kalerkantho


এমপি লিটন হত্যাকাণ্ড

‘পরিকল্পনাকারী ও অর্থদাতা’ ডা. কাদের ১০ দিনের রিমান্ডে

গাইবান্ধা প্রতিনিধি   

২৩ ফেব্রুয়ারি, ২০১৭ ০০:০০



‘পরিকল্পনাকারী ও অর্থদাতা’ ডা. কাদের ১০ দিনের রিমান্ডে

এমপি লিটন হত্যাকাণ্ডে জড়িত অভিযোগে আটক সাবেক এমপি কাদের খানকে আদালতে হাজির করার জন্য নিয়ে যাওয়া হয়। ছবি : কালের কণ্ঠ

গাইবান্ধা-১ (সুন্দরগঞ্জ) আসনের আওয়ামী লীগদলীয় সংসদ সদস্য মঞ্জুরুল ইসলাম লিটনের হত্যার মূল পরিকল্পনাকারী ও অর্থের জোগানদাতা জাতীয় পার্টির সাবেক এমপি গ্রেপ্তারকৃত কর্নেল (অব.) ডা. আবদুল কাদের খান। গতকাল বুধবার এক প্রেস ব্রিফিংয়ে রংপুর রেঞ্জের ডিআইজি খন্দকার ফারুক আহমেদ এ কথা বলেন। এদিকে ডা. কাদেরকে গতকাল দুপুরে আদালতে হাজির করলে তাঁকে ১০ দিনের রিমান্ডে পাঠানো হয়েছে।

গত মঙ্গলবার বিকেল ৫টায় বগুড়া শহরের রহমাননগর এলাকার নিজ বাসভবন থেকে কাদের খানকে গ্রেপ্তার করে ডিবি পুলিশ। রাত সাড়ে ৯টার দিকে তাঁকে গাইবান্ধা পুলিশ সুপারের কার্যালয়ে আনা হয়। গতকাল দুপুর ১টা ৫ মিনিটে তাঁকে অতিরিক্ত চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে হাজির করা হয়। এমপি লিটন হত্যা মামলার তদন্ত কর্মকর্তা সুন্দরগঞ্জ থানার ওসি (তদন্ত) আবু হায়দার মো. আশরাফুজ্জামান তাঁকে ১০ দিন রিমান্ডে নেওয়ার আবেদন

করেন। বিচারক মইনুল হাসান ইউসুব শুনানি শেষে আবেদন মঞ্জুর করেন।

এর আগে সকাল ১০টায় গাইবান্ধা পুলিশ সুপারের কার্যালয়ে এক জনাকীর্ণ প্রেস ব্রিফিংয়ে এমপি লিটন হত্যা মামলার তদন্ত ও অগ্রগতি সম্পর্কে বিস্তারিত তুলে ধরেন রংপুর রেঞ্জের ডিআইজি খন্দকার গোলাম ফারুক। এ সময় রংপুর রেঞ্জের এডিশনাল ডিআইজি বশির আহমেদ, গাইবান্ধার পুলিশ সুপার আশরাফুল ইসলাম, এডিশনাল এসপি (এ সার্কেল) রবিউল ইসলাম, এডিশনাল এসপি (হেডকোয়ার্টার) খায়রুল আলম, সুন্দরগঞ্জ থানার ওসি আতিয়ার রহমান, গাইবান্ধা থানার ওসি এ কে এম মেহেদী হাসান, মামলার তদন্ত কর্মকর্তা সুন্দরগঞ্জ থানার ওসি (তদন্ত) আবু হায়দার মো. আশরাফুল ইসলামসহ জেলা পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন। এ ছাড়া এমপি লিটন হত্যা মামলার বাদী ও নিহতের বোন ফাহমিদা বুলবুল কাকলী, স্ত্রী সৈয়দা খুরশিদ জাহান স্মৃতি, গাইবান্ধা পৌরসভার মেয়র অ্যাডভোকেট শাহ মাসুদ জাহাঙ্গীর কবির মিলনসহ জেলা আওয়ামী লীগ ও অন্যান্য দলের নেতারা এবং জেলা কমিউনিটি পুলিশিং কমিটির নেতারা উপস্থিত ছিলেন।

