kalerkantho


দুই দিন ধরে সীমাহীন দুর্ভোগে দেশবাসী

পরিবহন শ্রমিকদের নজিরবিহীন তাণ্ডব

যাত্রীদের ওপর হামলা, পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষ, ঢাকায় নিহত ১

কালের কণ্ঠ ডেস্ক   

২ মার্চ, ২০১৭ ০০:০০



পরিবহন শ্রমিকদের নজিরবিহীন তাণ্ডব

পরিবহন ধর্মঘটের দ্বিতীয় দিন গতকাল রাজধানীর গাবতলী এলাকায় তাণ্ডব চালায় পরিবহন শ্রমিকরা। নির্বিচারে ভাঙচুরের সময় রক্ষা পায়নি মুমূর্ষু রোগীবাহী অ্যাম্বুল্যান্স।ছবি : লুৎফর রহমান

সারা দেশে দুই দিন ধরে নজিরবিহীন অরাজকতা চালিয়েছে সড়ক পরিবহন শ্রমিকরা। ধর্মঘটের নামে সড়ক-মহাসড়কে টায়ারে আগুন জ্বালিয়ে বিক্ষোভ এবং যানবাহন ভাঙচুর করেছে তারা। তাদের হাত থেকে রেহাই পায়নি এসএসসি পরীক্ষার্থীদের গাড়ি, রোগীবাহী অ্যাম্বুল্যান্স পর্যন্ত। এমনকি অ্যাম্বুল্যান্স ভাঙচুর করে রোগীকে পথেই নামিয়ে দেওয়া হয়েছে।  

এ ছাড়া রাস্তায় নামা অন্য যেকোনো যানবাহনের চালক ও যাত্রীদের মারধর করে ধর্মঘটি পরিবহন শ্রমিকরা। রিকশা, সাইকেল-মোটরসাইকেল পর্যন্ত চলতে বাধা দেওয়া হয়। কোথাও কোথাও মোটরসাইকেলের চালককে ইঞ্জিন বন্ধ রেখে ঠেলে নিতে বাধ্য করে শ্রমিকরা। এমন পরিস্থিতিতে পড়ে চরম দুর্ভোগ পোহাতে নয় যাত্রীদের। অথচ কোথাও কোথাও পরিবহন মালিক ও শ্রমিক নেতাদের প্রাইভেট কারে চড়ে শ্রমিকদের নির্দেশনা দিতে দেখা গেছে।

এভাবে দুই দিন তাণ্ডব চালিয়ে গতকাল বুধবার বিকেল ৩টার পর ধর্মঘট প্রত্যাহার করে নিয়েছে সড়ক পরিবহন শ্রমিকরা। সরকারপক্ষের সঙ্গে বৈঠকে নৌপরিবহনমন্ত্রী শাজাহান খানের আহ্বানে সাড়া দিয়ে ওই ধর্মঘট প্রত্যাহার করে নেওয়া হয়।

এতে স্বস্তি নেমে এসেছে জনজীবনে।

তবে এর আগে রাজধানীর গাবতলীতে পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষে মারা গেছেন এক বাসচালক। পুলিশের ওপর হামলার অভিযোগে ওই এলাকা থেকে অন্তত ২৯ জনকে আটক করেছে পুলিশ। পরিবহন শ্রমিকদের সহিংসতার ঘটনায় গত রাতে তিনটি মামলা হয়েছে বলে জানিয়েছেন দারুসসালাম থানার ওসি সেলিমুজ্জামান। তিনি জানান, পুলিশ বাদী হয়ে দুই মামলা এবং ক্ষতিগ্রস্ত এক ব্যক্তি বাদী হয়ে অন্য মামলাটি করেছেন। তিন মামলায় ৪০ জনের নাম উল্লেখসহ এক হাজার জনকে আসামি করা হয়েছে।

আদালতের রায়ে দুই চালকের সাজার প্রতিবাদে আনুষ্ঠানিক পূর্বঘোষণা ছাড়াই গত মঙ্গলবার থেকে রাজধানীসহ সারা দেশে ধর্মঘট শুরু করেছিল সড়ক পরিবহন শ্রমিকরা। আইনি প্রক্রিয়ায় না গিয়ে হঠাৎ তারা ধর্মঘট শুরু করায় সড়ক-মহাসড়কে অবর্ণনীয় দুর্ভোগে পড়ে দেশবাসী। যাত্রীদের পাশাপাশি পণ্য পরিবহনও বন্ধ ছিল।

