kalerkantho


কাদেরের বাড়ির আঙিনা থেকে পিস্তল গুলি উদ্ধার

এস এম আজাদ, ঢাকা ও অমিতাভ দাশ হিমুন, গাইবান্ধা   

২৪ ফেব্রুয়ারি, ২০১৭ ০০:০০



কাদেরের বাড়ির আঙিনা থেকে পিস্তল গুলি উদ্ধার

এলাকায় রাজনৈতিক আধিপত্য বিস্তার করে ক্ষমতা পাওয়া এবং নির্বাচনী মাঠে পথের কাঁটা সরাতেই গাইবান্ধার সরকারদলীয় সংসদ সদস্য (এমপি) মঞ্জুরুল ইসলাম লিটনকে হত্যার পরিকল্পনা করা হয় বছরখানেক আগে। একটি শিশুর পায়ে গুলি করে বিতর্কিত হওয়া এমপি লিটন খুন হওয়ার পর ঘটনাটি যেন ভিন্ন খাতে প্রবাহিত হয়, সে চেষ্টাও করা হয়। লিটনকে খুনের জন্য মেহেদী হাসান ও শাহিন নামে দুজনকে নিয়োগ করা হয়। খুনি দলে ছিল আনোয়ারুল ইসলাম রানা নামে আরেকজন। প্রতিবেশী এই যুবককে পিস্তল কিনে দেওয়া হয়, অস্ত্র চালানোর প্রশিক্ষণও দেওয়া হয়। ঘটনার দিন রানা এমপি লিটনের বাসায় গিয়ে ক্লাবের ব্যাপারে কথা বলে তাঁকে ব্যস্ত রাখে। মেহেদী গিয়ে লিটনের শরীরে গুলি চালায়। বের হয়ে রানা গুলি ছুড়ে আতঙ্ক তৈরি করে সবাই মিলে পালায়। এই খুনি দলের সহায়তায় ছিল গ্রেপ্তারকৃত হান্নানসহ আরো দুই-তিনজন। সরাসরি খুনি দলে থাকা তিন যুবকের মধ্যে মেহেদীকে তিন লাখ এবং অন্য দুইজনকে দুই লাখ টাকা করে দেওয়ার চুক্তি করেন পরিকল্পনাকারী। প্রথমেই তাদের হাতে ১৫ হাজার টাকা করে দেওয়া হয়।

তদন্তসংশ্লিষ্টরা বলছেন, এমপি লিটন হত্যার মূল পরিকল্পনাকারী স্থানীয় সাবেক এমপি জাতীয় পার্টির নেতা কর্নেল (অব.) ডা. মো. আবদুল কাদের।

এমপি লিটন হত্যা মামলায় সরাসরি অংশগ্রহণকারী তিনজনসহ পাঁচ আসামিকে জিজ্ঞাসাবাদে এমন চাঞ্চল্যকর তথ্য পেয়েছে পুলিশ। এই হত্যাকাণ্ডের এক মাস আগে গাইবান্ধার একটি ছিনতাইয়ের ঘটনার তদন্তে রহস্যের সূত্র পায় পুলিশ। পরে পুলিশ ও আদালতের কাছে স্বীকারোক্তিতে বেরিয়ে আসছে হত্যার আদ্যোপান্ত। সর্বশেষ গতকাল বৃহস্পতিবার রাজধানী থেকে রানাকে গ্রেপ্তার করে গাইবান্ধায় নিয়ে যায় সেখানকার পুলিশ। পরে গাইবান্ধা জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে হাজির করা হলে রানা বিচারক জয়নাল আবেদীনের কাছে ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেয়।

এদিকে বুধবার গভীর রাতে সুন্দরগঞ্জে কাদের খানের বাড়ির উঠানের আমগাছতলায় মাটি খুঁড়ে একটি পিস্তল ও ছয় রাউন্ড বুলেটসহ একটি ম্যাগাজিন উদ্ধার করে পুলিশ। অন্যদিকে কাদের খানকে ১০ দিনের রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করছে পুলিশ। গতকাল ছিল সেই রিমান্ডের দ্বিতীয় দিন।

