kalerkantho


সিএনজি অটোরিকশায় বাসের ধাক্কা

মায়ের সামনেই ঝরে গেল মেডিক্যাল ছাত্রীর প্রাণ

নিজস্ব প্রতিবেদক   

২৬ ফেব্রুয়ারি, ২০১৭ ০০:০০



মায়ের সামনেই ঝরে গেল মেডিক্যাল ছাত্রীর প্রাণ

সাদিয়া হাসান

মেডিক্যালের শেষ বর্ষের পরীক্ষা চলছে, পড়াশোনার ভীষণ চাপ। তাই মাঝে অনেক দিন বাড়ি যাওয়া হয়নি। একটানা এত দিন মাকে না দেখতে পেয়ে অস্থির হয়ে উঠছিলেন সাদিয়া হাসান (২২)। যদিও প্রতিদিনই মোবাইল ফোনে কথা হতো; কিন্তু তাতে কি আর মায়ের স্নেহের পরশ মেলে! তাই বৃহস্পতিবার পরীক্ষা দিয়েই ছুটে গিয়েছিলেন বাড়ি। গতকাল শনিবার সকালেও পরীক্ষা ছিল। মাকে সঙ্গে নিয়ে ভোরেই ঢাকায় এসেছিলেন। তবে তাঁর আর পরীক্ষা দেওয়া হয়নি। চলন্ত বাস ধাক্কা দিয়ে চিরতরে নিথর করে দিয়েছে তাঁকে। অথচ মোটে ৯ মাস বাকি ছিল, তার পরই ডাক্তার হয়ে বের হতেন তিনি।

গতকাল পুরান ঢাকার বংশাল এলাকায় এ দুর্ঘটনা ঘটে। সাদিয়া পুরান ঢাকার ন্যাশনাল মেডিক্যাল কলেজের পঞ্চম বর্ষে পড়তেন।

কলেজের হোস্টেলে থেকেই পড়াশোনা করতেন। সিএনজি অটোরিকশায় করে মেডিক্যালে যাওয়ার পথে দুর্ঘটনায় পড়েন মা-মেয়ে। মা শাহীন সুলতানাও আহত হয়েছেন।   

সাদিয়ার বাড়ি রাজশাহী সদরের হড়গ্রামের কোর্ট স্টেশন রোডে। তাঁর বাবা হাসানুজ্জামান একটি ব্যাংকের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা। গতকালই লাশ রাজশাহী নিয়ে যাওয়া হয়েছে। ফুপাতো বোন স্বর্ণা জানান, ন্যাশনাল মেডিক্যালের ছাত্রী হোস্টেলের ১০০৭ নম্বর রুমে থাকতেন সাদিয়া।

খবর পেয়ে গতকাল ন্যাশনাল মেডিক্যাল কলেজের শিক্ষক, চিকিত্সক ও সহপাঠীদের মধ্যে শোকের ছায়া নেমে আসে। সহপাঠীরা কিছু সময়ের জন্য দুপুরে রায়সাহেব বাজার মোড়ে সড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ করে। ২৪ ঘণ্টার মধ্যে তারা দায়ী বাস ও চালককে আটকের দাবি জানায়। সেই সিএনজি অটোরিকশাচালকেরও গ্রেপ্তার দাবি করে তারা। না হলে তারা সারা দেশের মেডিক্যাল শিক্ষার্থীদের নিয়ে কঠোর আন্দোলনের হুমকি দেয়। ন্যাশনাল মেডিক্যাল কলেজের প্রিন্সিপাল প্রফেসর মোহাম্মদ আবুল বাশারও শিক্ষার্থীদের সঙ্গে একাত্মতা প্রকাশ করেন।

সহপাঠীরা জানায়, মায়ের সঙ্গেই সবচেয়ে বেশি সখ্য ছিল সাদিয়ার। রাজশাহীতে থাকা মায়ের সঙ্গে প্রতিদিন মোবাইল ফোনে কথা না বললেও শান্তি পেতেন না। গত বুধবার থেকে মাকে দেখার জন্য ব্যাকুল হয়ে উঠেছিলেন। বৃহস্পতিবার গাইনি ওয়ার্ড পরীক্ষা শেষ করেই বাস ধরে চলে যান রাজশাহী। শনিবারও (গতকাল) পরীক্ষা ছিল। সেই পরীক্ষা ধরতে মাকে সঙ্গে নিয়ে শুক্রবার রাতে ঢাকার উদ্দেশে রওনা দিয়েছিলেন সাদিয়া।