রাজধানী ছাড়তে চাওয়া এবং বাইরে থেকে আসা যাত্রীদের কেউ কেউ ধর্মঘটের দুই দিন টার্মিনালে বা সড়কে আটকে ছিল। কেউ কেউ পরিচিতজনদের বাসায় ওঠে। দূরপাল্লার বাস বন্ধ থাকায় যাত্রীরা জরুরি যাত্রাও বাতিল করে।

রাজধানীতে গতকাল সকালে গাবতলী, বাড্ডা, যাত্রাবাড়ী, সায়েদাবাদ, শনির আখড়াসহ বিভিন্ন স্থানে পরিবহন শ্রমিকরা হালকা যানের চালক ও যাত্রীদের হেনস্তা করে। রোগীবাহী অ্যাম্বুল্যান্সও তারা থামিয়ে দেয়।

ধর্মঘট প্রত্যাহারে মন্ত্রীর আহ্বানের পর সড়কে গণপরিবহন চলতে শুরু করে। তবে অতিরিক্ত চাপ ছিল ট্রেন ও লঞ্চে। ভুক্তভোগী যাত্রীরা পরিবহন শ্রমিকদের উসকে দেওয়ার ঘটনায় দোষীদের শাস্তির দাবি জানিয়েছে।

গাবতলীতে সংঘর্ষে বাসচালকের প্রাণহানি : প্রত্যক্ষদর্শী ও পুলিশ জানায়, গতকাল সকালে রাজধানীর গাবতলী বাস ট্রার্মিনাল-সংলগ্ন সড়কে টায়ারে আগুন জ্বালিয়ে বিক্ষোভ শুরু করে শ্রমিকরা। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী তাদের সরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করলে বিক্ষুব্ধ শ্রমিকরা তাদের ওপর ইটপাটকেল নিক্ষেপ করতে থাকে। পুলিশ তখন শ্রমিকদের ছত্রভঙ্গ করতে কাঁদানে গ্যাসের শেল ও রাবার বুলেট ছোড়ে।

সংঘর্ষের সময় সকাল ১০টার পর শাহ আলম (৩৩) নামের এক বাসচালক রাবার বুলেটবিদ্ধ হন। তাৎক্ষণিক তাঁকে স্থানীয় একটি হাসপাতালে নেওয়া হয়। এরপর তাঁকে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয়। গতকাল সন্ধ্যায় সেখানকার কর্তব্যরত আবাসিক চিকিৎসক ডা. মোছাম্মৎ জেসমিন নাহার তাঁকে মৃত ঘোষণা করেন। নিহত শাহ আলম বৈশাখী পরিবহনের বাসচালক ছিলেন।

ওই সংঘর্ষে পরিবহন শ্রমিক ও পুলিশসহ অর্ধশতাধিক ব্যক্তি আহত হয়। তাদের ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালসহ বিভিন্ন ক্লিনিকে ভর্তি করা হয়েছে। তার মধ্যে অনিক, রবিউল ইসলাম ও মিজু আহমেদ নামে তিন পুলিশ কনস্টেবল এবং শ্রমিক ইসমাইল ও রবিউল ইসলাম; গরু ব্যবসায়ী দেলোয়ার হোসেন, হোটেল কর্মচারী রুবেলের অবস্থা আশঙ্কাজনক। তাঁরা সবাই রাবার বুলেট ও ইটপাটকেলে আহত হয়েছেন।

এদিকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য গতকাল ২০ শ্রমিককে আটক করেছে পুলিশ। এর আগে মঙ্গলবার রাতে আরো ৯ জনকে আটক করা হয়েছিল।

