জঙ্গিরা বসুন্ধরা ইন্ডাস্ট্রিয়াল (২) অফিসে হামলা চালিয়ে ব্যাপক ক্ষতি করে। ওই অফিসের সামনে দুটি ব্যাংকের বুথেও হামলা চালায় তারা। সাজানো ফুলের টব ভেঙে চুরমার করে। তাদের এই তাণ্ডব বুধবার রাত সোয়া ৩টা পর্যন্ত চলে। পুলিশের গুলশান ডিভিশনের উপপুলিশ কমিশনার ও র‌্যাব-১-এর পরিচালক, নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটির প্রক্টর কামরুল ইসলাম ও বসুন্ধরা গ্রুপের কয়েকজন কর্মকর্তা আবারও যুবকদের অনুরোধ করে সহিংসতার পথ পরিহার করতে বলেন। কিন্তু কয়েকজন অতি উৎসাহী যুবক তাদের আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার প্রত্যয় ব্যক্ত করে। তারা দাবি করে, যে আনসার সদস্য নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটির ছাত্রকে মারধর করেছেন তাঁকে আইনের আওতায় আনতে হবে। এ সময় র‌্যাব ও পুলিশের দুই কর্মকর্তা বলেন, ‘তদন্ত করে অবশ্যই ব্যবস্থা নেওয়া হবে। এ জন্য আমাদের সময় দিতে হবে। ’ কিন্তু যুবকদের সাফ কথা, ‘এখনই তাঁর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে হবে, না হয় আমাদের আন্দোলন চলতে থাকবে। ’ পরে প্রক্টর কামরুল ইসলাম অনেকটা রাগান্বিত হয়ে বলতে থাকেন, ‘তাহলে তোমরা সাবোটাজই করতে থাকবে?’

এ সময় শ্মশ্রুমণ্ডিত এক যুবক চিত্কার করতে করতে বলতে থাকে, বসুন্ধরা গ্রুপকে ছাড় দেওয়া হবে না। এ কথা বলার পরপরই অন্য যুবকরা করতালি দিয়ে ‘বিচার চাই, বিচার চাই’ বলে স্লোগান দিতে থাকে। র‌্যাব-পুলিশ ধৈর্যের পরিচয় দিতে থাকে। পুলিশের উপকমিশনার ও র‌্যাবের সিও যুবকদের বলতে থাকেন, ‘তাহলে তোমরা বৃহস্পতিবার সকালে বৈঠকে বসো। এখানে আমরাসহ বসুন্ধরা গ্রুপ ও নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটির কয়েকজন প্রতিনিধি যোগ দেবেন। ’ একপর্যায়ে তারা রাজি হয়ে বলে, সকাল ১০টার দিকে বসতে হবে। তাতে সবাই সম্মত হলে রাত সাড়ে ৩টার দিকে যুবকরা রাস্তা ছেড়ে চলে যায়। রাতে এসব হামলা ও অপতৎপরতার সময় কয়েকজন পায়জামা-পাঞ্জাবি পরা যুবককে দেখা যায়। হামলাকারীদের সবার হাতে লাঠি ও রড ছিল।

বুধবার রাতে যখন তাণ্ডবলীলা চলছিল তখন আবাসিক এলাকার বাসিন্দাদের অনেকে ভয়ে ভবনের ছাদে উঠে পড়ে।

রাতভর অপপ্রচার : রাতে পুলিশ ও প্রশাসনের সমঝোতায় পরিস্থিতি যখন শান্ত হয়ে যায় তখন ফেসবুকে অপপ্রচার চালায় কিছু উগ্রবাদী তরুণ। তাদের মধ্যে আসিফ মাহতাব, শরীফুল ইসলাম, হাজ্জাজ আহমেদ আয়ন, ইমরান হোসেন, মো. শহীদ প্রিজনার, শাহজাদা, এস এম রিফাত শাহরিয়ার অর্ণব ও তুহিন তুষারকে শনাক্ত করা হয়েছে।

তারা ফেসবুকে পোস্ট দিয়ে দাবি করে, বসুন্ধরার নিরাপত্তাকর্মীরা মিলে ছাত্র তপুকে পিটিয়ে গুরুতর আহত করেছে। সে এখন সংকটাপন্ন। এ জন্য বড় আন্দোলন করে দেখিয়ে দিতে হবে।

