kalerkantho


মুক্তিযোদ্ধা আব্দুর রব

তেলিখালীর যুদ্ধ এখনো শরীরে শিহরণ জাগায়

নিয়ামুল কবীর সজল, ময়মনসিংহ   

১ মার্চ, ২০১৭ ০০:০০



তেলিখালীর যুদ্ধ এখনো শরীরে শিহরণ জাগায়

‘মুক্তিযুদ্ধে যে কয়টি যুদ্ধ করেছি সেগুলোর মাঝে ময়মনসিংহের হালুয়াঘাট উপজেলার সীমান্ত ছোঁয়া তেলিখালীর যুদ্ধের কথা মনে হলে এখনো শরীরে শিহরণ জাগে। এ অঞ্চলের একটি গুরুত্বপূর্ণ সম্মুখ যুদ্ধ ছিল সেটি। ওই যুদ্ধে ১২৪ জন পাক সেনা, ৮৫ জন রাজাকার ও ২৫ জন রেঞ্জার মারা গিয়েছিল। একজন পাক সেনা ও দুজন রাজাকার আত্মসমর্পণ করেছিল। সম্পূর্ণভাবে পরাস্ত হয়েছিল পাকবাহিনী, নির্মূল হয়েছিল তাদের দোসররা। বহু অস্ত্রশস্ত্র মুক্তিযোদ্ধাদের আয়ত্তে এসেছিল। যুদ্ধে আটজন মুক্তিযোদ্ধা ও ২১ জন মিত্রবাহিনীর সদস্য শাহাদাতবরণ করেন। ’

মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিচারণের সময় সবচেয়ে স্মরণীয় যুদ্ধ কোনটি—এ কথা জিজ্ঞেস করলে ময়মনসিংহের বীর মুক্তিযোদ্ধা আব্দুর রব তেলিখালী যুদ্ধের কাহিনী শোনান। ময়মনসিংহ জেলা মুক্তিযোদ্ধা সংসদের সাবেক কমান্ডার তিনি। বর্তমানে একাত্তরের ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটির জেলা শাখার সাধারণ সম্পাদক। এখন তাঁর বয়স ৬৫ বছর।

আব্দুর রব জানান, ওই সময় তিনি ছিলেন বিএ প্রথম বর্ষের ছাত্র। পড়াশোনা করতেন ফুলপুর ডিগ্রি কলেজে। বাড়ি ফুলপুরের পয়ারী গ্রামে। যুদ্ধের দামামায় আর ঘরে বসে থাকা হলো না। মে মাসের একদিন পথে বের হন, উদ্দেশ্য ভারতে পৌঁছানো। সেখানে ট্রেনিং নিয়ে মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেওয়া। নানা পথ ঘুরে সীমানা পেরিয়ে পৌঁছান ভারতে। যুব প্রশিক্ষণ কেন্দ্রে উপস্থিত হন। তারপর প্রশিক্ষণ নেন তোড়া ক্যাম্পে। জুন মাসে প্রশিক্ষণ শেষ হয়, যোগ দেন রণাঙ্গনে।

আব্দুর রব বলেন, তিনি মোট আটটি যুদ্ধে অংশ নিয়েছিলেন। তিনটি ছিল সম্মুখ যুদ্ধ, আর পাঁচটি গেরিলা যুদ্ধ। তাঁর প্রথম যুদ্ধটি ছিল নাগলা ব্রিজ ধ্বংস করার জন্য। আর সবচেয়ে স্মরণীয় ও শেষ যুদ্ধটি ছিল তেলিখালীর যুদ্ধ।

তেলিখালীর যুদ্ধ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, তাঁদের অবস্থান ছিল ভারতের সীমন্তবর্তী যাত্রাকুনা এলাকায়। বাংলাদেশের হালুয়াঘাটের বাঘাইতলার ঠিক উল্টো দিকে। পাহাড়ি এলাকা। সেখানে যৌথ বাহিনীর ব্যাটালিয়ন হেড কোয়ার্টার ছিল। অক্টোবরের শেষ সপ্তাহে হাই কমান্ড সিদ্ধান্ত নিল ঢাকা বিজয়ের। ঠিক করা হলো—ঢাকা বিজয়ের জন্য হালুয়াঘাট, ফুলপুর, ময়মনসিংহ হয়ে এগোতে হবে। এ লক্ষ্যে ভারতের ১৩ রাজপুত রেজিমেন্টের সঙ্গে মুক্তিযোদ্ধাদের সমন্বিত করা হলো।

