kalerkantho


চুক্তি থেকে মুক্তি নেই প্রশাসনে!

আশরাফুল হক রাজীব   

২৭ ফেব্রুয়ারি, ২০১৭ ০০:০০



চুক্তি থেকে মুক্তি নেই প্রশাসনে!

সরকারি চাকরিতে কোনো পদে উপযুক্ত লোক পাওয়া না গেলে সেই পদে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ দেওয়া হতো। কিন্তু এই রেওয়াজ থেকে বের হয়ে এখন দলীয় দৃষ্টিভঙ্গি থেকে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ দেওয়া হচ্ছে।

বর্তমান সরকার শুরুতে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ না দিলেও এই সময়ে এসে আবার গণহারে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ দিচ্ছে।

গুরুত্বপূর্ণ পদে পদোন্নতিপ্রত্যাশী কর্মকর্তারা বলছেন, চুক্তি থেকে মুক্তির কোনো উপায় তাঁরা দেখছেন না। কারণ চুক্তিভিত্তিক নিয়োগের বিপক্ষে যাঁরা সিদ্ধান্ত নেবেন, তাঁদের প্রায় সবাই চুক্তিভিত্তিক নিয়োগে কাজ করছেন। বর্তমানে প্রশাসনে দেড় শতাধিক কর্মকর্তা রয়েছেন চুক্তিভিত্তিক। এর বাইরেও আরো শতাধিক সরকারি কর্মচারী রয়েছেন চুক্তিভিত্তিক।

অনুসন্ধানে জানা যায়, প্রশাসনে পদের চেয়ে অনেক বেশি কর্মকর্তা রয়েছেন। এটা দুই থেকে তিন গুণ। এর পরও যাঁদের চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ দেওয়া হচ্ছে তাঁদের পরিবর্তে যাঁরা চাকরিতে রয়েছেন তাঁদেরই সেসব পদে পদোন্নতি দেওয়া যায়। এসব পদে স্থলাভিষিক্ত করার মতো অনেক যোগ্য লোক রয়েছেন। তবু শুধু রাজনৈতিক কারণে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ চলছেই। অভিযোগ রয়েছে, সচিব পদে একটি চুক্তিভিত্তিক নিয়োগের বিপরীতে গড়ে চারজন কর্মকর্তা পদোন্নতিবঞ্চিত হন। এ ছাড়া চুক্তিভিত্তিক নিয়োগের ফলে কর্মরত নিয়মিত কর্মকর্তারা কাঙ্ক্ষিত পদে যেতে পারেন না। এতে তাঁরা কর্মস্পৃহা হারিয়ে ফেলেন। এই প্রক্রিয়ার চক্করে পড়ে তরুণ কর্মকর্তারা শিক্ষাবৃত্তিসহ নানা উপায়ে দেশের বাইরে গিয়ে আর ফিরে আসেন না। বঞ্চিত হওয়ার চেয়ে তাঁরা উন্নত জীবনের আশায় সেখানেই থেকে যান। ফলে ক্ষতিগ্রস্ত হয় প্রশাসন।

এসব বিষয়ে প্রশ্ন তুললে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব ড. মোজাম্মেল হোসেন খান কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘চুক্তিভিত্তিক নিয়োগের বিধান রয়েছে। এটা বেআইনি কিছু নয়। যোগ্য, মেধাবী ও অভিজ্ঞদেরই চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ দেওয়া হয়। ’

তবে অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত এর আগে জনপ্রশাসন প্রতিমন্ত্রী ইসমাত আরা সাদেককে এক চিঠিতে জানান, অবসরের পরে চাকরির মেয়াদ বাড়ালে কর্মকর্তাদেরও অসুবিধা হয়। কারণ তখন তাঁদের কোনো দলের সদস্য বলে অপবাদ দেওয়া সহজ হয়। তিনি সরকারি কর্মকর্তাদের অবসরান্তে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগের জন্য নীতিমালা করার তাগিদ দিতে গিয়ে এ কথা বলেছেন।

