kalerkantho


হলমার্ক কেলেঙ্কারি নিরীক্ষা

মরণপণ করেও শেরাটনে যেতে পারেনি নিরীক্ষাদল

আবুল কাশেম ও এম সায়েম টিপু   

২৮ ফেব্রুয়ারি, ২০১৭ ০০:০০



মরণপণ করেও শেরাটনে যেতে পারেনি নিরীক্ষাদল

মরণপণ করে ২০১২ সালের ৪ এপ্রিল সোনালী ব্যাংকের অডিট টিম বা নিরীক্ষাদল অফিসে না গিয়ে সরাসরি শেরাটনের দিকে ছুটল, ব্যাংকের শেরাটন শাখায় আসলে কী হচ্ছে তা যাচাই করতে। কিন্তু শাহবাগ মোড়ে বারডেম হাসপাতাল পর্যন্ত পৌঁছতে পারলেন নিরীক্ষাদলের সদস্যরা।

আর এক ইঞ্চিও সামনে এগোনোর উপায় ছিল না তাঁদের। তাই তাঁরা ফিরে গেলেন প্রধান কার্যালয়ে। পরের দিনই তাঁদের ঢাকার বাইরে বদলি করে দেওয়া হয়। জীবনবাজি রেখে নিরীক্ষা করতে গিয়ে ব্যর্থ হওয়া ওই দলেরই একজন বাংলাদেশ ব্যাংককে গোপনে জানিয়েছিলেন সোনালী ব্যাংকের শেরাটন শাখার কেলেঙ্কারির আশঙ্কার কথা। এর সূত্র ধরেই প্রকাশ্যে আসে দেশের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় আর্থিক কেলেঙ্কারির ঘটনা।

সোনালী ব্যাংকের পিআরএলে থাকা মহাব্যবস্থাপক (জিএম) এস এইচ এস আবু জাফর গত ২৬ জানুয়ারি জাতীয় সংসদের অনুমিত হিসাব সম্পর্কিত কমিটির বৈঠকে জবানবন্দিতে জানিয়েছেন হলমার্ক কেলেঙ্কারির ঘটনা ফাঁস হওয়ার ভয়ে ব্যাংকটির তখনকার ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা কিভাবে ওই শাখা নিরীক্ষা করা থেকে তাঁকে বিরত রেখেছিলেন। তখন ডিজিএম হিসেবে দায়িত্বে থাকা এই কর্মকর্তা নিজের জীবনহানির আশঙ্কা করেছিলেন একজন জিএমের কাছে। কিন্তু নিরীক্ষা করা থেকে এক চুলও সরছিলেন না তিনি।

সোনালী ব্যাংককে ‘পূর্ণ স্বাধীন’ ব্যাংক হিসেবে ধরে নিয়ে সুপারভিশনের কাজ তখন ওই ব্যাংকের ওপরই ছেড়ে দিয়েছিল বাংলাদেশ ব্যাংক।

সোনালী ব্যাংকের নিরীক্ষাদল ব্যাংকের শেরাটন শাখায় ঢুকতে না পেরে যখন বদলি হয়ে ঢাকার বাইরে চলে যেতে বাধ্য হলো, তখন সেই দলেরই একজন কেলেঙ্কারির আশঙ্কার কথা জানিয়েছিলেন বাংলাদেশ ব্যাংককে। পরে বাংলাদেশ ব্যাংক পরিদর্শন করে কাগজপত্র, স্বাক্ষর-পত্র ছাড়াই সোনালী ব্যাংকের শেরাটন শাখা থেকে দুই হাজার ৬৬৮ কোটি টাকা হাতিয়ে নেওয়ার তথ্য পায় হলমার্ক গ্রুপের বিরুদ্ধে।