আব্দুর রব বলেন, ‘আমাদের কমান্ডার ছিলেন আবুল হাশেম। মুক্তিযোদ্ধা ছিল ২০১ জন। ১৩ রাজপুত রেজিমেন্টের পাঁচটি কম্পানি ছিল। ২০১ জন মুক্তিযোদ্ধাকে পাঁচ ভাগে ভাগ করা হলো। দলগুলোর নাম দেওয়া হয় আলফা, ব্রেভো, চার্লি, ডেল্টা ও এডম। মুক্তিযোদ্ধারা প্রায় এক সপ্তাহ ভারতীয় বাহিনীর সঙ্গে যৌথ মহড়া দেয়। তবে তখন পর্যন্ত আমরা জানতাম না যে বাংলাদেশে এসে তেলিখালী ক্যাম্প আক্রমণ করতে হবে। আলফা গ্রুপের কমান্ডার ছিলেন নুরুল ইসলাম। ব্রেভোর কমান্ডার ছিলেন আতাউদ্দিন শাহ। চার্লির কমান্ডার ছিলেন হাফিজ উদ্দিন। ডেল্টার কমান্ডার ছিলেন হাবিলদার মেজবাহ। আর এডম গ্রুপের কমান্ডার ছিলাম আমি। প্রতিটি কম্পানিতে যোদ্ধা ছিল প্রায় এক শ জন। ’

২ নভেম্বর রাত ১১টা থেকে ১২টার মধ্যে পাঁচটি কম্পানিকেই যাত্রাকুনা স্কুল মাঠে হাজির করা হয় বলে তিনি জানান। সেখানে কিছু আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করা হয়। মুসলমানদের কোরআন ও হিন্দুদের গীতা স্পর্শ করে শপথ করানো হয় জীবনবাজি রেখে যুদ্ধ করার জন্য। রাতেই তেলিখালীর উত্তর দিক খালি রেখে অন্য তিন দিক ঘিরে পজিশন নেওয়া হয়। এ জন্য ঘণ্টা দুয়েক সময় লাগে। উত্তর দিকে ছিল আর্টিলারি গ্রুপ।

আব্দুর রব বলেন, ‘তেলিখালী ছিল ওই অঞ্চলে পাকবাহিনীর শক্তিশালী ঘাঁটি। সেখান থেকে তারা সীমান্ত এলাকা ও আশপাশে যুদ্ধ করত। হামলা করত মুক্তিবাহিনীর ওপর। এ ছাড়া, স্থানীয় লোকজনকে ওই ক্যাম্পে নিয়ে নির্যাতন করত তারা। মেয়েদের ধরে নিয়ে নির্যাতন চালাত, ধর্ষণ করত। স্বাধীনতাকামীদের বাড়িঘরে গিয়ে আগুন দিত। পাক সেনাদের ওই দলটি সীমান্তও পাহারা দিত, যাতে ভারত থেকে মুক্তিযোদ্ধারা বা ভারতীয় বাহিনীর সদস্যরা বাংলাদেশে ঢুকতে না পারে। ওই ক্যাম্পে অনেক রাজাকার এবং বন বিভাগের বেশ কিছু রেঞ্জার ছিল। ’

