kalerkantho


গুরুতর অপরাধে কাউন্সিলররা

তোফাজ্জল হোসেন রুবেল   

২৫ ফেব্রুয়ারি, ২০১৭ ০০:০০



গুরুতর অপরাধে কাউন্সিলররা

রাজধানী ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনের বেশ কয়েকজন কাউন্সিলরের বিরুদ্ধে নানা বিতর্কিত কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়ার অভিযোগ উঠেছে। হত্যা, মাদক বিক্রি, চাঁদাবাজি, দখল, ডিশ ব্যবসা ও ধর্ষণের মতো গুরুতর অপরাধে জড়িয়ে পড়েছেন তাঁরা।

কেউ কেউ করপোরেশন পরিচালিত ভ্রাম্যমাণ আদালতের ওপর হামলা ও স্থানীয় সরকার আইন (সিটি করপোরেশন আইন-২০০৯) ভঙ্গ করে ঠিকাদারি করছেন। নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের কয়েকজন ফুটপাত, রাস্তা, এমনকি সরকারি জমি দখল করে স্থাপনা গড়ছেন। নগর পরিকল্পনাবিদরা বলছেন, ঢাকার দুই মেয়র বাসযোগ্য নগরী গড়ার যে চেষ্টা করছেন, এসব বিতর্কিত কর্মকাণ্ডে তা ব্যর্থ হয়ে যেতে পারে।

নগর পরিকল্পনাবিদ অধ্যাপক ড. নজরুল ইসলাম কালের কণ্ঠকে এ বিষয়ে বলেন, ‘জনগণের ভোটে নির্বাচিত কাউন্সিলরদের অব্যশই সৎ ও নিষ্ঠাবান হতে হবে। তাঁদের জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে। এ ব্যাপারে সরকারের কঠোর নজরদারি প্রয়োজন। তা না হলে নির্বাচিত জনপ্রতিনিধির কাছ থেকে সেবার বদলে জনগণ ভোগান্তিই পাবে। ’

সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) সম্পাদক ড. বদিউল আলম মজুমদার বলেন, ‘কাউন্সিলরদের সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানে ব্যবসা করার কোনো আইনগত সুযোগ নেই। এ ছাড়া নির্বাচিত জনপ্রতিনিধির আচরণ কী হবে সিটি করপোরেশন আইনে তা সুস্পষ্টভাবে বলে দেওয়া আছে। কিন্তু দুঃখজনক বিষয় হলো, অনেকে অন্যায় করে পার পেয়ে যাচ্ছেন। এভাবে চলতে থাকলে আইনের শাসন বলে কিছু আর থাকবে না। আশা করব, সরকার বেপরোয়া কাউন্সিলরদের ব্যাপারে ব্যবস্থা নেবে। ’

স্থানীয় সরকার (সিটি করপোরেশন) আইন-২০০৯-এর ১৩ অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, ‘কাউন্সিলর তার স্বীয় পদ থেকে অপসারণযোগ্য হবেন যদি তিনি (ঘ) অসদাচরণ বা ক্ষমতার অপব্যবহারের দায়ে দোষী সাব্যস্ত হন। অসদাচরণ বলতে ক্ষমতার অপব্যবহার, আইন বা বিধিনিষেধ লঙ্ঘন, দুর্নীতি, অসদুপায়ে ব্যক্তিগত সুবিধা গ্রহণ, পক্ষপাতিত্ব, স্বজনপ্রীতি, ইচ্ছাকৃত অপশাসন, নির্বাচনী ব্যয়ের হিসাব দাখিল না করা বা অসত্য তথ্য প্রদান করাকে বোঝাবে। ’

গত বছরের ৯ ডিসেম্বর ডিএসসিসির ৭ নম্বর ওয়ার্ড কাউন্সিলর আবদুল বাসিত খান বাচ্চুর বিরুদ্ধে ধর্ষণের অভিযোগ ওঠে। ধর্ষিতা মুগদা থানায় নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে একটি মামলা করেছেন। তাতে অভিযোগ করা হয়, ঘটনার দিন রাত ৮টার দিকে এক নারীর সহায়তায় স্থানীয় ওয়ার্ড কাউন্সিলর তাঁর অফিসে ডেকে নিয়ে যান ভিকটিমকে। এরপর ওই কাউন্সিলর অফিসে আটকে রেখে ওই নারীকে ধর্ষণ করেন। এ বিষয়ে আব্দুল বাসিত খানের মন্তব্য জানতে তাঁর মোবাইল ফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন ধরেননি।