প্রত্যক্ষদর্শীরা জানায়, গাবতলী এলাকায় সড়ক অবরোধ করে শ্রমিকরা সব ধরনের যান চলাচলে বাধা দেয়। এমনকি দুটি অ্যাম্বুুল্যান্সও ভাঙচুর করা হয়। এতে এক রোগীর স্বজন আহত হয়। এ ছাড়া শ্রমিকরা আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর একটি গাড়ি লক্ষ্য করে ইটপাটকেল ছোড়ে। একপর্যায়ে তারা রাস্তায় বসানো সিসিটিভি ক্যামেরা পর্যন্ত ভাঙচুর করে।

পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে সকাল ১০টা ৫ মিনিটের দিকে পুলিশ গাবতলী এলাকায় অভিযান শুরু করে। এতে পুলিশের সঙ্গে শ্রমিকদের সংঘর্ষ শুরু হয়। শ্রমিকরা পুলিশকে লক্ষ্য করে ইটপাটকেল ছোড়ে। পুলিশ পাল্টা হিসেবে রাবার বুলেট ছোড়ে।  

ওই রাবার বুলেটবিদ্ধ শাহ আলমকে প্রথমে স্থানীয় সেলিনা আক্তার ক্লিনিক অ্যান্ড ডায়াগনস্টিক সেন্টারে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে জরুরি বিভাগে কর্তব্যরত চিকিৎসক ডা. মঞ্জুর-উল্লাহ হক বলেন, ‘তাঁকে (শাহ আলম) যখন নিয়ে আসা হয় তখন আমরা তাঁর পালস পাইনি। তখন তাঁকে সোহরাওয়ার্দী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যেতে বলা হয়। ’

তবে প্রত্যক্ষদর্শীরা জানায়, সকাল ১০টা ৩৫ মিনিটে সেলিনা ক্লিনিক থেকে অন্য শ্রমিকরা শাহ আলমকে সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালে না নিয়ে গাবতলী বাস টার্মিনালে নিয়ে যায়। পুলিশ সেখান থেকে তাঁকে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে পাঠায়।

ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল পুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জ বাচ্চু মিয়া কালের কণ্ঠকে বলেন, শাহ আলমকে আশঙ্কাজনক অবস্থায় হাসপাতালের আইসিইউতে ভর্তি করা হয়েছিল। তাঁর শরীরে স্প্লিন্টারের আঘাতের মতো বহু চিহ্ন ছিল।

দারুস সালাম থানার ওসি সেলিমউজ্জামান জানান, শাহ আলমের গ্রামের বাড়ি রাজবাড়ী জেলায়। তিনি বলেন, পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষের পর ঘটনাস্থল থেকে বেশ কয়েকজন শ্রমিককে আটক করা হয়েছে। তাদের জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে।

পুলিশের মিরপুর বিভাগের উপকমিশনার মাসুদ আহমেদের নেতৃত্বে সকাল সাড়ে ৯টার দিকে গাবতলী এলাকায় অভিযান চালায় পুলিশ। পুলিশের অভিযানের মুখে পরিবহন শ্রমিকরা রাস্তা থেকে সরে যায়। এ প্রসঙ্গে উপকমিশনার মাসুদ আহমেদ কালের কণ্ঠকে বলেন, পরিস্থিতি শান্ত করে সাধারণ যানবাহন চলাচলের ব্যবস্থা নেওয়া হয়।

এদিকে গতকাল ধর্মঘট প্রত্যাহারের আগ পর্যন্ত শত শত নগরবাসী দুর্ভোগকে সঙ্গী করে হেঁটে গন্তব্যের উদ্দেশ্যে রওনা হয়।

বিভিন্ন স্থানে ভাঙচুর, সংঘর্ষ : আমাদের নিজস্ব প্রতিবেদক ও প্রতিনিধিদের পাঠানো খবরে দেখা গেছে, রাজধানীর অন্যতম প্রবেশপথ সাভারের নবীনগর-চন্দ্রা মহাসড়কে গাজীপুরগামী একটি পিকনিক বাসে ভাঙচুর চালিয়েছে শ্রমিকরা। জিরানী এলাকায় বাংলাদেশ ক্রীড়া শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের (বিকেএসপি) সামনে ঠিকানা পরিবহনের একটি বাসেও ভাঙচুর চালানো হয়। এ ছাড়া ঢাকা-আরিচা মহাসড়কের জাতীয় স্মৃতিসৌধ এলাকায় বাস, ট্রাক ও রিকশা থামিয়ে যাত্রীদের নামিয়ে দেয় ধর্মঘটি শ্রমিকরা। এতে এসএসসি পরীক্ষার্থী, গার্মেন্ট শ্রমিক ও সাধারণ যাত্রীরা দুর্ভোগে পড়ে।