রাত ৩টার দিকে তেলিখালী ক্যাম্পে আক্রমণ শুরু হয় বলে তিনি জানান। জীবনবাজি রেখে যুদ্ধে নামে মুক্তিযোদ্ধারা। ক্যাম্পে অনেক বাংকার ছিল। সেসব বাংকারে পাকবাহিনী সুরক্ষিত ছিল। কিন্তু মুক্তিবাহিনী মৃত্যুকে উপেক্ষা করে অভিযান শুরু করে, বাংকারে গ্রেনেড চার্জ শুরু করে। গোলাগুলি আর আর্তচিৎকারে আকাশ-বাতাস প্রকম্পিত হলো। রক্তের স্রোত বয়ে গেল ক্যাম্প চত্বরে। পাকবাহিনীও ভারী ও আধুনিক অস্ত্র নিয়ে পাল্টা আক্রমণ চালাল। কিন্তু দেশের জন্য নিবেদিতপ্রাণ, সাহসী মুক্তিযোদ্ধাদের কাছে তারা পরাস্ত হলো। সকাল ৮টার দিকে ক্যাম্প পুরোপুরি দখল করে নেয় মুক্তিবাহিনী। এদিক-সেদিক ছড়িয়ে-ছিটিয়ে ছিল অনেক লাশ। যুদ্ধে ১২৪ জন পাকসেনা, ৮৫ জন রাজাকার ও ২৫ জন রেঞ্জার মারা যায়। একজন পাকসেনা ও দুজন রাজাকার আত্মসমর্পণ করে। দুজন মহিলার লাশও পাওয়া যায়।

আব্দুর রব বলেন, যুদ্ধে আটজন মুক্তিযোদ্ধা শহীদ হন। শাহাদতবরণ করেন ২১ জন মিত্রবাহিনীর সদস্য। নিহত মুক্তিযোদ্ধাদের নাম এখনো তাঁর মনে আছে। তাঁরা হলেন হালুয়াঘাটের ভূবনকূড়া ইউনিয়নের তেলিখালীর আক্তার হোসেন সরকার, ফুলপুরের হযরত আলী, ময়মনসিংহ শহরের বাঘমারার শাহজাহান বাদশা ও আলাউদ্দিন, ইপিআর সদস্য ওয়ালিউল্লাহ ও ইদ্রিস আলী, বেগুনবাড়ির রঞ্জিত গুপ্ত এবং জামালপুরের সরিষাবাড়ীর শওকত ওসমান (কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র)। হযরত আলী ছিলেন তাঁর ঘনিষ্ঠ সহযোদ্ধা। যুদ্ধ শুরুর আগে হযরত আলী বলেছিলেন, তিনি যদি মারা যান তাহলে লাশটি যেন তাঁর বাবার কাছে ফিরিয়ে দেওয়া হয়। কিন্তু তা সম্ভব হয়নি।

নিহত ২১ জন ভারতীয় সেনার শেষকৃত্য সম্পন্ন হয় ব্যাটালিয়ন হেড কোয়ার্টারে ভারতীয় সেনাবাহিনীর পূর্বাঞ্চলীয় কমান্ডার লে. জেনারেল জগজিৎ সিং অরোরার উপস্থিতিতে। আব্দুর রব জানান, তিনিও সে অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন।

বীর মুক্তিযোদ্ধা আব্দুর রব বলেন, ওই যুদ্ধ ছিল মরণপণ এক যুদ্ধ। কে মারা যাবে, কে জীবিত থাকবে—কোনো নিশ্চয়তা ছিল না। মুক্তিযোদ্ধারা সবাই জীবন বাজি রেখে যুদ্ধ করেন। ওই যুদ্ধ জয়ের মধ্য দিয়ে সীমান্তের ওই এলাকায় পাকবাহিনী সম্পূর্ণ বিধ্বস্ত হয়। ময়মনসিংহ বিজয়ের পথ সহজ হয়। ওই এলাকায় সেটিই ছিল সবচেয়ে বড় যুদ্ধ।

আব্দুর রব জানান, সেখানে সাতজন মুক্তিযোদ্ধার কবর রয়েছে—তেলিখালী বিওপিসংলগ্ন স্থানে। ছোট একটি স্মৃতিফলক আছে। একটি বড় স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণ করলে ভালো হয় বলে তাঁর অভিমত। লোকজন যাতে সহজে সেখানে যেতে পারে, ওই যুদ্ধের তথ্য পেতে পারে তার ব্যবস্থাও করা উচিত।


মন্তব্য