kalerkantho

ভয়ংকর এমপি আসলাম

মিরপুরজুড়ে দখলদারি সন্ত্রাস চাঁদাবাজি

নিজস্ব প্রতিবেদক   

১ মার্চ, ২০১৭ ০০:০০



ভয়ংকর এমপি আসলাম

ঢাকা-১৪ আসনের সরকারদলীয় সংসদ সদস্য আসলামুল হক নির্বাচিত হওয়ার পরপরই মেতে ওঠেন সরকারি ও ব্যক্তিমালিকানার জমি দখলে। রাজধানীর মিরপুরের শাহ আলী, মাজার রোড, বেড়িবাঁধ, গাবতলী, দারুসসালামসহ নিজের নির্বাচনী এলাকায় যেখানে সরকারি জমি পড়ে থাকতে দেখেছেন, সেখানেই থাবা বসিয়েছেন এমপি আসলাম; মালিকানা প্রতিষ্ঠা করে নিজের আয়ত্তে নিয়েছেন সেই জমি। তুরাগ নদের অংশ দখল করে গড়ে তুলেছেন নিজের মালিকানাধীন ‘মায়িশা গ্রুপ’-এর একাধিক প্রতিষ্ঠান। এ ছাড়া সিটি করপোরেশনের ঠিকাদারিও নিয়ন্ত্রণ করাচ্ছেন শ্যালক মনসুরকে দিয়ে। আর নিজের তৈরি ১৫ সদস্যের বাহিনী দিয়ে চলে তাঁর এলাকা শাসন। আপন বড় ভাই মফিজুল হক বেবুকে দিয়ে নিয়ন্ত্রণ করেন গাবতলী বাস টার্মিনাল। সরেজমিন অনুসন্ধানে ও এলাকাবাসীর অভিযোগ থেকে এমপি আসলামের অপকর্মের এসব তথ্য পাওয়া গেছে। তবে তাঁর নিজস্ব বাহিনীর ভয়ে এলাকার সাধারণ মানুষ প্রকাশ্য মুখ খুলতে সাহস পায় না।

সরকারি-বেসরকারি জমিতে থাবা : অনুসন্ধানে জানা যায়, এমপি আসলাম ক্ষমতায় আসার পর প্রথম স্থানীয় বসুপাড়ায় এক বৃদ্ধার প্লট দখল করে আলোচনায় আসেন। এরপর আনসার ক্যাম্প-সংলগ্ন গণপূর্তের পুকুর ভরাট, বুদ্ধিজীবী কবরস্থান-সংলগ্ন তিন একর জলাশয় ভরাট, দারুসসালাম থানার (নতুন জায়গা) পাশে ১৫ কাঠা জমি দখল, মাজার রোডের মাথায় বাতেন নগরের ‘গাবতলী মাঠ’ দখলসহ একাধিক জমি নিজের আয়ত্তে নেন। সম্প্রতি ডিএনসিসি কর্তৃপক্ষ তাদের মালিকানাধীন গাবতলী পশুর হাট-সংলগ্ন প্রায় ৫২ একর জমি নিয়ে জরিপ কাজ শুরু করে।

সেখানে এমপি আসলামের ঘনিষ্ঠ লোকজন মূল্যবান জমি দখল করে ইট-বালু ও পাথরের দোকান বসিয়েছে। সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, সেখানে ডিএনসিসি উচ্ছেদ কার্যক্রম চালাতে পারছে না এমপির সবুজ সংকেত পায়নি বলে।