গাইবান্ধার পুলিশ সুপার (এসপি) মো. আশরাফুল ইসলাম কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আইজিপি মহোদয়ের সরাসরি তত্ত্বাবধানে এই মামলাটির রহস্য উদ্ঘাটনের কাজ চলছিল। স্যারের প্রচেষ্টা ও সমন্বিত কাজে রহস্য এখন উন্মোচিত। আধিপত্য বা প্রভাব প্রতিষ্ঠার জন্য এই হত্যাকাণ্ড বলে তথ্য পাওয়া গেছে। আসামিদের জিজ্ঞাসাবাদ ও আলামত ধরে তদন্ত চলছে। ’

তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, এমপি লিটন হত্যার ২৯ দিন আগে ২ ডিসেম্বর রাতে সুন্দরগঞ্জে একটি মোবাইল ফোন ছিনতাইয়ের ঘটনা ঘটে। ছিনতাইয়ের সময় সন্ত্রাসীরা একটি গুলিভর্তি ম্যাগাজিন ফেলে রেখে যায়। ম্যাগাজিনটি কার সে তথ্য ও লুণ্ঠিত মোবাইল ফোনটি উদ্ধারে চেষ্টা অব্যাহত রাখে পুলিশ। একপর্যায়ে সিমফোনি কম্পানির মোবাইল ফোনসেটটি উদ্ধার করতে সক্ষম হয় পুলিশ। যার কাছ থেকে মোবাইল ফোনসেটটি উদ্ধার করা হয় তার কাছে মাত্র দুই হাজার টাকায় সেটি বিক্রি করেছিল সন্ত্রাসীরা। এরপর ম্যাগাজিনের উৎস খুঁজতে থাকে পুলিশ। এসপি বলেন, এরই মধ্যে ৩১ ডিসেম্বর নিজ বাড়িতে খুন হন এমপি লিটন। দুটি ঘটনারই পৃথক তদন্ত চলতে থাকে। একপর্যায়ে ম্যাগাজিন ফেলে যাওয়া ছিনতাইকারীদের শনাক্ত ও গ্রেপ্তার করে পুলিশ। ওই ম্যাগাজিনে যে গুলি পাওয়া যায় আর এমপি লিটনের শরীরে যে গুলির খোসা পাওয়া যায়, তা একই গুলি। পরে গ্রেপ্তারকৃতরা পুলিশের কাছে স্বীকারোক্তি দেয়, সাবেক এমপি কাদের খানের ঘনিষ্ঠ লোক তারা। ওই ম্যাগাজিন ও গুলিও কাদের খানের পিস্তলের।

এসপি আশরাফুল ইসলাম বলেন, গ্রেপ্তার হওয়া তিনজন সরাসরি অংশগ্রহণকারী এবং সহায়তাকারী হান্নান স্বীকার করে, সাবেক এমপি কাদের খানের পরিকল্পনা ও নির্দেশে তারাই এমপি লিটনকে হত্যা করেছে। নির্বাচনী মাঠের প্রতিপক্ষ সরাতেই এ হত্যাকাণ্ড ঘটানো হয়। কিলিং মিশনের খুনিদের স্বীকারোক্তি ও গুলির অকাট্ট প্রমাণ পাওয়ার পর মঙ্গলবার বিকেলে বগুড়া শহরের বাসা থেকে সাবেক এমপি কাদের খানকে গ্রেপ্তার করা হয়। তাঁকে জিজ্ঞাসাবাদের মাধ্যমে তথ্যগুলো যাচাই করা হচ্ছে বলে জানান এসপি।

জানতে চাইলে এসপি আশরাফুল ইসলাম বলেন, ‘এখন পর্যন্ত হত্যায় সরাসরি অংশ নেওয়ার মধ্যে মেহেদী, শাহিন ও রানার নামই পাওয়া গেছে। তারা তিনজনই ধরা পড়েছে। হান্নান সহযোগী ছিল। আরো দু-তিনজনের নাম পাওয়া গেছে। তাদেরও গ্রেপ্তারের চেষ্টা চলছে। কত টাকার চুক্তিতে খুন করা হয়েছে, সেটা এখনো নিশ্চিত হওয়া যায়নি। তবে ১৫ হাজার টাকা করে দিয়েছিল বলে জানা গেছে। ’