ডিএসসিসির ২৯ নম্বর ওয়ার্ড কাউন্সিলরের বিরুদ্ধে মেয়রের কাছে লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন পশ্চিম ইসলামবাগের বাসিন্দা হাজি আব্দুল জলিল। তিনি কাউন্সিলর জাহাঙ্গীর আলম বাবুলের বিরুদ্ধে বাড়ি দখলের পাঁয়তারার অভিযোগ তুলেছেন। একইভাবে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ে ৩৩ নম্বর ওয়ার্ড কাউন্সিলর আউয়াল হোসেনের বিরুদ্ধে অভিযোগ করেছে স্থানীয় বাসিন্দারা। লিখিত অভিযোগে তারা একটি হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে এই কাউন্সিলরের জড়িত থাকার কথা উল্লেখ করেছে। এ ছাড়া অস্ত্র ব্যবসা ও চাঁদাবাজির সঙ্গে আউয়াল সরাসরি জড়িত বলেও অভিযোগ করা হয়। আবদনে এ কাউন্সিলরের হাত থেকে এলাকাবাসীকে রক্ষার জন্য স্থানীয় সরকার মন্ত্রীর সহায়তা চাওয়া হয়। তবে এসব অভিযোগ অস্বীকার করে আউয়াল হোসেন বলেন, ‘দুই বাড়ির লোকজনের কথা-কাটাকাটির সময় মোখলেছুর রহমান নামে একজন মারা যায়। কিন্তু মৃত ব্যক্তির পরিবারের লোকজন ষড়যন্ত্রমূলক হত্যা মামলা দায়ের করে আমাকে আসামি করেছে। ’

জানতে চাইলে ডিএসসিসির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (অতিরিক্ত সচিব) খান মোহাম্মদ বিলাল বলেন,  ‘আমরা কাউন্সিলরদের নিয়ে একটি কর্মশালা আয়োজনের চিন্তা করছি। এতে তাঁরা নিয়মকানুন সম্পর্কে নানা ধারণা পাবেন। আর যে দুজন কাউন্সিলরের বিরুদ্ধে অভিযোগ পাওয়া গেছে, তা আইনানুগভাবে দেখা হবে। ’

গত বছর ডিএসসিসির অস্থায়ী কোরবানির হাট ইজারা নিয়েছিলেন ৯ নম্বর ওয়ার্ড কাউন্সিলর ও যুবলীগ দক্ষিণের যুগ্ম সম্পাদক এ কে এম মমিনুল হক সাঈদ। ব্রাদার্স ইউনিয়নসংলগ্ন বালুর মাঠ এবং কমলাপুর স্টেডিয়ামসংলগ্ন আরেকটি হাটের বিপরীতে সর্বোচ্চ দরপত্র জমা দেন তিনি। বিষয়টি নিয়ে একাধিক জাতীয় দৈনিকে খবর আসার পর এ দুটি হাটের ইজারা বাতিল করতে বাধ্য হয় ডিএসসিসি। স্থানীয় সরকার (সিটি করপোরেশন) আইন অনুযায়ী কোনো জনপ্রতিনিধির এসংক্রান্ত কার্যক্রমে অংশ নেওয়া বারণ।

গত বছরের ১৪ মার্চ ডিএসসিসির পরিচ্ছন্নতা অভিযান ঘিরে আয়োজিত অনুষ্ঠানের ব্যানারে নিজের নাম না দেখে সংস্থাটির দুই কর্মকর্তাকে মারধর করেন ২০ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলর ফরিদ উদ্দিন রতন ও তাঁর লোকজন। বাংলাদেশ টেলিকমিউনিকেশনস কম্পানি লিমিটেডের (বিটিসিএল) অফিস আঙিনায় তিনি ডিএসসিসির জনসংযোগ কর্মকর্তা উত্তম কুমার রায় ও অতিরিক্ত প্রধান বর্জ্য ব্যবস্থাপনা কর্মকর্তা খন্দকার মিল্লাতুল ইসলামের গায়ে হাত তোলেন।