প্রেস ব্রিফিংয়ে ডিআইজি খন্দকার গোলাম ফারুক জানান, এমপি লিটন হত্যাকাণ্ড দেশজুড়ে আলোচিত একটি ঘটনা। আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সব বিভাগের ব্যাপক তত্পরতার কারণে এক মাস ২০ দিনের তদন্ত শেষে গত মঙ্গলবার এ হত্যার রহস্য উদ্ঘাটন হয়েছে। পুনরায় সংসদ সদস্য নির্বাচিত হওয়া ও ক্ষমতার মোহ থেকেই এমপি লিটনকে সরিয়ে দেওয়ার পরিকল্পনা করেন কাদের খান। পথের কাঁটা লিটনকে সরানোর জন্য গত এক বছর ধরে তিনি সুযোগের অপেক্ষা করছিলেন। এ জন্য তিনি তাঁর ঘনিষ্ঠ চার ক্যাডার মেহেদী হাসান, শাহীন, হান্নান ও রানাকে নানাভাবে অর্থশালী করে দেওয়ার প্রলোভন দেখান। নিজের লাইসেন্স করা পিস্তল দিয়ে তাদের ছয় মাস ধরে নানাভাবে প্রশিক্ষণও দেন তিনি। তাঁর ছক অনুযায়ী এর আগে ঢাকা থেকে গাইবান্ধা আসার পথে এমপি লিটনকে গত অক্টোবর মাসে হত্যার পরিকল্পনা করা হলেও তা ব্যর্থ হয়।

এমপি লিটন হত্যা মিশন : পুলিশের একাধিক সূত্র জানায়, লিটন হত্যা মিশনে মেহেদী হাসান, শাহীন ও হান্নান সরাসরি অংশ নেয়। তিন খুনি প্রথমে জরুরি কথা আছে বলে লিটনের সঙ্গে তাঁর বৈঠকখানার ঘরে ঢোকে। এরপর তাঁকে সালাম দিয়েই এক রাউন্ড গুলি ছোঁড়ে মেহেদী। লিটন হাত দিয়ে আটকানোর চেষ্টা করায় গুলিটি তাঁর হাতে লাগে। প্রথম গুলিটি ব্যর্থ হলে মেহেদী ঘাবড়ে গিয়ে চোখ বন্ধ করে এলোপাতাড়ি চার রাউন্ড গুলি ছোড়ে। পরে তিন খুনি তাদের ব্যবহৃত ডাইং ব্রাউন্সার রানার ১০০ সিসির কালো রঙের মোটরসাইকেলটিতে চড়ে পালিয়ে যায়। এরপর রাস্তায় অপেক্ষমাণ কাদের খানের গাড়িতে চড়ে কিলাররা বগুড়ায় তাঁর বাড়িতে আশ্রয় নেয়। সেখান থেকে পরে খুনিরা বাসে করে ঢাকায় গিয়ে কাদের খানের ছত্রছায়ায় আত্মগোপন করে ছিল।

খুনের সময় ব্যবহৃত মোটরসাইকেলটি কাদের খানের নামে রেজিস্ট্রেশন করা এবং রেজিস্ট্রেশন ফি জমা করা হয়েছে এমডি আলী নামে, যা পুলিশ জব্দ করেছে।

অসমর্থিত একটি সূত্র জানায়, ডা. কাদের জাতীয় পার্টির বর্তমান উপজেলা সভাপতি এবং সংসদ উপনির্বাচনে দলের প্রার্থী ব্যারিস্টার শামীম হায়দার পাটোয়ারীকেও হত্যার পরিকল্পনা করেছিলেন। কিন্তু ওই খুনিরা রাজি না হওয়ায় কাদের খান সেই পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করতে পারেননি।