২০১২ সালে মিরপুরের সরকারি বাঙলা কলেজের তিন বিঘা জমি দখলের অভিযোগ ওঠে এমপি আসলামের বিরুদ্ধে। এই ঘটনায় হিউম্যান রাইটস অ্যান্ড পিস ফর বাংলাদেশ (এইচআরপিবি) হাইকোর্টে রিট আবেদন করে। ওই আবেদনে বলা হয়, আওয়ামী লীগ নেতা ও সংসদ সদস্য আসলামুল হক ঐতিহ্যবাহী সরকারি বাঙলা কলেজের প্রায় চার বিঘা জমি নিজ কম্পানি মায়িশা গ্রুপের নামে দখলে নিয়েছেন। ব্যক্তিমালিকানাধীন কিছু জমির সঙ্গে কলেজের জমি মিশিয়ে ইতিমধ্যে মায়িশা গ্রুপের সাইনবোর্ডও লাগানো হয়েছে। ওই আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে ২০১২ সালের ৯ মে আসলামুল হককে তলব করেন হাইকোর্ট। ১৬ মে তাঁকে হাজির হয়ে এ অভিযোগের বিষয়ে ব্যাখ্যা দিতে বলা হয়। একই সঙ্গে বিশেষজ্ঞ কমিটির মাধ্যমে বাঙলা কলেজের জমির জরিপ করে ১৬ মের মধ্যে আদালতে প্রতিবেদন দাখিল করতে ঢাকার জেলা প্রশাসককে নির্দেশ দেওয়া হয়। আসলামুল হক পরে হাইকোর্টে হাজির হয়ে নিজেকে ব্যবসায়ী পরিচয় দিয়ে বলেছিলেন, ‘পারিবারিকভাবে তাঁর পাঁচ-ছয় হাজার কোটি টাকার সম্পত্তি রয়েছে। ’

২০১০ সালের অক্টোবরে কল্যাণপুর খালের অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদে বাধা দিয়ে বেশ সমালোচনার মুখে পড়েন এমপি আসলাম। গণমাধ্যমে প্রচারিত খবরে বলা হয়, কল্যাণপুর খালে গড়ে ওঠা অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ করতে পারেনি ওয়াসা ও জেলা প্রশাসন। সংসদ সদস্যের আপত্তির কারণে ম্যাজিস্ট্রেট ও পুলিশ ফিরে যায়। এ সময় ভ্রাম্যমাণ আদালতের সঙ্গে এমপি আসলামের দুর্ব্যবহার করার বিষয়টিও সবার মুখে মুখে উঠে আসে।

শুধু সরকারি জমি নয়, ব্যক্তিমালিকানাধীন জমি দখলেরও অভিযোগ আছে আসলামুলের বিরুদ্ধে। অভিযোগ আছে, বুদ্ধিজীবী করবস্থানসংলগ্ন ওয়াক্ফ এস্টেটের জমিতে বালু ভরাট করেছেন এমপি আসলাম। কিন্তু এ জমিটি মতিউর রহমান নামের এক ব্যক্তিকে বরাদ্দ দেওয়া হয়েছিল। সেখানে মতিউর রহমান আর ঢুকতে পারেননি। এ বিষয়ে ভুক্তভোগী মতিউর রহমান অভিযোগ নিয়ে গেলে দারুসসালাম থানার ওসি সেলিমুজ্জামান তা আমলে নেননি বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। এ বিষয়ে ওসি সেলিমুজ্জামান কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আমার জানা মতে এমন কেউ এমপি সাহেবের বিরুদ্ধে অভিযোগ নিয়ে আসেনি। ’

নাম প্রকাশ না করার শর্তে মাজার রোডের একাধিক বাসিন্দা কালের কণ্ঠকে বলেন, আসলাম ২০০৮ সালে প্রথমবার এমপি হওয়ার পর লালকুঠি এলাকায় আব্দুল লতিফের প্লটটি দখল করেন। লতিফ স্বেচ্ছাসেবক লীগের সক্রিয় কর্মী হয়েও তাঁর সেই প্লট রক্ষা করতে পারেননি। লতিফ ও তাঁর বাবা দীর্ঘ সময় থানা পুলিশের দুয়ারে ঘুরেও মামলা বা জিডি করতে পারেননি। এই কষ্টে লতিফের বাবা মারা যান।

জানা যায়, গত বছর হাউস বিল্ডিং রিসার্চ ইনস্টিটিউটের (এইচবিআরআই) ভেতরে থাকা বস্তির শত শত বাসিন্দাকে উচ্ছেদ করেন আসলামুল হক। সরকারি সংস্থাকে সামনে রেখে এই সংসদ সদস্য তাঁর নিজস্ব লোকজনের মাধ্যমে বস্তির বাসিন্দাদের ঘরছাড়া করেন। একপর্যায়ে হামলা-ভাঙচুর করে এবং আগুন দিয়ে বস্তির সেই জায়গা এমপি নিজেই দখলের চেষ্টা করেন বলে অভিযোগ তোলে স্থানীয়রা। তবে উচ্চ আদালতের স্থগিতাদেশের কারণে পুরোপুরি সফল হননি এমপি আসলাম।

