kalerkantho


পরিকল্পনার কথা স্বীকার করলেন কাদের খান!

নিজস্ব প্রতিবেদক, ঢাকা ও গাইবান্ধা প্রতিনিধি   

২৬ ফেব্রুয়ারি, ২০১৭ ০০:০০



পরিকল্পনার কথা স্বীকার করলেন কাদের খান!

গাইবান্ধা-১ (সুন্দরগঞ্জ) আসনের আওয়ামী লীগের সংসদ সদস্য (এমপি) মঞ্জুরুল ইসলাম লিটনকে হত্যার দায় ওই আসনের জাতীয় পার্টির সাবেক এমপি কর্নেল (অব.) ডা.  আবদুল কাদের খান স্বীকার করেছেন বলে জানিয়েছে পুলিশ। ওই হত্যা মামলায় গ্রেপ্তার কাদের খান গতকাল শনিবার আদালতে ১৬৪ ধারায় এই স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন বলে তদন্তসংশ্লিষ্ট পুলিশ কর্মকর্তারা জানিয়েছেন।

লিটন হত্যা মামলায় কাদের খান ১০ দিনের রিমান্ডে ছিলেন। রিমান্ডের চতুর্থ দিনে তিনি ওই হত্যায় নিজের জড়িত থাকার কথা স্বীকার করে নিলেন বলে বলছে পুলিশ। গতকাল বিকেল থেকে রাত প্রায় সাড়ে ৯টা পর্যন্ত গাইবান্ধার জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে বিচারক মো. জয়নুল আবেদিন তাঁর জবানবন্দি রেকর্ড করেন।

পুলিশ বলছে, রিমান্ডে জিজ্ঞাসাবাদের প্রথম দিকে লিটন হত্যায় জড়িত থাকার কথা অস্বীকার করেছিলেন কাদের খান। পরে স্বীকার করেন যে তাঁর পরিকল্পনায়ই লিটনকে হত্যা করা হয়। একপর্যায়ে আদালতেও স্বীকারোক্তি দিতে রাজি হন তিনি। এর আগে ওই হামলায় সরাসরি অংশ নেওয়া তিনজন গ্রেপ্তার হওয়ার পর পুলিশের জিজ্ঞাসাবাদে জানিয়েছিল যে কাদের খানের পরিকল্পনায় তারা লিটনকে হত্যা করেছে।   

আদালতে কাদের খানের দেওয়া জবানবন্দির কথা উল্লেখ করে পুলিশ দাবি করছে, লিটনের জনপ্রিয়তা কমায় জামায়াত-বিএনপির ভোট পাবেন বলে ভেবেছিলেন কাদের খান। এ কারণে লিটনের অবর্তমানে এমপি হতে তিনি এই হত্যার পরিকল্পনা করেন।

তিনি গাইবান্ধায় মন্দিরের প্রতিমা ভাঙচুর করিয়ে নব্য জেএমবির কাজ বলে চালিয়ে দিয়েছেন—এমন তথ্য পাওয়ারও দাবি করেছে পুলিশ।

গতকাল রাত সাড়ে ৯টার দিকে আদালত চত্বরে রংপুর রেঞ্জের অতিরিক্ত ডিআইজি আহমেদ বশির সাংবাদিকদের বলেন, গতকাল বিকেল সাড়ে ৩টার পর থেকে রাত সাড়ে ৯টা পর্যন্ত গাইবান্ধার জ্যেষ্ঠ বিচারিক হাকিম জয়নাল আবেদিন তাঁর জবানবন্দি গ্রহণ করেন। কাদের খান আদালতে ১৬৪ ধারায় এমপি লিটন হত্যার পরিকল্পনা, প্রশিক্ষণ ও বাস্তবায়ন সম্পর্কে বিস্তারিত বিবরণ দিয়েছেন। এ সময় অতিরিক্ত ডিআইজি আরো বলেন, ‘এ মামলার পুরো রহস্য উন্মোচনের পাশাপাশি প্রধান সব আসামি গ্রেপ্তার হয়েছে। ১৫ দিনের মধ্যে আদালতে এমপি লিটন হত্যা মামলার অভিযোগপত্র জমা দেওয়া সম্ভব হবে বলে আশা করছি। ’

গাইবান্ধার বিদায়ী পুলিশ সুপার (এসপি) মো. আশরাফুল ইসলাম কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘তিনি (কাদের খান) আদালতে স্বেচ্ছায় স্বীকারোক্তি দিতে রাজি হয়েছেন। এর বাইরে আর কিছু বলার নেই। ’

পুলিশের জিজ্ঞাসাবাদে অন্য আসামিদের বর্ণনার মতো নিজের পরিকল্পনার কথা স্বীকার করেছেন কি না—এ প্রশ্নে এসপি আশরাফ বলেন, ‘আমি আজ চার্জ (দায়িত্ব) ছেড়ে দিয়েছি। এ ব্যাপারে আমি কিছু বলতে পারব না। তিনি আদালতে গেছেন স্বীকারোক্তি দিতে এটাই পরিষ্কার। ’ 