ওই চিঠিতে অর্থমন্ত্রী আরো বলেছেন, সরকারি কর্মচারীদের চাকরি থেকে অবসরে যাওয়ার বয়স বাড়ানো হয়েছে। এ কারণে তাঁদের চুক্তিভিত্তিক চাকরি পরিহার করতে হবে। আগে তাঁরা ৫৭ বছরেই চাকরি থেকে অবসরে যেতেন। ২০১১ সালে সেটা বাড়িয়ে ৫৯ করা হয়েছে। ২০১৩ সালের ফেব্রুয়ারিতে মুক্তিযোদ্ধা কর্মচারীদের চাকরি থেকে অবসরে যাওয়ার বয়স বাড়িয়ে ৫৯ বছর করা হয়েছে। তার পরও কেন তাঁদের চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ চাই?

সরকারকে তার পরও কিছু ক্ষেত্রে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ দিতে হয়। এ কারণেই অর্থমন্ত্রী প্রস্তাব দিয়েছিলেন এ বিষয়ে একটি সমীক্ষা করার। কী ধরনের জনবল ছয় মাস বা এক বছরের মধ্যে অবসরে যাবে; তাদের কোন পর্যায়ের কর্মকর্তাদের সরকারের দরকার; যে পদে বা ক্যাডারের কোন কর্মকর্তাকে অবসরের পরও সরকার ব্যবহার করতে চায়—তাঁদের ক্যাডারবহির্ভূত বিশেষ পদে নিয়োগ করার পরামর্শ দেন অর্থমন্ত্রী। বিশেষ পদ বলতে তিনি তাঁদের নিয়ন্ত্রক সংস্থায় বা উপদেষ্টা পরিষদে নিযুক্তিকে বুঝিয়েছেন। এ ছাড়া আরো একটি সিদ্ধান্ত তিনি নেওয়ার জন্য জনপ্রশাসন প্রতিমন্ত্রীকে বলেছিলেন যে, কোনো ব্যক্তিকে সরকারি চাকরিতে কত বছর পর্যন্ত সুযোগ দেওয়া হবে, তাও চিহ্নিত করা দরকার। কিন্তু অর্থমন্ত্রীর এসব প্রস্তাব ‘নথিজাত’ করে রেখেছে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, সচিবদের মধ্যে সর্বশেষ চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ পেয়েছেন প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের সিনিয়র সচিব সুরাইয়া বেগম। তাঁকে সিনিয়র সচিব করার ১৬ দিনের মাথায় এক বছরের চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। একই কার্যালয়ের মুখ্য সচিবও চুক্তিতে নিয়োজিত আছেন। গত ২৭ নভেম্বর জনপ্রশাসন সচিব ড. কামাল আবদুল নাসের চৌধুরীকে প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব পদে বদলি করা হয়। ৩১ ডিসেম্বর তাঁর অবসরে চলে যাওয়ার কথা। কিন্তু ২৭ ডিসেম্বর অবসরোত্তর ছুটি বাতিল করে তাঁকে প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব পদে এক বছরের চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ দেওয়া হয়।

তথ্যসচিব মরতুজা আহমদ গত ২২ জানুয়ারি এক বছরের চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ পেয়েছেন। গত ২৭ নভেম্বর নতুন পদ ‘এসডিজি বিষয়ক মুখ্য সমন্বয়ক’ সৃষ্টি করে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়েই চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ দেওয়া হয় প্রধানমন্ত্রীর সাবেক মুখ্য সচিব আবুল কালাম আজাদকে। গত ১০ অক্টোবর এক বছরের জন্য চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ পেয়েছেন সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগের সাবেক সচিব এম এ এন ছিদ্দিক। সরকারের অবসরপ্রাপ্ত সচিব কাজী মো. আমিনুল ইসলামকে তিন বছরের জন্য বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের নির্বাহী চেয়ারম্যান পদে নিয়োগ দেওয়া হয়। তাঁকে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ না দেওয়া হলেও চাকরি থেকে চলে যাওয়ার অনেক দিন পর তাঁকে সরকারি কাজে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। কাজী আমিন গত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময়ে প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয়ে মুখ্য সচিবের দায়িত্ব পালন করেছেন। এরপর সেখান থেকে তাঁকে বিশ্বব্যাংকে বিকল্প নির্বাহী পরিচালক করে ওয়াশিংটন পাঠানো হয়েছিল।