রাজশাহীতেও ব্যাপক নৈরাজ্য চালিয়েছে পরিবহন শ্রমিকরা। নগরের চৌদ্দপাই এলাকায় ডাক বিভাগের একটি গাড়িতে এবং তালাইমারী এলাকায় চিনিকলের গাড়িতে হামলা চালায়। এ ছাড়া সিএনজি ও ব্যাটারিচালিত কয়েকটি অটোরিকশা ভাঙচুর এবং চালক ও যাত্রীদের মারধর করে শ্রমিকরা। তালাইমারী মোড়ে রিকশা, অটোরিকশা, মোটরসাইকেলও চলাচল করতে দেওয়া হয়নি। সেখানে সাইকেল-মোটরসাইকেলচালকদের যান বন্ধ করে ঠেলে নিতে বাধ্য করা হয়।

ধর্মঘটকে কেন্দ্র করে নারায়ণগঞ্জে পুলিশের সঙ্গে শ্রমিকদের কয়েক দফা ধাওয়া-পাল্টাধাওয়ার ঘটনা ঘটে। শ্রমিকরা পুলিশকে লক্ষ্য করে ইটপাটকেল ছুড়ে মারে। পরে পুলিশ লাঠিপেটা করে শ্রমিকদের ছত্রভঙ্গ করার চেষ্টা করে। এর আগে শিমরাইল মোড় থেকে কাঁচপুর সেতু পর্যন্ত ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের কয়েকটি পয়েন্টে টায়ার জ্বালিয়ে অবরোধ করে পরিবহন শ্রমিকরা। তারা অ্যাম্বুল্যান্স, এমনকি রিকশাভ্যান চলতেও বাধা দেয়। এতে আটকা পড়েন কুমিল্লা-১ আসনের সংসদ সদস্য মেজর জেনারেল (অব.) সুবিদ আলী ভূঁইয়াও। পরে পুলিশ তাঁকে পাহারা দিয়ে সাইনবোর্ড পর্যন্ত পৌঁছে দেয়। এদিকে সোনারগাঁ উপজেলার কাঁচপুর বাসস্ট্যান্ড থেকে কোনো ধরনের গণপরিবহন ছাড়তে দেয়নি শ্রমিকরা।

ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আশুগঞ্জে ঢাকা-সিলেট মহাসড়কে পুলিশকে লক্ষ্য করে ইটপাটকেল নিক্ষেপ করে শ্রমিকরা। পরে পুলিশ লাঠিপেটা করে ও রাবার বুলেট ছুড়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে। আশুগঞ্জ থানার ওসি মুহাম্মদ সেলিম উদ্দিন জানান, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে পুলিশকে ৫৭ রাউন্ড বাবার বুলেট ছুড়তে হয়েছে।

গাজীপুর জেলা ট্রাক ও কাভার্ড ভ্যান শ্রমিক ইউনিয়নের শ্রমিকরা ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কের টঙ্গী, চেরাগআলী, স্টেশন রোড, এরশাদনগর, বোর্ডবাজার এলাকায় দফায় দফায় গাড়ি ভাঙচুর ও তাণ্ডব চালিয়েছে। এদের হাত থেকে এসএসসি পরীক্ষার্থী ও স্কুল-কলেজগামী ছাত্রছাত্রীরাও রেহাই পায়নি। রক্ষা পায়নি অ্যাম্বুল্যান্স, দূতাবাসের গাড়ি, সিএনজি ও ব্যাটারিচালিত অটোরিকশাও।