গত মঙ্গলবার বগুড়ার বাড়ি থেকে কাদের খানকে গ্রেপ্তার করা হয়। এরপর সুন্দরগঞ্জে তাঁর বাড়ি থেকে পিস্তল ও গুলি উদ্ধার করে পুলিশ। বুধবার আদালতের নির্দেশে ১০ দিনের রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছিল তাঁকে।

রিমান্ডে থাকার চতুর্থ দিনে গতকাল দুপুর সোয়া ২টার দিকে কাদের খানকে জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে হাজির করা হয়।

এর আগে অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (এ সার্কেল) রবিউল ইসলামের নেতৃত্বে পুলিশি কড়া নিরাপত্তার মধ্যে হেলমেট এবং বুলেট প্রুপ জ্যাকেট পরিয়ে কাদের খানকে আদালতে হাজির করা হয়। আদালত চত্বর এবং পুলিশ সুপার কার্যালয়ে কড়া নিরাপত্তা বেষ্টনী গড়ে তোলা হয়। জজ কোর্ট ভবনের সব ফটক বন্ধ করে দেওয়া হয়। কোনো সাংবাদিককে সেখানে ঢুকতে দেওয়া হয়নি। এমনকি পুলিশ সুপারের কার্যালয়েও কাউকে যেতে দেওয়া হয়নি।

পুলিশের একটি সূত্র দাবি করে, কাদের খান তাঁর জবানবন্দিতে হামলায় সরাসরি অংশ নেওয়া মেহেদী ও রানার বর্ণনার মতোই পরিকল্পনার কথা স্বীকার করে নিয়েছেন। রিমান্ডে হত্যার দায় স্বীকার করেও তিনি বারবার বাঁচার আকুতি জানান।

পুলিশ জানায়, গত বছরের অক্টোবর মাসে সুন্দরগঞ্জ উপজেলায় একাধিক মন্দিরে প্রতিমা ভাংচুরের ঘটনা ঘটে। ৯ অক্টোবর সদর উপজেলার লক্ষ্মীপুরের কামারপাড়া সড়কসংলগ্ন কালীমন্দিরের প্রতিমা ভাংচুর করে দুর্বৃত্তরা। পুলিশ এ অভিযোগে সুন্দরগঞ্জ উপজেলার ছাপড়হাটি ইউনিয়নের মণ্ডলেরহাট থেকে সে সময় কথিত চার নব্য জেএমবি সদস্যকে গ্রেপ্তার করে।

পরে জানা যায়, গ্রেপ্তারকৃতরা হলো কাদের খানের ভাতিজা সুন্দরগঞ্জের ছাপড়হাটি ইউনিয়নের খানপাড়া পশ্চিম ছাপড়হাটি গ্রামের ইউসুফ খানের ছেলে ফয়সাল খান ফাগুন (১৭) এবং সুন্দরগঞ্জের পশ্চিম ছাপড়হাটি খানপাড়া গ্রামের কাদের খানের বাড়িতে কর্মরত আব্দুল ওয়াহাবের ছেলে নজরুল ইসলাম খান (৩৫), আব্দুল হামিদ মিয়ার ছেলে আশিকুল ইসলাম (১৬) ও আদর আলীর ছেলে শহিদ মিয়া (১২)।

পুলিশ বলছে, গ্রেপ্তারকৃতরা জিজ্ঞাসাবাদে জানিয়েছে, তারা মোটরসাইকেলে গিয়ে মন্দিরের প্রতিমা ভেঙে সেখানে নব্য জেএমবির দায় স্বীকারসংক্রান্ত হাতে লেখা একটি চিঠি রেখে পালিয়ে যায়। সুন্দরগঞ্জ জেএমবি প্রভাবিত এলাকা তা প্রমাণ করতেই কাদের খান সুপরিকল্পিতভাবে তাঁর নিজের ভাতিজা ফয়সাল খান ফাগুনসহ নিজস্ব কাজের লোকদের ব্যবহার করেন।   

পুলিশ সূত্রের দাবি, কাদের খান আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জিততে মরিয়া ছিলেন। এ ক্ষেত্রে এমপি লিটনকে তাঁর পথের কাঁটা মনে করতেন। গত নির্বাচনে তাঁর পরাজয় এবং তাঁর সময়কালে সংঘটিত বিভিন্ন অনিয়ম-দুর্নীতির তদন্ত বিষয়ে তিনি এমপি লিটনকে দায়ী করেন। সে জন্য এক বছর আগে লিটনকে হত্যার পরিকল্পনা করেন।


মন্তব্য