kalerkantho


কিছুরই তোয়াক্কা করেন না কাউন্সিলর রতন

তোফাজ্জল হোসেন রুবেল   

২৭ ফেব্রুয়ারি, ২০১৭ ০০:০০



কিছুরই তোয়াক্কা করেন না কাউন্সিলর রতন

ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) ২০ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলর ফরিদ উদ্দিন রতনের বিরুদ্ধে অভিযোগের যেন অন্ত নেই। তাঁর বিরুদ্ধে দখল, চাঁদাবাজি, ডিএসসিসির সেগুনবাগিচা কাঁচাবাজার ভবন নিজের কবজায় রাখা, গুলিস্তানের ৯টি স্পটে অবৈধ দোকান বসিয়ে টাকা আদায়, মহানগর নাট্যঞ্চসহ আশপাশের এলাকায় মাদক বিক্রেতাদের আশ্রয় দেওয়ার কথা সবার মুখে মুখে।

এ ছাড়া বেপরোয়া এই কাউন্সিলর ডিএসসিসির কর্মকর্তাদের প্রকাশ্যে মারধরেও সিদ্ধহস্ত। তাঁর আচরণে ডিএসসিসির কর্মকর্তা-কর্মচারীরা সব সময় তটস্থ থাকেন। তবে এসব অভিযোগ সরাসরি অস্বীকার করেছেন ফরিদ উদ্দিন রতন।

গত কয়েক দিন ঘুরে দেখা যায়, রাজধানীর মহানগর নাট্যমঞ্চ ও সংশ্লিষ্ট পার্কে হাত বাড়ালেই মেলে মাদকদ্রব্য। ভাসমান মানুষকে সেখানে প্রকাশ্যে মাদক সেবন করতেও দেখা গেছে। সকাল থেকে গভীর রাত পর্যন্ত নাট্যমঞ্চের আশপাশে মাদক বিক্রেতারা ঘুরে বেড়ায়। দিনে তাদের বিক্রি এক থেকে দেড় লাখ টাকার মতো। সে হিসাবে প্রতি মাসে ৩০ থেকে ৪০ লাখ টাকার মাদকদ্রব্য বিক্রি হয় এ স্পটে। এ ব্যবসার পুরোটাই নিয়ন্ত্রণ করে সোহেল ও রাসেল নামের দুই যুবক।

তারা রতনের খুবই ঘনিষ্ঠ বলে পরিচিত।

কাউন্সিলর হওয়ার আগে থেকেই গুলিস্তানের ফুটপাতে টাকা আদায় করেন রতন। এখন তিনি আরো বেপরোয়া। গুলিস্তানের ৯টি ফুটপাতের নিয়ন্ত্রণ তাঁর হাতে। নিজের লোকজন দিয়ে তিনি ৯টি স্পটে দোকান বসিয়ে বিভিন্ন মার্কেট ও এলাকা থেকে অর্থ আদায় করেন। গুলিস্তান ট্রেড সেন্টারের সামনে, আল-মনসুরের সামনে থেকে ট্রেড সেন্টার, গোলাপশাহ মাজার থেকে রাজধানী সুপার মার্কেট, রমনার কোনা থেকে গোলাপশাহ মাজার, বিআরটিসির কোনা থেকে বেল্টপট্টি, অগ্রণী ব্যাংকের কোনা থেকে আওয়ামী লীগ অফিস হয়ে খদ্দর মার্কেটের কোনা পর্যন্ত, নগর ভবনের পূর্ব পাশের ফুটপাত, রাজধানী হোটেলসংলগ্ন বাটার শোরুম থেকে বেল্টপট্টি, টিঅ্যান্ডটি অফিস থেকে গোলাপশাহ মাজার হয়ে ফুলবাড়িয়া পর্যন্ত মোট ৯টি স্পট থেকে প্রতিদিন টাকা আদায় করা হয়। এই টাকা তোলার দায়িত্বে রয়েছে বাবুল, ফারুক, প্রদীপ সরকার শাহীন, ছালাম, আক্তার, হাসান ও মনির। তারা সবাই কাউন্সিলর রতনের লোক হিসেবে পরিচিত। এ ছাড়া ২০ নম্বর ওয়ার্ড এলাকার সরকারি বিভিন্ন দপ্তরে রতনের লোক হিসেবে পরিচিত ওয়ার্ড ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক ইব্রাহিম রাসেল, সহসভাপতি সজল মাহমুদ, শাহবাগ থানা স্বেচ্ছাসেবক লীগের সাধারণ সম্পাদক মহিউদ্দিন মহিন টেন্ডার নিয়ন্ত্রণ করেন।

