kalerkantho


এখন শক্তি সঞ্চয়ের কৌশল বিএনপির

আন্দোলন শেষের ৬ মাসে

এনাম আবেদীন   

২৬ ফেব্রুয়ারি, ২০১৭ ০০:০০



আন্দোলন শেষের ৬ মাসে

যত ইস্যুই সরকার সামনে আনুক না কেন, আপাতত সরকারবিরোধী কোনো আন্দোলনে বিএনপির নেতৃত্বাধীন জোট যাবে না। দলটির কৌশল হলো আগামী এক থেকে দেড় বছর সাংগঠনিক শক্তির পাশাপাশি রাজনৈতিক শক্তি সঞ্চয় করা। অর্থাৎ মামলা-মোকাদ্দমা মুকাবিলা করে ঘুরে দাঁড়ানো আর সরকার নতুন করে মামলা দেওয়ার সুযোগ পায়—এমন কর্মসূচি এড়িয়ে যাওয়া ও লোকবল ক্ষয় না করা।

সূত্রমতে, এভাবে শক্তি সঞ্চয় করে সরকারের মেয়াদের শেষ ছয় মাসে আন্দোলনে যাওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে বিএনপির। সরকারের শেষ সময়ে সাধারণত প্রশাসনিক ব্যবস্থা অনেকটা দুর্বল হয়ে পড়ে বলে এ দেশে আলোচনা আছে। তাই ওই সময়কেই আন্দোলনের জন্য বেছে নিয়ে নির্বাচনকালীন সহায়ক সরকারের দাবি মানানোর জন্য সরকারকে চাপে ফেলতে চায় দলটি। তাই এখন বিনা ইস্যুতে আন্দোলন করলে সরকার নতুন করে নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে মামলা দেওয়ার সুযোগ পাবে। আর এতে করে মেয়াদের শেষ সময় আন্দোলন করার মতো শক্তি বিএনপির থাকবে না বলে দলটির নীতিনির্ধারকরা মনে করেন।

জানতে চাইলে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন কালের কণ্ঠকে বলেন, গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠার লড়াইয়ে বিএনপি আছে। তবে এটি ঠিক যে যেকোনো সরকারের মেয়াদের শেষ ভাগে আন্দোলন সাধারণত জোরদার হয়। তাই শেষ সময়ে বিএনপি দুর্বার আন্দোলনে যাবে, এটি মনে হওয়া স্বাভাবিক।

তিনি বলেন, ‘নির্বাচনকালীন সহায়ক সরকারের দাবি সরকার দেশের বৃহত্তর প্রয়োজনে মেনে নেবে বলে আমরা প্রত্যাশা করি। কিন্তু দাবি না মানা হলে অবশ্যই আমরা আন্দোলনে যাব। একতরফা নির্বাচন কিছুতেই মেনে নেওয়া হবে না। ’

বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর কালের কণ্ঠকে বলেন, সরকারের মেয়াদের শেষ ভাগে কী হবে তা আগাম বলা সম্ভব নয়। তবে সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের দাবিতে বিএনপির আন্দোলন শেষ সময় পর্যন্ত অব্যাহত থাকবে। এ ক্ষেত্রে বিএনপি সহায়ক সরকারের প্রস্তাব দেবে জানিয়ে তিনি বলেন, সরকার ওই প্রস্তাব মেনে নিলে কোনো সংকট হবে না। তবে আগের মতো একতরফা নির্বাচনের উদ্যোগ নিলে তখন  সর্বাত্মক আন্দোলনে যাওয়া ছাড়া বিএনপির উপায় থাকবে না।

এক প্রশ্নের জবাবে মির্জা ফখরুল বলেন, কাউন্সিলের পর এখন বিএনপি সারা দেশে সংগঠন গোছানোর কাজ শুরু করেছে। মামলা-মোকাদ্দমাও মুকাবিলা করছে। দলীয় চেয়ারপারসনের নির্দেশনা পেলে উপযুক্ত সময়ে তারা আন্দোলনে ঝাঁপিয়ে পড়বে।

গত কয়েক মাসে ৩০টি জেলায় বিএনপির কমিটি গঠন সম্পন্ন হয়েছে জানিয়ে বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান মোহম্মদ শাহজাহান বলেন, ‘আমরা এখন রাজনৈকি শক্তি সঞ্চয়ের জন্য সংগঠন গোছানোর কাজ করছি। পাশাপাশি গ্রহণযোগ্য নির্বাচনও আমরা চাই। ’ তাঁর মতে, গ্রহণযোগ্য নির্বাচন করতে হলে আন্দোলনেরও প্রয়োজন হবে। তবে ওই আন্দোলন মাঝপথে নাকি সরকারের মেয়াদের শেষে হবে তা এখনো ঠিক হয়নি। তবে ৫ জানুয়ারির মতো নির্বাচন করা এত সহজ হবে না—যোগ করেন বিএনপির সংগঠন গোছানোর দায়িত্বপ্রাপ্ত এ নেতা।

