kalerkantho


ওপরের চাপে ভঙ্গ অযৌক্তিক ধর্মঘট

পার্থ সারথি দাস   

২ মার্চ, ২০১৭ ০০:০০



ওপরের চাপে ভঙ্গ অযৌক্তিক ধর্মঘট

সম্পূর্ণ ‘অযৌক্তিক’ কারণে দেশজুড়ে পরিবহন ধর্মঘট ডেকে দুই দিনের মাথায় গতকাল বুধবার তা প্রত্যাহার করা হয়েছে। সরকারের উচ্চ পর্যায় থেকে চাপে পড়ে শেষ পর্যন্ত ধর্মঘট প্রত্যাহারের ঘোষণা দেওয়া হয়েছে বলে জানা গেছে।

২০০৩ সালে সাভারে ট্রাকচাপা দিয়ে এক প্রতিবাদী নারীকে হত্যার দায়ে গত সোমবার ওই ট্রাকচালকের মৃত্যুদণ্ডের রায় হলে এর প্রতিবাদে মঙ্গলবার সকাল থেকে হঠাৎ করে পরিবহন ধর্মঘট শুরু হলে সরকারের প্রভাবশালী অনেক মন্ত্রী ও সংসদ সদস্য তাতে নাখোশ হন। ওই দিনই সরকারের উচ্চ পর্যায় থেকে দ্রুততম সময়ের মধ্যে ধর্মঘট প্রত্যাহারের জন্য ব্যবস্থা নিতে শীর্ষ পরিবহন মালিক ও শ্রমিক নেতাদের কাছে বার্তা চলে যায়। আওয়ামীপন্থী পরিবহন নেতারা তাতে সায় দিলেও বিএনপি ও জামায়াতপন্থী পরিবহন নেতা, মালিক ও শ্রমিকরা তাতে সাড়া দিতে নারাজ ছিলেন।

সোমবার রাতে ঢাকায় অনুষ্ঠিত পরিবহন মালিক-শ্রমিক নেতাদের এক গোপন বৈঠকে মঙ্গলবার থেকে ধর্মঘট শুরুর সিদ্ধান্ত হয়। তবে নেতারা তা প্রকাশ্যে স্বীকার করেননি। পরদিন মঙ্গলবার সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রী ওবায়দুল কাদের এ ধর্মঘটকে অযৌক্তিক অ্যাখ্যা দিয়ে তা প্রত্যাহারের প্রকাশ্য আহ্বান জানান। মঙ্গলবার তাঁর আহ্বানের পর শীর্ষ পরিবহন নেতাদের বড় একটি অংশ তাতে সায় দেয়। পাশাপাশি তাঁরা ধর্মঘট প্রত্যাহারে সরকারের উচ্চ পর্যায় থেকে চাপ পেতে শুরু করেন। মধ্যম সারির পরিবহন নেতারা ধর্মঘট চালিয়ে যাওয়ার অনুরোধ করলেও সরকারের মনোভাব বুঝতে পেরে শেষ পর্যন্ত গতকাল বুধবার সকাল ১১টায় সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রী ওবায়দুল কাদেরের দপ্তরে আইনমন্ত্রী আনিসুল হক, নৌপরিবহনমন্ত্রী শাজাহান খান, সমবায় প্রতিমন্ত্রী মসিউর রহমান রাঙ্গা, বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন মালিক সমিতির মহাসচিব খন্দকার এনায়েত উল্লাহসহ শীর্ষ পরিবহন নেতারা বৈঠক করেন।

সকালে সচিবালয়ে নৌমন্ত্রী শাজাহান খানের দপ্তরে সাংবাদিকরা গেলে তাঁর দপ্তর থেকে জানানো হয়, তিনি সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয়ের বৈঠকে গেছেন। নৌমন্ত্রী পৌঁছার পর বৈঠকে যোগ দিতে সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয়ে যান সমবায় প্রতিমন্ত্রী ও শীর্ষ পরিবহন নেতা মসিউর রহমান রাঙ্গা।

