kalerkantho


রিজার্ভের অর্থে বড় প্রকল্প বাস্তবায়নের নির্দেশ প্রধানমন্ত্রীর

নিজস্ব প্রতিবেদক   

১ মার্চ, ২০১৭ ০০:০০



রিজার্ভের অর্থে বড় প্রকল্প বাস্তবায়নের নির্দেশ প্রধানমন্ত্রীর

পদ্মা সেতুসহ বড় উন্নয়ন প্রকল্পগুলোর কাজ আগামী সাধারণ নির্বাচনের আগেই শেষ করতে চাইছে সরকার। একই সঙ্গে তৃণমূল পর্যায়ের সরু রাস্তা, সেতু-কালভার্ট থেকে শুরু করে সব ধরনের উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে গতি বাড়াতে হাত খুলে খরচ করার সুযোগ দিচ্ছে।

প্রতিবছর যেখানে মূল বাজেটে বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচিতে (এডিপি) দেওয়া বরাদ্দের অর্থ এডিপি সংশোধনকালে কমানোর জন্য ফাঁকফোকর খোঁজে সরকার, এবার সেই চিত্র নেই। দেশের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো এবার সংশোধনের সময় এডিপির বরাদ্দ কাটছাঁট না করার সিদ্ধান্ত হয়েছে। উন্নয়ন কর্মকাণ্ড বাস্তবায়ন করতে প্রয়োজনে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ থেকে অর্থ নিয়ে খরচ করার নির্দেশও দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।     

গতকাল মঙ্গলবার জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের (এনইসি) সভায় চলতি ২০১৬-১৭ অর্থবছরের সংশোধিত এডিপি অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। তাতে মূল এডিপিতে যা বরাদ্দ ছিল, তা কোনো রকম কাটছাঁট না করে বহাল রাখা হয়েছে। অবশ্য বরাদ্দের বেলায় কিছুটা পরিবর্তন আনা হয়েছে। এ বছরের মূল এডিপিতে বরাদ্দ রাখা হয়েছিল এক লাখ ১০ হাজার ৭০০ কোটি টাকা। এর মধ্যে রাষ্ট্রীয় কোষাগার থেকে ৭০ হাজার ৭০০ কোটি টাকা এবং উন্নয়ন সহযোগীদের কাছ থেকে ৪০ হাজার কোটি টাকা জোগান দেওয়ার কথা ছিল। কিন্তু উন্নয়ন সহযোগী সংস্থা থেকে সাত হাজার কোটি টাকা কাটছাঁট করে সরকারি কোষাগার থেকে সমপরিমাণ টাকা জোগান দেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়েছে গতকালের এনইসি সভায়।

ফলে সংশোধিত এডিপি অপরিবর্তিত রয়ে গেছে। অথচ বিগত বছরগুলোতে এডিপি সংশোধনকালে চার হাজার থেকে পাঁচ হাজার কোটি টাকা পর্যন্ত বরাদ্দ কমিয়েছে সরকার।

এনইসি বৈঠক শেষে এক সংবাদ সম্মেলনে পরিকল্পনামন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল বলেন, ‘দেশের ইতিহাসে এটা অস্বাভাবিক ঘটনা। এর আগে কখনো সংশোধিত এডিপি অপরিবর্তিত রাখা হয়নি। প্রতিবছরই কিছু না কিছু বরাদ্দ কমানো হয়েছে। শুধু এবারই এডিপি থেকে এক টাকাও কমানো হয়নি। যেহেতু আমাদের এডিপি বাস্তবায়ন হার ভালো, আমরা আশা করছি, বছরের বাকি সময়ে অবশিষ্ট টাকা খরচ করতে পারব। ’

উন্নয়ন সহযোগীদের কাছ থেকে যে টাকা পাওয়ার কথা ছিল সেটা পাওয়া এবং সরকারি টাকা খরচ করতে মন্ত্রণালয়গুলোর অতি উৎসাহী হওয়ার কারণ জানতে চাইলে পরিকল্পনামন্ত্রী কালের কণ্ঠকে বলেন, উন্নয়ন সহযোগীদের টাকা পেতে অনেক প্রক্রিয়া অনুসরণ করতে হয়। এতে করে অনেক সময় অপচয় হয়। সরকারি কোষাগারের টাকা পেতে ততটা প্রক্রিয়া অনুসরণ করতে হয় না। সে কারণে সরকারি টাকা পেতে সবাই আগ্রহী।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বক্তব্যের উদ্ধৃতি দিয়ে বৈঠকে উপস্থিত একাধিক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানান, গত বছর জুলাইয়ে রাজধানীর গুলশানে জঙ্গি হামলার কারণে এডিপি বাস্তবায়ন ব্যাহত হয়েছে। ওই সময় বড় বড় প্রকল্প বাস্তবায়ন থেকে হাত গুটিয়ে অনেক বিদেশি বাংলাদেশ ছেড়ে চলে যান। এ কারণে আশানুরূপ হারে এডিপি বাস্তবায়িত হয়নি। যারা বাড়তি টাকা খরচ করতে পারবে, তাদের চাহিদামাফিক বরাদ্দ দেওয়া হবে বলে জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী। গতকালের এনইসি সভায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা রিজার্ভের টাকা দিয়ে বড় উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়ন করার নির্দেশ দেন।