অস্ত্র উদ্ধারে তল্লাশি : গত বুধবার বিকেল থেকেই পুলিশ কাদের খানের গ্রামের বাড়ি সুন্দরগঞ্জের ছাপড়হাটি ইউনিয়নের পশ্চিম ছাপড়হাটি গ্রামের খানপাড়ার বাড়িতে ব্যাপক তল্লাশি শুরু করে। এ সময় ফায়ার ব্রিগেডের কর্মীরা বাড়ির পাশে একটি পুকুরের পানি সেচে ফেলে। কিন্তু সেখান থেকে কোনো আলামতই পাওয়া যায়নি। এরপর ওই দিন সন্ধ্যায় রংপুর ফায়ার সার্ভিসের দুই ডুবুরি সাজেদুল ইসলাম ও আব্দুল মতিন প্রায় দুই ঘণ্টা আরেকটি পুকুরে অস্ত্রের সন্ধানে কাজ করেও অস্ত্র উদ্ধারে ব্যর্থ হন। পরে রিমান্ডে থাকা কাদের খানকে সঙ্গে নিয়ে বুধবার রাতে আবারও তাঁর বাড়িতে অভিযান শুরু করে পুলিশ। তাঁর দেখানো আমগাছের গোড়ায় মাটি খুঁড়ে পিস্তল ও ম্যাগাজিন উদ্ধার করা হয়। পুলিশের ধারণা, মাটির নিচ থেকে উদ্ধারকৃত পিস্তল ও ম্যাগাজিন এবং গুলিগুলো লিটন হত্যার পর মাটিতে পুঁতে রাখা হয়েছিল।

রানার জবানবন্দি : গতকাল গাইবান্ধায় কার্যালয় চত্বরে তাত্ক্ষণিক এক প্রেস ব্রিফিংয়ে এসপি আশরাফুল ইসলাম বলেন, আনোয়ারুল ইসলাম রানাকে বুধবার ঢাকা থেকে গ্রেপ্তারের পর পুলিশ গতকাল গাইবান্ধা জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে হাজির করে। রানা আদালতের বিচারক জয়নাল আবেদীনের কাছে ঘটনার সঙ্গে জড়িত থাকার কথা স্বীকার করে জবানবন্দি দেয়। সে ঢাকার একটি গার্মেন্টে চাকরি করত। বুধবার পুলিশ কাদের খানের বগুড়ার বাড়ি থেকে পাসপোর্ট জব্দ করে। এ ছাড়া যে পরিবহনের টিকিট কেটে কিলারদের বগুড়া থেকে ঢাকায় পাঠানো হয়েছিল সেই টিকিটও জব্দ করা হয়েছে বলে সাংবাদিকদের জানান এসপি আশরাফুল ইসলাম।

চন্দনকে খুঁজছে পুলিশ : সূত্র জানায়, সুন্দরগঞ্জ উপজেলা আওয়ামী লীগের দপ্তর সম্পাদক বামনডাঙ্গার মনমথ গ্রামের সুশীল সরকারের ছেলে চন্দন সরকারকে খুঁজছে পুলিশ। কাদের খানের জব্দ করা মোবাইল ফোনের কললিস্ট ধরে তাঁর সঙ্গে চন্দন সরকারের ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ সম্পর্কে জানতে পারে পুলিশ। চন্দনই মূলত খুনের দিন এমপি লিটনের বাড়িতে তাঁর অবস্থান এবং অনুকূল পরিবেশের খবর মোবাইল ফোনে

খুনিদের জানায়। জানা গেছে, অত্যান্ত দরিদ্র পরিবারের সন্তান চন্দন সরকার উপজেলা আওয়ামী লীগের দপ্তর সম্পাদকের দায়িত্ব পাওয়ার পর নানা অপকর্মে জড়িয়ে পড়ে। ফলে অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে তাকে দল থেকে বহিষ্কার করে উপজেলা আওয়ামী লীগের

সভাপতি এমপি মঞ্জুরুল ইসলাম লিটন। এই ক্ষোভে সে সুন্দরগঞ্জে এমপি লিটনের বিরোধিতা করতে থাকে।

গাইবান্ধার এসপিকে খাগড়াছড়িতে বদলি : গাইবান্ধার এসপি মো. আশরাফুল ইসলামকে খাগড়াছড়িতে বদলি করা হয়েছে। ঢাকা মহানগর পুলিশের  উপকমিশনার মাশরুকুর রহমান খালেদকে গাইবান্ধার এসপি হিসেবে পদায়ন করা হয়েছে। গতকাল স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে এসংক্রান্ত প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়।


মন্তব্য