দশম সংসদ নির্বাচনের আগে নির্বাচন কমিশনে দাখিল করা হলফনামার তথ্যের বাইরেও আসলামুল হকের জমি থাকার তথ্য মেলে। এমন ৭৬ বিঘা (২৫ একরের অধিক) জমি তিনি গত বছর পত্রিকায় বিজ্ঞপ্তি দিয়ে বিক্রিও করেছেন। এর মধ্যে তাঁর মালিকানাধীন মায়িশা গ্রুপের নামে থাকা সাভারে (মহাসড়কের পাশে) ৫৭ বিঘা, আমিনবাজারে (মহাসড়কের পাশে) ১৪ বিঘা, মিরপুর এশিয়ান হাইওয়ের পাশে ৭১ কাঠা ও দারুসসালাম থানার গৈদারটেক এলাকায় ৩১ কাঠা জমি গত বছর বিক্রি করেন।

২০১০ সালের ২৮ অক্টোবর ড. আমিনুল ইসলাম নামের এক আমেরিকাপ্রবাসী এমপি আসলামুল হকের বিরুদ্ধে জাতীয় প্রেস ক্লাবে সংবাদ সম্মেলন করেন। তিনি অভিযোগ করেন, দারুসসালামের নন্দারবাগ মৌজায় পৌনে ১ শতাংশ জমি কিনে কেয়ারটেকারের অধীনে রেখে বিদেশে যান তিনি। ১৯৭৯ সালে তিনি আমেরিকায় পাড়ি জমান। ওই বছর তিনি তাঁর ভাগ্নি হোসনে আরা বেগম ও তাঁর স্বামী জি এম আহমেদকে সঙ্গে নিয়ে পাশের ‘বি’ প্লটে ৪৬ শতাংশ জমি কেনেন। আমিনুলের অভিযোগ, তাঁকে না জানিয়ে হোসনে আরা ও তাঁর স্বামী ওই জমি এমপি আসলামুলের কাছে বিক্রি করতে বাধ্য হন। আমিনুল নিজে জমি বিক্রি করতে না চাওয়ায় তাঁর সাইনবোর্ড ফেলে সেখানে নিজের নামে সাইনবোর্ড লাগিয়ে দেন এমপি আসলাম।

জমি দখলের ব্যাপারে জানতে চাইলে এমপি আসলাম গত রাতে কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আমি স্থানীয় সংসদ সদস্য হিসেবে সিটি করপোরেশন বা সরকারি সংস্থার জমি বেদখলে থাকলে তা উদ্ধারে সহয়তা করে আসছি। কোনো সংস্থার জমি দখল করিনি। ’

তিনি আরো বলেন, ‘আমার নির্বাচনী এলাকায় কোনো ব্যক্তি বা ওয়াকফর জমি দখলের কোনো ঘটনা আমার জানা নেই। আমি কোনো শ্রমিক নেতা বা পরিবহন নেতাকে প্রশ্রয় দিই না। এসব আমার কাজ না। ’

এলাকার আতঙ্ক ‘আসলাম বাহিনী’ : এলাকায় অনুসন্ধানকালে স্থানীয় একাধিক সূত্র জানায়, এমপি আসলাম তাঁর নির্বাচনী এলাকায় ১৫ সদস্যের একটি বাহিনী গঠন করেছেন। সেখানে সব ধরনের কাজ নিয়ন্ত্রণ করতে এমপি তাঁদের ব্যবহার করে থাকেন। এখানে স্থানীয় বিতর্কিত শুভ, স্বপন, নাক্কোয়া বাবু, হ্যাপি, জনি, রফু, ইসলাম, রাতুল, জাকির, সাব্বির, ইমরান ও বিন্দু জাকির পুরো এলাকায় আধিপত্য বিস্তার করেছে। আনসার ক্যাম্প ও বিএডিসি এলাকায় ভাঙ্গারি বাবুল, ছালু, কাঙ্গালি ফারুক ও তানসেনকে দিয়ে মাদক বিক্রির অভিযোগ রয়েছে। এ ছাড়া এ বাহিনীকে এমপির দখল ও টেন্ডারবাজির কাজে ব্যবহার করা হয়। এমপি আসলামের পিএস দেলোয়ার এ বাহিনীর নেতৃত্ব দেন বলে এলাকাবাসীর অভিযোগে। এই বাহিনীর আতঙ্কে থাকে এলাকার সাধারণ মানুষ। এমপির ঘনিষ্ঠ সহচর হিসেবে পরিচিত কাজী ফরিদুল হক হ্যাপির বিরুদ্ধে এলাকায় মাদক ব্যবসার সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগ রয়েছে। আনসার ক্যাম্প, টোলারবাগ ও মিরপুর-১ নম্বর এলাকায় একাধিক মাদক মামলার আসামি শেখ মামুনকে সঙ্গে নিয়ে হ্যাপি এ কাজ করে বলে জানায় এলাকাবাসী।

