kalerkantho


শেখ হাসিনার আক্ষেপ

আজও বাংলাদেশের গৌরবময় ইতিহাস রচিত হলো না

নিজস্ব প্রতিবেদক   

২৩ ফেব্রুয়ারি, ২০১৭ ০০:০০



আজও বাংলাদেশের গৌরবময় ইতিহাস রচিত হলো না

প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা আক্ষেপ করে বলেছেন, আজও বাংলাদেশের গৌরবময় ইতিহাস রচিত হলো না। এই ইতিহাস রচনার দায়িত্ব দেশের শিক্ষাবিদদের দিয়ে তিনি বলেন, ‘একটি জাতিকে ধ্বংস করার জন্য তার ইতিহাস, তার সংস্কৃতি, তার কৃষ্টিকে ভুলিয়ে দেওয়া হয়। যেভাবে ইতিহাস বিকৃত করে বায়ান্নর ভাষা আন্দোলনে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ভূমিকা মুছে ফেলা হয়েছিল। ’ সঠিক ইতিহাস চর্চার প্রতি গুরুত্বারোপ করে তিনি বলেন, ‘এই ইতিহাস পাঠ করে যেন বাংলার ভবিষ্যৎ প্রজন্ম তাদের অতীতের পরিচয় পেয়ে গর্ব অনুভব করতে পারে এবং মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে পারে। ’

প্রধানমন্ত্রী গতকাল বিকেলে রাজধানীর খামারবাড়িতে কৃষিবিদ ইনস্টিটিউশনে আওয়ামী লীগের আলোচনাসভায় এসব কথা বলেন। আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস উপলক্ষে এর আয়োজন করা হয়।

সভাপতির বক্তব্যে শেখ হাসিনা বলেন, ‘১৯৭৫ সালে জাতির পিতাকে হত্যার পর আমাদের ইতিহাস বিকৃত করা হয়েছে। আমাদের ভাষা আন্দোলন থেকে শুরু করে প্রতিটি আন্দোলন-সংগ্রামে বঙ্গবন্ধুর যে অস্তিত্ব রয়েছে, তিনিই যে অগ্রণী ভূমিকা নিয়েছেন, তিনিই যে এটির সূত্রপাত করেছিলেন, একসময় সেই ইতিহাস সম্পূর্ণভাবে মুছে ফেলা হয়েছিল। খুব বেশি দিন আগের কথা নয়, ভাষা আন্দোলনের ইতিহাস বলতে গিয়ে বঙ্গবন্ধুর কথা আসলেই আমাদের অনেক জ্ঞানী-গুণী বলতেন, উনি তো তখন কারাগারে ছিলেন, উনি আবার ভাষা আন্দোলনে কী অবদান রেখেছেন? অত্যন্ত দুর্ভাগ্যের বিষয়, ইতিহাস বিকৃতি ওই পাকিপ্রেমীরা তো করেই, আমাদেরও অনেকে কিন্তু সেই ভুলটা করেছিলেন। ’

মহাজোট সরকারের গত মেয়াদের প্রথম দিকে একুশে বইমেলা উদ্বোধনকালে দেওয়া বক্তব্যে ভাষা আন্দোলনে বঙ্গবন্ধুর ভূমিকা তুলে ধরার পর বুদ্ধিজীবী মহল থেকে সমালোচনা করা হয়েছিল বলে জানান শেখ হাসিনা। তিনি বলেন, ‘আমার মনে আছে, বইমেলা উদ্বোধনের সময় আমি এ ব্যাপারে অনেকগুলো তথ্য সংগ্রহ করি।

এমনকি গোয়েন্দা সংস্থা এসবি (স্পেশাল ব্রাঞ্চ), তখনকার সময়ের আইবির রিপোর্টে আমি পেয়েছিলাম, ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ছাত্রলীগের প্রেসিডেন্ট সেক্রেটারি বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে বৈঠক করে। বঙ্গবন্ধুর বিরুদ্ধে দেওয়া পাকিস্তানের গোয়েন্দা সংস্থার রিপোর্ট থেকে আমি তথ্য নিয়ে যখন ভাষণটা দিলাম, এরপর আমাদের বিরুদ্ধেই আমাদের এক বিদগ্ধজন বিশাল এক আর্টিকেল লিখে ফেললেন। আমার এক অত্যন্ত শ্রদ্ধাভাজন শিক্ষক বলে ফেললেন, ওই বক্তব্য দেওয়ার কী দরকার ছিল? এটা কিন্তু ২০০৯-এ সরকার গঠনের পরের ঘটনা আমি বলছি। তখন আমি যেটা করেছিলাম, আমি আর বেবি (বেবি মওদুদ) ওই রিপোর্টগুলোর একটা ফটোকপি নিয়ে এম আর আখতার মুকুল সাহেবের বাসায় গেলাম। ওনাকে আমি ওগুলো দিয়ে বললাম, মুকুল ভাই, আপনাকে এর জবাব লিখতে হবে। কারণ আমরা বললে এটা হবে না। ’