হলমার্ক কেলেঙ্কারি সংঘটনের সময় সোনালী ব্যাংক যে ‘পূর্ণ স্বাধীনতা’ ভোগ করত তা উল্লেখ করে বাংলাদেশ ব্যাংকের ডেপুটি গভর্নর এস এম মনিরুজ্জামান গত ২৬ জানুয়ারি অনুমিত হিসাব সম্পর্কিত কমিটির বৈঠকে বলেন, ‘২০০৮-০৯ সালের আগে রাষ্ট্রীয় ব্যাংকগুলোর নিজস্ব সুপারভিশন ছিল। সে হিসেবে বাংলাদেশ ব্যাংক সোনালী ব্যাংকের সুপারভিশন করত না। সোনালী ব্যাংকের নিজস্ব সুপারভিশন ও ব্যবস্থাপনা ছিল। এটি একটি স্বাধীন ব্যাংক ছিল। তাদের নিজস্ব এমডি আছে, জোনাল আছে। শেরাটন হোটেলসহ ঋণ কেলেঙ্কারি বারবার হতে থাকে কিন্তু যখন বাংলাদেশ ব্যাংক দেখল সোনালী ব্যাংক কোনো নজর দিচ্ছে না, এরপর বাংলাদেশ ব্যাংক সূত্রের পরিপ্রেক্ষিতে তদন্ত শুরু করে। ’

এস এইচ এস আবু জাফর ২০১৫ সালের ১২ নভেম্বর সংসদের অনুমিত হিসাব সম্পর্কিত কমিটির সভায় উপস্থিত হয়ে শেরাটন শাখায় নিরীক্ষা করতে গিয়ে যেসব ঘটনার মুখোমুখি হয়েছিলেন তার বিশদ বর্ণনা দেন। তাঁর বর্ণনা কমিটির অষ্টম সভার কার্যবিবরণীতে লিপিবদ্ধ করা হয়েছে।

আবু জাফর বলেন, তাঁকে অন্য একটি বিভাগে পোস্টিং দিয়ে ইন্টারন্যাশনাল ট্রেড ফাইন্যান্স ডিভিশন (আইটিএফডি) ইন্সপেকশন সেলের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল। একজন ডিজিএমের তত্ত্বাবধানে কয়েকজন কর্মকর্তার সমন্বয়ে এই সেল গঠিত ও পরিচালিত হয়ে আসছিল। এই সেলের পৃথক ও দ্বিতীয় ডিজিএম ছিলেন আবু জাফর। আইটিএফডি অডিট সেলের দায়িত্ব পাওয়ার মাসখানেক পরই তিনি জানতে পারেন যে দুটি শাখায় দীর্ঘদিন যাবৎ নিরীক্ষা দল পাঠানো যাচ্ছে না। স্বাভাবিক অবস্থায় কোনো শাখায় টিম পাঠাতে সংশ্লিষ্ট জিএম বা ডিএমডির মৌখিক সম্মতি নিয়ে অফিস নোট উপস্থাপন করা হতো। তারই ধারাবাহিকতায় গুলশান শাখা ও শেরাটন হোটেল শাখা অডিট করার বিষয়ে তখনকার ডিএমডি মাইনুল হকের (হলমার্ক কেলেঙ্কারির ঘটনায় এখন কারাগারে) সম্মতি নেওয়ার জন্য একাধিকবার চেষ্টা করেও সফল হতে পারেননি। পরে ভিন্ন পথে লক্ষ্য অর্জনে সচেষ্ট হন আবু জাফর। আইটিএফডির তখনকার জিএম আ ন ম মাসরুরুল হুদা সিরাজীকে তিনি জানান যে গুলশান শাখা ও শেরাটন হোটেল শাখায় অডিট টিম পাঠানো যাচ্ছে না। ডিএমডি মাইনুল হক কোনোক্রমেই ওই দুই শাখা নিরীক্ষা করতে দিচ্ছেন না। জিএম তাঁকে জরুরি ভিত্তিতে অফিস নোট উপস্থাপনের অনুরোধ করে বলেন, আইটিএফডির ডিজিএম আলতাফ হোসেন (জেলহাজতে) ও এজিএম মো. সাফিজ উদ্দিন আহমেদের (জেলহাজতে) উপস্থিতিতে যাতে কখনোই শাখা দুটি পরিদর্শনের পরিকল্পনা সম্পর্কে কিছু জিজ্ঞাসা না করেন। পরে সেই অফিস নোট অনুমোদিত হলেও সোনালী ব্যাংকের এক হাজার ২০৭টি শাখার মধ্যে সবচেয়ে বড় শাখা স্থানীয় কার্যালয়কে অন্তর্ভুক্ত করা হয়। স্থানীয় কার্যালয়কে অন্তর্ভুক্তির কাজটি করেন মাইনুল হক।

