kalerkantho


লেখক অভিজিৎ হত্যার ২ বছর

দুই খুনির পরিচয়ই শনাক্ত হয়নি

এস এম আজাদ   

২৬ ফেব্রুয়ারি, ২০১৭ ০০:০০



দুই খুনির পরিচয়ই শনাক্ত হয়নি

স্ত্রী রাফিদা আহমেদ বন্যাকে নিয়ে অমর একুশে গ্রন্থমেলায় ঘুরে বেড়াচ্ছিলেন যুক্তরাষ্ট্রপ্রবাসী লেখক ও মুক্তমনা ব্লগের প্রতিষ্ঠাতা অভিজিৎ রায়। তাঁদের অনুসরণ করে ঘোরাফেরা করছিল সাত-আটজন যুবক।

তাদের মধ্যে পাঁচজন ছিল বেশি সময়। আর তিনজন ছিল খুব কাছাকাছি। ২০১৫ সালের ১৭ থেকে ২৬ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত মেলার সিসিটিভি ফুটেজে মিলেছে এমনই চিত্র। ২৬ ফেব্রুয়ারি সন্ধ্যায় সেই ক্যামেরায় অভিজিৎ যখন শেষবার ধরা পড়েছিলেন তখনো তাঁর কাছাকাছি ছিল তিন যুবক। এর কিছু সময় পরই খুন হন অভিজিৎ। প্রত্যক্ষদর্শীদের কাছ থেকে পাওয়া তথ্য মতে, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় টিএসসির কাছে ওই তিন যুবকই হামলা চালিয়েছিল অভিজিৎ ও তাঁর স্ত্রীর ওপর। অভিজিৎ হত্যাকাণ্ডে সরাসরি জড়িত তিন যুবকসহ সাতজনকে এভাবেই ছবিতে শনাক্ত করে গোয়েন্দা পুলিশ। অন্য ব্লগার হত্যা মামলায় গ্রেপ্তার করা আসামিদের কাছ থেকে পরে ওই তিনজনের সাংগঠনিক নামও জানতে পারেন তদন্তকারীরা। তিনজনের মধ্যে একজন গত বছর গোয়েন্দা পুলিশের সঙ্গে ‘বন্দুকযুদ্ধে’ নিহত হয়েছে বলে দাবি করা হলেও অন্য দুজনের প্রকৃত নাম-পরিচয়ই এখনো শনাক্ত হয়নি।

দেশে-বিদেশে চাঞ্চল্য সৃষ্টি করা ওই হত্যাকাণ্ডের পরিকল্পনাকারী হিসেবে চাকরিচ্যুত সেনা কর্মকর্তা সৈয়দ জিয়াউল হকের নাম উঠে এলেও পুলিশ তাঁকে গ্রেপ্তার করতে পারেনি। দুই বছরেও জানা যায়নি হত্যায় জড়িত অন্য সদস্যদের পরিচয়। অভিজিৎ হত্যা মামলা তদন্তের অগ্রগতি এ পর্যায়েই আটকে আছে।

মামলাটি তদন্ত করছে ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) গোয়েন্দা শাখা (ডিবি)। তদন্তসংশ্লিষ্ট ডিবি কর্মকর্তারা জানান, হত্যাকাণ্ডে সরাসরি জড়িত হিসেবে তিনজনের সাংগঠনিক নাম জানতে পারেন তাঁরা। ওই তিনটি নাম হলো সেলিম ওরফে ইকবাল ওরফে মামুন ওরফে হাদি-২, সাজ্জাদ ওরফে সজীব ওরফে সিয়াম ওরফে শামস এবং শরীফুল ইসলাম ওরফে মুকুল রানা। গত বছর রাজধানীর খিলগাঁওয়ে ডিবি সদস্যদের সঙ্গে ‘বন্দুকযুদ্ধে’ এক যুবক নিহত হওয়ার পর তদন্তকারীরা জানান, সে-ই ছিল শরীফুল ইসলাম ওরফে মুকুল রানা। এই সময়ের মধ্যে সন্দেহভাজন আটজনকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ, সিটিটিভি ফুটেজ ও আলামত পরীক্ষায় যাদের কোনো সংশ্লিষ্টতাই মেলেনি।

