kalerkantho


ফেসবুক স্ট্যাটাসে বাবুল আক্তার

শ্যালিকাকে বিয়ে না করায় চটেছে শ্বশুরপক্ষ

এস এম রানা, চট্টগ্রাম   

২৮ ফেব্রুয়ারি, ২০১৭ ০০:০০



শ্যালিকাকে বিয়ে না করায় চটেছে শ্বশুরপক্ষ

আলোচিত সাবেক পুলিশ সুপার বাবুল আক্তারের সঙ্গে এবার তাঁর শ্বশুরপক্ষের বাকতর্ক শুরু হয়েছে। মাহমুদা খানম মিতু হত্যা মামলার তদন্ত কর্মকর্তার কাছে শ্বশুরপক্ষের লোকজনের অভিযোগ নিয়ে গণমাধ্যমে প্রকাশিত খবরের পরিপ্রেক্ষিতে সেসব বক্তব্যের জবাবে নিজের ফেসবুক পেজে স্ট্যাস্টাস দিয়েছেন বাবুল আক্তার। গতকাল সোমবার বিকেলে তিনি এই স্ট্যাস্টাস দেওয়ার পর তা নিয়ে তুমুল আলোচনার সৃষ্টি হয়েছে।

ফেসবুক স্ট্যাটাসে বাবুল আক্তার দাবি করেন, শ্বশুর-শাশুড়ির কথামতো এবং তাঁদের সৃষ্ট মাহিরদের ‘ছোট্ট আম্মু’ শেফা নামের এক শ্যালিকাকে বিয়ে না করার কারণেই এই বিরোধের সূত্রপাত হয়েছে। এর সঙ্গে ওই শ্যালিকাকে বিয়ে করে শ্বশুরবাড়িতেই সংসার শুরু না করা, বাবুল আক্তারের মা-বাবা ও স্বজনদের সঙ্গে যোগাযোগ বন্ধ না করাও এই বিরোধের কারণ।

ফেসবুক স্ট্যাস্টাস দেওয়ার পরপরই কালের কণ্ঠ’র প্রশ্নের মুখোমুখি হন বাবুল আক্তার। এত দিন চুপ থাকার পর কেন মুখ খুললেন এবং যা লিখেছেন তার সত্যতা নিয়ে প্রশ্ন করা হলে তিনি বলেন, ‘একান্তই পারিবারিক বিষয়গুলো নিয়ে আমি কখনোই কথা বলতে চাইনি। কিন্তু যখন দেখছি আমাদের ব্যক্তিজীবনের কথাগুলো মানুষের মুখরোচক গল্পে পরিণত হচ্ছে, তখনই ভাবলাম একেবারে চুপ থাকলে বোধ হয় ভবিষ্যতে আমার ছেলে-মেয়ের জীবনে এর নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। প্রকৃত সত্য জানানো দরকার। তাই লিখলাম। ’

শ্বশুরপক্ষ যখন ঘোর সন্দেহ প্রকাশ করল যে মিতু খুনের সঙ্গে বাবুল আক্তার জড়িত, তখনই এই সাবেক পুলিশ কর্মকর্তা নিজের অবস্থান ও আত্মপক্ষ সমর্থন করে ফেসবুকে লিখলেন।

এমন এক দিনে তিনি সরব হলেন যে দিনটি আবার তাঁর ছেলে আক্তার মাহমুদ মাহির জন্মদিন। গতকাল সোমবারই প্রথম মাকে ছাড়া জন্মদিন পালন করেছে মাহির। মা ছাড়া মাহির ও মেয়ে তাব্বাসুমকে নিয়ে বাবুল গতকাল সন্ধ্যায় বেড়াতে বের হন এবং ওদের নিয়ে শিশুবিষয়ক থ্রিডি সিনেমা দেখেন।  

দীর্ঘ নীরবতার বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে বাবুল আক্তার বলেন, ‘মিতুর মৃত্যুর পর আমি আসলে নিজেকে হারিয়ে ফেলেছিলাম। সন্তানদের মুখের দিকে তাকিয়ে সব কিছু নীরবে সহ্য করার চেষ্টা করেছি। এখন দেখছি আমার নীরবতার সুযোগ নিয়ে অনেক কিছুই হয়ে যাচ্ছে। ভবিষ্যতে মাহির-তাব্বাসুমের জীবনে এর নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। এই কারণে আংশিক কথা বললাম। এর বাইরে অনেক কিছুই বলার ছিল। কিন্তু সব বলার সময় এখনো হয়নি। পারিবারিক কথা আমি কেন বাইরে বলব?’

বাবুল আক্তার দাবি করে বলেন, ‘মিতু খুনের ঘটনায় আমি কোনোভাবেই জড়িত নই। এখন আমার বিরুদ্ধে যে অভিযোগ আনা হচ্ছে সেটা আমার শ্বশুর-শাশুড়ির প্রতিশোধপরায়ণতার অংশ। কিন্তু মিতু ছাড়া তো আমি জীবনে অন্য কাউকে কল্পনা করিনি। সেখানে খালা শাশুড়ির মেয়ে শেফাকে কেন বিয়ে করতে যাব? সে ছোট্ট একটা মেয়ে। ওর জীবন অনেক সুন্দর হবে। আমার সঙ্গে জড়ালে ওর জীবনও আমার জীবনের মতো অন্ধকারে পড়তে পারে।

