kalerkantho


মাদক ব্যবসা ফুটপাত ডিশ সবই তিতুর দখলে

তোফাজ্জল হোসেন রুবেল   

২৬ ফেব্রুয়ারি, ২০১৭ ০০:০০



মাদক ব্যবসা ফুটপাত ডিশ সবই তিতুর দখলে

সরকারি জমি দখল করে এই মার্কেট বানিয়েছেন ওয়ার্ড কাউন্সিলর ইকবাল হোসেন তিতু। ছবি : কালের কণ্ঠ

ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের (ডিএনসিসি) ১২ নম্বর ওয়ার্ড কাউন্সিলর ইকবাল হোসেন তিতুর বিরুদ্ধে মাদক ব্যাবসা, ফুটপাত ও রাস্তা, অন্যের জমি দখল আর ডিশ নৈরাজ্যের বিস্তর অভিযোগ। ভোটে জিতেই তিনি ছোট ভাই লিটু ও কিছু অনুসারী নিয়ে এলাকায় নিজের সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠার কাজে ঝাঁপিয়ে পড়েছেন বলে জানিয়েছে এলাকাবাসী।

নির্বাচিত হওয়ার অনেক আগেই মিরপুর ১ নম্বরে সনি সিনেমা হলের উল্টো পাশে সরকারের জমি দখল করে স্বাধীন বাংলা সুপার মার্কেট বানিয়ে এলাকায় আলোচনায় আসেন তিনি। নির্বাচিত জনপ্রতিনিধির এমন আগ্রাসী মনোভাব আর অনাচারে সাধারণ মানুষের মধ্যে ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে। তবে নিজের বিরুদ্ধে ওঠা এসব অভিযোগ সঠিক নয় বলে দাবি করেন ইকবাল হোসেন তিতু।

মাদক ব্যবসা : ডিএনসিসির ১২ নম্বর ওয়ার্ডে অনেক আগে থেকেই মাদকের আগ্রাসন। কিন্তু তিতু কাউন্সিলর নির্বাচিত হওয়ার পর তা রমরমা রূপ নিয়েছে বলে জানায় এলাকাবাসী। তাঁর অনুসারী হিসেবে পরিচিত সুজন, আসলাম, খোকন, মিরাজ (কৃষক লীগ) ও শেখ মামুন ওরফে ডাইল মামুন প্রকাশ্যে মাদক ব্যবসা করে যাচ্ছে। ইয়াবা, হেরোইন, ফেনসিডিল, গাঁজাসহ সব ধরনের মাদকদ্রব্য মেলে এ সিন্ডিকেটের কাছ থেকে। কালের কণ্ঠ’র অনুসন্ধানে দেখা যায়, মিরপুরের আহম্মেদনগর, শাহ আলীবাগ, জোনাকী রোড, ধানক্ষেতের মোড়, পুকুরপাড়, সালেমুদ্দিন মার্কেট ও মনির উদ্দিন মার্কেটে নির্বিঘ্নে দাপটের সঙ্গে মাদক বিক্রি চলছে। সম্প্রতি মনির উদ্দিন মার্কেট এলাকার মাদক ব্যবসা ও ডিশ লাইন নিয়ে পুলিশ ও র‌্যাবের সোর্স পরিচয়দানকারী ডাইল মামুনের সঙ্গে বিরোধে জড়িয়ে যান কাউন্সিলর তিতু ও তাঁর ভাই লিটু।

ফুটপাত ও রাস্তা দখল করে দোকান : তিতু-লিটু গং মিরপুর ১ নম্বর সেকশনের বেশ কিছু স্পটে দোকান বসিয়ে টাকা আদায় করছেন বেশ অনেক দিন থেকেই। কিন্তু কাউন্সিলর হওয়ার পর থেকে এর ব্যাপকতা অনেক বেড়েছে। মিরপুর ১ নম্বর ফুট ওভারব্রিজ ঘেঁষে প্রায় ২০০ দোকান বসিয়ে প্রতিদিন দোকানপ্রতি ৫০ টাকা করে আদায় করা হচ্ছে। কাউন্সিলরের পক্ষে টাকা তোলেন দেলোয়ার হোসেন নামের এক পরিবহন নেতা। এ ছাড়া কিয়াংসি চায়নিজের উল্টো পাশে আহম্মেদনগর সড়কের প্রবেশমুখে প্রায় ১০০ দোকান বসানো হয়েছে। এসব দোকান থেকে প্রতিদিন ১০০ টাকা করে আদায় করেন তিতুর ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত আব্দুল আওয়াল। এ ছাড়া জনতা হাউজিং এলাকায় একচেটিয়া ডিশ ব্যবসা চালাচ্ছেন তিনি। পুরো হাউজিং এলাকায় ডিশ ও ইন্টারনেট সংযোগ দেওয়ার বিনিময়ে অস্বাভাবিক হারে টাকা আদায় করা হচ্ছে। তাঁর কাছে এলাকাবাসী একরকম জিম্মি।

