kalerkantho


সরকারকে কাবু রাখতেই ‘ধর্মঘট-সন্ত্রাস’

পার্থ সারথি দাস   

১ মার্চ, ২০১৭ ০০:০০



সরকারকে কাবু রাখতেই ‘ধর্মঘট-সন্ত্রাস’

সড়কপথের বেসরকারি পরিবহনের মালিক-শ্রমিকদের গত চার দশকেও নিয়ন্ত্রণে আনতে পারেনি কোনো সরকার। উল্টো বিদেশি সংস্থাগুলোর পরামর্শে সড়ক বাড়িয়ে সরকারই এসব মালিক-শ্রমিকের ঔদ্ধত্যের খুঁটি আরো শক্ত করে তুলেছে। সরকারি অর্থে নির্মিত সড়কে রাষ্ট্রায়ত্ত বাস চালাতেও এখন চাঁদা দিতে হয় বেসরকারি পরিবহন নেতাদের। এ খাতের শ্রমিকরা দীর্ঘদিন সড়কে প্রাণহানি ঘটানোর মতো অপরাধ করেও কৌশলে রেহাই পেয়ে গেছে। পরিবহন শ্রমিকদের কিছু হলেই গাড়ি বন্ধ করে দেওয়া হয়। এমনকি আদালত রায় দিলেও ভিন্ন ভিন্ন সংগঠনের পরিবহন শ্রমিকরা এক হয়ে সড়কে গাড়ি চলাচল বন্ধ করে দেয়। সর্বশেষ দুই পরিবহন শ্রমিককে আদালত সাজা দেওয়ার প্রতিবাদে গাড়ি বন্ধ রেখে ধর্মঘট করছে পরিবহন শ্রমিকরা।

জানা গেছে, চালকের সাজা মওকুফ, আইন অমান্য করে অতিরিক্ত পণ্য পরিবহনের সুযোগ দেওয়াসহ বিভিন্ন দাবিতে গত আট মাসে স্থানীয় ও জাতীয়ভাবে ২১ বার ধর্মঘট করেছে পরিবহন শ্রমিকরা।

জানা যায়, সড়কে প্রাণহানি কমাতে সরকার উপযুক্ত সড়ক পরিবহন আইন করতে চাইলেও এক দশক ধরে তা পারছে না। সড়কে শৃঙ্খলার জন্য ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করা হলেও রাজধানীতে গাড়ি বন্ধ রেখে ধর্মঘট ডাকারও নজির রয়েছে। পরিবহন শ্রমিক সংগঠনগুলোর তথ্য অনুযায়ী, চার দশক আগে থেকেই ধর্মঘটের নামে এই নৈরাজ্য চালিয়ে যাচ্ছে পরিবহন খাতের শ্রমিকরা।

পেছন থেকে তাদের মদদ দেন পরিবহন মালিকরা।

২০১১ সালের ১৩ আগস্ট ঢাকা-আরিচা মহাসড়কে প্রাণ হারান বিশিষ্ট চলচ্চিত্রকার তারেক মাসুদ এবং শিক্ষক ও সাংবাদিক মিশুক মুনীরসহ পাঁচজন। তাঁদের প্রাণহানির জন্য দায়ী বাসচালক জামির হোসেনকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দিয়েছেন আদালত। এরপর পরিবহন শ্রমিকরা বিক্ষোভ শুরু করে। দণ্ডপ্রাপ্ত চালকের পক্ষে অবস্থান নিয়ে চুয়াডাঙ্গার পরিবহন শ্রমিকরা প্রথম দফায় ধর্মঘট শুরু করেছিল। তারপর গত রবিবার বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন শ্রমিক ফেডারেশনের ইঙ্গিত পেয়ে খুলনা অঞ্চলের ১০ জেলায় ধর্মঘট শুরু করে পরিবহন শ্রমিকরা। সাভারে ট্রাকচাপায় এক নারীকে হত্যার দায়ে সোমবার ঢাকার এক আদালত রায়ে ট্রাকচালক মীর হোসেনকে মৃত্যুদণ্ড দেন। এরপর গতকাল মঙ্গলবার সকাল থেকেই পরিবহন শ্রমিকরা দেশব্যাপী ধমর্ঘটের ডাক দেয়।

সূত্র জানায়, সোমবার রাতে ঢাকায় খুলনা অঞ্চলের ধর্মঘটের বিষয়ে বৈঠক হয়। পরিবহন মালিক ও শ্রমিক পক্ষের শীর্ষস্থানীয় নেতারা বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন। সভা চলা অবস্থায়ই মীর হোসেনের মৃত্যুদণ্ডের রায়ের খবর জানাজানি হয়। এতে উপস্থিত শ্রমিকরা ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠে। একপর্যায়ে ঢাকাসহ সারা দেশে পরিবহন শ্রমিকরা কর্মবিরতিতে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়।