এই বাহিনীর ব্যাপারে জানতে চাইলে এমপি আসলাম কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আমি রাজনীতি করি; আমার কোনো নিজস্ব বাহিনী নেই। ’

ডিএনসিসিতে টেন্ডার নিয়ন্ত্রণ : সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, সংসদ সদস্য আসলামুল হক নির্বাচিত হওয়ার পর থেকে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের (ডিএনসিসি) অঞ্চল-৪-এ ঠিকাদারির পুরোটা তাঁর কবজায় নিয়ে নেন। সেখানে নিজ নামে ঠিকাদারি করার আইনি বিধিনিষেধ থাকায় শ্যালক মনসুরকে এ দায়িত্ব দেন এমপি আসলাম। সেখানে স্বপন, ডন, পিয়ারও তাঁর হয়ে কাজ করে। তারা মিরপুর অঞ্চলের রাস্তাঘাটসহ সব ধরনের উন্নয়নকাজের দরপত্র ভাগিয়ে নিচ্ছে প্রভাব খাটিয়ে। তাদের ভয়ে সাধারণ ঠিকাদাররা দরপত্র দাখিলেরও সাহস পান না। এ ছাড়া ডিএনসিসির মিনিওয়েস্ট ট্রান্সফার স্টেশন নির্মাণ কাজও করেছে আসলামের লোকজন। শুরুতে ঠিকাদারি নিয়ে ডিএনসিসির সঙ্গে কিছুটা বিরোধ থাকলেও পরে তিনি তা মিটমাট করে নেন বলে জানা যায়।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন ঠিকাদার কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘ডিএনসিসির জোন ৪-এ আসলামের কথা ছাড়া একটি কাজও কেউ পায় না। এসব কাজ থেকে তাঁকে পার্সেন্টেজও দিতে হয় বলে শুনেছি। ’

এ ব্যাপারে এমপি আসলাম বলেন, ‘আমি বা আমার আত্মীয়-স্বজন কোনো ধরনের টেন্ডারের সঙ্গে জড়িত না। আমার এলাকায় কোনো উন্নয়নমূলক কাজ হলে আমি তা তদারক করে থাকি। সিটি করপোরেশনের টেন্ডার স্থানীয় কাউন্সিলররা দেখেন। ’

সঙ্গে নেই স্থানীয় আওয়ামী লীগ : ঢাকা-১৪ আসনের সংসদ সদস্য আসলামুল হকের স্বৈরতান্ত্রিক আচরণের কারণে তাঁর সঙ্গে বেশির ভাগ দলীয় নেতারা নেই। তিনটি থানার মধ্যে মিরপুর থানা আওয়ামী লীগের সভাপতি এস এম হানিফ, সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট আজাদুল কবির, শাহ আলী থানার আওয়ামী লীগের সভাপতি আগা খান মিন্টু, সাধারণ সম্পাদক আবুল কাশেম মোল্লা ও দারুসসালাম থানার সভাপতি মাজহার আনামের সঙ্গে এমপির মতবিরোধ এখন আলোচনায় রয়েছে। নাম প্রকাশ না করার শর্তে একজন আওয়ামী লীগ নেতা বলেন, এমপি আসলাম দলের ত্যাগী নেতাদের কোণঠাসা করে হাইব্রিড নেতাদের নিয়ে নিজের ব্লক তৈরি করেছেন। তাই বেশির ভাগ নেতারই আসলামের সঙ্গে দূরত্ব তৈরি হয়েছে। ’