যেভাবে খুনিদের খুঁজে বের করা হয় : ডিআইজি প্রেস ব্রিফিংয়ে জানান, এমপি লিটনের খুনিরা গত ২ জানুয়ারি গাইবান্ধা-সুন্দরগঞ্জ সড়কে ধোপাডাঙ্গায় হত্যাকাণ্ডে ব্যবহৃত পিস্তলটি ব্যবহার করে ভয় দেখিয়ে ফাইম নামে এক যুবকের কাছ থেকে মোবাইল ফোন ও টাকা-পয়সা ছিনতাই করে। ছিনতাই শেষে তাড়াহুড়ো করে পালাতে গিয়ে পিস্তলের ছয় রাউন্ড বুলেটের ম্যাগাজিনটি তাদের অগোচরে রাস্তায় পড়ে যায়। স্থানীয়দের তথ্যের ভিত্তিতে পরে পুলিশ সেটি উদ্ধার করে। এ পিস্তলের বুলেট পরীক্ষা করে দেখা যায় এমপি লিটনের শরীরে বেঁধা বুলেট ও হত্যার ঘটনাস্থলে প্রাপ্ত খোসার সঙ্গে এটির মিল রয়েছে। পরে এ সূত্র ধরে খুনিদের আটক করা হয় এবং পিস্তলটির ব্লাস্টিক পরীক্ষার জন্য ঢাকায় পাঠানো হয়।

খুনিদের স্বীকারোক্তি : এমপি লিটন হত্যার ঘটনায় আদালতে ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছে কাদের খানের তিন সহযোগী। মঙ্গলবার সন্ধ্যার পর অতিরিক্ত চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট মইনুল হাসান ইউসুবের কাছে দেওয়া স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিতে তারা এ হত্যাকাণ্ডের মূল পরিকল্পনাকারী, অর্থ যোগানদাতা ও প্রশিক্ষণদাতা হিসেবে আব্দুল কাদের খানের নাম উল্লেখ করেছে।

এর আগে ওই দিন সকালে গাইবান্ধা শহরের ব্রিজ রোড এলাকা থেকে গ্রেপ্তার করা হয় এই তিনজনকে। তারা হলো সুন্দরগঞ্জ উপজেলার উত্তর সমস কবিরাজপাড়া গ্রামের আব্দুল করিমের ছেলে রাশেদুল ইসলাম ওরফে মেহেদী হাসান, উত্তর সমস বেকাটারি গ্রামের ওসমান গণির ছেলে শাহীন ও কাদের খানের গাড়িচালক বগুড়ার শাহজাহানপুর থানার কামারপুর গ্রামের আব্দুর রহমানের ছেলে হান্নান। এদের মধ্যে কাদের খানের বিশেষ আস্থাভাজন মেহেদী ঢাকায় সিএনজি অটোরিকশার চালক ছিল। এ ছাড়া শাহীন ঢাকায় গার্মেন্ট ফ্যাক্টরিতে কাজ করত। আর হান্নান কাদের খানের গাড়িচালক। গত এক বছর ধরে তারা কাদের খানের ছায়াসঙ্গী ছিল। তারা এলাকায় কাদের খানের ক্যাডার হিসেবে পরিচিত।

খুনিরা কাদের খানের পিস্তলটি ব্যবহার করেছিল বলে বিভিন্ন সূত্র থেকে নিশ্চিত হয়েছে পুলিশ। সুন্দরগঞ্জ থানার ওসি আতিয়ার রহমান বলেন, খুনিদের স্বীকারোক্তি মোতাবেক কাদের খানের পিস্তল ও বুলেট জব্দ করা হয়। কিন্তু ৫০ রাউন্ড বুলেট কিনলেও কাদের খান পুলিশকে মাত্র ১০ রাউন্ড বুলেট জমা দিতে পেরেছেন। বাকি ৪০ রাউন্ড বুলেটের হিসাব তিনি দিতে পারেননি। এ ব্যাপারে থানায় একটি মামলা হয়েছে।