বৈঠকটি প্রায় আধাঘণ্টা চলে। বৈঠকে অংশ নেওয়া একাধিক মন্ত্রী কালের কণ্ঠকে বলেন, জনভোগান্তির কারণে সরকার যাতে প্রশ্নের মুখে না পড়ে, সরকারের ভাবমূর্তি যাতে ক্ষুণ্ন না হয়, এসব বিষয় বিবেচনায় রেখে সংক্ষিপ্ত বৈঠকে বুধবার সন্ধ্যার আগেই ধর্মঘট প্রত্যাহারের নীতিগত সিদ্ধান্ত হয়। এতে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেন সড়কমন্ত্রী।

সরকারের একটি সূত্র জানায়, এ ধর্মঘটে উসকানি দেওয়া হয়েছিল কি না তা খতিয়ে দেখা হবে। তার জন্য দায়ীদের চিহ্নিত করা হবে।

সূত্র জানায়, ওই বৈঠকের পর সচিবালয় থেকে নিজ নিজ গাড়িতে করে নৌমন্ত্রী ও সমবায় প্রতিমন্ত্রী এবং বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন মালিক সমিতির মহাসচিব খন্দকার এনায়েত উল্লাহ মতিঝিলে বিআরটিসি ভবনে পৌঁছান। বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন মালিক সমিতি ও ঢাকা সড়ক পরিবহন সমিতির কার্যালয় ওই ভবনের সপ্তম তলায়। কার্যালয়ের মিলনায়তনে এনায়েত উল্লাহ ছাড়াও ছিলেন বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন শ্রমিক ফেডারেশনের সাধারণ সম্পাদক ওসমান আলী, সংগঠনের জ্যেষ্ঠ সহসভাপতি আবদুর রহিম বক্স দুদুসহ পরিবহন খাতের বিশিষ্ট নেতারা। দ্রুত সংবাদ সম্মেলন আয়োজনের প্রস্তুতি নেওয়া হয়।   সড়কমন্ত্রীর দপ্তরে অনুষ্ঠিত বৈঠকের সিদ্ধান্ত অনুসারে কিছুক্ষণের মধ্যে মালিক-শ্রমিক নেতারা বৈঠক করে দুপুর ১টা ৩০ মিনিটে সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে ধর্মঘট প্রত্যাহারের ঘোষণা দেওয়ার কথা হয়। কিন্তু পরিবহন নেতারা নিজেদের মধ্যে ও বিভিন্ন জেলা, উপজেলা পর্যায়ের নেতাদের সঙ্গে মোবাইল ফোনে যোগাযোগ করে তাদের ‘কর্মবিরতি’ থেকে সরে আসার আহ্বান জানান। সেই সঙ্গে তাদের জানানো হয়, আদালতে মামলার ক্ষেত্রে ভবিষ্যতে সংগঠনের পক্ষ থেকে পরিবহন শ্রমিকদের আইনি পরামর্শ দেওয়া হবে। সকাল ১টা ১৫ মিনিটে পরিবহন সংগঠনের কার্যালয়ে নির্বাহী কর্মকর্তার কক্ষে সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তব্য কম্পোজ করা শুরু হয়। শীর্ষ পরিবহন নেতা হাতে লিখে কিছুক্ষণ পর পর কয়েকটি লাইন পাঠাচ্ছিলেন, আর কম্পোজ করা হচ্ছিল। দুই পৃষ্ঠার লিখিত বক্তব্যের শুরুতেই নমনীয় সুর প্রকাশ করে বলা হয়, ‘সড়ক পরিবহন মালিক-শ্রমিকরা আইনের ঊর্ধ্বে নয়। আমরা আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। আপনারা জানেন যে, ২০১১ সালের ১৩ আগস্ট মানিকগঞ্জ মহাসড়কে এক দুর্ঘটনায় বাংলাদেশের বিশিষ্ট ব্যক্তিত্ব তারেক মাসুদ ও মিশুক মুনীর নিহত হওয়ায় আমরা আন্তরিকভাবে দুঃখ প্রকাশ করে বিবৃতি দিয়েছিলাম। আমরা আজও বলতে চাই, সড়ক দুর্ঘটনায় কোনো মৃত্যু কারো কাম্য নয়, আমাদেরও নয়। ’