প্রত্যক্ষদর্শীদের বর্ণনা দিয়ে সহপাঠীরা কালের কণ্ঠকে জানায়, গতকাল ভোর ৬টার দিকে মাকে নিয়ে রাজধানীর কল্যাণপুর বাসস্ট্যান্ডে নামেন সাদিয়া। এরপর একটি সিএনজি অটোরিকশা নিয়ে ছোটেন ন্যাশনাল মেডিক্যাল কলেজের দিকে। পরীক্ষা ছিল সকাল ৯টায়। রাস্তাও ছিল ফাঁকা। পৌনে ৭টার দিকেই তাঁরা পৌঁছে যান বংশাল এলাকায়। এমন সময় পেছন থেকে আসা একটি বাস সজোরে ওই সিএনজি অটোরিকশাকে ধাক্কা দেয়। সেটি ছিটকে পড়ে রাস্তার পাশে। মাথায় আঘাত পেয়ে জ্ঞান হারান সাদিয়া। কোনো রকমে সিএনজির দরজা খুলে মেয়েকে কোলে করে রাস্তায় বেরিয়ে আসেন। মেয়েকে বাঁচাতে আশপাশ দিয়ে যাওয়া মানুষের কাছে সাহায্যের জন্য মিনতি করতে থাকেন। তবে লোকজন কিংবা আশপাশ দিয়ে যাওয়া কোনো গাড়িই তাঁদের কাছে এগিয়ে যায়নি। ততক্ষণে অটোরিকশা চালকও পালিয়ে যান। কোনো উপায় না দেখে মা চিত্কার করতে থাকেন। শেষে কয়েকজন এগিয়ে এসে মা-মেয়েকে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যায়। চিকিত্সকরা পরীক্ষা করে জানান, হাসপাতালে আনার আগেই মৃত্যু হয়েছে সাদিয়ার।  

দুপুরে ঢাকা মেডিক্যালে গিয়ে দেখা যায় বন্ধুর লাশ ঘিরে সহপাঠীরা আহাজারি করছে।   সুদীপ্ত হাজরা নামের এক সহপাঠী কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘ঢাকা মেডিক্যালের ডাক্তাররা আমাদের জানিয়েছেন আর কিছুক্ষণ আগে নিয়ে আসতে পারলে হয়তো সাদিয়াকে বাঁচানো যেত। অটোরিকশাচালক পালিয়ে না গিয়ে যদি তাঁদের হাসপাতালে নিয়ে আসত তা হলে চিকিত্সকরা চেষ্টা করতে পারতেন। তাই আমরা ওই অটোরিকশাচালকেরও বিচার চাই। ’

সাদিয়ার মৃত্যুর খবর পাওয়ার পর গতকাল সকালেই ন্যাশনাল মেডিক্যালের নির্ধাারিত সব পরীক্ষা ও ক্লাস বন্ধ ঘোষণা করা হয়। শিক্ষক ও সহপাঠীরা ছুটে যায় ঢাকা মেডিক্যালে।

ময়নাতদন্ত ছাড়াই গতকাল দুপুরের দিকে সাদিয়ার লাশ ঢাকা মেডিক্যাল থেকে নিয়ে যাওয়া হয় ন্যাশনাল মেডিক্যালে। সেখানে জানাজা শেষে মরদেহ অ্যাম্বুল্যান্সে করে রাজশাহী নিয়ে যাওয়া হয়। মা শাহীন সুলতানাকে প্রাথমিক চিকিত্সা দেওয়া হয়েছে। তিনিও মেয়ের মরদেহের সঙ্গে রাজশাহী যান।

সহপাঠীরা জানায়, মাকে প্রচণ্ড ভালোবাসতেন সাদিয়া। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানিয়েছে, সিএনজি অটোরিকশায় মায়ের কোলেই মাথা ছিল সাদিয়ার। ওই অবস্থাতেই বাস তাঁদের অটোরিকশায় ধাক্কা দেয়।  

সহপাঠী নাজরাতুন নাইম বলেন, ‘ভর্তির পর থেকেই সাদিয়া ন্যাশনাল মেডিক্যালের ছাত্রী হোস্টেলে থাকত। ডাক্তার হয়ে বিনা মূল্যে গরিবের সেবা করার কথা বলত। ও ছিল মা-অন্তঃপ্রাণ। প্রতিদিন আন্টিকে (সাদিয়ার মা) পাঁচ-সাতবার করে ফোন দিত। অনেকক্ষণ ধরে কথা বলত। পরীক্ষার কারণে মাঝে ছুটি পাচ্ছিল না। এ কারণে মাকে দেখতে বৃহস্পতিবারের পরীক্ষা দিয়েই রাজশাহী চলে গিয়েছিল। ’ 

আরেক সহপাঠী আরিফুল ইসলাম বলেন, ‘গত পাঁচ বছর সে (সাদিয়া) আমাদের সঙ্গে ছিল। আজ থেকে আর নেই। কার জন্য নেই? যারা এ জন্য দায়ী তাদের শাস্তি হতে হবে। তা না হলে এভাবে সাদিয়াদের মৃত্যু ঠেকানো যাবে না। ’

ন্যাশনাল মেডিক্যাল কলেজের প্রিন্সিপাল প্রফেসর মোহাম্মদ আবুল বাশার কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘সাদিয়া খুবই মেধাবী ছাত্রী ছিল। অমায়িক ছিল। ঘটনাটি অত্যন্ত দুঃখজনক। এ ধরনের ঘটনা কোনোমতেই গ্রহণযোগ্য নয়। ’

বংশাল থানার ওসি নূরুল আলম সিদ্দিক বলেন, এ ঘটনায় পুলিশ বাদী হয়ে অজ্ঞাত যানবাহন চালকের বিরুদ্ধে মামলা করা হয়েছে। ওই চালককে গ্রেপ্তারের চেষ্টা চলছে।


মন্তব্য