kalerkantho


গাবতলী হাটে পা দিলেই টাকা চায় কাইলা মইজা!

নিজস্ব প্রতিবেদক   

২৩ ফেব্রুয়ারি, ২০১৭ ০০:০০



গাবতলী হাটে পা দিলেই টাকা চায় কাইলা মইজা!

নাম তার হাজি মজিবুর রহমান, তবে রাজধানীর গাবতলী পশুর হাটসংশ্লিষ্ট গরু ও মাংস ব্যবসায়ীদের কাছে তার পরিচিতি কাইলা মইজা নামে। ট্রাকচালক থেকে সে হয়ে উঠেছে গাবতলী হাটের অন্যতম নিয়ন্ত্রক।

শুধু গাবতলী নয়, ঢাকাসহ সারা দেশের গরু ও মাংস ব্যবসায়ীরা তার নাম শুনলে আতঙ্কে ভোগে। মাংস ব্যবসায়ীরা বলছে, অবস্থা এমন যে গাবতলী হাটে পা দিলেই কাইলা মইজাকে টাকা দিতে হয়। গত সপ্তাহে ধর্মঘট ডেকে সরকার ও প্রশাসনের কাছে চার দফা দাবি তুলে ধরে মাংস ব্যবসায়ীরা। তার তৃতীয় দফায় গাবতলী হাটকেন্দ্রিক কাইলা মইজার হুন্ডি ব্যবসার নিয়ন্ত্রণ ও হয়রানির অভিযোগ তুলে তার প্রতিকার চাওয়া হয়েছে।  

কাইলা মইজা (৪৫) সম্পর্কে খোঁজ নিয়ে চাঞ্চল্যকর তথ্য পাওয়া গেছে। গরুর ব্যাপারী ও মাংস ব্যবসায়ীরা বলছে, গাবতলী হাটকেন্দ্রিক অর্ধশত হুন্ডি ব্যবসায়ী ভারত থেকে গরু আনার ব্যবস্থা করছে। এই হুন্ডির হাজার কোটি টাকা নিয়ন্ত্রণ করে কাইলা মইজা। প্রতিটি গরু আনার জন্য তাকে পাঁচ থেকে ছয় হাজার টাকা হুন্ডির কমিশন দিতে হয়। হাটের ইজারাদারের সঙ্গে সখ্য গড়ে গরু ব্যাপারী ও মাংস ব্যবসায়ীদের জিম্মি করে সে।

গাবতলী গবাদি পশু ব্যবসায়ী সমিতির সভাপতি পরিচয় দিয়ে গরু ব্যাপারীদের হুন্ডির টাকা দিতে বাধ্য করে। এ ছাড়া হাটে ট্রাক আনা-নেওয়া এবং গরু ও চামড়া কেনাবেচাসহ সব ক্ষেত্রেই তাকে টাকা দিতে বাধ্য হয় ব্যবসায়ীরা। এরই মধ্যে কয়েকজন স্থানীয় ব্যবসায়ী তার বিরুদ্ধে থানায় সাধারণ ডায়েরি (জিডি) ও র‌্যাবের কাছে অভিযোগ করেছে। এমন ছয়টি সুনির্দিষ্ট অভিযোগের কথা জানা গেছে।  

তবে মজিবুর রহমান তার বিরুদ্ধে সব অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করে বলে, ‘আমিই পশু ব্যবসায়ী সমিতির সভাপতি। সব মাংস ব্যবসায়ীই আমার সঙ্গে আছে। যারা অভিযোগ করছে, তাদের মাংসের দোকানই নেই। নিজেরা চুরি করে অন্যকে চোর বলছে। এখানে অনেক বিষয় আছে। এসব ব্যাপারে বিস্তারিত কথা বলতে হবে। ’

অনুসন্ধানে জানা গেছে, গাবতলীর কোর্টবাড়ী এলাকার ফজল হকের ছেলে মজিবুর রহমান ওই এলাকার ১২৮ নম্বর বাড়িতে পরিবার নিয়ে থাকে। আশির দশকের শেষ দিকে গাবতলী এলাকায় ট্রাক চালানো শুরু করে সে। এখন সে কয়েকটি ট্রাকের মালিক, গাবতলী এলাকায় তার ইট-বালুর ব্যবসাও আছে। বাংলাদেশ আন্তজেলা ট্রাকচালক ইউনিয়নের ২০১১-১২ সালের নির্বাচনে মিরপুর বালুঘাট শাখার সভাপতি পদে প্রার্থী হলেও বিপুল ভোটে হেরে যায়।

মাংস ব্যবসায়ীরা বলছে, বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় গরুর হাট গাবতলীকেন্দ্রিক অন্তত অর্ধশত হুন্ডি ব্যবসায়ী আছে, যারা গরু ব্যাপারীদের কাছ থেকে টাকা নিয়ে ভারতে পাচার করে। এরপর হুন্ডির মাধ্যমে ভারতে টাকা পাঠিয়ে গরু আনার ব্যবস্থা করে দেয়। বিনিময়ে প্রতি গরুর জন্য এই হুন্ডি সিন্ডিকেটকে দিতে হয় পাঁচ থেকে ছয় হাজার টাকা। এ সিন্ডিকেটের প্রধান কাইলা মইজা। ভারত থেকে গরু আনে, এমন ব্যাপারীদের বাধ্যতামূলকভাবে তার হাতে টাকা দিতে হয়। এ ছাড়া তিনি হুন্ডি সিন্ডিকেট থেকে আলাদা কমিশনও পায়। এ টাকার ভাগ ইজারাদারসহ বিভিন্ন মহলে যায়।

বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের আমলে প্রভাবশালী চলচ্চিত্র অভিনেতা মনোয়ার হোসেন ডিপজলের সহযোগী হিসেবে গাবতলীতে অবস্থান তৈরি করে কাইলা মইজা। এক-এগারোর পর গাঢাকা দেয় সে। এরপর ছদ্মবেশে বেশ কিছুদিন ট্রাকও চালায়। ঢাকা-কুষ্টিয়া রুটের ট্রাক চালানোর সময় মেহের নামের এক হুন্ডির ব্যাপারীর সঙ্গে তার পরিচয় হয়। পরে তারা দুজন গাবতলী হাটের ইজারাদারকে হাত করে সেখানে নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করে। হাটের যত অবৈধ আয় আছে তার মূলে এই কাইলা মইজা। হাট ঘিরে ছোট ছোট অবৈধ দোকান বসিয়েও টাকা তোলে সে। বিদ্যুৎ বিলের টাকা ইজারাদারের দেওয়ার কথা থাকলেও সে সেই টাকা ব্যাপারীদের কাছ থেকেই আদায় করে। খড়, ঘাসসহ হাটের অন্য জিনিসপত্র বিক্রির ব্যবসাও আছে তার।

গাবতলী হাটকেন্দ্রিক ঢাকা গবাদি পশু ব্যাপারীদের একটি বড় সমিতি আছে, সদস্য প্রায় ৫০০। নিজেকে এ সমিতির সভাপতি দাবি করছে কাইলা মইজা। তবে মাংস ও গরু ব্যবসায়ীদের একটি অংশের দাবি, এ সংগঠনের সভাপতি আসলে আনোয়ার হোসেন মণ্ডল। সংগঠনের সাধারণ সম্পাদক আমজাদ হোসেন কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আমরাই সংগঠনের নেতৃত্বে আছি। অনেক আগে একবার কাইলা মইজা ছিল। এখনো সে ওই নাম ভাঙিয়ে খায়। ’

হাটসংশ্লিষ্ট একটি সূত্রের দাবি, ট্রাক চালানো শুরুর পর গরুর ট্রাকে ডাকাতির বেশ কয়েকটি অভিযোগ উঠেছিল কাইলা মইজার বিরুদ্ধে। সাত বছর আগে চট্টগ্রামের এক ব্যবসায়ীর পাঁচ ট্রাক গরু ডাকাতির মামলার আসামি সে। ১৯৮৮ সালে এক ডাকাতির ঘটনায় ধরাও পড়েছিল। গত বছরের ১৭ অক্টোবর হুমকির অভিযোগে রাজধানীর মোহাম্মদপুর থানায় তার বিরুদ্ধে জিডি করেন বাংলাদেশ মাংস ব্যবসায়ী সমিতির মহাসচিব রবিউল আলম। প্রতারণার অভিযোগে ২০০৯ সালের ২৯ জানুয়ারি তার বিরুদ্ধে সাভার থানায় জিডি করেন হাসেন আলী নামের আরেক ব্যক্তি। একই বছর দারুস সালাম থানায় তার বিরুদ্ধে জিডি করেন গাবতলী হাটকেন্দ্রিক ঢাকা গবাদি পশু ব্যাপারী সমিতির সাবেক সাধারণ সম্পাদক মজিবুর রহমান ওরফে আম মইজা। গত বছরের ১০ অক্টোবর একই থানায় কাইলা মইজার বিরুদ্ধে জিডি করেন বাংলাদেশ মাংস ব্যবসায়ী সমিতির সভাপতি গোলাম মর্তুজা মন্টু। হুমকি ও হামলার অভিযোগে ২০১৫ সালের ১৯ অক্টোবর ওই থানায় তার বিরুদ্ধে জিডি করেন গরু ব্যবসায়ী আনোয়ার হোসেন মণ্ডল। গত বছর র‌্যাব মহাপরিচালকের কাছে গাবতলী গবাদি পশু ব্যবসায়ী বহুমুখী সমবায় সমিতির পক্ষ থেকে মজিবুরের বিরুদ্ধে অভিযোগ করা হয়। চাঁদাবাজি ও হয়রানির প্রতিকার চেয়ে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনেও তার বিরুদ্ধে অভিযোগ করে ব্যবসায়ীরা।  

বাংলাদেশ মাংস ব্যবসায়ী সমিতির মহাসচিব রবিউল আলম কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘কাইলা মইজার কাছে গাবতলীর সব গরু ও মাংস ব্যবসায়ী জিম্মি। বেপারীদের কাছ থেকে টাকা হাতিয়ে নিয়ে হুন্ডি করে। তার বাইরে যাওয়ার উপায় নেই। ভয়ে কেউ কথা বলে না। হাটে পা দিলেই মইজাকে টাকা দিতে হয়। ’

তবে দারুস সালাম থানার ওসি সেলিমুজ্জামান বলেন, গাবতলী হাট থেকে তেমন অভিযোগ পাওয়া যায়নি। জিডির বিষয়ে তদন্ত হচ্ছে। সুনির্দিষ্টভাবে অপরাধের অভিযোগ পেলে অবশ্যই ব্যবস্থা নেওয়া হবে।


মন্তব্য