তদন্তকারীরা এখন বলছেন, হত্যায় জড়িত ব্যক্তিরা আনসারুল্লাহ বাংলা টিম (এবিটি) থেকে আনসার আল ইসলামে রূপান্তরিত জঙ্গি দলের সদস্য। তাদের চেহারা শনাক্ত করা গেছে। মিলেছে সাংগঠনিক নাম। পরিচয় শনাক্ত করে গ্রেপ্তার করতে না পারায় মামলাটির চার্জশিট (অভিযোগপত্র) দাখিল করা হচ্ছে না।

ডিবির যুগ্ম কমিশনার আব্দুল বাতেন কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘এই খুনে সরাসরি জড়িত শরীফুল ওরফে মুকুল বন্দুকযুদ্ধে মারা গেছে। সেলিমসহ অন্যদের পরিচয় শনাক্ত করার চেষ্টা চলছে। জিয়ার নির্দেশনায় একটি জঙ্গিদল এই হত্যাকাণ্ড ঘটায়। তারা আরো খুনে জড়িত। ’ এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘আসামি গ্রেপ্তার না করে চার্জশিট দিলে সেটি মামলার মেরিট নষ্ট করবে। এ কারণে আমরা একটু সময় নিচ্ছি। ’

২০১৫ সালের ২৬ ফেব্রুয়ারি রাতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসি এলাকায় অভিজিেক চাপাতি দিয়ে কুপিয়ে হত্যা করে দুর্বৃত্তরা। যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিক অভিজিতের স্ত্রী রাফিদা আহমেদ বন্যাও ওই হামলায় গুরুতর জখম হন। পরে তিনি যুক্তরাষ্ট্রে চলে যান। তদন্তে নেমে দুজনকে জিজ্ঞাসাবাদের পর ডিবি দাবি করে, হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছে এবিটি। সিলেটের ব্লগার অনন্ত বিজয় দাস হত্যা মামলার আসামি মান্নান রাহী, ফারাবি, এবিটির আধ্যাত্মিক নেতা জসীমুদ্দীন রাহমানির ভাই আবুল বাশার, এবিটি সদস্য সাদেকুর রহমান মিঠু, আলিমুল মল্লিক, তৌহিদুর রহমান, জুলহাজ বিশ্বাস ও জাফরানকে সন্দেহভাজন হিসেবে গ্রেপ্তার করে পুলিশ ও র্যাব। বাশার জামিনে থাকাকালে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে চিকিত্সাধীন অবস্থায় মারা যায়। ঘটনাস্থল থেকে উদ্ধার করা দুটি ইনজেকশন, একটি সিরিঞ্জ, কিছু ওষুধ, পুরনো কিছু পত্রিকাসহ ১১টি আলামত জব্দ করে পুলিশ। সেগুলোর ডিএনএ পরীক্ষা করে রিপোর্ট দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় তদন্ত সংস্থা এফবিআই। সেই পরীক্ষায় সন্দেহভাজন আসামিদের শনাক্ত করা যায়নি।

ডিবির সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, সিসি ক্যামেরার ফুটেজ এবং দুই জঙ্গির দেওয়া তথ্যে অভিজিৎ হত্যার রহস্যজট খোলে। ব্লগার ও লেখক হত্যায় জড়িত ছয় জঙ্গির ছবিসহ তথ্য গত বছরের ১৯ মে প্রকাশ করে ডিএমপি। গুলশানে জঙ্গি হামলার পর সৈয়দ জিয়াউল হককে ধরতে ২০ লাখ টাকা পুরস্কার ঘোষণা করে পুলিশ সদর দপ্তর। তাঁকে বলা হয় আনসার আল ইসলামের সামরিক শাখার প্রধান।

ডিবির উপকমিশনার (গাইবান্ধায় এসপি হিসেবে বদলির আদেশ পেয়েছেন) মাশরুকুর রহমান খালেদ কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘সাগর নাম নিয়ে জিয়া অভিজিৎ হত্যার দল গোছায়। দীপন হত্যা এবং টুটুল হত্যাচেষ্টাসহ সব ঘটনায়ই ওপরের দিকে বড় ভাই, নেতা বা প্রশিক্ষক হিসেবে তিনটি নাম এসেছে—ইমতিয়াজ, ইশতিয়াক ও সাগর। তিনজনই একই ব্যক্তি—চাকরিচ্যুত মেজর জিয়া। এর পরই সেলিম, সাজ্জাদ ও শরীফুল। লেখক অভিজিৎ রায় হত্যার সময় মাশুল বা অপারেশনাল কমান্ডার ছিল শরীফুল। ’