৫ জানুয়ারিকে কেন্দ্র করে দুই দফা আন্দোলনসহ গত আট বছরে সারা দেশে বিএনপির নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে মোট ২১ হাজার মামলা রয়েছে বলে দলের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের এক হিসাবে বেরিয়ে এসেছে। আর এ নিয়ে দুশ্চিন্তায় আছে দলটির হাজার হাজার নেতাকর্মী। ফলে সরকারের বিরুদ্ধে নতুন করে আন্দোলনে যাওয়ার আগে এবার অনেক চিন্তা-ভাবনা করে এগোতে চায় দলটি। বিশেষ করে বর্তমান সরকারের প্রতি আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সমর্থন কতটুকু থাকে তাও দেখে নিতে চায় বিএনপি। এ ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্র, চীন, ভারত ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের ভূমিকা আন্দোলন শুরুর আগে তারা বিশেষভাবে পর্যালোচনা করে দেখবে। তবে সবচেয়ে বেশি বিবেচনায় নেবে তারা প্রতিবেশী দেশ ভারতের অবস্থান। কারণ ওই দেশটির সমর্থন ছাড়া আন্দোলন সফল করা তথা ক্ষমতায় যাওয়া সম্ভব নয় বলে বিএনপির নীতিনির্ধারণী মহলে আলোচনা আছে।

সূত্রমতে, চূড়ান্ত আন্দোলনে নামার আগে মহাজোট সরকারের বাইরে থাকা রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গেও বিশেষ করে আগামী নির্বাচনে অংশ নেওয়া না নেওয়া প্রশ্নে বিএনপি সব দলের সঙ্গে ঐকমত্য করতে চায়। পাশাপাশি দলকে শক্তিশালী করতে ‘সংস্কারপন্থী’ বলে পরিচিত নেতাদের ঘরে ফিরিয়ে আনছে বিএনপি। ইতিমধ্যে এ প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে এবং গত ২৩ ফেব্রুয়ারি থেকে খালেদা জিয়া সংস্কারপন্থী নেতাদের সঙ্গে ধারাবাহিকভাবে বৈঠক করা শুরু করেছেন। ওই দিন সাবেক দুই সংসদ সদস্য জহিরউদ্দিন স্বপন এবং সরদার সাখাওয়াত হোসেন বকুলের সঙ্গে আলাপকালে তিনি বলেছেন, এখন বিভেদের সময় নয়। জাতীয়তাবাদী দল তথা জাতীয়তাবাদী শক্তির ঐক্য পুনঃপ্রতিষ্ঠা করে গণতন্ত্রের জন্য একযোগে লড়াই করতে হবে। সূত্রমতে, এর বাইরে নির্বাচনকালীন সহায়ক সরকারের প্রস্তাব দিয়ে জনমত গঠন বিএনপির আরেকটি লক্ষ্য।

যদিও গত বছর ১ জুলাই গুলশানের হলি আর্টিজান বেকারিতে জঙ্গি হামলার পর বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার ‘সন্ত্রাসবিরোধী ঐক্য’র ডাক সফলতা পায়নি। কারণ ঐক্যের আগে ওই দলগুলো বিএনপির সুস্পষ্ট রাজনৈতিক অবস্থান জানতে চেয়েছে। বিশেষ করে ২০ দলীয় জোটের প্রধান শরিক জামায়াতকে নিয়ে বেশির ভাগ দল ওই সময় আপত্তি তুলেছে। ফলে সিপিবি, বাসদ, গণফোরাম, বিকল্প ধারা, জেএসডি ও কৃষক শ্রমিক জনতা লীগসহ বেশ কয়েকটি দলের সঙ্গে বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল বৈঠক করলেও তা কাজে লাগেনি। তবে নির্বাচনের সময় ঘনিয়ে এলে ওই দলগুলোকে কাছে টানার জন্য জামায়াত প্রশ্নের নিষ্পত্তিসহ আরো অনেক ইস্যু বিএনপি স্পষ্ট করবে বলে দলটির শীর্ষ পর্যায়ের নেতাদের সঙ্গে আলোচনা করে জানা গেছে।


মন্তব্য