একুশের প্রথম প্রহরে শহীদ মিনারের মূল বেদিতে উঠে বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার শ্রদ্ধা নিবেদন করার সমালোচনা করে শেখ হাসিনা বলেন, ‘আমি জানি না ভাষার প্রতি তাদের এতটুকু সম্মান আছে কি না? যেখানে সবাই সম্মান জানাচ্ছেন ফুল দিয়ে, সেই বেদিতেই যদি উঠে পড়েন তো উনি ফুলটা দিলেন কোথায়? নিজের পায়ের কাছেই দিয়ে আসলেন নাকি, সেটাই প্রশ্ন। এখন আমরা কী মনে করব?’

শেখ হাসিনা বলেন, ‘উনি হয়তো বেতালা হয়ে যেতে পারেন, কারণ মধ্যরাতে গেছেন। কিন্তু ওনার সাঙ্গোপাঙ্গ যারা সঙ্গে ছিল, নেতাকর্মীরা যারা ছিল তারা কি তাকে ঠিক জায়গামতো নিয়ে যাবে না যে কোথায় ফুলটা দিতে হবে?’

বিভিন্ন সময়ে বিএনপি-জামায়াতের আন্দোলনে ধ্বংসাত্মক কর্মকাণ্ডের উদাহরণ তুলে ধরে শেখ হাসিনা বলেন, ‘যাদের মধ্যে এতটুকু মনুষ্যত্ব বোধ নেই, যারা মানুষ পুড়িয়ে মারতে পারে, সন্ত্রাস-জঙ্গিবাদ যাদের কাজ, তাদের কাছ থেকে কী সংস্কৃতি আশা করবেন? কী সাহিত্যের আশা করবেন, কী ভাষার আশা করবেন? আপনারাই বিবেচনা করে দেখেন। এদের কাছে ক্ষমতা হলো ভোগের বস্তু, ক্ষমতা মানেই নিজেদের ভাগ্য গড়া। আমাদের দেশের সংস্কৃতি, আমাদের ভাষা, আমাদের ঐহিত্য, আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধের বিজয়—এসবের মর্যাদা ওই বিএনপি-জামায়াত দেবে কিভাবে? তাদের মনে তো স্বাধীন বাংলাদেশ নেই। তাদের মন পড়ে আছে ওই বারো শ মাইল দূরে পেয়ারে পাকিস্তানে। সে জন্যই তো শহীদ মিনারের বেদিতে উঠে যান। জানেন না কোথায় ফুল দিতে হবে। ’

একুশে ফেব্রুয়ারিতে কোনো নাশকতামূলক কর্মকাণ্ড না ঘটায় আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে ধন্যবাদ দেন শেখ হাসিনা। তিনি বলেন, ‘এবার সারা দেশে কোটি কোটি লোক স্বতঃস্ফূর্তভাবে নেমে গেছে। শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়েছে। স্বাভাবিকভাবেই আমার একটা চিন্তা সব সময় ছিল, আমি সারাক্ষণ খোঁজ নিচ্ছিলাম কোথাও কোনো দুর্ঘটনা যেন না ঘটে। আমাদের আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী চমত্কারভাবে, আন্তরিকতার সঙ্গে কাজ করেছে, সবাই নির্বিঘ্নে দিবসটি পালন করতে পেরেছে। ’

তরুণ প্রজন্মকে ইংরেজি ঢঙে বাংলা না বলার পরামর্শ দেন শেখ হাসিনা। তবে বিশ্বায়নের যুগে অন্য ভাষা শেখার প্রতি গুরুত্ব দিয়ে তিনি বলেন, ‘আমাদের ভাষা, আমাদের সংস্কৃতি, আমাদের কৃষ্টি—এটা আমাদের জানতে হবে। এর সঙ্গে অন্য ভাষাও শিখতে হবে। ’

আলোচনাসভায় বক্তব্য দেন আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য সৈয়দা সাজেদা চৌধুরী, উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য আমির হোসেন আমু, তোফায়েল আহমেদ, সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য মতিয়া চৌধুরী, শেখ ফজলুল করিম সেলিম, ইতিহাসবিদ সৈয়দ আনোয়ার হোসেন। আলোচনাসভায় কবিতা পাঠ করেন কবি নির্মলেন্দু গুণ। অনুষ্ঠান পরিচালনা করেন আওয়ামী লীগের প্রচার সম্পাদক হাছান মাহমুদ ও উপপ্রচার সম্পাদক আমিনুল ইসলাম আমিন।


মন্তব্য