গাজীপুরে ঢাকা-টাঙ্গাইল ও ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়ক, ঢাকা বাইপাস সড়ক, এমনকি গাজীপুরের অভ্যন্তরীণ সড়কে ব্যক্তিগত গাড়ি, রিকশা এমনকি সাইকেলও চলতে দেয়নি শ্রমিকরা। চান্দনা চৌরাস্তা, ভোগড়া বাইপাস মোড়, টঙ্গী, কালিয়াকৈরের চন্দ্রা মোড় ও মাওনা চৌরান্তা মোড়সহ গুরুত্বপূর্ণ এলাকাগুলোতে শ্রমিকদের লাঠিসোঁটা নিয়ে অবস্থান করতে দেখা গেছে।

বগুড়ায় মহাসড়কে গাড়ি দেখলেই হামলা করেছে শ্রমিকরা। এমনকি রোগী বহনকারী অ্যাম্বুল্যান্স, সংবাদপত্রবাহী গাড়িসহ জরুরি পণ্যবাহী যানেও হামলা চালানো হয়েছে। ভাঙচুর চালিয়ে চালকদের মারধর করেছে। মুঠোফোন ও টাকা-পয়সা কেড়ে নেওয়ার অভিযোগও পাওয়া গেছে একাধিক। অথচ পরিবহন শ্রমিক নেতারা তাঁদের ব্যক্তিগত গাড়িতে চড়ে মহাসড়কে নির্বিঘ্নে ঘুরেছেন।

চট্টগ্রাম নগর ও জেলার বিভিন্ন সড়কে ব্যারিকেড দিয়ে সব ধরনের যানবাহন চলাচল বন্ধ করে দেওয়া হয়। এমনকি রোগী বহনকারী অ্যাম্বুল্যান্স ও ব্যক্তিগত গাড়ি চলাচলের সময় বিভিন্ন স্থানে বাধার অভিযোগ পাওয়া গেছে। কোথাও কোথাও গাড়ি ভাঙচুর করা হয়েছে। আগের দিন হালকা যানবাহন চলাচল করলেও গতকাল তাও চলতে দেয়নি ধর্মঘটি শ্রমিকরা। রিকশা থেকেও যাত্রীদের নামিয়ে দিয়েছে। কেউ প্রতিবাদ করলে তাদের ওপর ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠে শ্রমিকরা।

চাঁদপুর তালতলা বাসস্ট্যান্ড এবং বাবুরহাট বাজারের সড়কে অবস্থান নিয়ে পরিবহন শ্রমিকরা সবধরণের যান চলাচল বন্ধ করে দেয়।

ভোলায় বীরশ্রেষ্ঠ মোস্তফা কামাল বাস টার্মিনালের সামনে ভোলা-চরফ্যাশন আঞ্চলিক মহাসড়কে কয়েকটি অটোরিকশা ও দুটি কাভার্ড ভ্যানে হামলা চালিয়ে ভাঙচুর করে শ্রমিকরা। এ ছাড়া তারা টায়ারে আগুন জ্বালিয়ে বিক্ষোভ করে এবং বিভিন্ন যানবাহন চলাচলে বাধা দেয়।

সিলেটে পরিবহন শ্রমিকদের নৈরাজ্যে ব্যক্তিগত গাড়িও চলতে পারেনি। নগরের সব মোড়ে অবস্থান নিয়ে সড়কে টায়ার জ্বালিয়ে এবং গাছের টুকরো ফেলে রাস্তা বন্ধ করে দেয় তারা। বিভিন্ন স্থানে রিকশা ও সিএনজিচালিত অটোরিকশা চলতেও বাধা দেয়। সড়কে পরিবহন না পেয়ে অনেকে সিলেট রেলস্টেশনে ভিড় করে। কিন্তু ট্রেনের টিকিট না পেয়ে অনেকে নিজের গন্তব্যে যেতে পারেনি।

নোয়াখালীতে শ্রমিক সংগঠনের নেতাকর্মীরা গণপরিবহনের পাশাপাশি সিএনজিচালিত, ব্যাটারিচালিত অটোরিকসাসহ যানবাহন চলাচলেও বাধা দিয়েছে। মাইজদীর পৌর বাজার, টাউন হল মোড়, পুরানা বাসস্ট্যান্ডসহ গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টে কয়েকটি গাড়ি চলাচলের চেষ্টা করলে আন্দোলনরত শ্রমিকরা তা থামিয়ে যাত্রীদের নামিয়ে দেয়। এ সময় শ্রমিকদের সঙ্গে যাত্রীদের বাগিবতণ্ডার সৃষ্টি হয়।