এর আগেও দেখা গেছে, আদালত যেকোনো শাস্তি দিলেই পরিবহন শ্রমিকরা গাড়ির চাকা বন্ধ করে দেয়। আবার অদক্ষ চালকদের পরীক্ষা ছাড়া ড্রাইভিং লাইসেন্স না দিলে কিংবা নিষিদ্ধ নছিমন-করিমন রাস্তায় চলতে না দিলেও ধর্মঘট শুরু করে তারা। জনদুর্ভোগ কমাতে সরকার পরে দাবি বিবেচনার আশ্বাস দিলে ধর্মঘট তুলে নেওয়া হয়। বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন শ্রমিক ফেডারেশনের সাধারণ সম্পাদক ওসমান আলী প্রায়ই সরকারের সঙ্গে তাঁদের সংগঠনের বহু চুক্তি হয়েছে উল্লেখ করে বলেন, সেসব চুক্তি কার্যকর হয়নি। এ নিয়ে নানা সভায় তিনি ক্ষোভও প্রকাশ করেছেন।

বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতির মহাসচিব মো. মোজাম্মেল হক চৌধুরী বলেন, সরকার চুক্তি করে সাময়িকভাবে তাদের (পরিবহন শ্রমিক) ক্ষান্ত করে। এতে উল্টো তারা প্রশ্রয় পেয়েছে। এখন ধর্মঘট ডেকে তারা আদালতের রায়ের বিরুদ্ধেও অবস্থান নিচ্ছে বলে মনে হচ্ছে। তাদের এ স্পর্ধার কারণ অতীতের সরকারি তোষণনীতি।  

নিরাপদ সড়ক চাই-এর চেয়ারম্যান ইলিয়াস কাঞ্চন বলেন, রাজনৈতিক দলগুলো সড়কে গাড়ি বন্ধ রাখে, গাড়ি ভাঙচুর করে মানুষের দাবি রক্ষার নামে। আর পরিবহন মালিক-শ্রমিক নেতারা নিজেদের অন্যায় স্বার্থ রক্ষার জন্য এক হয়ে সড়কে ধর্মঘটের রাজনীতিতে নামে।   

ইলিয়াস কাঞ্চন বলেন, শক্তি দেখিয়ে সরকারকে কাবু রাখতে পরিবহন শ্রমিকরা ধর্মঘট করে চলেছে। ১৯৮৩ সালেও ধর্মঘট করা হয়েছিল উল্লেখ করে তিনি বলেন, সড়ক দুর্ঘটনার মামলায় সাজা কমিয়ে আনতে পরিবহন শ্রমিকরা ধর্মঘট ও আন্দোলন করেছিল। সড়ক দুর্ঘটনার মামলা আগে ছিল জামিন অযোগ্য, সেটি জামিন যোগ্য করা হয়েছে এভাবে রাস্তায় শক্তি দেখিয়ে। সরকার প্রস্তাবিত সড়ক পরিবহন আইনে সড়কে প্রাণহানি ঘটানোর অপরাধের জন্য সর্বোচ্চ শাস্তি রাখার প্রস্তাব করা হয়েছিল ১০ বছর। পরে তা কমানো হয় ওই শক্তির কারণে। এখন প্রস্তাবিত আইনে এসংক্রান্ত অনুচ্ছেদই রাখা হচ্ছে না।  

জানা যায়, সড়ক দুর্ঘটনায় কারো মৃত্যু হলে বর্তমানে দণ্ডবিধির ৩০৪ (খ) ধারায় মামলা করা হয়। বিচারও হয় এ ধারায়ই। সড়ক দুর্ঘটনাজনিত মৃত্যুর ঘটনায় আগে ৩০৪ ধারায় বিচার করা হতো। ১৯৮৫ সালে পরিবহন মালিক-শ্রমিকরা আন্দোলন করার পর ৩০৪ ধারায় বিচার বন্ধ হয়। ৩০৪ (খ) ধারায় শাস্তির পরিমাণ ছিল সাত বছরের কারাদণ্ড। তাও কমিয়ে তিন বছরের কারাদণ্ডের বিধান করে ওই আইন সংশোধন করা হয়। কিন্তু কোনো সংশোধনীতেই বলা হয়নি যে ৩০৪ ধারায় চালকদের বিচার করা যাবে না। অথচ ১৯৮৫ সালের পর সড়ক দুর্ঘটনাজনিত মৃত্যুর ঘটনায় জড়িতদের বিরুদ্ধে এ ধারায় কোনো মামলাই করা হয়নি।

