kalerkantho


‘তবে’ রেখেই পাস হলো বাল্যবিবাহ নিরোধ বিল

‘বিশেষ ক্ষেত্রে’ নারীর মতো ছাড় পাবে পুরুষও

নিজস্ব প্রতিবেদক   

২৮ ফেব্রুয়ারি, ২০১৭ ০০:০০



‘তবে’ রেখেই পাস হলো বাল্যবিবাহ নিরোধ বিল

সুধীসমাজসহ বিভিন্ন মহলের আপত্তি সত্ত্বেও ‘তবে’ বিধান বহাল রেখেই বহুল আলোচিত ‘বাল্যবিবাহ নিরোধ বিল-২০১৭’ জাতীয় সংসদে পাস হয়েছে। গতকাল সোমবার বিকেলে মহিলা ও শিশুবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী মেহের আফরোজ চুমকি বিলটি পাসের প্রস্তাব করলে তা কণ্ঠভোটে পাস হয়। বিলের বিধান অনুসারে বিয়ের বয়স নির্ধারণে বিশেষ প্রেক্ষাপটে নারীর পাশাপাশি পুরুষও ছাড় পাবে।

স্পিকার ড. শিরীন শারমিন চৌধুরীর সভাপতিত্বে সংসদ অধিবেশনে বিলটি নিয়ে আলোচনাকালে পাসের আগে বিলটি জনমত যাচাই ও বাছাই কমিটিতে পাঠানোর প্রস্তাব করেন জাতীয় পার্টির সদস্য মো. ফখরুল ইমাম, সেলিম উদ্দিন ও রওশন আরা মান্নান। তবে তাঁদের প্রস্তাব গ্রহণযোগ্য নয় বলে জানান প্রতিমন্ত্রী। পরে প্রস্তাবগুলো কণ্ঠভোটে নাকচ হয়ে যায়।

আলোচিত এ বিলে বিয়ের জন্য ছেলের বয়স ন্যূনতম ২১ বছর ও মেয়ের বয়স ১৮ নির্ধারণ করা হয়েছে। তবে এ ক্ষেত্রে বিশেষ বিধানের কথাও বলা হয়েছে। সেখানে বলা হয়েছে, ‘এ আইনের অন্যান্য বিধানে যাহা কিছুই থাকুক না কেন, কোনো বিশেষ প্রেক্ষাপটে অপ্রাপ্ত বয়স্কের সর্বোত্তম স্বার্থে, আদালতের নির্দেশ এবং পিতা-মাতা বা প্রযোজ্য ক্ষেত্রে অভিভাবকের সম্মতিক্রমে, বিধি দ্বারা নির্ধারিত প্রক্রিয়া অনুসরণক্রমে, বিবাহ সম্পাদিত হইলে উহা এই আইনের অধীন অপরাধ বলিয়া গণ্য হইবে না। ’

সংশ্লিষ্ট সূত্র মতে, গত ২৪ নভেম্বর মন্ত্রিসভায় বিলটি অনুমোদন দেওয়া হয়। গত ৮ ডিসেম্বর সংসদে বিলটি উত্থাপন করেন প্রতিমন্ত্রী মেহের আফরোজ চুমকি।

পরে অধিকতর পরীক্ষা-নিরীক্ষার জন্য সেটি সংশ্লিষ্ট সংসদীয় কমিটিতে পাঠানো হয়। দুই দফা বৈঠকের পর তা চূড়ান্ত করে কমিটি। বিলটি পাসের সুপারিশ করে গত ৯ ফেব্রুয়ারি সংসদে প্রতিবেদন জমা দেন কমিটির সভাপতি রেবেকা মোমিন।

এই বিলে বিয়ের ক্ষেত্রে ‘বিশেষ কেইসের’ জন্য বিশেষ বিধান রাখায় দেশে-বিদেশে ব্যাপক প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হয়। সুধীসমাজ, নারী সংগঠন, আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠন হিউম্যান রাইট ওয়াচ, বিভিন্ন সাহায্য সংস্থা ও বেসরকারি সংগঠনের পক্ষ থেকে ‘বিশেষ বিধান’ বাতিলের দাবি জানানো হয়। তবে শেষ পর্যন্ত ওই বিধান রেখেই জাতীয় সংসদে বিলটি উত্থাপন করা হয়।  

বিলের ৩ ধারায় বলা হয়েছে, সরকার, বিধিমালা দ্বারা নির্ধারিত পদ্ধতিতে বাল্যবিবাহ প্রতিরোধে জাতীয়, জেলা, উপজেলা ও ইউনিয়ন পর্যায়ে সরকারি কর্মকর্তা, স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, বেসরকারি সংস্থার কর্মকর্তা এবং স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিদের সমন্বয়ে বাল্যবিবাহ প্রতিরোধ কমিটি গঠন করতে পারবে। এই আইনের বলে স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও সরকারি কর্মকর্তারা বাল্যবিবাহ বন্ধে ব্যবস্থা নিতে পারবেন।

বিলের ৫ নম্বর ধারায় বাল্যবিবাহ বন্ধে নিষেধাজ্ঞা আরোপের ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে আদালতকে। আদালতের নিষেধাজ্ঞা অমান্য করলে অনধিক ছয় মাসের কারাদণ্ড বা ১০ হাজার টাকা জরিমানা অথবা উভয় দণ্ডের বিধান রাখা হয়েছে। মিথ্যা অভিযোগের জন্য একই দণ্ডের বিধান রাখা হয়েছে।

বিলে কোনো নারী ও পুরুষ বাল্যবিবাহ করলে দুই বছরের কারাদণ্ড বা অনধিক এক লাখ টাকা অর্থদণ্ড অথবা উভয় দণ্ডের বিধান রাখা হয়েছে। আর এ ধরনের বিয়ের জন্য দায়ী মা-বাবাসহ অন্যদের ক্ষেত্রে শাস্তি দুই বছরের কারাদণ্ড বা ৫০ হাজার টাকা জরিমানা অথবা উভয় দণ্ডের বিধান রাখা হয়েছে। বাল্যবিবাহ নিবন্ধনের জন্য সংশ্লিষ্টদের শাস্তি ও লাইসেন্স বাতিলের প্রস্তাব করা হয়েছে।

বিলের উদ্দেশ্য ও কারণ সংবলিত বিবৃতিতে বলা হয়েছে, বাল্যবিবাহ বিশ্বের জন্য একটি উদ্বেগের বিষয়। বিশেষ করে তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলোতে এ সমস্যা ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। বাল্যবিবাহ মানবাধিকারের একটি সুস্পষ্ট লঙ্ঘন। এতে প্রজনন স্বাস্থ্যে ক্ষতিকর প্রভাব ফেলে, যা মাতৃ ও শিশুমৃত্যুর ঘটনা বাড়িয়ে দেয়। সরকার ২০৪১ সালের মধ্যে বাল্যবিবাহমুক্ত বাংলাদেশ গড়ার প্রত্যয় ব্যক্ত করেছে। এ অবস্থায় বাল্যবিবাহ বন্ধে একটি যুগোপযোগী আইন থাকা জরুরি। সেই আইন প্রণয়নের জন্য এ বিল আনা হয়েছে।


মন্তব্য