রাজধানীর সায়েদাবাদে অবৈধ ট্রাকস্ট্যান্ড বসিয়ে চাঁদা আদায় করে আসছেন স্থানীয় ওয়ার্ড কাউন্সিলর কাজী হাবিবুর রহমান হাবু। সেখানে গত বছরের ১ সেপ্টেম্বর উচ্ছেদ অভিযানে যাওয়া নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটকে শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত করেন ডিএসসিসি ৫১ নম্বর ওয়ার্ডের ওই কাউন্সিলর। এ ঘটনায় হাবুকে সাময়িক বরখাস্ত করে এলজিআরডি মন্ত্রণালয়।

ঢাকার ধোলাইখাল দখলের অভিযোগ রয়েছে দুই কাউন্সিলরের বিরুদ্ধে। খালের অংশে দলীয় কার্যালয় তৈরি করেছেন—এমন অভিযোগের বিষয়ে ব্যাখ্যা দিতে ওই দুই কাউন্সিলরকে তলবও করেছিলেন হাইকোর্ট। গত বছরের ১ নভেম্বর বিচারপতি শেখ হাসান আরিফ ও বিচারপতি মো. ইকবাল কবির সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্টের একটি বেঞ্চে ডিএসসিসির ৫০ নম্বর ওয়ার্ড কাউন্সিলর দেলোয়ার হোসেন এবং ৫১ নম্বর ওয়ার্ড কাউন্সিলর হাবিবুর রহমান হাবুকে উপস্থিত হয়ে জবাব দিতে হয়েছে।

২০১৬ সালের ২৯ সেপ্টেম্বর রাজধানীর নাখালপাড়া রেললাইনসংলগ্ন অবৈধ কাঁচাবাজার উচ্ছেদ করতে এসে বাধার মুখে পড়ে ডিএনসিসি। ডিএনসিসির ২৫ নম্বর ওয়ার্ড কাউন্সিলর শেখ মজিবুর রহমানের কারণে অভিযান পণ্ড হয়ে যায়। কাঁচাবাজারের জমিকে কাউন্সিলর নিজের সম্পত্তি দাবি করে উচ্ছেদে বাধা দেন। পূর্ব নাখালপাড়া রেললাইনের দুই পাশে রেল বিভাগ এবং ডিএনসিসির জমিতে দোকানপাট তুলে অনেক দিন ধরে অবৈধভাবে অর্থ আয় করছেন মজিবুর রহমান। ডিএনসিসির প্রধান সম্পত্তি কর্মকর্তা আমিনুল ইসলাম সে সময় সাংবাদিকদের জানান, পূর্ব নাখালপাড়া ডিএনসিসির সম্পত্তিতে গড়ে তোলা অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদে গেলে স্থানীয় ২৫ নম্বর ওয়ার্ড কাউন্সিলর ওই জায়গার মালিকানা দাবি করেন। এ কারণে সেখানকার সব অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ করতে পারেননি তাঁরা। কাউন্সিলরের দাবি করা জমির মালিক ডিএনসিসি।

ডিএনসিসির ১২ নম্বর ওয়ার্ড কাউন্সিলর ইকবাল হোসেন তিতু। নির্বাচিত হওয়ার পরপরই মিরপুরের আহম্মেদনগরসহ ১২ নম্বর ওয়ার্ড এলাকার ডিশ ব্যবসা নিজের কবজায় নিতে মরিয়া হয়ে ওঠেন তিনি। এক ডিশ ব্যবসায়ীর ওপর হামলা চালিয়ে তাঁকে এলাকাছাড়া করেন। এ ছাড়া ইকবাল হোসেন তিতু মিরপুর ১ নম্বর সেকশনের সনি সিনেমা হলের বিপরীতে থাকা জাতীয় গৃহায়ণ কর্তৃপক্ষের একটি প্লট দখল করেছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। সেখানে তিনি কোনো ধরনের নকশা অনুমোদন না করিয়েই তিনতলা মার্কেট নির্মাণ করেছেন। তবে এসব অভিযোগ অস্বীকার করে ইকবাল হোসেন বলেন, ‘ডিশ ব্যবসা আমার আগে থেকেই ছিল। কারো কাছ থেকে জোর করে নিইনি। এ ছাড়া মার্কেটের কিছু সমস্যার কথা শুনেছি। তবে এর সঙ্গে আমার কোনো সম্পৃক্ততা নেই। ’