ফেসবুকে বাবুল যা দাবি করছেন : ‘সবাই বিচারক, আমি প্রমাণ ছাড়াই খুনি’ উল্লেখ করে শুরু করা ফেসবুক স্ট্যাটাসে বাবুল দাবি করেন, তাঁর ছেলেমেয়েদের রাত ১২টা পর্যন্ত পড়ানো হয়। এত রাত পর্যন্ত পড়ার বিষয়ে মাহির তার বাবা বাবুল আক্তারকে জানিয়েছে, নানি বলেছে বনশ্রী আইডিয়াল স্কুলে তাকে চান্স পেতে হবে। এ কারণে ‘ছোট্ট আম্মু’ তাকে পড়ায়। ‘ছোট্ট আম্মু’ বলতে বাবুল প্রথমে তাঁর আপন শ্যালিকা শায়লাকে মনে করেছিলেন। পরে জেনেছেন এই ‘ছোট্ট আম্মু’ মিতুর খালাতো বোন ১৬ বছর বয়সী শেফা, যারা বাবুলের শ্বশুরবাড়িতেই থাকে। শেফাকে ‘ছোট্ট আম্মু’ ডাকাটা মাহিরকে ওর নানা-নানিই শিখিয়েছেন বলে দাবি করেন বাবুল।

মাহির নানাবাড়ি ছাড়তে চেয়েছিল উল্লেখ করে বাবুল লেখেন, ‘মাহির ঘিঞ্জি পরিবেশে অস্থির হয়ে উঠেছিল। এ কারণে দিন-মাস গুনে নতুন বাসায় উঠতে চেয়েছিলাম। তাই নতুন চাকরি নিয়ে আমি নতুন বাসায় উঠেছি। ’

বাবুল আরো লেখেন, ‘আমার বাচ্চা দুটো মিতুর মতো। ছিমছাম সাজানো সংসারেই থাকতে চায়। ’ চট্টগ্রামের বাসায় ডিশলাইন ছিল না উল্লেখ করে বাবুল লেখেন, ‘শ্বশুরের বাসায় ছেলেমেয়েরা স্টার জলসা দেখতে অভ্যস্ত হয়ে ওঠে। তারা আশপাশের মানুষের কাছ থেকে নানা অশ্রাব্য কথা শিখতে শুরু করে। আমার অনুপস্থিতিতে মিতু হত্যাকাণ্ড নিয়ে নানা-নানি মাহিরের সামনেই আলোচনা করেন। এতে মাহিরের বুক ব্যথা করে। কান্না আসে; কিন্তু কাঁদতে পারে না। এ কারণেই মাহির দুই মাসের মধ্যে নানার বাসা ছাড়তে চেয়েছিল। মাহিরই ক্যালেন্ডারে দাগ কেটে দিন গণনা করত। দুই মাস পরও বাসা না নেওয়ায় মাহির আমাকে ক্যালেন্ডার দেখায় এবং পরবর্তী সময়ে আমি ছেলের কাছ থেকে ১৫ দিন সময় চেয়ে নিই। শেষে শ্বশুর-শাশুড়ির মতামত নিয়েই সন্তান নিয়ে আমি নতুন বাসায় উঠেছি। তবে শ্বশুরপক্ষ আমাকে দেখে নেওয়ার হুমকি দেয়। সেই দেখে নেওয়ার কাজটিই করছেন তাঁরা। ’

বাবুল লেখেন, “আমার মুখ্য অপরাধ বাচ্চা একটা মেয়েকে (শেফাকে) বিয়ে না করে শ্বশুরবাড়ি ছেড়ে ছেলেমেয়ে নিয়ে নিজের মতো থাকার চেষ্টা করা। মিতুর মৃত্যুর পর তার মা কেঁদে কেঁদে বলেছিলেন, ‘১৪ বছরের সংসারে অশান্তি হয়নি বাবুল-মিতুর। ’ আমার শ্বাশুড়ি আরো বলেছিলেন, ‘বাবুল হইল ফেরেশতা। ’ এমনকি গত ২৫ জানুয়ারি তিনি চট্টগ্রামে সাংবাদিকদের বলেছিলেন, ‘আমি বাবুলকে সন্দেহ করি না। ’ মিতুর বাবা মিডিয়ায় আমাকে নিয়ে নানা অপপ্রচারের পরিপ্রেক্ষিতে বলেছিলেন, ‘এসব কথা ভিত্তিহীন। তদন্ত ভিন্ন খাতে নেওয়ার জন্য এসব রটানো হচ্ছে। ’ আমার শ্যালিকা শায়লা বলেছিল, ‘ভাইয়া আর আপুর সংসারে কোনো অশান্তি ছিল না। ’ আর কয়েক মাস গড়াতেই আজ ভিন্ন কথন!”

বাবুল আরো লিখেছেন, ‘মিতু মারা যাওয়ার আট মাস পর তার মা-বাবা আর বোনের মনে পড়ল আমি মিতুকে অবহেলা করেছি। তার সঙ্গে খারাপ আচরণ করেছি দিনের পর দিন, প্রতিনিয়ত পরকীয়ার সম্পর্ক চালিয়ে গিয়েছি, মিতু আত্মহত্যা করতে চেয়েছিল এবং মিতু নিতান্তই অপারগ হয়ে আমার সংসারে ছিল!’ তিনি লেখেন, ‘আমার শ্বশুরপক্ষ তাদের কথা রেখেছেন। আমাকে অপমানিত করার জন্য চেষ্টায় কোনো ত্রুটি রাখেননি। তোমারে পচাইয়া ছাড়মু, শান্তিতে থাকতে দিমু না। ’—কথাটি অক্ষরে অক্ষরে রাখার নিরন্তর সাধনা করে যাচ্ছেন তাঁরা। আমি যে বড়ই অবাধ্য জামাতা, আমার মা-বাবা, পরিবারের সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করে, ষোড়শী শ্যালিকাকে বিয়ে করে শ্বশুরবাড়িতেই ঘর তৈরি করে ঘরজামাই হওয়ার মতো বাধ্য যে আমি নই!


মন্তব্য