কাউন্সিলর রতন কতটা বেপরোয়া তা এলাকাবাসীসহ ডিএসসিসির কর্মকর্তা-কর্মচারীরা হাড়ে হাড়ে জানেন। গত বছরের ১৪ মার্চ ডিএসসিসির পরিছন্নতা অভিযান বিষয়ে আয়োজিত অনুষ্ঠানের ব্যানারে নিজের নাম না দেখে সংস্থাটির দুই কর্মকর্তার গায়ে হাত তোলেন এই ওয়ার্ড কাউন্সিলর। বাংলাদেশ টেলিকমিউনিকেশনস কম্পানি লিমিটেডের (বিটিসিএল) অফিস আঙিনায় তিনি এ কাণ্ড ঘটান। পিটুনির শিকার হন ডিএসসিসির জনসংযোগ কর্মকর্তা উত্তম কুমার রায় ও অতিরিক্ত প্রধান বর্জ্য ব্যবস্থাপনা কর্মকর্তা খন্দকার মিল্লাতুল ইসলাম। এ সময় সেখানে উপস্থিত গণমাধ্যমকর্মীরা ওই দুই কর্মকর্তাকে উদ্ধার করে সরিয়ে নেন।

২০০৬ সালে ২৩ কাঠা জমির ওপর ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন (ডিএসসিসি) নির্মাণ করে ‘সেগুনবাগিচা সিটি করপোরেশন মার্কেট’। বেইসমেন্টসহ পাঁচতলা ভবনটির দুটি ফ্লোরে মোট ১০৭টি দোকান বরাদ্দ দেওয়া হয়। বাকি দুটি ফ্লোর আর বেইসমেন্ট রাখা হয় কমিউনিটি সেন্টার আর পার্কিংয়ের জন্য। কিন্তু এর বেশির ভাগ বেদখল আর পরিত্যক্ত অবস্থায় আছে। একটি ফ্লোর স্থানীয় কাউন্সিলরের অফিস ও কনস্ট্রাকশন কম্পানির দখলে রয়েছে। পরিকল্পিত কমিউনিটি সেন্টারটি আজও করা হয়নি। মার্কেট ভবনটির তিন পাশ ঘিরে কমপক্ষে ২০টি অবৈধ দোকান নির্মাণ করা হয়েছে। কাউন্সিলরের দাপটে এ বিষয়ে ডিএসসিসি কোনো ব্যবস্থা নেয় না।

সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, মার্কেটের তিনতলায় পাঁচ হাজার বর্গফুটেরও বেশি জায়গা জুড়ে কাউন্সিলর রতনের অফিস। বাকি অংশে একটি কনস্ট্রাকশন কম্পানি রয়েছে। সেখানে গিয়ে দেখা যায়, কয়েকজন চেয়ার-টেবিল নিয়ে দাপ্তরিক কাজ করছেন। পুরো ফ্লোরেই রয়েছে ক্লোজড সার্কিট (সিসি) ক্যামেরা।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক স্থানীয় কয়েকজন জানায়, ডিএসসিসি মার্কেটের দুটি ফ্লোর আর বেইসমেন্ট নিজের কবজায় নিতে মরিয়া রতন। এ কারণে কমিউনিটি সেন্টারটি চালু করতে দেওয়া হয়নি। করপোরেশনের অর্থে কেনা লিফটও ভেঙে দুমড়েমুচড়ে রাখা হয়েছে, যাতে কেউ ওঠানামা করতে না পারে। সিঁড়িটাও ভয়ংকর নোংরা। ফলে এটি কেউ ব্যবহার করতে চায় না। বেইসমেন্টে থাকা পার্কিংয়ে বসানো হয়েছে ওয়ার্কশপ।

কাউন্সিলর রতন সেগুনবাগিচায় ফুটপাতের ওপর স্থায়ীভাবে একটি ভবন নির্মাণ করছেন। প্রায় ৫০ ফুট দৈর্ঘ্য আর ১৫ ফুট প্রস্থের এ জায়গায় তোলা ভবনটির দ্বিতীয় তলার কাজ চলছে এখন। ফলে এখানে ফুটপাত বলে আর কিছু নেই। ভবনের অংশ রাস্তার ওপর পর্যন্ত চলে এসেছে। ইমারত নির্মাণ আইন অনুযায়ী রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (রাজউক) সীমানায় যেকোনো স্থাপনা করতে হলে সংশ্লিষ্টদের অনুমোদন দরকার। তবে এ ক্ষেত্রে তা করা হয়নি। ভবনটির নিচতলায় এরই মধ্যে দুটি দোকান চালু করে দেওয়া হয়েছে।

এসব বিষয়ে জানতে চাইলে ফরিদ উদ্দিন রতন বলেন, ‘আমার বিরুদ্ধে করা সব অভিযোগ মিথ্যা। আমি ফুটপাত দখল নয়, সেখানে কমিউনিটি পুলিশের অফিস করতে চেয়েছিলাম। তবে এখন কাজ বন্ধ করে দিয়েছি। আর সেগুনবাগিচা কাঁচাবাজার ভবনে আমার কোনো দখল নেই। সিটি করপোরেশন চাইলে ভবনটি ব্যবহার করতে পারে। এ ছাড়া মাদক ব্যবসা বা ফুটপাত দখলের সঙ্গে আমি কখনোই জড়িত ছিলাম না। কোনো চাঁদাবাজি বা টেন্ডারবাজির সঙ্গে আমি নেই। ’

 


মন্তব্য