গত বছরের ৯ মে মিরপুরে জামায়াতে ইসলামীর ডাকা হরতালের বিরুদ্ধে কর্মসূচির সময় সংরক্ষিত আসনের সংসদ সদস্য সাবিনা আক্তারের সমর্থকদের ওপর হামলা ও গুলি চালায় আসলামুল হকের ক্যাডাররা। সংঘর্ষে সাবিনা আক্তারসহ অন্তত ১৮ জন আহত হন। স্থানীয় আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা বলছে, সংরক্ষিত মহিলা আসনের এমপি হওয়ার আগে সাবিনার সঙ্গে সুসম্পর্ক ছিল আসলামুল হকের। ২০১৪ সাল পর্যন্ত তাঁরা প্রতিটি সামাজিক-রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে একযোগে অংশ নিয়েছেন। এমপি হওয়ার পর এলাকায় রাস্তাসহ বিভিন্ন উন্নয়ন কর্মকাণ্ড শুরু করেন সাবিনা আক্তার। সিটি করপোরেশনের বিভিন্ন কাজও পান সাবিনার সমর্থকরা। এসব দেখে ভবিষ্যতে এলাকার দখল হারাতে পারেন এই আশঙ্কায় ক্ষুব্ধ হন আসলাম ও তাঁর সমর্থকরা। এরপর থেকেই ঢাকা-১৪ আসনকেন্দ্রিক রাজনীতির নিয়ন্ত্রণ, গাবতলী বাস টার্মিনাল নিয়ন্ত্রণ, কমিটি গঠনসহ বিভিন্ন বিষয় নিয়ে আসলাম-সাবিনার বিরোধ শুরু হয়। মিরপুর থানা আওয়ামী লীগের সভাপতি হানিফসহ সিনিয়র নেতারা সাবিনা গ্রুপের পক্ষ নেন। আর যুবলীগের ক্যাডার গ্রুপটির নিয়ন্ত্রণ করেন এমপি আসলাম। ফলে রাজপথ তাঁর দখলেই থাকছে।

স্থানীয় সূত্রগুলো জানায়, এমপি আসলামের হস্তক্ষেপের কারণেই এমপি সাবিনার ওপর হামলাকারীদের গ্রেপ্তার করে আইনের আওতায় নিতে পারেনি পুলিশ। এ ছাড়া দীর্ঘদিনের রাজনৈকিত সহকর্মী মিরপুর থানা আওয়ামী লীগের সভাপতি হানিফের সঙ্গে এখন দা-কুমড়া সম্পর্ক এমপি আসলামের।

জানতে চাইলে এমপি আসলামুল হক কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আমার সঙ্গে দলের কোনো নেতাকর্মীর দূরত্ব তৈরি হয়নি। আমি সবার সঙ্গে দল গুছিয়ে কাজ করে যাচ্ছি। ’

বিতর্কে এমপির বিদ্যুৎকেন্দ্র : এমপি আসলামের মালিকানাধীন একটি বিদ্যুৎকেন্দ্র নিয়ে বেশ বিতর্কের সৃষ্টি হয়েছে। মোহাম্মদপুরের বছিলা এলাকায় এ বিদ্যুৎকেন্দ্রের নামে সাধারণ মানুষের জমি দখলের বিস্তর অভিযোগ পাওয়া গেছে। প্রায় অর্ধশত সরকারি-বেসরকারি কর্মকর্তা মিলে বছিলা এলাকায় কিছু জমি কিনেছিলেন। এ বিদ্যুৎকেন্দ্র তাও দখলে নিয়েছে। বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ করতে পরিবেশ অধিদপ্তরের ছাড়পত্রের বিধান থাকলেও তা মানা হয়নি। এ অপরাধে এমপির এ বিদ্যুৎকেন্দ্রকে পরিবেশ অধিদপ্তর জরিমানা করে মামলা করেছে। এ ছাড়া বিদ্যুৎ প্লান্ট করার জন্য সরকার যে পরিমাণ জমি অধিগ্রহণ করে দিয়েছে, এর চেয়ে বেশি জমি তিনি দখল করে ব্যবহার করছেন বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে।

আরো জানা গেছে, আসলাম নিজের মালিকাধীন মায়িশা গ্রুপের নামে তুরাগ নদের বছিলা অংশ দখল করে একাধিক স্থাপনা করেছেন।