রাতে বসে আড্ডা : কাউন্সিলর নির্বাচিত হওয়ার পর থেকে তিতু ও তাঁর অনুসারীরা মিরপুর ১ নম্বর দারুস সালাম রোডের এটিএন পার্টি সেন্টারে নিয়মিত আড্ডা বসান। পার্টি সেন্টারের দ্বিতীয় তলায় রাত ১১টার পর থেকে ভোর পর্যন্ত চলে মাদক সেবন আর জুয়া খেলা। সেখানে স্থানীয় প্রভাবশালী নেতা সামসুল হক, আলী আকবর, আজমসহ অনেকে উপস্থিত থাকেন। নাম প্রকাশ না করার শর্তে একাধিক স্থানীয় বাসিন্দা জানায়, এ আসরে মিরপুরের বড় বড় জুয়াড়ি নিয়মিত আসে।

১৪ সরকারি প্লট দখল : মিরপুরে ১ নম্বর সেকশনের সনি সিনেমা হলের উল্টো পাশে জাতীয় গৃহায়ণ কর্তৃপক্ষের (এনএইচএ) প্রায় শত কোটি টাকা মূল্যের জায়গা দখল করে মার্কেট বানানো হয়েছে। স্বাধীন বাংলা সুপারমার্কেটের নির্মাণকাজ শেষ হয় ২০০৮ সালের দিকে। এখানে প্রায় ৩০০ দোকান আছে। ইকবাল হোসেন তিতু, তাঁর ভাই লিটুসহ একটি সিন্ডিকেট রাজউক থেকে নকশা অনুমোদন না করিয়েই মার্কেটটি নির্মাণ করেছে বলে অভিযোগ আছে। এ কারণে গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটি সংশ্লিষ্ট সংস্থাকে দখলদারদের উচ্ছেদের সুপারিশ করেছে। এ বিষয়ে এনএইচএর পক্ষ থেকে সংশ্লিষ্ট থানায় সাধারণ ডায়েরিও করা হয়েছে।

এনএইচএ সূত্রে জানা যায়, ওই জায়গাটি এলএ কেস নম্বর ১৩/৫৯-৬০-এর আওতায় কর্তৃপক্ষের অনুকূলে অধিগ্রহণ করা হয়। এরপর মোট ৬৬.৬৬ কাঠা জায়গায় ১৯৯০ সালে অনুমোদিত নকশা অনুযায়ী ১৪টি প্লট করা হয়। তাতে দেখা যায় সুফিয়া খাতুন ৮.৩২ কাঠা, আওলাদ হোসেন ৮.৩৩, সামসুদ্দিন আহমেদ ৮.৩৩, মোছা. জরিনা খাতুন ৮.১৩, হাজেরা খাতুন ৭.৭৫, রেহেনা আক্তার ৪.১৬, গোলাম হোসেন ৩.৫৪, হাজি নূর মোহাম্মদ ৩.৫৬, আশরাফ উদ্দিন ২.০৪, লাবিব উদ্দিন ২.৫০, আব্দুল হাই ২.৫০, ফজিলাতুন-নেছা ২.৫০, জামাল উদ্দিন চৌধুরী ২.৫০ ও রুহুল আমিন খাঁন ২.৫০ কাঠার মালিক। তবে এগুলো এখন আর তাঁদের দখলে নেই। এ প্লটগুলোর ওপরই জোর করে স্বাধীন বাংলা সুপারমার্কেটটি নির্মাণ করা হয়েছে। এখানে আছে শাড়ি-কাপড়ের বড় বড় শোরুমও। সেগুলো ভাড়া দেওয়া হয়েছে। দোতলায় একটি চায়নিজ রেস্টুরেন্ট আছে। একাধিক দোকান মালিক জানান, আয়তনভেদে প্রতিটি দোকান ও শোরুমের বিপরীতে ২০ থেকে ৫০ লাখ টাকা পর্যন্ত জামানত নেওয়া হয়েছে। মাসিক ভাড়াও ৫০ হাজার টাকার ওপরে।

এসব অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে কাউন্সিলর ইকবাল হোসেন তিতু কালের কণ্ঠকে বলেন,  ‘দখল তো দূরের কথা আমি ফুটপাত থেকে অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদের জন্য কয়েকবার পদক্ষেপ নিয়েছি। এখানে পুলিশ ও আওয়ামী লীগ নেতারা দোকান বসিয়ে টাকা আদায় করছে। ফুটপাতের দোকান থেকে টাকা আদায়কারী আওয়াল ও দেলোয়ার আওয়ামী লীগ নেতা হানিফের লোক। আর  যারা মাদক বিক্রি করে তাদের সঙ্গে আমি চলাফেরা করি না। এ ছাড়া এটিএন পার্টি সেন্টারে স্থানীয় আওয়ামী লীগের অঙ্গসংগঠনের লোকজনের আড্ডা দেওয়ার কথা শুনেছি। কিন্তু আমি কখনো সেখানে যাই না। ’


মন্তব্য