kalerkantho


মুক্তিযোদ্ধা আহম্মেদ নিজাম

বিজয়োল্লাসের দৃশ্য এখনো চোখে ভাসে

জাহাঙ্গীর হোসেন, রাজবাড়ী   

২ মার্চ, ২০১৭ ০০:০০



বিজয়োল্লাসের দৃশ্য এখনো চোখে ভাসে

‘তোরা যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়। আমার সাত ছেলের মধ্যে একজন ফিরে আসলেই ভাবব সবাই বেঁচে আছে।

বাবা ও মা’র নির্দেশ মাথায় নিয়েই আমরা সাত ভাই যে যার মতো বেরিয়ে পড়ি মুক্তিযুদ্ধে। আল্লাহর রহমতে যুদ্ধে পাক-হানাদারদের পরাজিত করে বাড়িতে ফিরে আসি। ফিরে বাবা, মা ও ছোট বোনকে কাছে পেয়ে যে বিজয়-উল্লাস করেছি তা এখনো চোখে ভাসে। ’

মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিচারণা করতে গিয়ে এ কথা বলেন, বীর মুক্তিযোদ্ধা আহম্মেদ নিজাম মন্টু। তিনি এখন জেলা জাসদের সভাপতি। তাঁর ছয় ভাই ফরিদ আহম্মেদ, মহসিন উদ্দিন বতু, অ্যাডভোকেট কবির আহম্মেদ, সিরাজ আহম্মেদ, ডা. সেলিম আহম্মেদ ও নাছির উদ্দিন আহম্মেদ—সবাই বীর মুক্তিযোদ্ধা। তাঁদের বাবার নাম আব্দুল মাজেদ মোল্লা ও মায়ের নাম হাসিনা বেগম। তাঁরা এখন বেঁচে নেই। তাঁদের একমাত্র বোন রোজিনা সুলতানা রোজি।

আহম্মেদ নিজামদের বাড়ি রাজবাড়ী শহরের সজ্জনকান্দার বড়পুল এলাকায়। বাবা আব্দুল মাজেদ মোল্লা রাজবাড়ীর এসডিও কোর্টের হেডক্লার্ক ছিলেন; তখন এ বাড়ি নির্মাণ করেন। তাঁদের গ্রামের বাড়ি গোপালগঞ্জের কাশিয়ানীর ভাটিয়াপাড়ায়। ১৯৬৫

সালের যুদ্ধের পর আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে সরকার একটি চিঠি ইস্যু করে। চিঠিটি তাঁর বাবা স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতাদের কাছে প্রকাশ করে দেন। এ কারণে তাঁকে কটু কথা শুনতে হয়, মানসিক নির্যাতন সইতে হয়। শেষ পর্যন্ত তাঁকে চাকরি থেকে ইস্তফা দিতে হয়। তাঁদের জন্য বিষয়টি ছিল খুবই কষ্টের। ফলে পুরো পরিবারই পাকিস্তানবিরোধী হয়ে পড়ে।

মুক্তিযোদ্ধা নিজাম জানান, বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণের পর তাঁর বড় ভাই—ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র—ফরিদ আহম্মেদ বাংলাদেশের একটি পতাকা এনে বড়পুলের বাড়িতে ওড়ান। এর পরই তাঁর বাবা-মা সাত ভাইকে ডাকেন এবং যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়ার নির্দেশ দেন। দেশের টানে বাবা-মা’র নির্দেশে তাঁরা মুক্তিযুদ্ধে যোগ দেন। পরে তাঁর বড় ভাই ছাত্রলীগ নেতা ফরিদ আহম্মেদ তাজউদ্দীন আহমদের বিপ্লবী সরকারের লিয়াজোঁ অফিসার এবং শিশুবিষয়ক কমিটির সদস্যসচিব নিযুক্ত হন। ফরিদপুর অঞ্চলের ছাত্রলীগ সদস্যদের মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে রিক্রুট করার কাজে নেতৃত্ব দেন তিনি। বঙ্গবন্ধুর মৃত্যুর পর তিনি আর রাজনীতিতে সক্রিয় হননি।

আহম্মেদ নিজাম জানান, তাঁর মেজো ভাই (বর্তমানে আওয়ামী লীগের জেলা কমিটির অন্যতম সম্পাদক) মুক্তিযোদ্ধা মহসিন উদ্দিন বতু ছিলেন পাকিস্তান বিমানবাহিনীর সদস্য। ২৫ মার্চের গণহত্যার পর তিনি মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিতে ভারতে পালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেন। হায়দরাবাদ সীমান্তে পাকিস্তানি সেনারা তাঁকে আটক করে বেদম মারপিট করে। তাঁর বাঁ হাত বাঁকা হয়ে যায়। সে সময় বেলুচিস্তান ও সিন্ধুর কিছু বিরোধীদলীয় নেতা আটক ছিলেন। ১৯৭১ সালের ১৪ আগস্ট তাঁদের সঙ্গে বতুকেও মুক্তি দেয় পাকিস্তানি বাহিনী। মুক্ত হয়ে তিনি রাজবাড়ী আসেন। পরে যান গোপালগঞ্জের কাশিয়ানী থানার মাজরাপাড়ায় মামাবাড়িতে। সেখানে বাবা-মা’র সঙ্গে দেখা হয়, জানতে পারেন অন্য ভাইয়েরা মুক্তিযুদ্ধে গেছেন।