জিএম সিরাজীকে প্রথমে গুলশান শাখা ও শেরাটন শাখায় টিম পাঠাতে বলেছিলেন আবু জাফর। কিন্তু সিরাজী তখন তাঁকে বলেন যে এমডি অ্যান্ড সিইও হুমায়ুন কবির (হলমার্ক কেলেঙ্কারির পলাতক আসামি) নির্দেশ দিয়েছেন প্রথমে স্থানীয় কার্যালয় ও গুলশান শাখা অডিট করে খসড়া প্রতিবেদন মাইনুল হককে দেখিয়ে চূড়ান্ত নিরীক্ষা প্রতিবেদন প্রস্তুত করতে। এ কাজ শেষ হওয়ার পর শেরাটন শাখা নিরীক্ষা করতে। ২০১২ সালের ১ ফেব্রুয়ারি রাত ৮টার দিকে তখনকার এমডি ও সিইও তাঁর কক্ষে সিরাজীর উপস্থিতিতে গুলশান শাখা ও স্থানীয় কার্যালয় অডিট শেষে মাইনুল হককে তা দেখিয়ে চূড়ান্ত করার নির্দেশ দেন। গুলশান শাখার ওপর জারি করা দপ্তর আদেশ বাতিল করার জন্য ওই দিন সন্ধ্যা সাড়ে ৭টায় বাসা থেকে আবু জাফরকে ডেকে আনেন মাইনুল হক। ২০১২ সালের ২ এপ্রিল গুলশান শাখার নিরীক্ষা প্রতিবেদন দাখিল করেন। তিনি ৮ এপ্রিল ২০১২ পর্যন্ত স্থানীয় কার্যালয়ের অডিট শেষ করতে পারেননি, কারণ বাস্তবতার নিরিখে এটি ছিল অসম্ভব কাজ। তা সত্ত্বেও ওই বছরের ১ এপ্রিল থেকে ৪ এপ্রিল পর্যন্ত শেরাটন হোটেল শাখা অডিট করার জন্য চারজন চৌকস, সাহসী ও দক্ষ কর্মকর্তার সমন্বয়ে অফিস অর্ডার জারি করেন।

আবু জাফর বলেন, ডিএমডি মাইনুল হকের নির্দেশমতো সন্ধ্যার পর অডিট সেলের এজিএম মো. শওকত আলীকে (বর্তমানে ডিজিএম) নিয়ে মাইনুল হকের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। এ সময় মাইনুল হককে দৃঢ়ভাবে আবু জাফর জানান, যেকোনো মুহূর্তে অডিট টিম শেরাটন হোটেল শাখায় যাবে এবং সেটা আগামী কার্যদিবস প্রত্যুষেও হতে পারে। মাইনুল হক তখন বলেন, তিনি শেরাটন শাখার ডিজিএম এ কে এম আজিজুর রহমানকে সঙ্গে নিয়ে বিদেশে যাচ্ছেন। আরো নানা অজুহাত দাঁড় করিয়ে টিম না পাঠানোর নির্দেশ দেন। তাঁর প্রতিটি অজুহাত যুক্তি দিয়ে খণ্ডন করেন আবু জাফর। এতে মাইনুল হক বিরক্ত হয়ে টিম না পাঠাতে কড়া শাসানি দেন। তখন আবু জাফর তাঁকে জানান, লিখিত নির্দেশ ছাড়া অডিট বন্ধ করা তাঁর পক্ষে সম্ভব নয়। এরপর ডিএমডি মাইনুলের রুম থেকে বেরিয়ে জিএম সিরাজীকে ঘটনার বর্ণনা করে তাঁকে আসন্ন বিপদ থেকে রক্ষার জন্য অনুরোধ করেন জাফর। পরে সিরাজী ও জাফর এমডির কাছে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন।