দুপুর আড়াইটার দিকে নৌমন্ত্রী সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তব্য পাঠ করেন। তিনি পরিবহন শ্রমিকদের কর্মবিরতি থেকে সরে যাওয়ার অনুরোধ করেন। তিনি জানান, পরিবহন শ্রমিকদের দাবির বিষয়টি আইনগতভাবে সমাধানের জন্য অগ্রসর হবেন তাঁরা। এ বিষয়ে সরকারের কাছ থেকে সহযোগিতার আশ্বাসও পেয়েছেন। সকালে সড়ক পরিবহন মন্ত্রীর দপ্তরে অনুষ্ঠিত বৈঠকে সরকারের পক্ষ থেকে এ আশ্বাস পাওয়ার কথা জানান তিনি। এরপর তিনি পরিবহন মালিক-শ্রমিকদের যানবাহন চলাচল শুরু করার আহ্বান জানান।

একাধিক বৈঠক ও সংবাদ সম্মেলনে যোগ দেওয়া সমবায় প্রতিমন্ত্রী মসিউর রহমান রাঙ্গার কাছে জানতে চাইলে কালের কণ্ঠকে তিনি বলেন, এ ধর্মঘট শুরুর জন্য কোনো পক্ষ থেকে উসকানি দেওয়া হয়নি। আগে ধর্মঘট শুরুর পর তা বহুদিন পর্যন্ত চলত। এরশাদ সরকারের সময়ও ধর্মঘট হয়েছিল। কিন্তু আগের সরকারের সঙ্গে বর্তমান সরকারের পার্থক্য আছে। বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন মালিক সমিতির সভাপতি এই প্রতিমন্ত্রী বলেন, ‘আমরা নিজেরা মিলে সমস্যার সমাধান করেছি। ’

বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক খন্দকার এনায়েত উল্লাহর কাছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘নিজেরা বসে সমাধান বের করার জন্য আমাদের পরামর্শ দেওয়া হয়েছিল। আমরা সমাধান করেছি দ্রুততম সময়ের মধ্যে। মানুষের ভোগান্তি নিয়ে অন্য কেউ যাতে রাজনীতি না করতে পারে তার সুযোগ আমরা দিতে চাই না। ’

বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতির মহাসচিব মোজাম্মেল হক চৌধুরী বলেন, ‘এ ধর্মঘটে যাত্রীদের যে ক্ষতি হলো, যে পরিবহন শ্রমিকের প্রাণ গেল তার দায় কে নেবে? এ ধর্মঘটের কোনো যৌক্তিক কারণ ছিল না। কেউ উসকানি দিয়ে থাকলে তাদের চিহ্নিত করে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য সরকারের কাছে দাবি জানাই। ’

‘নিরাপদ সড়ক চাই’ আন্দোলনের চেয়ারম্যান চিত্রনায়ক ইলিয়াস কাঞ্চন বলেন, আগেও ধর্মঘট করে সন্ত্রাস করেছে পরিবহন শ্রমিকরা। তবে এবার বেশিক্ষণ তা চালাতে পারেনি। জনগণ এখন বিকল্প ব্যবস্থায় চলতে চায়, তবু জিম্মি থাকতে চায় না। কারণ পরিবহন নেতাদের বড় পুঁজি হলো জনদুর্ভোগ। এবার এ রাজনীতিতে তারা সফল হতে পারল না।

 


মন্তব্য