একাধিক মন্ত্রণালয়ের সচিব ছিলেন এমন একজন গুরুত্বপূর্ণ কর্মকর্তা যিনি প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়েও দাপটের সঙ্গে চাকরি করেছেন, তিনি চুক্তিতেও নিয়োজিত ছিলেন তিন বছর। চুক্তি শেষে তিনি সরকারি সংস্থায় প্রতিমন্ত্রীর মর্যাদায় চাকরি করেছেন। সম্প্রতি তিনি সেই চাকরি থেকে বিদায় নিয়েছেন। বিদায়ের আগে তাঁর একান্ত সচিব, গাড়িচালক, পার্সোনাল স্টাফদের ডেকে বলেছেন, ‘তোমরা গুরুত্বপূর্ণ কোনো অফিসারের সঙ্গে যোগ দিও না। আমি কয়েক মাসের মধ্যে আবার চাকরিতে আসব। আমাকে নির্বাচন কমিশনারও করা হতে পারে। তখন তোমাদেরকে আমার দরকার। ভিআইপিদের সঙ্গে তোমরা চলে গেলে আমি তোমাদের ফিরিয়ে আনতে পারব না। এই বয়সে বিশ্বস্ত লোক পাব না। ’

এই ঘটনাটি জানিয়ে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন কর্মকর্তা কালের কণ্ঠকে বলেন, সরকারি চাকরিতে যাঁরা একবার গুরুত্বপূর্ণ পদে যোগ দিতে পারেন তাঁরা কেউ হাল ছাড়েন না। তাঁরা মৃত্যুর আগ পর্যন্ত চাকরিতে থাকার চেষ্টা করেন। সেটা চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ হতে পারে আবার অন্য কোনোভাবেও হতে পারে। তাঁরা জানেন কিভাবে নীতিনির্ধারকদের কাছাকাছি যেতে হয়।

জানা যায়, নৌপরিবহন সচিব অশোক মাধব রায়কে এক বছরের জন্য চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। তিনি বর্তমান জনপ্রশাসনমন্ত্রী সৈয়দ আশাফুল ইসলাম যখন স্থানীয় সরকার মন্ত্রী ছিলেন তখন তাঁর একান্ত সচিবের দায়িত্ব পালন করেছেন। গত ১৯ জুলাই শিল্প মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব মো. মোশাররফ হোসেন ভূঁইয়াকে এক বছরের জন্য চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ দেওয়া হয়। ভিয়েতনামে রাষ্ট্রদূত পদে প্রেষণে কর্মরত সরকারের সচিব মো. সাহাব উল্লাহকে গত ১৫ মে এক বছরের জন্য চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ দেওয়া হয়। গত ২৪ ফেব্রুয়ারি পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সচিব নববিক্রম কিশোর ত্রিপুরাকে দুই বছরের জন্য চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ দেওয়া হয়েছে।   

বিশ্বব্যাংকের ওয়াশিংটনের প্রধান কার্যালয়ে ‘বিকল্প নির্বাহী পরিচালক’ পদে যোগদানের জন্য ২০১৫ সালের ২৫ অক্টোবর সাবেক মন্ত্রিপরিষদসচিব মোশাররাফ হোসাইন ভূঁইঞাকে তিন বছরের জন্য চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ দেয় সরকার।

সম্প্রতি সৌদি আরবে বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত গোলাম মসীহর চুক্তিভিত্তিক নিয়োগের মেয়াদ আরো এক বছর বাড়িয়েছে সরকার। আর বাহরাইনে নিযুক্ত বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত মেজর জেনারেল কে এম মমিনুর রহমানকে আরো এক বছরের জন্য চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া পিআরএল বাতিল করে কেনিয়ায় বাংলাদেশের হাইকমিশনার মেজর জেনারেল আবুল কালাম মো. হুমায়ুন কবিরকেও চুক্তি ভিত্তিতে এক বছরের জন্য নিয়োগ দিয়ে আদেশ জারি করেছে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়।

 


মন্তব্য