kalerkantho


আসছে ৪ লাখ ২০ হাজার কোটি টাকার বাজেট

ব্যবসায়ী ও ভোটার তুষ্টির প্রয়াস থাকবে

ফারজানা লাবনী   

২৭ ফেব্রুয়ারি, ২০১৭ ০০:০০



ব্যবসায়ী ও ভোটার তুষ্টির প্রয়াস থাকবে

ফাইল ছবি

জাতীয় নির্বাচন সামনে রেখে ২০১৭-১৮ অর্থবছরের জন্য চার লাখ ২০ হাজার কোটি টাকার বাজেট ঘোষণার চিন্তাভাবনা করছে সরকার। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, ব্যবসায়ীসহ সাধারণ ভোটারদের তুষ্টিতে কিছু চমক থাকতে পারে নতুন বাজেটে। এই বাজেট ভাবনা মাথায় নিয়ে বিভিন্ন গবেষণাপ্রতিষ্ঠানের কর্তাদের সঙ্গে গতকাল প্রথম আনুষ্ঠানিক বৈঠক করেছেন অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত।

বৈঠকের পর অর্থমন্ত্রী জানান, জাতিসংঘ ঘোষিত টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (এসডিজি) অর্জনের স্বার্থে নতুন অর্থবছরে শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হবে। ব্যাংকিং খাতের ফাঁকি রোধে পদক্ষেপ থাকবে। ব্যবসায়ীদের দাবিদাওয়া পর্যালোচনা করে নতুন অর্থবছরে অবশ্যই ভ্যাট আইন বাস্তবায়ন করা হবে।      

আগামী অর্থবছরে দুই লাখ ৪৬ হাজার কোটি টাকার লক্ষ্যমাত্রা সামনে রেখে রাজস্ব আদায়ে কৌশল নির্ধারণের পরামর্শ দিয়ে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডকে (এনবিআর) চিঠি পাঠিয়েছে অর্থ মন্ত্রণালয়। গত সপ্তাহে এনবিআর চেয়ারম্যানের কাছে পাঠানো এ চিঠিতে লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণের পাশাপাশি রাজস্ব বাজেট প্রণয়নের দিকনির্দেশনাও দেওয়া হয়েছে। গত তিন অর্থবছরে রাজস্ব বাজেট প্রস্তাব প্রণয়নকালেই অর্থ মন্ত্রণালয়ের বেঁধে দেওয়া লক্ষ্যমাত্রায় জোরালো আপত্তি জানিয়ে এসেছিল এনবিআর। তবে এবার এর ব্যতিক্রম। লক্ষ্যমাত্রা যাই হোক তা অর্জনে তত্পর থাকবে এনবিআর—এমন ইঙ্গিতই দিলেন সংস্থাটির প্রধান।

 

এনবিআর চেয়ারম্যান মো. নজিবুর রহমান কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আগামী অর্থবছরের জন্য দুই লাখ ৪৬ হাজার কোটি টাকা রাজস্ব আহরণের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারিত হবে—এমন ধারণা দেওয়া হয়েছে এনবিআরকে। এ লক্ষ্যমাত্রা বাজেট ঘোষণার আগে কিছুটা কমানো বা বাড়ানো হতে পারে। তবে লক্ষ্যমাত্রা যাই হোক তাতে আমি চিন্তিত বা বিচলিত নই। ’ যথাযথ কৌশল প্রণয়ন করে লক্ষ্যমাত্রার চেয়েও বেশি রাজস্ব আহরণের আশা করেন এনবিআর চেয়ারম্যান।

গতকাল রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন পদ্মায় বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা ইনস্টিটিউট (বিআইডিএস), ইকোনমিক রিসার্চ গ্রুপ (ইআরজি), পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউট (পিআরআই) ও বাংলাদেশ অর্থনীতি সমিতির (বিইএ) সঙ্গে প্রাক-বাজেট আলোচনায় বসেন অর্থমন্ত্রী।

বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের অর্থমন্ত্রী বলেন, ‘চলতি বছর শেষে ৭.২ শতাংশ জিডিপি প্রবৃদ্ধি অর্জিত হবে। তবে আগামী অর্থবছরের জিডিপি প্রবৃদ্ধির প্রাক্কলন এখনো ঠিক করা হয়নি। চলতি বছর জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) রাজস্ব আদায় পরিস্থিতি সন্তোষজনক। তবে তাদের দক্ষতা আরো ভালো হওয়া দরকার। কারণ একদিকে করদাতার সংখ্যা বাড়ছে, অন্যদিকে বাজেটে বরাদ্দ বাড়ছে। ফলে আমাদের রাজস্ব আদায় আরো বাড়াতে হবে। ’