২০১২ সালের ২৮ বা ২৯ মার্চ তাঁরা দুজন এমডি হুমায়ুন কবিরের কাছে গিয়ে জীবনহানির আশঙ্কার কথা জানিয়ে শেরাটন শাখা অডিট করার অনুমতি চান। অনুমতি দিয়ে এমডি তাঁদের বলেন, ৩-৪ এপ্রিল থেকে শেরাটন শাখা অডিট শুরু করেন। তখন তিনি আর মাইনুল হকের ‘নিয়ন্ত্রণে’ থাকবেন না।

এমডির সম্মতি এবং জিএম আ ন ম মাসরুরুল হুদা সিরাজীর সার্বক্ষণিক সহযোগিতার কারণে অত্যন্ত সৎ ও সাহসী কর্মকর্তাদের নিয়ে ২০১২ সালের ৪ এপ্রিল থেকে অডিট শুরু করার পরামর্শ দিয়ে ১ এপ্রিল দপ্তর নির্দেশ জারি করেন। কিন্তু ৩ এপ্রিল সন্ধ্যার পর অডিট টিমের প্রধান মো. শওকত আলী (বর্তমানে অবসরপ্রাপ্ত ডিজিএম) টেলিফোনে জাফরকে জানান যে ডিএমডি মাইনুল এবং পরিদর্শন ও নিরীক্ষা বিভাগের জিএম মো. নুরুল ইসলাম চৌধুরী শেরাটন হোটেল শাখা অডিট করার অফিস অর্ডার ওই দিনই প্রত্যাহার করার নির্দেশ দিয়েছেন। তখন জাফর তাঁকে জানান, তিনি ডিজিএম হিসেবে অফিস আদেশে সই করলেও তা এমডি ও সিইওর দপ্তরভাষ্যের পরিপ্রেক্ষিতে হয়েছে। তাই ওই আদেশ প্রত্যাহার করার ক্ষমতা তাঁর নেই। এরপর জিএম নুরুল ইসলাম চৌধুরী মোবাইল ফোনে তাঁকে মাইনুলের নির্দেশের কথা উল্লেখ করে ওই অফিস আদেশ প্রত্যাহারের জন্য প্রচণ্ড চাপ দেন। তবে জাফর তাতে অপারগতা প্রকাশ করেন। রাতে অডিট টিমের প্রতিটি সদস্যকে উজ্জীবিত রাখতে জাফর তাগাদা অব্যাহত রাখেন এবং সকালে কোনোভাবেই মতিঝিল এলাকায় না গিয়ে সরাসরি একত্রে শেরাটন হোটেল শাখায় ঢোকার সিদ্ধান্ত নেন। সে মোতাবেক অডিট টিমের সদস্যরা ২০১২ সালের ৪ এপ্রিল সকালে অডিট শুরু করার জন্য শেরাটন অভিমুখে রওনা দেন। কিন্তু শাহবাগ মোড়ে বারডেম হাসপাতাল পর্যন্ত পৌঁছলে জিএম নুরুল ইসলাম তাঁদের ফিরে যেতে বাধ্য করেন। অডিট টিম প্রধান মো. শওকত আলী ফিরে পরিদর্শন ও নিরীক্ষা বিভাগের জিএম নুরুল ইসলাম চৌধুরী বরাবর লিখিত পত্রে তাঁকে অডিট করতে না দিয়ে ফেরত আনা এবং পরবর্তী করণীয় সম্পর্কে লিখিত ব্যাখ্যা চান। পরে তাঁদের বদলি করে দেওয়া হয়।

 


মন্তব্য