এরশাদ সরকারের সময় একজন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর ছেলের গাড়ি ছড়াকার বাপি শাহরিয়ারকে চাপা দিয়ে হত্যা করেছিল। তারপর সাজার মেয়াদ কমানো হয়েছিল। বেপরোয়া গাড়ি চালানোর জন্য ১৯৯০ সালের আগেও এক বছর সাজার বিধান ছিল। ১৯৯০ সালের এক সংশোধনীতে সাজা কমিয়ে ছয় মাস করা হয়ছিল। জরিমানা কমিয়ে করা হয়ছিল ৫০০।

সড়ক দুর্ঘটনাসংক্রান্ত মামলায় দোষীদের সর্বোচ্চ শাস্তি তিন বছরের কারাদণ্ড। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, এটি লঘু আইন। আইনে দোষী চালকদের মৃত্যুদণ্ডের বিধান রাখা উচিত। ১৯৮৮ সালে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এ ধরনের একটি প্রস্তাবও তৈরি করেছিল। কিন্তু পরিবহন শ্রমিকদের চাপে ওই প্রক্রিয়া ভেস্তে যায়। ১৯৮৮ সালের মার্চে রাজধানীর ফার্মগেটে জিপযাত্রী বিমানবাহিনীর তিন কর্মকর্তা বাসের সঙ্গে সংঘর্ষে নিহত হন। এরপর তৎকালীন সরকার বিশেষ ট্রাইব্যুনাল গঠন করে। একপর্যায়ে বাসের চালক, কন্ডাক্টর ও হেলপারের ফাঁসির রায়ও হয়। প্রতিবাদে সড়ক পরিবহন মালিক শ্রমিক ঐক্য পরিষদ লাগাতার আন্দোলনে নামে। একপর্যায়ে রাষ্ট্রপতির কাছ থেকে দণ্ড মওকুফ করিয়ে নেওয়া হয়।

ওই আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন শ্রমিক ইউনিয়নের ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক ওসমান আলী কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘অনেক সময় গাড়ির ত্রুটির জন্য সড়ক দুর্ঘটনা ঘটে। তা সত্ত্বেও সব দোষ দেওয়া হয় চালকদের। আইনে মালিকদের শাস্তির বিধান রাখার জন্য আমরা সর্বশেষ ২০০৬ সালে যোগাযোগ মন্ত্রণালয়ে একটি প্রস্তাব দেই, কিন্তু তাতে কোনো ফল হয়নি। ’ 

দুর্ঘটনা গবেষণা ইনস্টিটিউটের পরিসংখ্যান পর্যালোচনায় দেখা গেছে, শতকরা ৮৩ ভাগ অপরাধী দুর্ঘটনার পরই পালিয়ে যায় কিংবা পুলিশের খাতায় ‘পলাতক’ থাকে। তার নেপথ্যে থাকে পরিবহন নেতা ও পুলিশের ঘুষ-চুক্তি।

মন্ত্রীরাও সংক্ষুব্ধ : দেশজুড়ে সড়কে পরিবহন ধর্মঘট আহ্বানে সরকারের মন্ত্রীরাও সংক্ষুব্ধ। এ ধর্মঘটকে ‘দুঃখজনক’ মন্তব্য করে আইনমন্ত্রী আনিসুল হক গতকাল সচিবালয়ে বলেছেন, ‘তাঁদের (পরিবহন শ্রমিক) উদ্দেশে বলতে চাই, জনগণকে কষ্ট না দিয়ে আপনারা আদালতে এসে আপনাদের বক্তব্য তুলে ধরেন। আপনাদের বক্তব্য যদি যুক্তিসংগত হয়, তবে তা দেখা হবে। ’

ধর্মঘটে আদালত অবমাননা হচ্ছে কি না, জানতে চাইলে আইনমন্ত্রী বলেন, এটি আদালতের বিবেচ্য বিষয়।

সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রী ওবায়দুল কাদের পরিবহন শ্রমিকদের ধর্মঘট অযৌক্তিক আখ্যা দিয়ে তা প্রত্যাহারের আহ্বান জানিয়েছেন। গতকাল বিকেলে ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশন মিলনায়তনে একটি অনুষ্ঠানের ফাঁকে তিনি এ আহ্বান জানান।

ওবায়দুল কাদের বলেন, ‘আদালতের রায়ের সঙ্গে জনগণের কোনো সম্পৃক্ততা নেই। তাই এ রায়ে জনগণ কেন ভোগান্তিতে পড়বে? কাজেই আপনাদের (পরিবহন শ্রমিক) এ অযৌক্তিক ধর্মঘট জনস্বার্থে দ্রুত প্রত্যাহার করে নেওয়া উচিত। ’


মন্তব্য