প্রাক-বাজেট আলোচনায় গবেষণা সংস্থাগুলোর প্রতিনিধিরা বেশ কিছু সুপারিশ করেছেন। এর মধ্যে রয়েছে রেমিট্যান্স প্রবৃদ্ধি বাড়াতে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া। রিজার্ভের অর্থ দিয়ে সভরেন বন্ড ছাড়ার বিষয়ে সতর্ক থাকার কথা বলেছেন তাঁরা। এ ছাড়া শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে অধিক গুরুত্ব দেওয়া, এনবিআরের আয় বাড়াতে পদক্ষেপ, কর ফাঁকি ঠেকানোর পদক্ষেপ ও ব্যাংকিং সংস্কারে কঠোর নজরদারি করতে পদক্ষেপ নেওয়া সুপারিশ করা হয়েছে।

নতুন বাজেটের লক্ষ্যমাত্রা সামনে রেখে এবার এনবিআর বিগত অর্থ বছরগুলোর তুলনায় কিছুটা আগেভাগেই রাজস্ব বাজেট প্রস্তুতির কাজ শুরু করেছে। এবারও এনবিআর পেশাজীবী, ব্যবসায়ীসহ সব শ্রেণির প্রতিনিধিদের সঙ্গে প্রাক-বাজেট আলোচনা করবে। গত মঙ্গলবার থেকে আগামী অর্থবছরের রাজস্ব বাজেটের গুরুত্বপূর্ণ এবং আলোচিত বিষয়গুলো নিয়ে কর্মকর্তাদের মধ্যে প্রাথমিক আলোচনা শুরু হয়েছে। আগেই যাচাই-বাছাই করে রাখলে পরে প্রাক-বাজেট থেকে পাওয়া বিভিন্ন দাবি, সুপারিশ মূল রাজস্ব বাজেট প্রস্তাবে অন্তর্ভুক্তির সিদ্ধান্ত নিতে সহজ হবে বলে জানিয়েছেন রাজস্ব কর্মকর্তারা।

এনবিআরের বাজেট প্রস্তুত কমিটির কর্মকর্তাদের ধারাবাহিক বৈঠক চলবে রাজস্ব বাজেট চূড়ান্তকরণ পর্যন্ত। তাঁদের তৈরি রাজস্ব বাজেট প্রস্তাব অর্থ মন্ত্রণালয় খতিয়ে দেখে চূড়ান্তকরণের জন্য প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কাছে উপস্থাপন করা হবে। প্রধানমন্ত্রীর অনুমোদনের পর চূড়ান্ত রাজস্ব বাজেট প্রস্তাব আইন মন্ত্রণালয়ের ভেটিং শেষে মূল বাজেট প্রস্তাবে অন্তর্ভুক্ত করা হবে; যা আগামী জুনের প্রথম ভাগে অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত জাতীয় সংসদে পেশ করবেন।

সম্প্রতি অর্থ মন্ত্রণালয় থেকে এনবিআরে পাঠানো চিঠিতে আগামী বাজেটে সংশোধন ছাড়াই ভ্যাট (ভ্যালু অ্যাডেড ট্যাক্স) বা মূসক (মূল্য সংযোজন কর) আইন সম্পূর্ণ বাস্তবায়নের প্রস্তুতি নিতে বলা হয়েছে।

এ বিষয়ে অর্থ মন্ত্রণালয়ের চিঠিতে উল্লেখ আছে, ‘ব্যবসায়ীদের পক্ষে রেখেই ভ্যাট আইন ২০১২ সম্পূর্ণ বাস্তবায়নে যাওয়া সম্ভব হলে আগামীতে এনবিআরের রাজস্ব আদায়ের প্রধান খাত হবে ভ্যাট। ’

ভ্যাট আইন-২০১২ নিয়ে গত তিন অর্থবছর ধরে সরকারের সঙ্গে ব্যবসায়ীদের টানাপড়েন চলছে। প্যাকেজ ভ্যাট বহাল রাখা, সব পণ্যের ভ্যাটের একই হার (১৫ শতাংশ) বাতিলের দাবিতে ব্যবসায়ীরা পথে নামায় চলতি বছরও ভ্যাট আইন-২০১২ সম্পূর্ণ বাস্তবায়ন করতে পারেনি এনবিআর।

ভ্যাট আইন সম্পূর্ণ বাস্তবায়নের প্রস্তুতির কথা বললেও কিছুটা নমনীয়তার আভাসও রয়েছে অর্থ মন্ত্রণালয়ের চিঠিতে। এত বলা হয়েছে, কোনো কারণে ভ্যাট আইনটি সম্পূর্ণ বাস্তবায়ন সম্ভব না হলে বা সংশোধন করে বাস্তবায়নে বাধ্য হলে ভ্যাট খাতের পরিবর্তে আয়কর খাতকে এনবিআরের রাজস্ব আদায়ের প্রধান খাত হিসেবে গণ্য করা যেতে পারে। কারণ এরই মধ্যে করদাতার সংখ্যা ৩০ লাখের কাছাকাছি পৌঁছেছে, আগামী বছর যা ৪০ লাখ ছাড়িয়ে যেতে পারে।


মন্তব্য