বৈঠকে উপস্থিত সূত্র মতে, প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, ‘বড় বড় প্রকল্প বাস্তবায়নে আমরা উন্নয়ন সহযোগীদের কাছ থেকে ঋণ নেই। সে ঋণের আবার সুদ পরিশোধ করতে হয়। ফলে টাকার বড় একটি অংশ উন্নয়ন সহযোগীদের দিয়ে দিতে হয়। আমাদের রিজার্ভ এখন ৩২ বিলিয়ন (তিন হাজার ২০০ কোটি) ডলারের ওপরে। আমরা উন্নয়ন সহযোগীদের কাছ থেকে ঋণ না নিয়ে বড় বড় প্রকল্প বাস্তবায়নে এখন থেকে রিজার্ভের টাকা খরচ করতে পারি। এতে করে নিজের দেশের টাকা দেশেই থাকবে। ঋণের সুদ নেবে বাংলাদেশ ব্যাংক। ’ প্রধানমন্ত্রীর এমন নির্দেশনার পর বৈঠকে উপস্থিত বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর ফজলে কবির বলেন, বড় প্রকল্প বাস্তবায়নে যে টাকা দরকার, রিজার্ভের টাকা থেকে বাংলাদেশ ব্যাংক তা দিতে প্রস্তুত আছে। প্রকল্প বাস্তবায়নে এ বছরের জন্য রিজার্ভ থেকে ২০০ কোটি ডলার রাখা হয়েছে বলে জানান কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নর।

মন্ত্রিসভা সম্প্রতি সিদ্ধান্ত নিয়েছে, প্রতিবছর বন্ড ছেড়ে ২০০ কোটি ডলার নেওয়া হবে, যা অবকাঠামো খাতে খরচ হবে।

প্রতিবছর এডিপিতে বড় আকারের টাকা রেখে চমক দেখান অর্থমন্ত্রী। অবশ্য বছরের মাঝামাঝি সময়ে গিয়ে খরচ করতে না পারার আশঙ্কায় মন্ত্রণালয় ও বিভাগগুলো বড় একটি অংশ ফেরত দিতে শুরু করে। এ বছরও তার ব্যতিক্রম হয়নি। ২০১৬-১৭ অর্থবছরে মূল এডিপির আকার ছিল এক লাখ ১০ হাজার ৭০০ কোটি টাকা। এর মধ্যে রাষ্ট্রীয় কোষাগার থেকে ৭০ হাজার ৭০০ কোটি টাকা এবং উন্নয়ন সহযোগীদের কাছ থেকে ৪০ হাজার কোটি টাকা জোগান দেওয়ার কথা ছিল। কিন্তু মূল এডিপি থেকে সাত হাজার কোটি টাকা ফেরত দেওয়ার প্রস্তাব করে কয়েকটি মন্ত্রণালয় ও বিভাগ। এই টাকার পুরোটাই উন্নয়ন সহযোগীদের কাছ থেকে পাওয়ার কথা ছিল। প্রতিবারের ধারাবাহিকতায় এবারও এডিপির আকার কমানোর উদ্যোগ নেয় অর্থ বিভাগ ও পরিকল্পনা কমিশন।

গতকালের এনইসি সভায় সাত হাজার কোটি টাকা কমিয়ে সংশোধিত এডিপি উত্থাপন করে পরিকল্পনা কমিশন। বৈঠক সূত্র মতে, অর্থ বিভাগ ও পরিকল্পনা কমিশন সংশোধিত এডিপির আকার এক লাখ চার হাজার ২০০ কোটি টাকার প্রস্তাব উত্থাপন করলে কয়েকটি মন্ত্রণালয় ও বিভাগ তাদের জন্য বাড়তি অর্থ বরাদ্দের প্রস্তাব করে। স্থানীয় সরকার সচিব আবদুল মালেক তাঁর মন্ত্রণালয়ের বিপরীতে বাড়তি পাঁচ হাজার কোটি টাকা দেওয়ার দাবি জানান। এ ছাড়া বিদ্যুৎসচিব ড. আহমেদ কাউকাউস তাঁর মন্ত্রণালয়ের জন্য বাড়তি তিন হাজার কোটি, গণপূর্তসচিব বাড়তি দুই হাজার ২০০ কোটি, সেতু বিভাগের সচিব খন্দকার আনোয়ারুল ইসলাম বাড়তি এক হাজার ৩০০ কোটি টাকা দাবি করেন।

সবার বক্তব্য শোনার পর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, উন্নয়ন সহযোগীদের যে সাত হাজার কোটি টাকা ফেরত যাচ্ছে, সরকারি কোষাগার থেকে সেই টাকা জোগান দেওয়া হবে। এডিপি থেকে টাকা কাটছাঁট হবে না। যাদের বাড়তি বরাদ্দের চাহিদা আছে আগামী এক সপ্তাহের মধ্যে অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত এবং পরিকল্পনামন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামালকে বসে মন্ত্রণালয়গুলোর চাহিদার আলোকে বরাদ্দ দেওয়ার নির্দেশ দেন প্রধানমন্ত্রী।


মন্তব্য