এ বিষয়ে বক্তব্য জানতে চাইলে এমপি আসলাম কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আমি জাতীয় স্বার্থে বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপন করেছি। এখানে কারো জমি দখল করিনি। যারা বাজারদরের চেয়ে বেশি দাম  চেয়েছে, তাদের কথা ভিন্ন। এখানে একটি সমিতির জমি ছিল, তাদের টাকা দেওয়া হয়েছে। ’

এমপির ভাই বেবুর নিয়ন্ত্রণে বাস টার্মিনাল : এমপি আসলামের ভাই মফিজুল হক বেবুর নিয়ন্ত্রণে রয়েছে গাবতলী বাস টার্মিনাল। প্রায় ১০ বছর আগে জসিম উদ্দিন নামের এক ব্যক্তির নামে এ টার্মিনাল ইজারা এনে তা পুরোটাই নিজের কবজায় রেখেছেন বেবু। বিএনপি নেতা হিসেবে পরিচিত ঢাকা জেলা শ্রমিক ইউনিয়নের সভাপতি আব্বাসকে নিয়ে বেবুর এই আধিপত্য। সঙ্গে স্থানীয় কাউন্সিলর তাহেরও এমপির হয়ে বেবুকে শক্তি জোগান বলে জানা যায়। এ টার্মিনাল থেকে প্রতিদিন বিপুল পরিমাণ অর্থ বেবু ও আব্বাসের লোকজন আদায় করে।

গড়েছেন সম্পদের পাহাড় : সরকারদলীয় এমপি হওয়ার সুবাদে প্রভাব খাটিয়ে বৈধ-অবৈধভাবে শত শত কোটি টাকার মালিক হয়েছেন এমপি আসলাম। হলফনামায় তাঁর দেওয়া তথ্যের সূত্রে দুদকও তদন্ত করেছে। দুদকের কাছে ধরা পড়ে তথ্য ভুল হয়েছে বলে দাবি করেছেন আসলাম। হলফনামা ও অবৈধ সম্পদ বিষয়ে তদন্ত করে দুদক তথ্য পায়, গত পাঁচ বছরে আসলামুল হকের ঘোষিত সম্পত্তি (জমি) বেড়েছে ৩৪ গুণের বেশি। তখন এই সংসদ সদস্য বলেছিলেন, গণমাধ্যম সঠিক তথ্য প্রকাশ করছে না। তারা রাজনীতিবিদদের চরিত্র হননের চেষ্টা করছে।

২০১৪ সালের ২৬ ফেব্রুয়ারি অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগে এমপি আসলামুল হককে তলব করে চিঠি পাঠায় দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। সে সময় সংশ্লিষ্ট অনুসন্ধান কর্মকর্তা ও উপপরিচালক শেখ মেসবাহ উদ্দিনের সই করা চিঠিতে আসলামকে ওই বছরের ৫ মার্চ অভিযোগের পক্ষে-বিপক্ষে নিজের বক্তব্য উপস্থাপনের জন্য হাজির হওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়। দুদক সূত্র জানায়, ২০০৮ সালের হলফনামায় এমপি আসলাম ও তাঁর স্ত্রী মাকসুদা হকের নামে চার একর ১৯.৫ শতাংশ জমি ছিল। আর পাঁচ বছর পর স্বামী-স্ত্রী মিলে ১৪ হাজার ৫৬৭.৫৪ শতাংশ (১৪৫ দশমিক ৬৭ একর) জমির মালিক হয়েছেন। অথচ এই বাড়তি জমির দাম দেখিয়েছেন মাত্র এক কোটি ৭২ লাখ ৩০ হাজার টাকা। জমির এই কম মূল্যকে অস্বাভাবিক বলেই সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা জানান।

২০১৪ সালের ৫ মার্চ দুদকে হাজির হয়ে তিনি দাবি করেন, আয়কর উপদেষ্টা তাঁর নির্বাচনী হলফনামায় ভুল তথ্য দিয়েছেন। ওই হলফনামা জমা দেওয়ার তিন মাস পর তিনি তখন বলেন, ‘হলফনামায় ভুল এসেছে। আমার আয়কর উপদেষ্টা এ ভুল করেছেন। জমির পরিমাণে তিনি ভুল তথ্য দিয়েছেন। আয়কর উপদেষ্টা অযুতাংশের জায়গায় শতাংশ লিখে ফেলেছেন। ’


মন্তব্য