ডিএনসিসির ১৪ নম্বর ওয়ার্ড কাউন্সিলর হুমায়ুন রশিদ জনির বিরুদ্ধে রয়েছে ওয়াসার পাম্প বসানোর নামে অর্থ আদায়ের অভিযোগ করা হয়েছে। মিরপুরের মনিপুর এলাকায় পানি সংকটকে কেন্দ্র করে তিনি পাম্প বসানো বাবদ তাঁর নিজের প্যাডে বিভিন্ন বাড়ির মালিকের চাঁদার পরিমাণ নির্ধারণ করে দেন। নিজের লোকজন দিয়ে ওই টাকা তিনি সংগ্রহও করেছেন। অনিচ্ছুক বাড়ি মালিকদের চাপ দিয়ে অর্থ আদায়ের অভিযোগও পাওয়া গেছে। এ ছাড়া ওই কাউন্সিলরের বিরুদ্ধে এলাকার ডিশ ব্যবসায় একক আধিপত্য বিস্তারের প্রমাণ আছে। ডিএনসিসির ওয়ার্ড কাউন্সিলর আব্দুর রউফ নান্নুর বিরুদ্ধে মিরপুর ১১ নম্বরে সরকারি জমি ও রাস্তা দখল করে বাজার নির্মাণের অভিযোগ রয়েছে। এসব বিষয়ে জানতে হুমায়ুন রশিদ জনির মোবাইল ফোনে যোগাযোগের জন্য একাধিকবার চেষ্টা করেও তা বন্ধ পাওয়া যায়।

স্থানীয় সরকার (সিটি করপোরেশন) আইন-২০০৯ ভঙ্গ করে কাউন্সিলররা সিটি করপোরেশনে ঠিকাদারি ব্যবসা শুরু করেছেন। অনেকে নিজেই আবার কেউ কেউ আত্মীয়স্বজনের নামে এ ব্যবসা করছেন। ডিএসসিসির ১২ নম্বর ওয়ার্ড কাউন্সিলর গোলাম আশরাফ তালুকদার ‘আশরাফ এন্টারপ্রাইজ’ নামে একটি ট্রেড লাইসেন্স দিয়ে করপোরেশনে ঠিকাদারি করেন। একই সঙ্গে ১০ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলর মারুফ মনসুর আহমেদ, ২ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলর আনিছুর রহমান, ১৩ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলর মোস্তবা জামান পপি, ২২ নম্বর ওয়ার্ডের তরিকুল ইসলাম সজিব, ৪১ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলর সারোয়ার হাসান আলো ও ৫৬ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলর মোহাম্মদ হোসেন করপোরেশনের ঠিকাদারির সঙ্গে জড়িত বলে জানা যায়। অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে ওয়ার্ড কাউন্সিলর মারুফ আহমেদ মনসুরের ফোনে একাধিকবার চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন ধরেননি।

ডিএনসিসির ৭ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলর মোবাশ্বের চৌধুরী ‘চৌধুরী অ্যান্ড কোং’ নামে একটি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে ঠিকাদারি করেন বলে জানা গেছে। তবে একাধিক কাউন্সিলর জানান, তাঁরা নিজ নামে ঠিকাদারি করেন না।

স্থানীয় সরকার (সিটি করপোরেশন) আইন-২০০৯-এ কাউন্সিলরদের যোগ্যতা ও অযোগ্যতা বিষয়ে বলা আছে, ‘কাউন্সিলর পদে থাকবার যোগ্য হবেন না, যদি তার পরিবারের কোনো সদস্য সংশ্লিষ্ট সিটি করপোরেশনের কার্য সম্পাদনের বা মালামাল সরবরাহের জন্য ঠিকাদার হন বা এর জন্য নিযুক্ত ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের অংশীদার হন বা সিটি করপোরেশনের কোনো বিষয়ে তার কোনো প্রকার আর্থিক স্বার্থ থাকে বা তিনি সরকার কর্তৃক নিযুক্ত অত্যাবশ্যক কোনো দ্রব্যের ডিলার হন। ’


মন্তব্য