শরীফুল ইসলাম নামের একজন ফেসবুকে ভিডিও শেয়ার করে সকাল সাড়ে ১০টায় নর্থ সাউথে জড়ো হতে বলে সবাইকে। শ্মশ্রুমণ্ডিত ওই যুবক বলে, ‘ইনশাল্লাহ এর কোনো প্রকার ছাড় দেওয়া হবে না। ’

রাত ৪টার দিকে তারা ‘প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয় অ্যালায়েন্স’ নামে একটি ফেসবুক পেজ থেকে প্রচারণা চালাতে শুরু করে। চক্রটি সকাল পর্যন্ত ফেসবুক মেসেঞ্জারে উসকানিমূলক তৎপরতা চালায়।

দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে পুলিশের গুলশান বিভাগের উপকমিশনার মোশতাক আহমেদ ও ভাটারা থানার ওসি নূরুল মোত্তাকিন বলেন, কারা এভাবে অপপ্রচার চালিয়েছে তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে।

পরদিন সকালেই ফের শুরু তাণ্ডব : গতকাল সকাল ১০টা থেকেই জড়ো হতে শুরু করে নর্থ-সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র নামধারী কিছু যুবক ও বহিরাগত। এরপর তারা সমঝোতা বা আলোচনার পথ বন্ধ করতে বিক্ষোভ শুরু করে দেয়। অপপ্রচারের কারণে সাধারণ শিক্ষার্থীদের অনেকেই না বুঝে বিক্ষোভে জড়ায়। তারা ক্যাম্পাস থেকে বের হয়ে নির্বিচারে বসুন্ধরা এলাকার ভেতরের ব্যক্তিমালিকানাধীন প্রতিষ্ঠানের সাইনবোর্ড, রাস্তার ব্যারিকেড ও বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে ভাঙচুর চালায়। এরপর প্রগতি সরণিতে গিয়ে সড়ক অবরোধ করে। আবাসিক এলাকার তিনটি নিরাপত্তা বুথ ভাঙচুর করে উগ্রবাদীরা। তারা সংবাদকর্মীদের সেই দৃশ্য ধারণ করতে বাধা দেয়। ক্যামেরা বের করলেই কয়েকজন চিহ্নিত হামলাকারীর তোপের মুখে পড়েন সংবাদকর্মীরা। এমনকি সাধারণ মানুষকে মোবাইল ফোনেও ছবি তুলতে বাধা দেয় তারা।

তাদের অবরোধের কারণে অবর্ণনীয় দুর্ভোগে পড়ে সাধারণ মানুষ। কুড়িল বিশ্বরোড থেকে নতুনবাজার পর্যন্ত রাস্তায় তীব্র যানজট লেগে যায়। এ রাস্তায় হাজার হাজার নারী-পুরুষকে হেঁটে গন্তব্যে যেতে দেখা গেছে।

রোকসানা ইসলাম ও সাইদুর রহমান নামের এক দম্পতি বলেন, ‘জরুরি কাজে উত্তরা থেকে বনশ্রীর এক আত্মীয়ের বাসায় যাচ্ছিলাম। পথে এ ঘটনায় আধাঘণ্টা আটকে এখন হাঁটছি। ’

মোবারক হোসেন নামের ষাটোর্ধ্ব এক পথচারী বলেন, ‘একজন নিরাপত্তাকর্মীর সঙ্গে একজন ছাত্রের মারামারি হইছে। কেউ তো মরে নাই। এই ঘটনায়ই এমন অবস্থা! এই বাড়াবাড়ির মানে হয় না। ’

পরিকল্পিত হামলা-ভাঙচুর : গতকাল দুপুর ১২টার দিকে ঢাকা মহানগর পুলিশ কমিশনার আছাদুজ্জামানসহ ঊর্ধ্বতন পুলিশ কর্মকর্তারা বিক্ষোভকারীদের অনেক অনুরোধ করে সড়ক থেকে সরান। ওই সময় তাদের বসুন্ধরা আবাসিক এলাকার মধ্যে শান্তিপূর্ণ অবস্থান নিতে বলা হয়। তারা ওই নির্দেশনা মেনেও নেয়। তবে বসুন্ধরা এলাকার ভেতরে ঢুকেই মারমুখী হয়ে ওঠে সামনের দিকে থাকা কয়েকজন যুবক। তারা নির্বিচারে আশপাশের প্রতিষ্ঠানে ইটপাটকেল ছোড়ে। এতে গোটা এলাকায় আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। পরিস্থিতি শান্ত রাখতে সকাল থেকেই বসুন্ধরা গ্রুপের নিরাপত্তা বিভাগের সব কর্মীকে সরিয়ে নেওয়া হয়। এর পরও যাঁদের বসুন্ধরার কর্মী বলে ধারণা করা হয়েছে, তাঁদেরই হেনস্তা করেছে কথিত ছাত্ররা।

সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে কয়েক শ যুবক রাস্তায় ভাঙচুর করে সামনে এগিয়ে যায়। আতঙ্কে রাস্তা ফাঁকা হয়ে যায়। পুলিশ তাদের শান্ত থাকতে বললেও তারা শোনেনি। তাদের সামনের দিকের একটি দল ব্যাংক এশিয়া মোড়ে এসে ব্যাংক এশিয়া ও পাশের একটি ভবনের নিচে ভাঙচুর করে। তাদের মধ্যে বেশ কয়েকজন বসুন্ধরার করপোরেট অফিসে ভাঙচুর শুরু করে। ছাত্রবেশী হামলাকারীরা সেখানে একটি ব্যাংকের বুথ এবং এক ডজন গাড়ি ও মোটরসাইকেল নির্বিচারে ভাঙচুর করে।

হামলাকারীদের মধ্যে কয়েকজন যুবক করপোরেট অফিসের নিচতলায় ঢুকে গুরুত্বপূর্ণ নথিপত্র তছনছ করে। নিরাপত্তাকর্মীসহ সেখানকার কর্মকর্তারা ভয়ে নিরাপদ স্থানে সরে যান। হামলাকারীদের সবার হাতে বাঁশ, রড ও লাঠি ছিল। তাদের কয়েকজন মুখে কালো ও কমলা রঙের রুমাল বাঁধা ছিল। একসময় পুলিশ ফোর্স বাড়িয়ে হামলাকারীদের সরতে বলা হয়। এরপর হামলাকারীরা ব্যাংক এশিয়ার মোড়ে নিরাপত্তা বুথে হামলা চালায়। রাস্তার পাশে থাকা বসুন্ধরার বাসিন্দাদের জন্য লাগানো সোসাইটির সাইনবোর্ডসহ কোনো কিছুই তাদের হামলা থেকে রক্ষা পায়নি। পরে তাদের নর্থ-সাউথের সামনের রাস্তায় যেতে বলে পুলিশ।

এর পর থেকে তারা পুলিশের দিকে তেড়ে আসে এবং ইটপাটকেল ছোড়ে। পুলিশও শান্তিপূর্ণ অবস্থানে থেকে বোঝানোর চেষ্টা করে। উগ্রপন্থীরা এ সময় নর্থসাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের সামনে থাকা বাবা রাফি নামের দুটি রেস্টুরেন্টে হামলা, ভাঙচুর ও লুটপাট চালায়। একপর্যায়ে তারা ওই রেস্তোরাঁর মালপত্রে আগুন ধরিয়ে দেয়।

কথিত আন্দোলনের সময় জঙ্গিরা পুলিশকে উদ্দেশ করে গুলি চালাতে বলে স্লোগান দেয়। বসুন্ধরার কয়েকজন বাসিন্দা বলেন, এই বিশ্ববিদ্যালয়ে কিছু জঙ্গি ছিল। পুলিশের অভিযান ও বসুন্ধরার নিরাপত্তার কারণে তারা বেকায়দায় পড়েছে। তারা একটু সুযোগ নিয়ে সবাইকে জিম্মি করছে। একাধিক সূত্র নিশ্চিত করেছে, জঙ্গি তৎপরতার অভিযোগে নর্থ সাউথ থেকে বহিষ্কৃত কিছু সাবেক ছাত্রও মুখোশ পরে এতে অংশ নেয়। এই বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রত্বের আড়ালে লুকিয়ে থাকা জঙ্গিরা সাধারণ ছাত্রদের অনুভূতিকে পুঁজি করে ভয়ংকর তাণ্ডব চালানোর চেষ্টা করেছিল। এ কারণে আগে থেকেই তারা ফেসবুকে পেজ খুলে ছাত্রদের উত্তেজিত করে হামলার দিকে ঠেলে দিয়েছিল।