টাঙ্গাইলে পরিবহন শ্রমিকরা পিকেটিংয়ের সময় অটোরিকশার পাশাপাশি রিকশাও চলতে দেয়নি। এ ছাড়া ঢাকা-টাঙ্গাইল-বঙ্গবন্ধু সেতু মহাসড়ক ও টাঙ্গাইল-ময়মনসিংহ সড়কের বিভিন্ন স্থানে টায়ারে আগুন দিয়ে তারা বিক্ষোভ করে।

ময়মনসিংহের ভালুকায় ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কে লাঠিসোঁটা নিয়ে অবস্থান নিয়ে কোনো যান চলতে দেয়নি শ্রমিকরা। ত্রিশালের দরিরামপুর বাসস্ট্যান্ড মোড়ে টায়ারে আগুন জ্বালিয়ে বিক্ষোভ করে তারা। কয়েকটি সিএনজি অটোরিকশাও এ সময় ভাঙচুর করা হয়।

নাটোরে দূরপাল্লার যাত্রীদের আগে থেকে কেটে রাখা টিকিট বাতিল করা নিয়ে যাত্রীদের সঙ্গে বাগিবতণ্ডার ঘটনা ঘটে।

খুলনা নগরীসহ জেলার সড়ক-মহাসড়কে শ্রমিকরা বিকল্প যান চলাচলে বাধা দেয়। তারা সাধারণ যাত্রীদেরও নাজেহাল করে।

গাবতলী টার্মিনালে তিন দিন : ধর্মঘট প্রত্যাহারের আগ পর্যন্ত গতকাল গাবতলী বাস টার্মিনালসহ সব বাস টার্মিনাল ও বিভিন্ন স্থানের কাউন্টারগুলোয় ছিল নীরবতা। ছিল না যাত্রী, হকার। সকালে গাবতলী বাস টার্মিনালে দিগন্ত পরিবহনের বাস কাউন্টারের সামনে দেখা গেল এক পরিবার বসে আছে। ওই পরিবারের একজন তাজ মোহাম্মদ কবির বলেন, ‘তিন দিন ধরে এখানেই আছি। পরিবার নিয়ে এত দিন ঢাকায় থাকতাম। এখন আর ঢাকায় থাকব না। বাড়িভাড়া মিটিয়ে জিনিসপত্র নিয়ে একেবারে সাতক্ষীরার কালীগঞ্জে যাচ্ছিলাম। ধর্মঘটের কারণে দুর্ভোগে পড়ে বাস কাউন্টারেই থাকতে হচ্ছে। ’ তিনি জানান, ঢাকায় অন্য কোনো স্থানে তাঁদের থাকার জায়গা নেই।

প্রসঙ্গত, সড়ক দুর্ঘটনায় চলচ্চিত্র নির্মাতা তারেক মাসুদ ও গণমাধ্যম ব্যক্তিত্ব মিশুক মুনীরসহ পাঁচজন নিহত হওয়ার মামলায় গত ২২ ফেব্রুয়ারি চুয়াডাঙ্গা ডিলাক্সের চালক জামির হোসেনকে যাবজ্জীবন সাজা দেন মানিকগঞ্জের আদালত। এতে ওই দিন থেকেই চুয়াডাঙ্গায় বাস বন্ধ করে দেয় শ্রমিকরা। এরপর বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন শ্রমিক ফেডারেশনের খুলনা বিভাগীয় আঞ্চলিক কমিটি খুলনা বিভাগের ১০ জেলায় রবিবার থেকে অনির্দিষ্টকালের ধর্মঘট আহ্বান করে। গত সোমবার তারা ওই ধর্মঘট প্রত্যাহারের সিদ্ধান্ত নেয়। এর মধ্যেই সোমবার সাভারের এক নারীকে চাপা দিয়ে হত্যার দায়ে মীর হোসেন মীরু নামে এক ট্রাকচালকের মৃত্যুদণ্ড দেন ঢাকার আদালত। এ ঘটনার পর সোমবার রাতে গোপন বৈঠক করে ধর্মঘটে যায় পরিবহন শ্রমিকরা।


মন্তব্য