অস্ত্রের খোঁজে কাদের খানের বাড়িতে ও পুকুরে তল্লাশি : লিটন হত্যাকাণ্ডে ব্যবহৃত অস্ত্রের খোঁজে সুন্দরগঞ্জের পশ্চিম ছাপড়হাটি খানপাড়া গ্রামে কাদের খানের বাড়িসংলগ্ন পুকুরে তল্লাশি চালানো হচ্ছে। গতকাল দুপুর দেড়টা থেকে শুরু হওয়া অভিযানে একটি পুকুর সেচে তল্লাশি চালানো হয়। এভাবে আরো দুটি পুকুর সেচে তল্লাশি চালানো হবে। এ তল্লাশি অভিযানে ফায়ার সার্ভিসের কর্মী ছাড়াও পুলিশ সদস্যরা উপস্থিত থাকছেন।

মামলার বাদী ও লিটনের স্ত্রীর সন্তোষ : ডিআইজির প্রেস ব্রিফিংয়ে উপস্থিত এমপি লিটনের স্ত্রী সৈয়দা খুরশিদ জাহান স্মৃতি ও মামলার বাদী বোন ফাহমিদা বুলবুল কাকলী খুনের রহস্য উদ্ঘাটিত হওয়ায় সন্তোষ প্রকাশ করেন। তাঁরা এ জন্য প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এবং এ হত্যার রহস্য উদ্ঘাটনে নিয়োজিত আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের ধন্যবাদ জানান। একই সঙ্গে তাঁরা পরিকল্পনাকারী ও খুনিদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানান।

বগুড়ার বাড়িতে ফের তল্লাশি : বগুড়া থেকে নিজস্ব প্রতিবেদক জানান, ডা. কাদের খানের বগুড়া শহরের বাড়িটিতে দ্বিতীয় দফা তল্লাশি চালিয়েছে পুলিশ। মঙ্গলবার বিকেলে ডা. কাদেরকে এ বাড়ি থেকে গ্রেপ্তারের পর এক দফা তল্লাশি শেষে রাত ১২টা থেকে ভোর সাড়ে ৪টা পর্যন্ত দ্বিতীয় দফা তল্লাশি চালানো হয়। গতকালও চার-পাঁচজন পোশাকধারী পুলিশকে সেখানে অবস্থান করতে দেখা যায়।

এমপি খুনের পরিকল্পনাকারী কাদের : আইজিপি

চট্টগ্রাম থেকে নিজস্ব প্রতিবেদক জানান, আওয়ামী লীগ দলীয় সংসদ সদস্য মঞ্জুরুল ইসলাম লিটন হত্যাকাণ্ডের মূল পরিকল্পনাকারী হিসেবে জাতীয় পার্টির সাবেক সংসদ সদস্য কর্নেল (অব.) আবদুল কাদের খানের নাম উল্লেখ করেছেন পুলিশের মহাপরিদর্শক এ কে এম শহীদুল হক।

আইজিপি গতকাল বুধবার চট্টগ্রাম নগর পুলিশ লাইন মাঠে নগর পুলিশের বার্ষিক ক্রীড়া প্রতিযোগিতা ও পুলিশ সমাবেশে প্রধান অতিথি হিসেবে যোগ দেন। সেখানে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে আইজিপি এ কথা বলেন। নেপথ্য কারণসম্পর্কিত এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘লিটনকে যদি সরিয়ে দেওয়া যায় তাহলে পরবর্তী নির্বাচনে নিজে এমপি হতে পারবেন—এমন আশা থেকেই কাদের খান খুনের পরিকল্পনা করে থাকতে পারেন। ’


মন্তব্য