ফেসবুকে আপলোড করা বেশ কিছু পোস্ট মুছে ফেলে ওই দুর্বৃত্তরা ভিডিওতে বলছিল, নিরাপত্তার স্বার্থে এগুলো মুছে ফেলা জরুরি।

উত্তপ্ত পরিস্থিতিতে নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ দাবি করে, তাদের শিক্ষার্থীরা হামলা ও লুটপাট করছে না। এখানে বহিরাগতরা আছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের নিরাপত্তা কর্মকর্তা মেজর (অব.) ইমরান বলেন, ‘আমাদের ছাত্ররা এসব হামলা চালায়নি। তাদের আমরা সরিয়ে এনেছি। ’

বিশ্ববিদ্যালয়টির প্রক্টর কামরুল ইসলাম বলেন, ‘যারা হামলা করেছে তারা বহিরাগত। তাদের মধ্যে অনেককে বহিষ্কারও করা হয়েছে। এরই মধ্যে আমরা দুজনকে শনাক্ত করে পুলিশে সোপর্দ করেছি। ’

শান্ত ছিল প্রশাসন : পুলিশের গুলশান বিভাগের উপকমিশনার মোশতাক আহমেদ কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আমরা তাদের বুঝিয়ে শান্ত করার চেষ্টা করেছি। তার পরও তারা কেন এমন করল তা বুঝতে পারছি না। আমরা এসব বিষয় অবশ্যই খতিয়ে দেখব। ’ জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘এখানে অনেক বহিরাগত ছিল বলে আমরা শুনেছি। চার-পাঁচজনকে আটক করা হয়েছে। তাদের পরিচয় যাচাই চলছে। ’

পুলিশের একাধিক কর্মকর্তা বলেন, রাতের শেষ ভাগে সমঝোতা বৈঠক হলে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের অনেকে করজোড়ে ক্ষমা চায়। ভুল হওয়ার কথা স্বীকার করে তারা আশ্বাস দেয়, এ ধরনের ঘটনা আর ঘটবে না। শান্ত শিক্ষার্থীদের আবার পরিকল্পিতভাবে উসকে দেওয়া হয়েছে বলে দাবি করেন পুলিশ ও র‌্যাবের দায়িত্বরত কর্মকর্তারা।

গতকাল দুপুরে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের জন্য বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের সঙ্গে দফায় দফায় কথা বলেন পুলিশ কর্মকর্তারা। ওই সময় কর্তৃপক্ষের হস্তক্ষেপে সাধারণ শিক্ষার্থীদের অনেকেই চলে যায়, কিন্তু সরেনি উগ্রবাদীরা। বিকেল ৪টার দিকে বড় মসজিদের কাছে পুলিশের ওপর ইটপাটকেল ছোড়ে কিছু যুবক। এরপর পুলিশ ও র‌্যাব ধাওয়া করে তাদের ক্যাম্পাসের মধ্যে ঢুকিয়ে দেয়। তখন পুলিশ শান্তিপূর্ণভাবে সবাইকে বাসায় ফিরে যেতে মাইকে ঘোষণা দেয়। বিশ্ববিদ্যালয়টির রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ইমদাদুল হক ও নিরাপত্তাকর্মীদের মধ্যস্থতায় কিছু শিক্ষার্থী বাসায় ফিরে গেলেও অনেকে ভেতরে অবস্থান নেয়।

পুলিশের যুগ্ম কমিশনার মীর রেজাউল করিম বলেন, ‘পরিস্থিতি পুরোপুরি শান্ত না হওয়া পর্যন্ত এখানে পুলিশ ফোর্স থাকবে। আমরা বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ ঘোষণা করার অনুরোধ জানিয়েছি কর্তৃপক্ষকে। ’

তবে গতকাল রাত পর্যন্ত বিশ্ববিদ্যালয়টি বন্ধ ঘোষণা করেনি কর্তৃপক্ষ। উপপরিচালক (জনসংযোগ) বেলাল আহমেদ গত রাতে কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘উদ্ভূত পরিস্থিতির কারণে আগামীকাল (আজ) শুক্রবার যেসব ক্লাস ও পরীক্ষা হওয়ার কথা, তা হবে না। শনিবার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। ’

 


মন্তব্য