দেরি না করে সবচেয়ে ছোট ভাই নাছির আহম্মেদকে বাড়িতে রেখে আরেক ভাই কবির আহম্মেদকে নিয়ে ভারতে চলে যান বতু। সেখানে তাজউদ্দীনের সঙ্গে দেখা করেন এবং মুক্তিবাহিনীতে যোগ দেন। পরে তিনি মুজিব বাহিনীর ফরিদপুর অঞ্চলের দায়িত্ব নিয়ে দেড় শ মুক্তিযোদ্ধাসহ দেশের উদ্দেশে রওনা হন। আসার পথে তিনি যশোর, মাগুরা ও লোহাগাড়ায় যুদ্ধ করেন। পরে ভাটিয়াপাড়ায় নানাবাড়িতে ক্যাম্প স্থাপন করেন। একদল মুক্তিযোদ্ধা এসেছে শুনে তাঁর ১৪ বছর বয়সী ছোট ভাই নাছির উদ্দিন আহম্মেদ সেখানে যান এবং বতুর বাহিনীতে যোগ দেন। টানা তিন দিনের সম্মুখযুদ্ধে অংশ নিয়ে তারা ভাটিয়াপাড়া ওয়ারলেস টাওয়ার দখল করেন এবং সেখানে থাকা পাকিস্তানি সেনাদের আটক করেন।

মুক্তিযোদ্ধা নিজাম জানান, আরেক ভাই কবির আহম্মেদ ভারতে মুজিব বাহিনীর ট্রেনিং শেষে একদল মুক্তিযোদ্ধার সঙ্গে রাজবাড়ীতে এসে যুদ্ধ করেন। তাঁর ভাইদের মধ্যে সবার আগে ভারতে যান ডা. সেলিম আহম্মেদ। তিনি ভারতের তাণ্ডুয়া ক্যাম্পে ইনস্ট্রাক্টর নিযুক্ত হন।

আহম্মেদ নিজাম বলেন, তিনি ও তাঁর আরেক ভাই সিরাজ আহম্মেদ এবং চাচাতো ভাই এস এম ফকরুজ্জামান রতন তাণ্ডুয়া ক্যাম্পে ট্রেনিং শেষ করে ১১ জনের একটি দল নিয়ে পাকশী ব্রিজ এলাকায় আসেন। দলনেতা তাঁর ভাই সিরাজ আহম্মেদ। তাঁরা পদ্মার তীরবর্তী এলাকায় রাজবাড়ী আসার উদ্দেশে অবস্থান নেন। বিষয়টি স্থানীয় রাজাকাররা জেনে যায়; সন্ধ্যার আগে তারা পাকিস্তানি সেনাদের নিয়ে তিন দিক থেকে ডাবল মার্চ করে আসতে থাকে। টের পেয়ে তাঁরা গুলিবর্ষণ শুরু করেন। একপর্যায়ে নৌকার মাঝিরা পালিয়ে যায়। এ অবস্থায় তাঁরা নিজেরাই পদ্মায় নৌকা ভাসান। পাকিস্তানি সেনারা গুলি ছুড়তেই থাকে, গুলিতে তাদের নৌকা ফুটো হয়ে তলিয়ে যেতে শুরু করে। একসময় নৌকাটি একটি চরের ওপর ডুবে যায়। পাকিস্তানি সেনারা মনে করেছিল তাঁরা সবাই ডুবে মারা গেছেন। রাখে আল্লাহ, মারে কে—ঘণ্টাখানেক পর কয়েকটি ডিঙ্গি নৌকার সাহায্যে তাঁরা পাবনা পয়েন্টে পৌঁছান। তখন চীনপন্থী কমিউনিস্ট পার্টির সদস্যরা তাঁদের ঘিরে ফেলে। তাঁরাও পিঠে পিঠ লাগিয়ে গুলিবর্ষণ শুরু করেন।

আহম্মেদ নিজাম বলেন, কয়েক মিনিটের মধ্যে কমিউনিস্ট পার্টির সদস্যরা আত্মসমর্পণ করে। পরে তাঁরা ডিঙ্গি নৌকায় করেই কুষ্টিয়া আসেন। সেখানে তাঁদের দলের এক সদস্যের সঙ্গে দেখা হয় তাঁর বাবার। ছেলের মুখে তাঁদের সাহসিকতার কথা শুনে তিনি তাঁকে কাছে টেনে নিয়ে চুমু দেন ও দোয়া করেন। তিনি বলেন, ‘তুমি যদি সৎ থাক, তবে তোমার কোনো ক্ষতি হবে না। সাড়ে সাত কোটি লোকের মায়ের দোয়া তোমার জন্য রইল। ’ এখনো সেই পিতার কথা মেনে চলার চেষ্টা করেন তিনি।

মুক্তিযোদ্ধা নিজাম বলেন, এরপর তাঁরা রাজবাড়ীতে চলে আসেন। ১৪ ডিসেম্বর রাজবাড়ীতে বিহারি ও রাজাকারদের সঙ্গে তাঁদের সম্মুখযুদ্ধ হয়। পাকিস্তানি সেনারা আগেই সরে গিয়েছিল। ওই যুদ্ধে রফিক, শফিক ও সাদিক নিহত হন। গুরুতর আহত দিয়ানত পরে মারা যান। ১৬ ডিসেম্বর দেশ স্বাধীন হলেও রাজবাড়ী জেলা মুক্ত হয় ১৮ ডিসেম্বর।

আহম্মেদ নিজাম জানান, ‘বিজয় অর্জনের পরের দিন আমরা সাত ভাই এবং চাচাতো ভাই এস এম ফকরুজ্জামান রতন ও মামাতো ভাই জি এ মান্নান রাজবাড়ীর ভোকেশনাল মাঠে অস্ত্র হাতে একটি ছবি তুলি। সেটি তোলেন আলোকচিত্র সাংবাদিক সিরাজুল আলম ভুঁইয়া। ছবিটি সেদিনের স্মৃতির স্মারক হয়ে আছে। ’


মন্তব্য