অভিজিৎ হত্যায় জড়িত হিসেবে সেলিম ওরফে ইকবাল ওরফে মামুন ওরফে হাদী-২-কে ধরিয়ে দিতে পাঁচ লাখ টাকা পুরস্কার ঘোষণা করা হয়। পুলিশের বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, এগুলো তার প্রকৃত নাম না-ও হতে পারে। সেলিমের উচ্চতা ৫ ফুট ১০ ইঞ্চি, গায়ের রং শ্যামলা এবং চশমা পরে। বিজ্ঞপ্তিতে তার কোনো ঠিকানা উল্লেখ করা হয়নি। পুলিশের দাবি, প্রকাশক দীপন, ব্লগার ওয়াশিকুর বাবু, নীলাদ্রি নীল এবং মিরপুরের স্কুল শিক্ষক হত্যার ঘটনায়ও নেতৃত্ব দেয় সেলিম। অন্যদিকে অভিজিৎ রায় ও নীলাদ্রি নীল হত্যাকাণ্ডে সরাসরি অংশ নেয় পলাতক সাজ্জাদ। পুলিশ জানিয়েছে, সজিব, সিয়াম ও শামস নামেও সাজ্জাদ পরিচিত। তার তথ্যদাতার জন্য দুই লাখ টাকা পুরস্কার ঘোষণা করে পুলিশ। এই দুজনের ব্যাপারে তথ্য প্রচার করার পর এক বছরেও তাদের প্রকৃত পরিচয় শনাক্ত করতে পারেনি পুলিশ।

২০১৫ সালে গ্রন্থমেলা চলাকালে ১৭ থেকে ২৬ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত সিসি ক্যামেরার ফুটেজ বিশ্লেষণ করে ডিবির তদন্তসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, ওই ফুটেজ বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, শরীফুল, সেলিম, সাজ্জাদসহ সাত-আটজন অভিজিৎ রায়ের গতিবিধি অনুসরণ করছিল। ঘটনার আগে সেলিম, সাজ্জাদ ও শরীফুল ছিল অভিজিতের কাছাকাছি। তদন্তকারীদের দাবি, হত্যাকাণ্ডের তিন মাস আগে এর পরিকল্পনা করা হয়। সাগর নাম নিয়ে টঙ্গীর বর্ণমালা রোডের একটি আস্তানা বা মারকাজে হত্যাকারী দলকে জড়ো করেন জিয়া। হত্যায় যারা অংশ নিয়েছিল তাদের রাজধানীর এলিফ্যান্ট রোড, মহাখালী, উত্তরা ও টঙ্গীর ওই মারকাজে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। অভিজিেক হত্যা করতে মাঠপর্যায়ে সামরিক কমান্ডার হিসেবে শরীফকে নিয়োজিত করেছিলেন জিয়া। ঘটনার দিন টঙ্গীর একটি বাসা থেকে এবিটি সদস্যরা বইমেলায় যায়। আগের দিনও তারা বইমেলায় গিয়ে অভিজিেক না পেয়ে ফিরে যায়।

জানতে চাইলে ডিবির ডিসি মাশরুকুর রহমান খালেদ বলেন, ‘বিভিন্নভাবে পলাতক জঙ্গিদের পরিচয় শনাক্ত করার চেষ্টা চলছে। তাদের অনেক নামসহ অবস্থানের ব্যাপারে তথ্য পাওয়া গেছে। অনেক দূর এগিয়েছি। ধরার আগে এসব বলা যাবে না। ’

অভিজিৎ রায়ের বাবা অধ্যাপক অজয় রায় আশা করছেন, এই হত্যাকাণ্ডের বিচার হবে। তিনি বলেন, ‘শরীফুল নামের এক আসামি ডিবির সঙ্গে বন্দুকযুদ্ধে মারা গেছে বলে শুনেছি। পুলিশ আসামিদের যদি শনাক্ত করতে পারে তবে ধরুক। শনাক্ত হয়েছে বলছে অথচ ধরা যাচ্ছে না। পরিচয় বের হবে এমন আশাই তারা শোনাচ্ছে। ’


মন্তব্য